ধর্ম ও জীবন

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় : স্নেহ-ভালবাসা

আখতার হোসাইন প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৭-২০১৯ ইং ০১:১৩:২৪ | সংবাদটি ৭০ বার পঠিত

ইমাম মাওয়ারদী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ¯েœহÑভালবাসা এমন একটি ভিত্তি যা দ্বারা মানুষের অবস্থা সংশোধন হয়। কারণ একজন মানুষকে অন্যরা কষ্ঠ দিতে চায়, তার উন্নতিকে হিংসা করে। আসলে প্রকৃত ভালবাসা একমাত্র আল্লাহর জন্য হয়ে থাকে। তাই সে যদি অন্যকে ভাল না বাসে এবং অন্যরা ও যদি তাকে ভাল না বাসে, তাহলে হিংসুকরা তার সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে যাবে। তার কোন উন্নতিই নিরাপদ থাকবেনা এবং তার জীবনে কোন শান্তি আসবেনা।
পক্ষান্তরে সে যদি অন্যকে ভালোবাসে এবং অন্যরাও তাকে ভালোবাসে, তাহলে এ ভালোবাসার বলে সে তার শত্রুদের প্রতিশোধ নিতে পারবে এবং জীবনে প্রশান্তি আসবে। এ যামানায় শান্তি আসা কঠিন, নিরাপদ হওয়া দুষ্কর সেটা ভিন্ন কথা। (আদাবুদ দুনয়া ওয়াদ দ্বীন,পৃষ্ঠা-১৪৮)
ড. আলী খলিল বলেন, মানুষের মধ্যে ¯েœহ-ভালবাসা, প্রীতি-সহানুভূতি মুসলিম স্বকীয়তায় সামাজিকতার একটি বৈশিষ্ট। এরমধ্যে একটি আকর্ষণীয় শক্তি আছে, যা সামাজিক কার্যাদি, পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে শক্তি, সঙ্গতির ক্ষেত্রে সুস্থতা, আর ঐক্যের ক্ষেত্রে আনন্দ সৃষ্টি করে। এক দলকে আরেক দলের সাথে বেঁধে রাখে।
এর দ্বারাই পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক নিরাপত্তাবলয় তৈরী হয়। রাহমাতুল্লীল আলামিন মানুষের সাথে ¯েœহ পরায়ন আচরণ করতেন এবং তাঁর প্রতি মানুষের উৎসাহিত করতেন। ইমাম মাওয়ারদির মতে, ¯েœহ-ভালোবাসা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত লোকদেরকে একত্রিত করে এবং সকল প্রকার অবমাননার হাত থেকে রক্ষা করে। (নাদরাতুন নাঈম, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৭৭)
পবিত্র জীবন বিধানে বলা হয়েছে, হে নবী! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি আপনাকে পৃথিবীবাসীর জন্য রাহমাত বা ¯েœহপরায়ন হিসেবে প্রেরণ করেছি। (সূরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)
আল্লামা জুরজানি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছার একটি উপায় হলো- ¯েœহ-ভালোবাসা। (আত্-তা’রিফাত, পৃষ্ঠা-৩৫)
আল্লামা থানভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, প্রিয় জিনিসের প্রতি মন ধাবিত হওয়াই হল ¯েœহ-ভালোবাসা। (কাশ্শাফ, ইস্তিলাহাতিল ফুনুন, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-১১৪)
আল্লামা রাগিব ইস্পাহানি বলেন, ¯েœহ-ভালোবাসা হলোÑ মমতা ও সহানুভূতির সাথে পরস্পর একত্রিত হওয়া। (মুফরাদাত, পৃষ্ঠা-২০)
¯েœহ-ভালোবাসার কারণ ও উপলক্ষ পাঁচটি। যথাÑ দ্বীন বা ধর্ম, বংশ, বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তা, ভালোবাসা এবং সদাচারণ। দ্বীন বা ধর্ম পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা এবং সম্পর্ক রক্ষা করার প্রতি উৎসাহিত করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন করনা, একে ওপরের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন কর না, পরস্পর হিংসা কর না বরং তোমরা সবাই ভাই ভাই হয়ে থাক। জেনে রাখ! কোনো মুসলমান অপর মুসলমানের সহিত তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েজ নয়। (নাদরাতুন নাঈম, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৭৮)
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের আদর্শের উপর পূর্ণ ঈমান আনে এবং সৎ কর্ম করে, দয়াময় প্রভু তাদের জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করবেন। (সূরা : মারয়াম, আয়াত : ৯৬)
বংশ প্রীতি ¯েœহ, আত্মীয়তার মায়া, স্বজনের মর্যাদাবোধ একে অপরকে সাহায্য করা এ ¯েœহ-ভালোবাসার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে এবং সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধা দেয়। বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তায় রয়েছে ¯েœহ-ভালোবাসার উপকরণ। আল্লাহ তা’য়ালা তাই বলেন, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য থেকে তোমাদের জন্য সঙ্গিনী সৃষ্ঠি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের নিকট শান্তি লাভ করতে পার। কেননা তিনি তোমাদের উভয়ের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এ কারণেই সম্পূর্ণ অপরিচিত, ভাষা ও জন্মস্থানের অনেক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও বিবাহ বন্ধনের সাথে সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়ে যায়। (সূরা : রুম, আয়াত : ২১)
ভ্রাতৃত্ব, ¯েœহ-ভালোবাসা তৈরির মাধ্যমে ইখলাস বা আন্তরিকতা এবং মনের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা সৃষ্টি করে। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন, মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা একে অপরের প্রতিহিংসা বিদ্বেষ না করে সংশোধন করে নাও। (সূরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)
একইভাবে সদাচরণ একে অপরের মধ্যে ¯েœহ-প্রীতি ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে, হৃদয়-মন্দিরে, দয়া-মমতাও সহানুভূতির উদ্রেক করে। ¯েœহ-মমতা এমন একটি গুণ যা প্রতিপক্ষকে বিচার করে না বরং বুঝার চেষ্টা করে। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শান্তি আনয়নে এর জুড়ি নেই। মুত্তাকী বা আল্লাহ সচেতন মানুষ হতে হলে তাক্বওয়া এবং সদাচারের গুণে গুণী হতে হবে। কারণ তাক্বওয়াতে রয়েছে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি আর সদাচরণে রয়েছে মানুষের সন্তুষ্টি। পবিত্র জীবন বিধানে তাই ইরশাদ হচ্ছে, আল্লাহ তা’য়ালা সদাচারীদের ভালোবাসেন। (সূরা : মায়িদাহ, আয়াত : ১৩)
তাই তোমরা ভালো কাজের মাধ্যমে অন্যায় কাজের জবাব দাও। (সূরা : মু’মিনুন, আয়াত : ৯৬)
এ বিশ্বভূমন্ডল মঙ্গলামঙ্গল, ভালো-মন্দ ও সৎ-অসতের আবাস ভূমি। যদি অপরাধ প্রবণতা তথা চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্টন ইত্যাদির জন্য সুশৃংখল দল গঠিত হয়ে পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতা করতে থাকে তবে তা বিশ্ব ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিতে পারে। তাহলে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারি। যা নিজেকে ধ্বংস করার সাথে সাথে বিশ্ব ব্যবস্থাকেও বানচাল করে দিতে পারে। যা বর্তমানে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে। এর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন মতবাদের ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে কিন্তু তা আদৌ কার্যকর হচ্ছে না বরং তা আরো বাড়ছে। মানবজাতির সংবিধানে এর প্রতিকার হিসাবে বলা হয়েছে, ‘সৎ কর্ম ও তাক্বওয়ার কাজে তোমরা একে অন্যকে সাহায্য কর। সাবধান! পাপ ও সীমালঙ্গনের কাজে একে অন্যকে সাহায্য করো না। আর প্রতিটি ব্যাপারে সৃষ্টিকর্তার অপার নিয়ামত ও তার শাস্তির কথা স্মরণ রেখ। মনে রেখো! তিনি কঠোর শাস্তিদাতা। (সূরা : মায়িদাহ, আয়াত : ১৬)
সৃষ্টির লক্ষ্যই হচ্ছে, শাস্তি দেয়া নয়, জীবের প্রতি অনুকম্পা করা। সুবিচার, ¯েœহ-ভালোবাসা ও অনুকম্পার দাবি হিসেবেই শাস্তি বা পুরস্কার দেয়া হয়ে থাকে। (সূরা : আল ইমরান, আয়াত : ১০৬)
শায়খ ইবনে আশুর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বে আরবের লোকেরা শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ এবং যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত ছিলো। আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে একশ’ বিশ বছর পর্যন্ত যুদ্ধ স্থায়ী ছিলো। তখনকার শাসকগোষ্ঠি ও বুদ্ধিজীবীরা বক্তৃতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও কাব্য জাতীয় বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ¯েœহ-ভালোবাসা, মায়া-মমতা স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু তারা সফল হননি। অবশেষে ইসলামের নবী ও তার সাহাবীরা শত্রু ও বন্ধু সবার সাথে সমান সদাচারণ, সৎকর্ম ও তাক্বওয়ার বাস্তবায়ন দেখিয়ে তাদের মধ্যে স্থাপন করলেন প্রেম-প্রীতি ও ¯েœহ-ভালোবাসা। দূরীভূত হলো সকল প্রকারের অশান্তি। ফলে সবাই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। সবাই ভাই ভাই হয়ে একে অপরের বন্ধুতে পরিণত হয়ে গেলেন। বংশের ভিন্নতা, স্থান ও মাতৃভূমির দূরত তাদের এই ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের পথে একটুও বাধা হয়ে দাড়ায়নি। জীবন বিধানে তার প্রতিধ্বনি আমরা শুনি। ‘তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলো, অতঃপর সৃষ্টিকর্তা তোমাদের হৃদয়ে ভালোবাসার সঞ্চার করে দিলেন। ফলে তোমরা তার অপার অনুগ্রহে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেলো। (সূরা : আল ইমরান, আয়াত : ১০৩)
¯েœহ-ভালোবাসার পুরস্কার ঘোষণা করে এ পৃথিবীর সর্বশেষ বার্তাবাহক মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের ময়দানে সাতটি দলকে তার নৈকট্যে তথা আরশের ছায়াতলে স্থান দিবেন। যখন তার এ ছায়া ছাড়া আর কোনো সাহায্যের ছায়া থাকবে না। তন্মধ্যে চতুর্থ দলটি হলো তারা যারা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসার জন্য একত্রিত হতো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হতো। (সহীহ বুখারী)
হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিসে নবীজী বলেন, তোমরা ততোক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবো না যতোক্ষণ না তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে। আর তোমরা বেশি বেশি করে সালামের প্রসার ঘটাও তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-১০০)
একটি ঘটনা বর্ণনার মাধ্যমে আলোচনার উপসংহার টানবো ইনশাআল্লাহ। ঘটনাটি হলোÑ এক ব্যক্তি দূরের একটি গ্রামে তার এক ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছে। এদিকে সৃষ্টিকর্তা মহান রাব্বুল আলামিন তাকে পরীক্ষা করার জন্য এক ফিরিশতা নিযুক্ত করলেন। তার চলার পথে এ ফিরিশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর বান্দা তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে বললো আমার অমুক ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। ফিরিশতা বললেন তোমার কোনো স্বার্থ নিয়ে যাচ্ছ? লোকটি উত্তর দিলো না। আমি শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য তাকে ভালোবাসি। আর এ ভালোবাসার টানেই তাকে এক নজর দেখতে যাচ্ছি। ফিরিশতা বললেন, আমি আল্লাহর অমুক দূত। এ বিষয়টি জানার জন্য আমি এসেছিলাম। জেনে রাখ! তুমি যেভাবে আল্লাহর জন্য তাকে ভালোবেসেছ। মহান আল্লাহও তোমাকে সেভাবে ভালোবাসেন। (সহীহ মুসলিম, মিনহাজুস সালিহীন, পৃষ্ঠা নং-২৯২)
আল্লাহ তা’য়ালা যেন আমাদের মধ্যে ¯েœহ-মমতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। এ ভুবন যেন পরম শান্তিতে ভরে উঠে। (আমীন)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT