সাহিত্য

সৈয়দ শাহনূরের গান প্রসঙ্গ

কাউসার চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৭-২০১৯ ইং ০০:৪৮:১৪ | সংবাদটি ২১৩ বার পঠিত

সৈয়দ শাহনুর মুর্শিদের আস্তানা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে থাকেন। আল্লাহ প্রেমে মশগুল হয়ে তিনি গান গাইতে লাগলেন। আল্লাহভীরু লোকজন সৈয়দ শাহনুরকে খুব পছন্দ করেন এবং তাঁর ভক্ত হয়ে যান। কিন্তু সৈয়দ শাহনুর কোনো স্থানেই বেশিদিন থাকতেন না। ভারতের আসামের করিমগঞ্জ এবং বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় তিনি বসবাস করেছেন। যতœ সহকারে লোকজন সৈয়দ শাহনুরের বসতবাড়ীগুলোকে সংরক্ষণ করেন। এরকম ৫৪টি বাড়ীর অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়। সৈয়দ শাহনুর যে সকল এলাকায় বসবাস করেছিলেন তার মধ্যে সিলেটের জৈন্তাপুর অন্যতম। জীবন ধারায় এক সময় তিনি জৈন্তাপুরে ছিলেন বলে তাঁর গানের মধ্যেই প্রমাণ পাওয়া যায়। সৈয়দ শাহনুর বলেন-
‘সৈয়দ শাহ নুরে কইন, বইয়া জৈন্তাপুরে/ সকল যাইন মুর্শিদ বাড়ী আমি অধম দূরে’।
জৈন্তাপুরের পর তিনি সুনামগঞ্জ চলে যান বলে একাধিক গবেষক উল্লেখ করেন। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সৈয়দ শাহনুর অবস্থান করেন। বর্তমান দক্ষিণ সুনামগঞ্জের জামলাবাদ, দিরাইয়ের তাড়ল, ধল, কুলঞ্জ, তাহিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, জগন্নাথপুরের সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন এলাকা, বর্তমান সিলেট জেলার ওসমানীনগর উপজেলার ইশবপুরের নাম পাওয়া যায়। তবে তিনি বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার তৎকালীন ইটা পরগনার লামুয়া ও কদমহাটা, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের সৈয়দপুর ও হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের জালালসাফে বিভিন্ন সময়ে বেশি দিন অবস্থান করেন। জীবনের শেষ সময়ে জালালসাফেই ছিলেন সৈয়দ শাহনুর।
সৈয়দ শাহনুর তিনটি বিয়ে করেন বলে নিজের গানেই উল্লেখ করেছেন। বিয়ের ব্যাপারে সৈয়দ শাহনুর বলেন-
তিনবার নূর পাগলে শরীয়ত করিলু/ দুনিয়ার উপরে কোন পুতরু না পাইলু/ দুনিয়ার উপরে মুই পুতরু না পাইলু/ সে কারণে পরার পুতের যতন করিলু।
লেখক মুহাম্মদ ফয়জুর রহমান তার লেখা ‘আধ্যাত্মিক সাধক ও মরমী কবি সৈয়দ শাহনুর (র)’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে,-অনুসন্ধানে এ পর্যন্ত দুই বিয়ের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি মৌলভীবাজারের লামুয়া ও নবীগঞ্জের সদরঘাটে বিয়ে করেন। তবে নেত্রকোনায় তিনি আরেকটি বিয়ে করেছিলেন বলে শোনা যায়। মৌলভীবাজারের লামুয়া গ্রামে বিয়ের বিষয়টি তিনি তাঁর গানেই উল্লেখ করেন। সৈয়দ শাহনুর বলেন-
‘তুই শামে কলংকিনি কইলে মোরে/ কলংকিনি কইলে/ ধনি আল্লার কুদরত বাণী বুঝিতে না পারি/ উড়াল পঙ্খী হইয়া আমি ফান্দে বাজে মরি॥/ লাগিছে কাষ্ট পাট না লাগিছে মুড়া/ বিনা রশি এ দিল বান্দ না ছুটে যার জুড়া॥/ আনা সুতে বিনা পাটে কে বলিল দড়ি/ বিনা লোহায় বিনা কামারে পায় লাগিল বেড়ী॥/ মুরশিদ মুরশিদ ডাকি তুমি স্বর্গের চান্দ/ শাহনুরের পায়ে লাগিল শরিয়তের ফান্দ/ সৈয়দ শাহনুরে কইন শা’ মনজুর ঠাকুর/ কয়েদ ছাড়াইয়া রাখ বালক তোমার নুর॥
এ বিয়ের সন্তান ও স্ত্রীকে লামুয়ার শ্বশুরবাড়িতে রেখে তিনি সেখান থেকে চলে যান। পরে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের সদরঘাটের দেওয়ান মোঃ বসিরের প্রথমা কন্যা ছামিনা বানুকে বিয়ে করেন। ছামিনা বানু সব সময় সৈয়দ শাহনুরের সাথেই থাকতেন। ছামিনা বানু ছিলেন সিলেটের অন্যতম মহিলা কবি। ছামিনা বানু লিখেন-
‘কহে বিবি ছামিনা বানু শাহ নুরের তিরি/ মুর্শিদের লাগিয়া আমি দিবানিশি ঝুরি’।
সৈয়দ শাহনুর তিনবার বিয়ে করেন বলে নিজের গানে উল্লেখ করেন। গানে তিনি এও উল্লেখ করেন যে তিনি সন্তান লাভ করেননি। কিন্তু নবীগঞ্জের জালালসাফ ও জগন্নাথপুরের সৈয়দপুরে মৌলভীবাজারের লামুয়া ও নিচিনপুরে তার বংশধর বসবাস করছেন বলে বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হয় সন্তান লাভের পূর্বে বিয়ে ও সন্তান লাভ না করার বিষয়ে গান রচনা করেন। তবে সৈয়দ শাহনুর মছু নামের এক বালককে পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এক সময় পালক পুত্র মছু কোনো এক কারণে সৈয়দ শাহনুরের কাছ থেকে চলে গেলে তিনি খুব ব্যাথা পান। কি পরিমাণ ব্যাথা তিনি পেয়েছিলেন তা তার গানে উল্লেখ করেছেন তিনি। তিনি গানে বলেন-
‘তালিম হইতা আদমী আইন মুই আদমের গেছে/ কইয়া দিতু তালিম হও মছুর পাছে/ মুরিদ তালিম করিয়া বালক চলিয়া গেল দূরে/ দাগা করি ফকির হইছে দুজখের করিডর/ সৈয়দ শাহনুরে কইন কইলে নিরাশ/ মুরশিদের দাগা করি গেলে দুজখে মছুর বাস’।
সৈয়দ শাহনুরের জীবনীকার লিখেছেন : ‘সৈয়দ শাহনুরের পবিত্র জীবনধারার শেষাংশের অপরিহার্য চরিত্র হচ্ছে মন্দোদরী। প্রৌঢ় বয়সে দক্ষিণাবলী গ্রামে অবস্থানকালে পাশের বাড়ীর চন্ডালিনী গৃহবধু পীর সাহেবের আধ্যাত্মিক ক্রিয়াকর্ম অবলোকন করতঃ তার প্রতি চরম শ্রদ্ধাশীল হয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণের মানসে সংসার ত্যাগ করেন। এ মহিলার গৃহত্যাগ ও পীর সাহেবের আস্তানায় আসা-যাওয়াকে কেন্দ্র করে পীর সাহেবকে অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে’।
অনেকে লিখেছেন, ‘সৈয়দ শাহনুর মন্দোদরী নামক এক চন্ডালিনীর প্রেমে বিভোর হয়ে চাড়াল পাড়ায় থাকতেন। সৈয়দ শাহনুর তার গানের মধ্যেও চাড়াল পাড়ার প্রসঙ্গ এনেছেন। সৈয়দ শাহনুর বলেন-
‘আমার শা’নুর থাকইন চাড়াল পাড়া;/ পরান বন্ধু আ কালা/ আমার শা’নুর থাকইন চাড়াল পাড়া’।/ আবার আরেক গানে সৈয়দ শাহনুর বলেন-/ ‘কদমহাটা বিনেছিরি শানুরে না পাইলা বাড়ী/ শানুর থাকইন চাড়াল পাড়ার মাঝে’।/ কেউ কেউ লিখেছেন, ‘সৈয়দ শাহনুরের এক প্রেমিকার নাম মন্দোদরী’।
আবার কারো কারো মতে, ‘সৈয়দ শাহনুর মন্দোদরীকে বিয়ে করেছিলেন’। তবে সৈয়দ শাহনুরের জীবনীকার মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান মন্দোদরীকে সৈয়দ শাহনুরের বিয়ের বিষয়টি অসত্য বলে উল্লেখ করেছেন। সৈয়দ শাহনুর মন্দোদরীকে নিয়ে একটি গান লিখেন। গানের ভাবার্থ পর্যালোচনা করলে মনে হয় যে, সৈয়দ শাহনুর মন্দোদরীকে মেয়ে হিসেবে ধরে নেন। সৈয়দ শাহনুর তার গানে বলেন-
মন্দোদরী মাই গো/ তোমার বিলাই কেনে বান্ধনা/ তোমার বিলাইর যন্ত্রণা/ আমি সইতে পারি না/ ও সে ছিকা ভাঙ্গি/ খাইলো ননী গো/ তোমার বিলাইরে দিমু জেলখানা/ তোমার বিলাইর যন্ত্রণা/ আমি সইতে পারি না। -(অসমাপ্ত)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT