শিশু মেলা

মজার ছড়া লিখেন যারা

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৭-২০১৯ ইং ০০:১৫:১৩ | সংবাদটি ২৪৯ বার পঠিত

ছড়া শব্দটি উচ্চারণের সাথে সাথেই আমাদের মনের আয়নায় খুব সহজেই শিশুদের হাসিমুখ ভেসে ওঠে। আমাদের সাহিত্যের এক মজার অধ্যায় হচ্ছে ছড়া। আমাদের গ্রামে-গঞ্জে মুখে মুখে কতো ছড়া যে রচিত হয় তা অগণিত। কোনো কোনো মজার ছড়া মায়ের মুখ থেকে বেরিয়ে অনেক মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে যায় অনেক দূরের গ্রাম ও শহরে। ওইসব ছড়ার কে ছড়াকার তা অনেক সময় আর জানা যায় না। কারণ, ছড়াগুলো আর লিখিতরূপে মূল লেখকের পরিচয়ে পাওয়া যায় না। আবার অনেক ছড়া একসময় হারিয়ে যায়। ছড়াকার আছেন ছড়িয়ে সারা বাংলাদেশে। তবে আজ আমরা জানবো মজার ছড়া লিখেন কারা এই সিলেটে। সবসময় ছড়ার অর্থ বোধগম্য নাও হতে পারে। এতে খুব অসুবিধা নাই। তবে যে ছড়ার শব্দচয়ন শিশু মনে দোলা দেয় ও মা-বাবার হাসি পায় সেগুলিকে আমরা মজার ছড়া বলতে পারি। আর অর্থপূর্ণ মজার ছড়া হলে তো বলি, দারুন। মজাই মজা। আমাদের সিলেটের অনেক ছড়াকার সিলেটের বহুল প্রচারিত পত্রিকা দৈনিক সিলেটের ডাকসহ দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় ছড়া লিখে থাকেন। অনেকের আবার ছড়াগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আসুন দেখি স্বল্প পরিসরে এই সিলেটের ছড়াকারদের সাথে কতেটা পরিচিত হতে পারি।
আমাদের শিশুদের জন্যে ছড়া লিখে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন, কবি দিলওয়ার সহ আরো অনেকে। বাংলাদেশে এখনকার ছড়াকারদের কেউ কেউ মজার ছড়া লিখে প্রকাশিত হয়েছেন। আমরা এই সিলেটের অনেককে পাই যারা ইতিমধ্যে ছড়ার গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছেন। আবার অনেকে পত্রিকায় ছড়া নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছেন নিয়মিত। সিলেটে বইমেলা হলে দেখতে পাওয়া যায় সিলেটের প্রকাশনা স্টলে অধিক ছড়ার বই বিক্রি হয় এবং এসব ছড়াগ্রন্থ বেশির ভাগই সিলেট বিভাগের ছড়াকারদের। ছড়াকার সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী একজন স্বনামধন্য ছড়াকার। তাঁর ছড়ায় দেশ, প্রকৃতি ও মানুষের কথা উঠে এসেছে। আমাদের শিশুরা তাঁর ছড়া পড়ে শিখবে ও আনন্দ পাবে। তিনি শিশুদের জন্যে মজার ছড়া লিখেছেন, ‘ঈদের দিনে গাইছে পাখি/ ঈদের খুশির গান/ খোকা খুকুর মুখে ফোটে/ রাঙা আলোর বান। (ছড়া: ঈদের দিনে’)। এরকম ছড়া শিশুদের সহজে আকর্ষণ করে এবং মায়েদের মুখে আওড়াতে সহজ হয়। প্রিয় ছড়াকার অজিত রায় ভজন এর একটি ছড়া ‘রেলগাড়ি’ ঝুমঝুম রেলগাড়ি/ছুটে চলে পাহাড়ে/ সবুজের গালিচায়/ কি যে মায়া আহারে/ রেলগাড়ি ছুটে চলে/ বনে আর বাদারে,/ গুহা দিয়ে চলে যায়/ ভয় নেই আঁধারে।’ কি চমৎকার ছড়া। এ পর্যন্ত তাঁর দুটি ছড়াগ্রন্থ ‘পাখির মতো মেলব ডানা’ ও ‘স্মৃতির বাঁকে খুঁজি মাকে’ প্রকাশ হয়েছে। আমরা পাই সিলেটের জয়নাল আবেদীন জুয়েল লিখেন, ‘ভয় করি না কুমির ভালুক/ সিংহ-বাঘের থাবা,/ দৈত্যদানব যার কাছে যাই/ সেই হয়ে যায় হাবা।’ (ছড়া: ফুলের সাথে পাখির সাথে)। গাজী সাদিকুল হক শিশুদের দুরন্তপনা নিয়ে লিখেন, ‘রাত পোহালেই কত্তো নালিশ/আসতো মায়ের কাছে/তোমার ছেলে আম পেড়েছে/ওঠে আমার গাছে।/ কেউ এসেছে নালিশ নিয়ে/ ডাব নিয়েছে পেড়ে/ কারো নালিশ তোমার ছেলে/ খুব গিয়েছে বেড়ে।’ (ছড়া: ‘নালিশ’)। এই নিবন্ধের লেখক মোহাম্মদ আব্দুল হক এর প্রথম ছড়া প্রকাশ হয় দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকায়। তিনিও শিশুদের জন্যে ছড়া লিখেছেন, ‘আয়রে ছোটো আয়রে বড়ো/ আয়রে বুলবুলি/ আমার গাছে ফুল ফুটেছে/রঙিন ফুল তুলি।/ নাচি ছড়ায় বাঁচি ছড়ায়/ ছড়ার বাগিচায়/ কপালে টিপ গলায় মালা/ অদর মমতায়।’ (ছড়াগ্রন্থ: ‘ছড়ার বুলবুলি’)। সিলেটের এক বিশিষ্ট ছড়াকার কামরুল আলম। ইতিমধ্যে তাঁর বহু ছড়াগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ছড়ায় সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতা ফুটে ওঠে এবং শিশুরা এ থেকে আমাদের দেশীয় সবজির নাম লিখে নিতে পারে সহজে। তাঁর একটি ছড়া হলো, ‘কুমড়া কদুর দাম বেড়েছে/ দাম বেড়েছে ঝিঙেরও/দাম বেড়েছে তেল সাবানের/ হাতেরবালা রিঙেরও/ লাফিয়ে ওঠে পিঁয়াজ রসুল/ লাফায় দেখি গাজরে/ পান সুপারি লাফিয়ে লাগায়/ আঘাত কারো পাঁজরে।’ (ছড়া: দাম)। তোরাব আল হাবীব ছড়া লিখে সুনাম কুড়িয়েছেন। তিনি স্বাধীনতার মাস কবিতায় আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে লিখেন, ‘স্বাধীনতার মাস এলো ভাই/ স্বাধীনতার মাস/ এই মাসেতে মুক্তিসেনা/ যুদ্ধে করে চাষ।’ ছড়াকার দুলাল শর্মা চৌধুরী নিয়মিত সিলেটের পত্রিকায় ছড়া নিয়ে হাজির হন। তাঁর ছড়া, ’পাখি কেন উড়ে যায়/ দূর অজানায়/ প্রজাপতি কেন আসে/ ফুলের মেলায়।’ (ছড়া: প্রজাপতি কেন আসে)। তরুণ ছড়াকার নাজমুল হক চৌধুরীর ছড়া ‘আলোর দিশা’য় পাই, ‘ভোর বেলাতে জাগলে মাগো/ আমায় ডেকে দিও/ মুয়াজ্জিনের মধুর আযান/ আমার যে খুব প্রিয়/ সালাত আদায় শেষ হলে মা/ মন লাগে সব কাজে/ কোরআন-হাদিস রাখবো গেঁথে/ আমার হৃদয় মাঝে।’ সত্যি এমন ছড়া মন কাড়ে। ছড়াকার শাহ মিজানের ছড়া, ‘একুশ মানে রফিক, জব্বার/ সালাম ও বরকত/ একুশ মানে আমার ভাইয়ের/ রক্তে আঁকা পথ/ একুশ মানে চেতনা আর/ তাজা প্রাণের সাড়া/ একুশ মানে বীর সেনাদের/ লাল শোণিত ধারা।’ (ছড়া: একুশ মানে)। লুৎফুর রহমান তোফায়েলের ছড়ায় বাংলার প্রকৃতির ছবি ভেসে ওঠে, ‘শরৎ এলে নদীর তীরে/ ফুটে কাশের সারি/ তারই পাশে ছোট্ট গাঁয়ে/ আমার বসতবাড়ি/ মাথার ওপর শুভ্র মেঘে/ ঢাকা নীল আকাশ,/সবুজ গাছের ছাউনি ঘেরা/ গাঁয়ের চারিপাশ।’ (ছড়া: শরৎ এলে)। আকরাম সাবিত দারুন সব ছড়া লিখে শিশু ও বড়োদের মন জয় করেছেন। দেখুন তাঁর ‘সবাই মজা পাচ্ছে’ ছড়ার কয়েক লাইন/ এখানে, ‘বাঁদর পরে চাদর গাঁয়ে/ কুকুর পরে জাম্পার,/ ছাগল হলো পাগল দেখে/ বললো হেসে বাম্পার।’ এমন শব্দে গাঁথা ছড়া পড়লে সকলেই একবার হাসতে বাধ্য হবে। আমাদের এই সিলেটের এক তরুণ ছড়াকার মুয়াজ বিন এনাম। ইতিমধ্যে তাঁর সুনাম সিলেট ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর ‘আজান’ নামক ছড়াটি ধর্মীয় চেতনাবোধ সংক্রান্ত। কয়েকটি লাইন হচ্ছে, ‘আজান হলে শুনতে বলুন/কার না লাগে ভালো?/ শুনলে আজান মন থেকে সব/ দূর হয়ে যায় কালো।/ আজান নিয়ে তামশা করা/ নয়তো ভালো কাজ/ রুখতে এসব কলম নিয়ে/ তাই নেমেছি আজ।’ শিশুদের জন্যে এমনি সব মজার ছড়া ও শিক্ষণীয় ছড়া নিয়ে আমাদের সিলেটি ছড়াকার এখন বাংলা সাহিত্যে ভালোভাবে জায়গা করে নিচ্ছেন।
সিলেট বিভাগের সকল ছড়াকারদের নাম উল্লেখ করে শেষ করা যাবে না। আছেন সুনামধন্য শাহাদাত করিম, শাহাদাৎ বখত শাহেদ, এখলাছুর রহমান সহ আরো অনেক অনেক সম্মানিত জন। ছড়াকার মিনহাজ ফয়সল, আহমদ সোহেল, মাহমুদ পারভেজ, আহমদ জুয়েল, আবিদ সালমান, রুমান হাফিজ আরো আরো অনেক প্রকাশিত ছড়াকার আমাদের সিলেট বিভাগ জুড়ে আছেন। আমাদের শিশুরা তাঁদের ছড়ায় আনন্দ পেয়ে নেচে ওঠে এবং পাশাপাশি শিখে অনেক কিছু। আমি এখানে খুব অল্পই তুলে ধরেছি। আমি চেষ্টা করেছি যারা ছড়া লিখে আমাদের ছড়া সাহিত্যকে শিশুদের মাঝে আকর্ষণীয় করে তুলছেন তাঁদের স্মরণ করতে। আর অবশ্যই এ ব্যাপারে আমাদের সিলেটের পত্রিকাগুলো অনেক বড়ো ভূমিকা রাখছে। প্রতি সপ্তাহে শিশুদের জন্যে মজার মজার ছড়া ছাপিয়ে। আমরা অভিভাবকরা পত্রিকায় পড়ার পাশাপাশি শিশুদের জন্যে ছড়াকারদের মজার সব ছড়ার বই কিনে উপহার দিলে শিশুমন আনন্দিত হবে। শিশুদের আনন্দে বেড়ে ওঠার জন্যে চাই মজার ছড়া ও ছড়ার বই। শুধু শিশু নয়, বড়োরাও ছড়ায় খুঁজে পায় আনন্দ এবং সমাজ বাস্তবতা। বাংলাদেশে সাহিত্যের মাঠে সিলেটের ছড়াকাররা আর পিছিয়ে নেই।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT