ধর্ম ও জীবন

ন্যায়বিচার একটি ইবাদত

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৭-২০১৯ ইং ০১:১৪:১১ | সংবাদটি ১৮০ বার পঠিত

যে সকল কারণে আমাদের সমাজে অশান্তির অগ্নিশিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে সে কারণগুলোর প্রধান হচ্ছে আমাদের সমাজে ন্যায়বিচারের অভাব। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলেই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এ জন্য আল্লাহপাক সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বারবার ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছি, অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না। এটা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে’। (সূরা : সোয়াদ, আয়াত : ২৬)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে তুমি তাদের মধ্যে বিচার ফয়সালা কর’। (সূরা : মায়িদা, আয়াত)
বিচারকার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার উপরই গোটা সমাজের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের নাগরিকদের শান্তি, স্বস্তি ও নিশ্চিন্ততা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে। যে সমাজে বিচার ব্যবস্থা নেই, জনগণের ফরিয়াদ পেশ করার মতো কোনোস্থান নেই এবং তার প্রতিকার করারও কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেইÑতা পাশবিক সমাজ হতে পারে, তা কখনও মানুষের বসবাসযোগ্য সমাজ হতে পারে না। বিচার কার্য সুষ্ঠু ও সমুন্নতকরণ এমন একটি মহৎ কাজ, যার শিখরে মানবজাতির পদচারণা। বলা যায়, বিচারকার্য হাজার ইবাদতের চেয়েও একটি উত্তম ইবাদত। কেউ যদি একটি বিচারকার্য্য ন্যায় সঙ্গতভাবে সম্পন্ন করতে পারে, একটি ন্যায়বিচার করতে পারেÑতাহলে সে হাজার ইবাদতের সাওয়াব পাবে। এজন্যই বলা হয় ‘হাজার ইবাদত এক আদালত’। কেননা, আকাশ ও পৃথিবী যে ন্যায়পরায়ণ ভিত্তিতে টিকে আছে, সেই ন্যায়পরায়ণতা বিচারের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বয়ং মহান আল্লাহপাক নিজেকে একজন শ্রেষ্ঠ বিচারক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ইরশাদ হচ্ছেÑ‘তিনিই বিচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ’ (সূরা : আরাফ, আয়াত : ৮৭, সূরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮০)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ‘আপনি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক’ (সূরা : হুদ, আয়াত : ৪৫)
ন্যায়বিচার করা মহান আল্লাহর একটি অনন্য গুণ। এই মহান গুণটি মানুষের মধ্যে যার আছে তার এতোই মর্যাদা বেশি যে, এরূপ ব্যক্তি হাজার হাজার ইবাদত করে যে সাওয়াব পাবে, সে একটি মাত্র ন্যায়বিচার করে এর চেয়েও বেশি সাওয়াব পাবে। একজন ন্যায়বিচারকের এতো উচ্চ মর্যাদা যে, যার শান-মান বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না।
ন্যায়বিচার করলে হাজার ইবাদতের সাওয়াব পাওয়া যায়। এজন্য আল্লাহপাক মানুষের মধ্যে সর্বদা ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘আল্লাহপাক ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা অসৎকার্য ও সীমালঙ্ঘন, তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর’ (সূরা : নাহল, আয়াত : ৯০)
ইসলাম শুধু ন্যায়বিচারের ওপরই গুরুত্বারোপ করেনি, বিচারকের নির্দিষ্ট কয়েকটি গুণ থাকার শর্ত আরোপ করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং বিচারকার্য সম্পাদনের জন্যে কতিপয় নিয়মনীতি ও নির্দিষ্ট এবং কার্যকর করেছে এবং বিচারকের জন্যে তা অবশ্য পালনীয় করে দিয়েছে। একজন বিচারকের মধ্যে যেসব গুণ থাকাকে ইসলাম বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে সেগুলো হচ্ছেÑ১. পূর্ণ বয়স্ক হওয়া। ২. বিবেক বুদ্ধির সুস্থতা থাকা। ৩. তাকওয়ার অধিকারী হওয়া। ৪. পক্ষপাতহীন হওয়া। ৫. জন্মের পবিত্রতা। ৬. আইন সম্পর্কে পূর্ণমাত্রার জ্ঞান ও বিচক্ষণতা অর্জন করা। ৭. বিচারক পুরুষ হওয়া। ৮. বিচারকের স্মরণ শক্তির তীক্ষ্মতা, মেধা ও প্রতিভা বিদ্যমান থাকা। কেননা, বিচারক বিস্মৃতির শিকার হলে তার দ্বারা সঠিকভাবে বিচারকার্য সম্পাদন হতে পারে না। বিচারক পদের গুরুত্ব তার মর্যাদা ও তার দায়িত্ব, জবাবদিহির বিরাটত্ব সম্পর্কে রাসুল (সা.) অত্যন্ত কঠোরতা আরোপ করেছেন। হযরত বুরায়দা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘বিচারক তিন ধরণের হয়ে থাকে। তন্মধ্যে এক প্রকারের জন্য জান্নাত এবং দুই প্রকারের জন্য জাহান্নাম অবধারিত। সে বিচারক জান্নাতে প্রবেশ করবেন, যিনি সত্যটি উপলব্দি করেছেন এবং তদানুযায়ী বিচার করেছেন। সে বিচারক জাহান্নামে প্রবেশ করবে, যে সত্য উপলব্দি করেও বিচারের মধ্যে অন্যায় (জুলুম) করেছে। আর সে বিচারকও জাহান্নামে প্রবেশ করবে, যে অজ্ঞতার সাথে মানুষের বিচার করেছে এবং ভুল ফয়সালা দিয়েছে’ (আবু দাউদ, ইবনে নাজাহ, মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা-৩২৪)
বিচারের ক্ষেত্রে সাক্ষ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। সাক্ষ্য হলো বাদীর দাবির প্রমাণ এবং বিবাদীর পক্ষে বাদীর দাবি অস্বীকারের উপায়। বাদী যদি তার দাবি বিচারার্থে প্রমাণ করতে চায়, তাহলে তার দাবির পক্ষে সাক্ষ্য পেশ করতেই হবে এবং বিবাদী যদি সে দাবি থেকে নিষ্কৃতি পেতে চায়, তাহলে তাকেও সে জন্যে সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করতেই হবে। বিচার কার্যে উভয় পক্ষেরই সাক্ষ্য দেয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ। এ উভয় পক্ষের সাক্ষ্যদানে নিশ্চয়ই বিভিন্ন ব্যক্তিকে বিচারকের সম্মুখে উপস্থিত হতে হবে। গোটা বিচারের ব্যাপরটিই সাক্ষীর সাক্ষ্যদানের উপর নির্ভরশীল। সাক্ষী যদি সত্য সাক্ষ্যদান করে তবে বিচারকার্য সত্য ভিত্তিক হবে। আর সাক্ষী যদি মিথ্যা সাক্ষ্যদান করে, তাহলে নিঃসন্দেহে অবিচার হবে। একটি বিষয় সর্বান্তঃকরণে মনে রাখতে হবে, ন্যায়বিচার করলে যেমন হাজার ইবাদতের সাওয়াব পাওয়া যায় তেমনি সেই বিচারকার্যে সত্য সাক্ষাদান করলেও অনুরূপ হাজার ইবাদতের সাওয়াব পাওয়া যায়।
ইরশাদ হচ্ছেÑ হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের জন্য শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যাও, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাতা হিসেবে, যদিও সে সাক্ষ্য তোমাদের নিজেদের কিংবা পিতামাতার ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। সে সম্পদশালী হোক কিংবা দরিদ্র হোক। আল্লাহ উভয়ের যোগ্যতার অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচার করতে কামনার অনুগামী হইও না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বলো অথবা পাশ কাটিয়ে যাও তবে জেনে রাখ যে, তোমরা যা কর আল্লাহ তার সম্যক খবর রাখেন। (সূরা : নিসা, আয়াত : ১৩৫)
কোনো বিশেষ পক্ষের স্বার্থ রক্ষার জন্য মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতা নস্যাত হবে, অবিচার ও জুলুমই প্রবল হয়ে দাঁড়াবে। এ জন্য ইসলামে সাক্ষী কি রকমের লোক হতে হবে, সে বিষয়ে কয়েকটি জরুরি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। শর্তসমূহ হচ্ছেÑ ১. স্বাক্ষীকে প্রাপ্ত বয়স্ক হতে হবে। ২. তাকে অবশ্যই ঈমানদার হতে হবে। ৩. পূর্ণ ও সুস্থ বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন হতে হবে। ৪. চরিত্রবান হতে হবে। ৫. সাক্ষীকে সকল প্রকার দুষ্কৃতির অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে হবে।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সামাজিক শান্তির পূর্বশর্ত। একটি ন্যায়বিচার করলে হাজার ইবাদতের সাওয়াব পাওয়া যায়। হাজার ইবাদত এক আদালত। তাই ন্যাবিচার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসা আমাদের উচিত।

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • হাদীস সংগ্রহকারী ইমাম মুসলিম ও তিরমিজি
  • নবীজিকে ভালোবাসার দাবী সমূহ
  • বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র:)
  • জৈন্তা অঞ্চলে হিফজুল কোরআন পরিক্রমা
  • তাফসিরুল কোরআন
  • হাদীস সংগ্রাহক ইমাম বুখারী (রহ.)
  • জৈন্তা অঞ্চলে হিফজুল কোরআন পরিক্রমা
  • কুরআন চর্চা অপরিহার্য  কেন 
  • একদিন নবীজির বাড়িতে
  • বেহেস্তের সিঁড়ি নামাজ
  • দেন মোহর নিয়ে যত কথা
  • তাফসিরুল কোরআন
  • মানব সভ্যতায় মহানবীর অবদান
  • মানব সভ্যতায় মুহাম্মদ (সা.) এর অবদান
  • দেনমোহর নিয়ে যতো কথা
  •   উম্মাহাতুল মুমিনীন
  • ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম
  • তাফসিরুল কোরআন
  • রাসূল (সা.) এর প্রতি মুহব্বত ও আহলে বাইত প্রসঙ্গ
  • মহানবীর প্রতি ভালোবাসা
  • Developed by: Sparkle IT