ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৭-২০১৯ ইং ০১:১১:৪০ | সংবাদটি ১০১ বার পঠিত

সূরা : বাক্বারাহ
[পূর্ব প্রকাশের পর]
ইহুদীদের দাবি ছিলো দু’টি : এক. ইহুদীবাদ ইসলামের চাইতে শ্রেষ্ঠ। দুই. তারা মুসলমানদের শুভাকাক্সক্ষী। প্রথম দাবিটি তারা প্রমাণ করতে পারেনি। নিছক দাবিতে কিছু হয় না। এছাড়া দাবিটি নিরর্থকও বটে। কারণ, ‘নাসিখ’ (যে রহিত করে) আগমন করলে ‘মনসুখ’ (যাকে রহিত করা হয়) বর্জনীয় হয়ে যায়। তা উত্তম ও অধমের পার্থক্যের উপর নির্ভরশীল নয়। এই উত্তরটি সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত, এ কারণে আয়াতে তা উল্লেখ করা হয়নি। আয়াতে শুধু দ্বিতীয় দাবিটি নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। বিষয়বস্তুকে শক্তিশালী ও জোরদার করার উদ্দেশ্যে আহলে-কিতাবদের সাথে মুশরিকদের উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ মুশরিকরা যেমন নিশ্চিতরূপেই তোমাদের হিতাকাক্সক্ষী নয়, তাদেরকেও তেমনি মনে করো।
আনুষাঙ্গিক বিষয় :
‘মা নানছাখ মিন আয়াতিন আও নুনছিহা’Ñএই আয়াতে কুরআনী আয়াত রহিত হওয়ার সম্ভাব্য সকল প্রকারই সন্নিবেশিত রয়েছে। অভিধানে ‘নস্খ’ শব্দের অর্থ দূর করা, লিখা। সমস্ত মুসলিম টীকাকার এ বিষয়ে একমত যে, আয়াতে ‘নস্খ’ শব্দ দ্বারা বিধি-বিধান দূর করাÑঅর্থাৎ, রহিত করাকে বোঝানো হয়েছে। এ কারণেই হাদিস ও কুরআনের পরিভাষায় এক বিধানের স্থলে অন্য বিধান প্রবর্তন করাকে ‘নখ্স’ বলা হয়। ‘অন্য বিধানটি’ কোন বিধানের বিলুপ্তি ঘোষণাও হতে পারে, আবার এক বিধানের পরিবর্তে অপর বিধান প্রবর্তনও হতে পারে।
আল্লাহর বিধানে নসখের স্বরূপ : জগতের রাষ্ট্র ও আইন-আদালতে এক নির্দেশকে রহিত করে অন্য নির্দেশ জারী করার ব্যাপারটি সর্বজনবিদিত। রচিত আইনে ‘নস্খ’ বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। এক. ভুল ধারণার উপর নির্ভর করে প্রথমে যদি কোনো আইন প্রবর্তন করা হয়, তবে পরে বিষয়টির প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটিত হলে পূর্বেকার আইন পরিবর্তন করা হয়। দুই. ভবিষ্যত অবস্থার গতি-প্রকৃতি জানা না থাকার কারণে কোনো কোনো সাময়িক আইন জারি করা হয়। পরে অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে সে আইনও পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু এ ধরণের নস্খ আল্লাহর আইন হতে পারে বলে ধারণা করা যায় না।
তৃতীয় প্রকার ‘নস্খ’ এরূপ : আইন-রচয়িতা আগেই জানে যে, অবস্থার পরিবর্তন হবে এবং তখন এই আইন আর উপযোগী থাকবে না, অন্য আইন জারী করতে হবে। এরূপ জানার পর সাময়িকভাবে এই আইন জারী করে দেন, পরে পূর্বজ্ঞান অনুযায়ী যখন অবস্থার পরিবর্তন ঘটে, তখন পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইনও পরিবর্তন করেন। উদাহরণতঃ রোগীর বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দেন। তিনি জানেন যে, এই ওষুধ দু’দিন সেবন করার পর রোগীর অবস্থার পরিবর্তন হবে এবং তখন অন্য ব্যবস্থাপত্র দিতে হবে। অবস্থার এহেন পরিবর্তন জানার ফলেই চিকিৎসক প্রথম দিন এক ওষুধ এবং পরে অন্য ওষুধ দেন।
অভিজ্ঞ চিকিৎসক প্রথম দিনেই পরিবর্তনসহ চিকিৎসার পূর্ণ প্রোগ্রাম কাগজে লিখে দিতে পারে যে, দুদিন এই ওষুধ, তিন দিন অন্য ওষুধ এবং এক সপ্তাহ পর অমুক ওষুধ সেব্য। কিন্তু এরূপ করা হলে রোগীর পক্ষে জটিলতার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং এতে ভুল বোঝাবুঝির কারণে ত্রুটিরও আশঙ্কা থাকে। তাই ডাক্তার প্রথম দিনেই পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেন না।
আল্লাহর আইনে এবং আসমানী গ্রন্থসমূহে শুধুমাত্র তৃতীয় প্রকার নস্খই হতে পারে এবং হয়ে থাকে। প্রতিটি নবুওয়ত ও প্রতিটি আসমানী গ্রন্থ পূর্ববর্তী নবুওত ও আসমানী গ্রন্থের বিধান নস্খ তথা রহিত করে নতুন বিধান জারি করেছে। এমনিভাবে একই নবুওয়ত ও শরীয়তে এমন রয়েছে যে, এক বিধান কিছু দিন প্রচলিত থাকার পর খোদায়ী হেকমত অনুযায়ী সেটি পরিবর্তন করে তদস্থলে অন্য বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে। সহীহ্ মুসলিমের হাদিসে আছেÑ অর্থাৎ, এমন নবুওয়ত কখনও ছিলো না, যাতে নস্খ ও পরিবর্তন করা হয়নি। (কুরতুবী- বিধান পরিবর্তন সংক্রান্ত বিস্তারিত জানার জন্য উসুলে ফেকাহ দ্রষ্টব্য)।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT