পাঁচ মিশালী

লজিং জীবন

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৭-২০১৯ ইং ০০:৩১:১৫ | সংবাদটি ৬৯ বার পঠিত

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আমরা গোবিন্দগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় বিভিন্ন গ্রামে লজিং ছিলাম। ৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথমদিন থেকেই পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের কারণে দেশ ছিল উত্তাল। ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। ৪ঠা মার্চ রেডিও পাকিস্তানের নাম পরিবর্তন করে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ করা হয়েছিল। মজলুম জননেতা মৌলানা ভাসানী লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা প্রদানের প্রস্তাবসহ আন্দোলন সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছিল। বর্তমানে যেখানে শিশু পার্ক তার নাম ছিল তখন রেসকোর্স ময়দান। ৭ই মার্চ সেখানে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা শুনে সকাল থেকেই সেখানে মানুষের ঢল নেমে ছিল। সেদিন প্রতিটি অলিগলি ও রাস্তায় রাস্তায় বাঁশের লাঠি হাতে লক্ষ লক্ষ প্রতিবাদী মুক্তিকামী সাধারণ জনতা জড়ো হয়েছিল জাতির পিতার ভাষণ শোনার জন্য।
আমরা মফস্বল শহর ও গ্রামগঞ্জের স্বাধীনতায় উজ্জীবিত মানুষেরা তখন টেলিভিশন ছিল না বিধায় রেডিও হাতে নিয়ে বিভিন্ন বাড়িতে, মাঠে-ঘাটে, দোকান বা বাজারে জড়ো হয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। সেদিন সারাদেশের মানুষের একমাত্র লক্ষ্য ছিল রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ। সেদিন বাঙালির অভিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। আমি যদি হুকুম দিতে নাও পারি তোমরা সব কিছু বন্ধ করে দিবে, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো, এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
তখনকার সময় দেশের ৯৮ ভাগ মানুষ বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলন ও স্বাধীনতা ঘোষণার প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেছিল। তাই ৭ই মার্চের ভাষণ টিভির প্রচলন না থাকায় রেডিওতে শোনার জন্য মানুষ যে কী আগ্রহ, উৎকণ্ঠা ও গণজাগরণ ছিল, তা-না দেখলে শুধু অন্তর দিয়ে অনুভব করার নয়। সন্তানের জন্য মায়ের ভালোবাসাও সেদিন হার মেনেছিল কেননা অনেক মা সেদিন তার সন্তানকে নিজ উদ্যোগে আন্দোলন সংগ্রামেতো বটেই মুক্তিযুদ্ধে পাঠাতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। আসলে মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত জনযুদ্ধ। তাই যে যেখানে, যেভাবে সম্ভব, যা দিয়ে সম্ভব, লাঠিসোটা, বন্ধুক, হাতবোমা অথবা সাধারণ অস্ত্র দিয়েই শত্রুর মোকাবেলা করেছিল, যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল অথবা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগিতা করেছিল। পাকিস্তানী সেনারা সেদিন আমাদেরকে বাংলার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করার প্রত্যয় নিয়েই ২৫ মার্চের রাতের আঁধারে নৃশংস, জঘন্যতম ও নারকীয় আক্রমণ করে বর্বর গণহত্যা শুরু করেছিল যা জার্মানীর হিটলারের গণহত্যাকেও হার মানিয়েছিল। চরম এই গণহত্যা ও দুর্ভোগ পরিস্থিতিতে বাংলার প্রতিটি দেশপ্রেমিক জনতা ৭ই মার্চের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে শহর, বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে এমনকি প্রতিটি ঘরে ঘরে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
২৫শে মার্চের গণহত্যার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। গোবিন্দগঞ্জ অঞ্চলে তখন থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রতিরোধ প্রস্তুতি চলছিল। এমন আতঙ্কজনক পরিস্থিতিতে বহিরাগত ছাত্ররা স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষকবৃন্দের নির্দেশক্রমে আমরা নিজ নিজ এলাকায় চলে যাই। আমার বাড়ি ভারত সীমান্তের সন্নিকটে সুনামগঞ্জ জেলাধীন বর্তমান দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের বাঁশতলার নিকটবর্তী হওয়ায় দীর্ঘ নয় মাস আমরা মুক্ত এলাকাতেই স্বাধীনভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণসহ সক্ষম সকল নারী পুরুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিলাম। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে যারা প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নিতে যেতো আমরা তাদেরকে ভারতে আশ্রয় শিবিরে পৌঁছানো অথবা আমাদের মুক্ত এলাকায় আশ্রয় দিয়ে যতটুকু সম্ভব সাহায্য সহযোগিতা করেছিলাম।
আমরা মুক্তিযুদ্ধের ৫ম সেক্টরের অধীনে ছিলাম। আমার মরহুম পিতা আমাদের বাড়িতে জেড ফোর্সের নিয়মিত সৈনিকের একটি কোম্পানীকে থাকার জায়গা করে দিয়েছিলেন। সাবেক মন্ত্রী মরহুম মেজর জেনারেল মীর শওকত আলী বীরউত্তম ছিলেন ৫ম সেক্টরের অধিনায়ক এবং সহঅধিনায়ক ক্যাপ্টেন এএস হেলাল আহমদ ছিলেন উক্ত বাহিনীর কমান্ডিং অধিনায়ক। আমাদের বাড়ির পেছনের দিকে ৮/১০টি বড় বড় বাঁশের ঝাড় ছিল, সেই ছায়াঘেরা বাঁশের ঝাড়ের নীচে সুন্দর মনোরম পরিবেশে তাঁবু খাঁটিয়ে সৈনিকবৃন্দ অবস্থান করেছিল। সেখান থেকে ছাতক, দোয়ারাবাজার ও সুনামগঞ্জের কাছাকাছি অগ্রবর্তী বাহিনীর রসদ ও গোলাবারুদ ইত্যাদি সরবরাহ করা হতো এবং যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যাবতীয় প্ল্যান প্রোগ্রাম আমাদের বাংলাঘরে বসে করা হতো। ক্যাপ্টেন এসএন হেলাল উদ্দিন সাহেব আমাদের বাংলাঘরেই অবস্থান করতেন এবং মরহুম মীর শওকত আলী বীরউত্তম মাঝে মধ্যে আসতেন এবং যুদ্ধ পরিকল্পনা করে উভয়ই চলে যেতেন।
দীর্ঘ চার পাঁচ মাস অবস্থানের পর ডিসেম্বরের ১ম সপ্তাহে অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর ছাতক-সুনামগঞ্জ মুক্ত হওয়ার পর ছাতক হয়ে সিলেটের দিকে চলে যান। সিলেট চলে আসার পর হতে অদ্যাবধি উনাদের সাথে আমাদের মত সাধারণ মানুষের দেখা সাক্ষাৎতো দূরের কথা যুদ্ধ জয়ের মহিমান্বিত স্মৃতিটুকুও আজ হারিয়ে গেছে।
আমি নিয়মিত বা তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা না হলেও আমাদের বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর সেনা সদস্যসহ সিনিয়র অফিসারবৃন্দ থাকায় আমি তাদের সাথে প্রায়ই ছাতক, জোড়াপানি, সিমেন্ট কোম্পানী এবং দোয়ারাবাজার এলাকার বিভিন্ন যুদ্ধ ক্ষেত্রসমূহে আসা যাওয়া করতাম। একদিন রাত ১২-১টার দিকে ছাতক সিমেন্ট কোম্পানীর পাশে গেলে সেখানে অবস্থানরত রাজাকার ও পাক বাহিনীরা হঠাৎ করে গোলাগুলি আরম্ভ করে। আমি সাথের সেনা সদস্যদের নির্দেশ মত মাটিতে শুয়ে তাদের নির্দেশমত কাজ করতে থাকলাম। রাতের আঁধারে যুদ্ধক্ষেত্রের যে কি বীভৎস পরিবেশ ও ভয়ানক অবস্থা তা যারা সম্মুখ যুদ্ধে বেঁচে ফিরেছিলেন শুধু তারাই এহেন সত্যি ঘটনাটি উপলব্দি করতে সক্ষম। সেদিন গুড়ুম গুড়ুম মর্টারের শব্দ ও মেশিনগানের গোলাগুলির আওয়াজ আমার সামনে পিছনে পড়ে হৃদয়ে আতঙ্ক ও কম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল। কিশোর জীবনের সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার কথা মনে হলে আজও আতঙ্ক ও শিহরণ সৃষ্টি হয় ও মনকে নাড়া দেয়।
গোবিন্দগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে যারা অত্র এলাকার বিভিন্ন গ্রামে লজিং থেকে লেখাপড়া করতেন তাদের মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম হলেন জনাব আব্দুল মজিদ বীর প্রতীক, মরহুম গিয়াস উদ্দিন, মোঃ ফজর আলী, মোঃ মতলিব হোসেন, মরহুম মোঃ নুরুল হক, জনাব আলাউদ্দিন, আব্দুল মোছব্বির, আতাউর রহমান হিরণসহ আরও অনেকেই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল। আমিসহ অন্যরা বিভিন্ন আঙ্গিকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সহযোগিতা করেছিলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধে সুনামগঞ্জ মহকুমা ছিল জাতীয়ভাবে বিভক্ত সেক্টরসমূহের ৫ম সেক্টরের অন্তর্গত। পঞ্চম সেক্টর আবার ৬টি সাব সেক্টরে বিভক্ত ছিল। চেলা সাবসেক্টর ক্যাম্পটি ছিল বাংলাবাজার ইউনিয়নের বাঁশতলায়। ক্যাপ্টেন এসএন হেলালউদ্দিন বাঁশতলা সাব-সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি বাঁশতলা ওয়ার্ডের কুশিউরা গ্রামে আমাদের বাড়িতে উনার কোম্পানীর সেনা সদস্যগণকে নিয়ে প্রায় ৫-৬ মাস অবস্থান করেছিলেন। এবং এখান থেকেই যুদ্ধ পরিকল্পনা তৈরি করে ছাতক, দোয়ারাবাজার ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করতেন।
সুনামগঞ্জ জেলা তথা সুনামগঞ্জ মহকুমার ‘স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ’ মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে শেষ পর্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিল। তার সাথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল জেলার সংগ্রামী ছাত্র জনতা ও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল সীমান্ত ইউনিয়নসহ তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহকুমার হাজার হাজার মুক্তিপাগল মুক্তিযুদ্ধাবৃন্দ। বীরত্বগাঁথা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে গৌরবোজ্জল ভূমিকা রেখেছিলেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ইদ্রিস আলী বীর প্রতীক, মোঃ আব্দুল মুজিদ বীর প্রতীক ও আমাদের গ্রামের মোঃ নুরুল ইসলাম, আব্দুল হাসিম, জমির আলী ও মোহাম্মদ আলীসহ আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা। বারবার মোকাবেলা করেছিল ছাতক, দোয়ারা, গোবিন্দগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ অত্র অঞ্চলে অবস্থানকারী পাক-হানাদার বাহিনী ও কুখ্যাত রাজাকারদের সাথে। প্রতিদিন প্রাণপণ যুদ্ধ করে মুক্ত রেখেছে বাংলাবাজার, দোয়ারাবাজার, বাঁশতলা, নরসিংপুর, ছাতক ও সুনামগঞ্জের অধিকাংশ এলাকা। চেলা সাব সেক্টরের জেড ফোর্স অধিনায়ক ক্যাপ্টেন এএস হেলাল উদ্দিনসহ লে: রউফ, লে: মাহবুব সহ আরও অনেকেই ছিলেন সেই গৌরবময় কর্মের অংশীদার। উনাদেরকে ঘনিষ্টভাবে সহযোগিতা করেছেন ছাতক দোয়ারা অঞ্চলের তৎকালীন এমএলএ মরহুম আং হক, শামছুল হক, শহীদ চৌধুরী, বাংলাবাজার ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান মরহুম সামছুল ইসলাম ও আমার মরহুম পিতা হাফিজ হাসান উদ্দিনসহ অত্র অঞ্চলের সাধারণ জনগণ।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT