সাহিত্য

আছাব আলী গীতিসমগ্র

বাছিত ইবনে হাবীব প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৭-২০১৯ ইং ০০:৪৫:২৪ | সংবাদটি ১৫৭ বার পঠিত

একবার প্রুশিয়ার জনৈক রাজা বলে বসলেনÑ যদি সমস্ত পৃথিবীকে তোমার দাস বানাতে চাও, তাহলে সঙ্গীতচর্চা করো। আমাদের সঙ্গীতস¤্রাট কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘যৌবনের গান’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বনের পাখির মতো স্বভাব আমার গান করার। কারো ভালো লাগিলেও গাহি, ভালো না লাগিলেও গাহিয়া যাই।
জগৎ¯্রষ্টার ভূ-প্রকৃতিতে বৃক্ষ, বায়ু, জলরাশিতে সুর ও স্বরের বিপুল শ্রাব্য অস্তিত্ব আছে বলেই প্রকৃতির ইশকুলের ধ্যানমগ্ন শিক্ষার্থীরা পৃথিবীর মানুষের জন্যে রেখে যাচ্ছেন বিশাল সঙ্গীত সম্ভার। এ নিয়মে লালন শাহ, হাছন রাজা, রাধা রমন, শিতালং শাহ, সৈয়দ শাহ নূর, উকিল মুনশি, বাউল আবদুল করিমের পথ ধরে বহু সাধক সঙ্গীত প্রতিভার জন্ম হয়েছে বাংলা মায়ের বিপুলায়তন প্রকৃতির ঘরে।
আরবের আবহাওয়ায় জন্ম নেয়া সুফি মতবাদ পারস্য দেশে লালিত পালিত হয়ে পূর্বদিকে অগ্রসর হতে হতে বাংলাদেশে সিলেটে এসে বেশ শক্তভাবে ডাল-পালা মেলেছে তার আরেকটি তাজা প্রমাণ আমাদের আজকের আলোচ্য গ্রন্থ ‘আছাব আলী গীতি সমগ্র-১’।
বিগত তিন দশক ধরে সঙ্গীত রচনায় নিবেদিত লন্ডনে বসবাসরত সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দশপাইকা গ্রামের কৃতিসন্তান জনাব আছাব আলী বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বনামধন্য তালিকাভুক্ত গীতিকার। তাঁর পাঁচখানা গ্রন্থ সারেগামা ১ম খন্ড ২০০৪-সারেগামা ৫ম গ্রন্থ ২০১১ পর্যন্ত হাজারখানেক গানের বিশাল ভা-ার থেকে ৬৫৫টি বাছাইকৃত গানের কথা নিয়ে ‘তেরটি’ শিরোনামে প্রায় ২৭ ফর্মার ঢাউস গ্রন্থ আছাব আলী গীতি সমগ্র-১। এত রকমারি গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হচ্ছেÑ আল্লাহ স্মরণ, নবি স্মরণ, ওলি স্মরণ, পীর-মুর্শিদ স্মরণ, ভক্তিগীতি, নিগূঢ়তত্ত্ব, মনঃশিক্ষা, প্রেমতত্ত্ব ইত্যাদি। তবে এই বৈচিত্রময় গ্রন্থের মূল সুর হচ্ছে ভাববাদ বা মরমীবাদ। এই গীতিকার মর্মলোকের আবহাওয়াপুষ্ট চেতনায় ডুবে থেকে তাঁর প্রতিটি গীতের শব্দ-বর্ণের রূপ দান করার চেষ্টা করেছেন।
বিশ্বশ্রেষ্ঠ সূফী কবি মর্মলোকের শব্দ স¤্রাট জালাল উদ্দীন রুমী যেমনটি তাঁর মসনবী শরীফে বলেছেনÑ ‘সূর্যের আলো দেয়ালে পড়িয়া / দেয়াল উজ্জ্বল হয় / কোন সে বেকুব সূর্যেরে ছাড়ি / দেয়ালে মশগুল হয় ।’ বাংলাদেশে মরমী চেতনা, সাধনা ও ভাব সংগীতের সমন্বয়ে বাউল সঙ্গীতের যে উদ্ভব তারই একটি সহজ রূপ আছাব আলী গীতি সমগ্র ১-এ ফুটে উঠেছে। ভাববাদী গীতিকাররা সঙ্গীতের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের পথে এগিয়ে যান। এখানেই সূফীদের সাথে তাঁদের কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তবে, ভাববাদী দর্শনসিক্ত এই গীতিকারের ইহলৌকিক চেতনা সমৃদ্ধ অনেক গান এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।
¯্রষ্টাপ্রেমে অন্তলীন আছাব আলী মাবুদের কাছে নিজেকে সমর্পন করে লিখেছেন, ‘সয়ালের মালিক তুমি রে বন্ধু অন্তর্যামী সাঁই / তুমি ছাড়া মনের দুঃখ কইবার জায়গা নাই বন্ধুরে।’ (পৃ.৪০)
‘আছাব আলীর ভাঙা নৌকা পাপেতে বোঝাই / নিজগুণে ক্ষমা করো চরণে দাও ঠাই।’ (পৃ.৩৭)
‘আশিক আমি দেখতে মাশুক যমুনাতে যাই,
এগো না পাই ধরে কলসীর গলা কেঁদে বুক ভাসাই।’ (পৃ.৩২১)
মরমী কবিরা ¯্রষ্টাকে কখনো বন্ধু কখনো প্রিয়তমা কখনো কানাই বলে সম্বোধন করেছেন। গীতিকার আছাব আলীও তার ব্যতিক্রম নন। যেমনÑ‘অন্তর সাজাই প্রেম রঙে বন্ধুর রূপ দেখ।’ (পৃ.১২৭) গানটি আমাদের মরমী কবি হাছন রাজার কথা মনে করিয়ে দেয়, ‘আঁখি মুজিয়া দেখ রূপ রে আঁখি মুজিয়া দেখ রূপ।’
কবি ও গীতিকাররা বিধাতাকে মনমাঝি ও মানুষকে মনবেপারী সম্বোধন করে পরম তৃপ্তি অনুভব করেন। যেমনটি করেছেন আছাব আলীÑ ‘দমের ঘোড়া বান্ধ শক্ত করি / ও মনবেপারী / দমের ঘোড়া বান্ধ শক্ত করি / লা ইলাহা ইল্লাল্লায় / বাজাইয়া বাঁশরি, ও মনবেপারী।’
প্রেম ছাড়া জীবন যেমন অকল্পনীয় প্রেমহীন রচনাও তেমনটি অসম্ভব। আল্লামা রুমী বলেছেনÑ ‘নারীপ্রেমের মাধ্যমে যে প্রেমেরে সূচনা ¯্রষ্টাপ্রেমের মধ্য দিয়ে তার সমাপ্তি।’ গীতিকার আছাব আলীর ভাষায়, ‘প্রেম আমার সম্বল রে বন্ধু প্রেম আমার সম্বল / যার কারণে বারণ হয় না / দুই নয়নের জল।’
লেখক আল্লাহর রসুল প্রেমে মশগুল হয়ে ১৪টি গান এ গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। যেমন, ‘পুবাল হাওয়া রে তুমি যাওরে মদিনায় / আমার সালাম কইও গিয়া নবিজির রওজায়।’ মনে হয় যেন নজরুলের, ‘পুবাল হাওয়া পশ্চিমে যাও কাবার পথে বইয়া / যাও মদিনায় এই গরিবের সালামখানি লইয়া।’ গানটির শব্দের অদল-বদল মাত্র। অবশ্য আছাব আলীর আন্তরিক উপস্থাপনায় মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।
মুর্শিদপ্রেমে পাগল আছাব আলী তাঁর মুর্শিদ শাহ দামড়ি (রহ.)-কে নিয়ে রচিত ২১টি গান গ্রন্থটিতে স্থান দিয়েছেন। তিনি তাঁর মুর্শিদকে এভাবে আহ্বান করেছেন, ‘এসো বাবা নিজ গুণেতে প্রাণ জুড়াইয়া যাও সাক্ষাতে / ভক্তি দিয়া সিলসিলাতে আশায় রই পড়ি।’ (পৃ.৮৮) তবে কাজী নজরুল ইসলাম অত্যন্ত চমৎকারভাবে ‘মুর্শিদ’ শব্দের যথাযথ প্রয়োগে লিখে গেছেন, ‘তৌহিদেরই মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম / ঐ নাম জপলেই বুঝতে পারি খোদায়ী কালাম / মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম।’
মানবপ্রেম অন্যান্য গীতিকবিদের মতো আছাব আলীর অন্যতম অনুষঙ্গ। প্রিয়তমার উদ্দেশ্যে তাঁর দরদী নিবেদনÑ ‘তোমায় পেয়ে বুঝলাম কত সুন্দর এ জীবন / বাঁচতে ইচ্ছে করে যদি তুমি রও আপন গো তুমি রও আপন।’ মারিফাত বা নিগূঢ়তত্ত্বের ৪০টি গানে সমৃদ্ধ আছাব আলী গীতিসমগ্র ০১ পাঠে মনে হলো গীতিকার ইসলাম ধর্মের অন্তরঙ্গের খবর ভালোই রাখেনÑ ‘দোষ যদি করে থাকি দিও ক্ষমা করে / প্রাণের বন্ধু তুমি ভুলে যাইও না মোরে।’ (পৃ.১৬৯) প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ছে মহাগ্রন্থ আল কোরআনের আয়াত ‘ফাজকুরুনী আজকুরু কুম ওয়াশ কুরুলী ওয়ালা তাকফুরুন’। সুতরাং ‘তোমরা শুধু আমাকেই স্মরণ করো, আমিও তোমাদিগকে স্মরণ করবো। তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং কৃতঘœ হইও না ।’ (সূরা বাকারা : আয়াত ১৫২) উল্লেখ্য, গীতিকার এ গ্রন্থে ওলিস্মরণ পর্বে হযরত শাহজালাল (রহ.)-কে নিয়ে সুন্দর গান রচনা করেছেন। লিখেছেন মনঃশিক্ষা সঙ্গীত এমনকি ভাটিয়ালিও।
আছাব আলীর রচনা অত্যন্ত সহজ সরল। মনে হয় অতি সাধারণ থেকে প-িত পর্যন্ত সঙ্গীত পিপাসু মানুষের সু-খাদ্যের জোগান রয়েছে তাঁর প্রথম গীতিসমগ্রে। তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। তিনি একজন নিবেদিত গীতিকার। তাঁর সঙ্গীতগুলো আজকের বিশ্বের মরমী সঙ্গীত পিপাসুদের হৃদয়তৃষ্ণা পূরণে সক্ষম হবে বলে মনে হয়। বাউল স¤্রাট আবদুল করিমের পর এত নিবেদিত গীতিকার খুব বেশি আছেন বলে মনে হয় না।
এই গুণী গীতিকারের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে বলতে হয়, সৃজন ভুবনে সংখ্যাধিক্যতা কখনোই উৎকর্ষের মাপকাঠি নয় বরং প্রাচুর্যের ইঙ্গিতবাহী। আবার মৌলিক লেখকের ক্ষেত্রে সংখ্যাবাহুল্য উপেক্ষা ও নিষ্প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে সংখ্যাধিক্যতা সু-বিবেচনার দাবি রাখে। বাংলা সঙ্গীত জগতে এর অনুপম উজ্জ্বল উদাহরণ মরহুম কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আমরা জানি সৃষ্টির প্রাচুর্যের জন্যে হৃদয়নদীর উভয়কূলে অবিরাম ভেসে বেড়ান প্রতিভাবান লেখকেরা। গীতিকার আছাব আলীও তা-ই করেছেন। তবে তাঁর ক্ষেত্রে আরেকটু সংযতবাক হলে উত্তম হবে বলে মনে করি। শ্রদ্ধেয় গীতিকার আছাব আলীকে এমন কিছু ব্যতিক্রম সঙ্গীত রচনা করতে হবে যেগুলো শোনামাত্র বাউল, ভাব ও মরমী সঙ্গীত শ্রোতারা সহজেই ধরে নিতে পারেন এগুলো আছাব আলী রচিত সঙ্গীত।
২০১৮ সালে দেশজ প্রকাশনী থেকে আছাব আলী গীতি সমগ্র-১ প্রকাশিত হয়। প্রকাশনা সংস্থাকে ধন্যবাদ। এত বিশাল কলেবরের প্রায় নির্ভুল এ গ্রন্থটি পাঠকের সামনে উপস্থাপনের জন্যে। এর বিনিময় মূল্য গ্রন্থস্বাস্থ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়। সঙ্গীত পিপাসুদের সংগ্রহে রাখার মতো একটি সুন্দর গ্রন্থ। এই গীতিকারের সুস্থ সুন্দর দীর্ঘ কলমী জীবন কামনা করে শেষ করছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT