পাঁচ মিশালী

বস্তুবাদ ও বাস্তববাদ

সৈয়দ মুলতাজিম আলী বখতিয়ার প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৭-২০১৯ ইং ০০:৩১:৫৮ | সংবাদটি ১৪২ বার পঠিত

কায়িক শ্রম, মেধা ও বুদ্ধি বৃত্তিকতার সার্বিক প্রয়োগে হতাশা ও মনস্তাত্ত্বিক জড়তাকে দূরে ঠেলে দিয়ে দেহ ও মনের উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে বৈষয়িক উন্নতির চরম শিখরে আরোহনের সার্বিক কর্মপন্থা নানারূপে, নানা পদ্ধতিতে এবং বাস্তব হাজারো দৃষ্টান্তের অবতারণার মাধ্যমে সুলেখক ডাঃ লুৎফুর রহমান আজীবন তাঁর লেখনীর সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। রচনা করেছেন উন্নতজীবন, মহৎ জীবন, মানব জীবন, মহাজীবন, সত্য জীবন, যুবক জীবন, ধর্মজীবনের মতো কতো অনবদ্য গ্রন্থ। এগুলো কোন উপন্যাস কিংবা গল্প ধর্মী কোন রোমান্টিকতার প্রলেপ আচ্ছাদিত গ্রন্থ নয়; তবু এক নিঃশ্বাসে পাঠ শেষ না করে পাঠকের পক্ষে এর সঙ্গ ত্যাগ করা এক দুষ্কর ব্যাপার বৈকি। একটার পর একটা উপদেশের কথার মালা গেয়েছেন লেখক, আর সেই সাথে আছে জীবনে নানা ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনকারী বিশ্বের কতোশত মনিষীর জীবনের আকর্ষণীয় দৃষ্টান্তের অবতারণা। সব মিলিয়ে তার লিখায় আছে এক অনন্য সাধারণ ভাষা শৈলীর অপূর্ব ব্যঞ্জনা।
ডা: রহমান গত হয়েছেন প্রায় শতাব্দীকাল হতে চলছে। তিনি যে সময়টাতে লিখেছেন তখন ছিল বুর্জোয়া ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার পতনের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে শুরু হওয়া বলডেশিক রিজ্যুলিউশনের জয়-জয়কারের যামানা। সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে কমিউনিজমের উত্থান আর সমগ্র পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, জাজিরাতুল আরব ও উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার এক বিশাল অংশে মেহনতী মানুষের কর্মের স্বীকৃতি তথা তাদেরই কল্যাণার্থে এক গণমানুষের শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের যুগ। এই বিপ্লববাদিতায় অনুপ্রাণিত হয়ে-জরাসন্ধ লিখলেন তার বিখ্যাত ‘লৌহ কপাট’ উপন্যাস। আর, সাহিত্যিক সত্যেন সেনতো সরাসরি সেই শ্রেণি শত্রু খতমের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। কারামুক্তির পর লিখলেন তার বিখ্যাত ‘রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ’ উপন্যাস গ্রন্থখানি। তাঁর এই লিখাটি আমার ন্যায় অনেক কোমলমতি পাঠকের মনকেই রোমান্টিক বিপ্লববাদীতায় ছুয়ে যেত। রুশ সাহিত্যিক মাক্সিম গোর্কি লিখলেন তাঁর পৃথিবী বিখ্যাত ‘মা’ উপন্যাস। গোটা পৃথিবীর চিন্তাশীল মানুষ সে সময়ে তাদের সমস্ত মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিকতার রসায়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চেয়েছিলেন এক শোষণমুক্ত শ্রেণি শত্রু খতমের মাধ্যমে সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। আর, সেই সময়েই ডা. লুৎফুর রহমান কোন বিশেষ সমাজ কিংবা শ্রেণিকে নিয়ে কাজ না করে বরং ধনী নির্ধন নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক চেতনাকে জাগিয়ে তুলে উন্নত জীবনের লক্ষপানে ধাবিত হতে অনুপ্রাণিত করতে সর্বোতভাবে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে লিখার কাজে উৎসর্গ করলেন।
বস্তবাদী জীবন শিল্পী হিসেবে আমাদের দেশে মানিক বন্দোপাধ্যায় ও জহির রায়হান সমাধিক পরিচিত। তাদের লিখাগুলো উপন্যাস সাহিত্য হলেও পরোক্ষ এবং অনেকক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবেই অন্যায় অন্যায়কারী অত্যাচারী এবং সর্বোপরি দুর্বলের প্রতি সবলের অন্যায্য নিষ্পেষণ, যুগ যুগ যাবত চলে আসায় একে সমাজের চিরায়ত রীতি বলে যে সমাজ অবলীলায় মেনে নিয়েছিল; এ দু’জন তাদের লিখার মাধ্যমে সেই সব অন্যায়কারী ও প্রতিপত্তিশালী সমাজ ও অন্যায় জর্জরিত বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী সহ নিরব বাকরুদ্ধ বিপুল সংখ্যক জনমানুষের চিন্তার রাজ্যে নাড়া দিয়েছেন শক্ত হাতে, সর্বশক্তি দিয়ে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তারা তাদের মেধা বিচার ও বিবেচনা শক্তিরই প্রাধান্য দিয়েছেন পুরোভাবে।
নবম-দশম শ্রেণির ঘঞঈই (এন টি সি বি) এর বাংলা সাহিত্য বইয়ে খ্যাতিমান কথাশিল্পী ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ‘বাধ’ শিরোনামে একটি চমৎকার প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। জহির রায়হানের অন্তর্ধান ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পরে। সেই বাস্তবতার বিচার করলেও এ লিখাটি কম করে হলেও এখন থেকে অর্ধশতাব্দিকাল পূর্বে রচিত।
বাংলাদেশের আবহমান পরিবেশ, প্রকৃতি, বৈচিত্র্যময় মানুষের মনস্তত্ত্ব, আবহাওয়া ও জলবায়ুর বাস্তবতায় লিখা এ প্রবন্ধটিতে বলতে গেলে দেশের সিংহভাগ মানবগোষ্ঠীর কর্মধারা ও জীবনাচারের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি অংকিত হয়েছে সুনিপুণভাবে। হাওরে পানি ঢুকে যেন ফসল ধ্বংস না করে এর বাস্তব সমাধান হলো হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা। গল্পের মূল সংক্ষিপ্ত সার এভাবে যে, কোন এক প্রতিকূল বর্ষা মৌসুমে আকাশফাটা বৃষ্টি, মুহুর্মূহু বজ্রপাত আর অবিরাম বিদ্যুৎ চমকানো এবং ঢলের পানি বৃদ্ধি পেয়ে হাওরে প্রবেশ করে কৃষিজীবি গ্রামবাসীর জীবিকা ও ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণের একমাত্র মাধ্যম ফসল ধ্বংসের উপক্রম হলে গ্রামের যুবক ছেলেরা তাৎক্ষণিক পরামর্শের মাধ্যমে কোদাল আর মাটি বহনের ঝুড়িকে সম্বল করে নিয়ে বজ্রপাত, আকাশ চাঙ্গা বৃষ্টি আর বাতাসের সো সো গর্জনের ভীতিকে বিন্দুমাত্র মনে ঠাই না দিয়ে বরং অদম্য উদ্যমে বাঁধ নির্মাণে যৌথ কর্ম প্রবাহ বীর দর্পে চালিয়ে যেতে থাকে। পুরো রাত ব্যাপী কয়েক গ্রামবাসী যুবক ছেলেদের চলে বিরামহীন কর্মযজ্ঞ।
ঢলের পানির সাথে চলে তাদের কোদাল আর ঝুড়ির লড়াই। ঢলের পানি বেড়ে চলছে বিরামহীন গতিতে, যদি হাওরে এই পানি ঢুকতে পারে তবে হাজারো কৃষিজীবির নিয়তি পরাজিত হবে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কাছে। অন্যদিকে দামাল দুরন্ত কৃষক ছেলেদের একটাই পণ যেমন করেই হোক রাতের মধ্যেই বাধ নির্মাণ সমাপ্ত করে রুখে দিতে হবে প্রকৃতির তা-বকে। দামাল ছেলেদের সারা রাতের বিরামহীন যৌথশ্রম তথা কর্মপ্রবাহের কাছে এক সময় পরাজয় বরণ করে নেয় আষাঢ়ের প্রতিকূল প্রকৃতির সর্বনাশা তা-ব। তারা নির্মাণ করতে সক্ষম হয় সুউচ্চ বাঁধ। বর্ষার ঢলের পানি হাওরে প্রবেশ করতে পারে না, তারা জয় করে নেয় প্রকৃতির প্রতিকূলতাকে; আর রক্ষা পায় বিশাল হাওরের বিপুল পরিমাণ ফসল।
এই হচ্ছে গল্পের একটি দিক। অন্যদিকে গ্রামের অশিক্ষিত, অকর্মণ্য অলস, কর্মবিমুখ আর ধর্মান্ধ শ্রেণির লোকেরা প্রকৃতির রুদ্রতা-ব থামাতে দূর গ্রাম থেকে তাদের বহুল শ্রদ্ধা ও সমীহের পাত্র পীর দরবেশ খ্যাত আর এক অর্ধশিক্ষিত ভন্ড ধর্মজীবিকে গ্রামে নিয়ে আসে। তাদের অজ্ঞতা ও মূর্খতার সুযোগকে পূঁজি করে ষোলকলায় কাজে লাগায়- সেই ভ-পীর ধর্মজীবি। গ্রামের সেই সব লোককে নিয়ে সারারাত মসজিদে উচ্চস্বরে জিকির আজকার করে সে। উচ্চকন্ঠে দোয়া দরুদ করে। সকালে হাওরে ফসল রক্ষা পেলে তার অনুসারীরা এটি তাদের সেই ‘পীর সাহেবের’ কেরামতি ও অলৌকিক ক্ষমতা বলে সমস্ত অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করে এবং তাদের সেই বিভ্রান্তিকর বিশ্বাসকে গ্রামময় প্রচার করতে থাকে। কর্মঠ মানুষের প্রাণান্তকর পরিশ্রম তাদের চোখে পড়ে না। শ্রম ও কাজের মাধ্যমে মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে পারে, এ শিক্ষা তারা কখনো পায়নি; এমনটি তাদের বিশ্বাস ও ধারণায় নেই।
শ্রম ও সাধনাই মানুষকে উন্নতির উচ্চ শিখরে তুলে দেয়, নিরন্তর প্রচেষ্টায় বাঁধ নির্মাণ করলে হাওরে ফসল রক্ষা পায় এ হলো শ্রমশীল মানুষের বিশ্বাস। এ বিশ্বাসই বাস্তব বলে আমরা বিশ্বাস করি। এ সত্যের উপর ভিত্তি করেই অনন্তকাল যাবত মানুষের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় পৃথিবী বর্তমান রূপের উপর এসে দাঁড়িয়েছে। তৃতীয়ত: পরিবেশ প্রতিবেশ তথা সামগ্রিক বিশ্ব পরিক্রমা অদৃশ্য শক্তির ইচ্ছার প্রতিফলনে পরিচালিত হয়, এটি চর্মচক্ষুর পর্যবেক্ষণের বাইরে হলেও বিবেক ও গবেষণালব্ধ সত্যের বাইরে নয়। ইন্দ্রিয়ের শক্তি সীমাবদ্ধ, আর এখানেই ইন্দ্রিয়ের ব্যর্থতা।
অলস কর্মবিমুখ কোন কর্মজীবির শুধুই আল্লার কাছে প্রার্থনার যেমন কোন মূল্য নেই, (কাজ ব্যতিরেখে) অনুরূপভাবে যিনি বিশ্বাস করেন বস্তুর উর্ধ্বে কিছু নেই, যা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তাই বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য, আর যা ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতার বাইরে বলে অস্তিত্ব প্রমাণিত নয় বলে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না; আমরা মনে করি এ জাতীয় ধারণাও ঠিক একইভাবে যেমন বিজ্ঞান ভিত্তিক নয়, তেমনি ধর্মতাত্ত্বিক গবেষণায়ও এমনটি নিশ্চয়ই স্বীকৃত নয়।
মানুষ জ্ঞান বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করে সাধনা ও গবেষণার মাধ্যমে জীবন চলার পথ বাছাই করবে এবং তা বাস্তবে চালু করবে। এতে যা কিছু ভুল ধরা পড়বে তা সংশোধন করবে, আর এভাবেই পরীক্ষা ও ভুলের সংশোধনের মাধ্যমে সভ্যতা এগিয়ে চলবে। বস্তুবাদের সাথে একই সমান্তরালে এটি পাশ্চাত্য সভ্যতার আর একটি দর্শন যার বাংলা শাব্দিক অর্থ দ্বন্দ্ব বাদ (ফরধষবপঃরংস)। ধর্মবিশ্বাসী মানুষেরা বিশেষত: ইসলাম ধর্মানুসারীরা এ বিশ্বাস নিয়ে ফবারহষ মঁরফবহপব কে স্বীকার অস্বীকারের মুখোমুখি অবস্থানে নিজেদের কখনো দাড় করাতে চায় না। কারণ এটি তাদের ঈমান ও আকিদার সম্পূর্ণ বিপরীত।
ডা: লুৎফুর রহমান ‘কর্মই জীবন কিংবা জীবনই কর্ম’ এ বিশ্বাস নিয়ে তার কর্ম প্রবাহ চালাতে গিয়ে কখনো বস্তুবাদ কি দ্বন্দ্ববাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এমনটি কখনো মনে হয় না।
আসলে ডা: লুৎফুর রহমান কিংবা মানিক বন্দোপাধ্যায়ের সময়টাই ছিল একদিকে রুশ বিপ্লবের স্বর্ণযুগ আর একই সাথে বিশ্বের মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলোতে পশ্চিমা সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তিগুলো সংক্রমণের মোক্ষম মাহেন্দ্রক্ষণ। আত্মবিস্তৃত মুসলিম জনগোষ্ঠী তখন বিশ্বে নিজেদের অবস্থান ইজ্জত ও সম্মানের সাথে টিকে থাকার দলিল কুরআনুলকারীমের অনুধাবনের পরিবর্তে কেবলই সওয়াবের নিয়তে তিলাওয়াত আর কুরআনের বিভিন্ন সুরা তেলাওয়াতের আমল সৃষ্টির মাধ্যমে পার্থির সফলতা অর্জনের চিন্তার জগতে নৈরাজ্যে নিপতিত বিকারগ্রস্ততা। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান বঞ্চিত বিপুল সংখ্যক মানুষের মনকে এ অবস্থা ধর্মসম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। এই নেতিবাচক অবস্থার কারণেই বাংলাদেশে এক সময় ইসলাম ফোবিয়ার সৃষ্টি হয়। আর বস্তুবাদীরা বাস্তব জগৎ থেকে নিজেদের নির্বাসিত করেন দূরে বহু দূরে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT