সাহিত্য

সৈয়দ শাহনুরের গান

কাউসার চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৭-২০১৯ ইং ০১:১৬:১৭ | সংবাদটি ৮৭ বার পঠিত

(পূর্ব প্রকাশের পর)
প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক ড. মুহাম্মদ সাদিক লিখেছেন, ‘মন্দোদরী এবং চাড়াল পাড়া নিয়ে সৈয়দ শাহনুরের জীবনে যে কিংবদন্তী আছে তা আজও রহস্যময়। সৈয়দ শাহনুর ও মন্দোদরীর সম্পর্ক মরমি ঘরানার এক মৌলিক মহা-আখ্যান হিসেবে সিলেটের ফকির সমাজে এক কিংবদন্তি।
সুফী সাধক হযরত সৈয়দ শাহনুর ‘নুর নছিহত, রাগনূর, নূরের বাগান, মনিহারি ও সাত কন্যার বাখান’ নামের পাঁচটি অমর গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর বহুল প্রচলিত এবং গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হচ্ছে সিলেটী নাগরী লিপিতে রচিত ‘নূর নছিহত’। তাঁর এই গ্রন্থে সৃষ্টিতত্ত্ব, নূরতত্ত্ব, রহস্যময় পই-প্রবাদ ছাড়াও বিপুল সংখ্যক মরমী সংগীত রয়েছে। বাঙ্গালার বৈষ্ণভাবাপন্ন মুসলমান কবির পদমঞ্জুষা গ্রন্থে তাঁর ২০টি গান ছাপা হয়েছে। এছাড়াও শ্রীহট্টের লোকসংগীত, সিলেট বিভাগের পাঁচশ মরমী কবি ইত্যাদি গ্রন্থে তার গান সংকলিত হয়েছে। আব্দুল জব্বার কর্তৃক শাহানুর গীতিকা গ্রন্থে তাঁর ৪৮টি গান মুদ্রিত হয়েছে। কিন্তু সৈয়দ শাহনুরের ‘নূর নছিহত’ গ্রন্থটি অদ্যাবধি সিলেটী নাগরী কিংবা বাংলায় মুদ্রিত হয়নি।
সৈয়দ শাহনুর এর ‘নুর নছিহত’ রচনা শেষ হয় (১২২৬ বাংলা সনের ভাদ্র মাসে) ১৮১৯ সালে। এর এক বছর আগে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এর প্রায় পাঁচ বছর পর জন্মগ্রহণ করেন কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এর প্রায় উনিশ বছর পর বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন। সৈয়দ শাহনুর মৃত্যুঞ্জয় ও রামরাম বসুর সমসাময়িক লোক। ১৭৩০ সালে তাঁর জন্ম যখন বাংলা গদ্য আঁতুড় ঘরে লালিত পালিত হয়ে একটু একটু করে বর্ধি হচ্ছে।
নুর নছিহতের ভূমিকায় সৈয়দ শাহনুর বলেছেন :-
‘‘নুর নছিহত পুঁথি শাহনুর বান্দে,/ নেড়া লুড়িয়া নুরে এ পুঁথি কান্দে। / ধান দাইয়া যেই মতে কিরানে লইয়া যায়,/ নেড়ার মাঝে লুড়িয়া যেমন দুখিজন খায়। / সকল ফকিরে যবে পুঁথি রচিয় ছিলা,/ আনামত যত কথা লেখিয়া পালাইলা। / ধান দাইয়া ঘরে নিলা ভরা কিডা পাইয়া,/ পীর মুর্শিদের বন্দে মুই নেড়া লুড়িয়া আইলু। / চান্দ মঞ্জুরের মেহেরবাণীয়ে মুই পুঁথি রচিলু ॥
সৈয়দ শাহ নুর ‘নুর নছিহত’ রচনা করলেও গ্রন্থটি প্রকাশ-মুদ্রণ বা ছাপাতে অসম্মতি দেন। সৈয়দ শাহনুরের অসম্মতি থাকায় আজো ‘নুর নছিহত’ একত্রে প্রকাশ হয়নি। সৈয়দ শাহনুর এ প্রসঙ্গে গানের মধ্যেই বলেন-
‘কেও যদি চায় এই পুঁথি লেখিবার। / ছারা লেখিয়া পুথি করহ সমার ॥/ পয়ার থইয়া যেই, রাগ নিত চাইব।/ নিশ্চয়ই জানিও তার রুহ ছিয়া হইব ॥/ তবে যদি কেউ চায় ভাংগিয়া লিখিবার। / আউয়ালে আখেরে সে হৈব গুনাগার ॥
‘নুর নছিহত’ সম্পর্কে ভারতের ন্যাশনাল পাবলিশার্স- আসাম থেকে প্রকাশিত ড. আব্দুল মুসাব্বির ভূইয়া’র জালালাবাদী নাগরী-এ ইউনিট স্ক্রিপ্ট এন্ড লিটারচার অব সিলেটী’ গ্রন্থের এক জায়গায় বলা হয়, ‘এতে কবি দেহ ও মনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। এই সম্পর্ক জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার-ইহ জগতের সাথে পারলৌকিক জগতের। সার্বিক বিবেচনায় গ্রন্থটি সাধারণের জন্য রচিত হয়নি। গ্রন্থটি তাদের জন্য যারা একান্তভাবে ঈশ্বরের জন্য নিবেদিত’। ড. আব্দুল মুসাব্বির উক্ত গ্রন্থে আরো উল্লেখ করেন যে, ‘আমাদের হাতে নুর নছিহত এর সম্পূর্ণ ও খন্ডিত মিলিয়ে প্রায় পনেরোটি পান্ডুলিপি রয়েছে। নুর নছিহত মুদ্রিত না হওয়ার বিষয়ে তার সিলসিলার ফকিররা বলে থাকেন, ‘এতে নিষেধ রয়েছে’। নুর নছিহত গ্রন্থে শুধু তত্ত্বকথা, পই এবং মরমী সংগীত ছাড়াও কৃষি ও গার্হস্থ্য বিষয়ক দৈনন্দিন জীবনের অনেক নীতিকথা, শুভাশুভ, জাগতিক ও আধ্যাত্মিক দিক নির্দেশনাও আছে’। গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিকের এক লেখায় এই তথ্য পাওয়া যায়।
‘নুর নছিহত’ কে অপ্রকাশিত সিলেটী নাগরী পুঁথি উল্লেখ করে বলা হয়, সৈয়দ শাহনুর মজুফ ফকির ছিলেন। নুর নছিহতকে (১) পরমাত্মার রূপ ও সন্ধান, (২) দেহ ও আত্মা এবং (৩) লোকশিক্ষা- এই তিন ভাগে ভাগ করা যায়। গবেষক চৌধুরী গোলাম আকবর উপরোক্ত তথ্য উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন-নুর নছিহতে ২৭৩ পৃষ্ঠা রয়েছে। এতে ২৭টি পয়ার ও ২১৩টি গানের মাধ্যমে কবি ‘তন’ ‘মন’ ‘জীবাত্মা’ ‘পরমাত্মা’ ‘নবী’ ‘রসুল’ ‘মুরীদ’ ‘মুরশিদ’ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের তরজমা করেছেন।
সৈয়দ শাহনুর তার সৃষ্টিকর্তার প্রেমে কতো পাগল ছিলেন তা লেখায় অনুধাবন করা যায়। সৈয়দ শাহনুর লিখেন-
(১) ঘরে ঘরে ফিরি আমি মাঙ্কুর ভিখারী;/ ভিখারী হইলাম আমি যাহার লাগিয়া;/ তারে না ভজিতে পারি মন গুমানী হইয়া ॥ (২) বন্ধুরে দিবানিশি ঝুরিয়া মরি তুই বন্ধুর লাগিয়া/ রাইতে দিনে চাইয়া থাকি পন্থ নিরিখিয়া। (৩) তনের মাঝে আছে আল্লাহ্ কে বুঝিব লীলা। / যাদের ঘোড়া ছওয়ার হইয়া আসে আর যায়। / আঙ্খির নিকটে থাকে কেহ নাই পায়। (৪) যে বলে বন্ধুর কথা তার দিকে যাই/ মস্তকে মস্ত মারি ভূমিতে লুটাই। (৫) লাহল দরিয়ার মাঝে পরান বন্ধুর খেলা,/ ধরিমু ধরিমু করি বেরথা জনম গেলা। / জলকেলী করিয়াছে আশিক আর মাশুক ॥
সৈয়দ শাহনুরের প্রতিটি কবিতাংশে আল্লাহর প্রেমের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। নানাভাবে আল্লাহর অস্তিত্বের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহকে মাশুক বানিয়ে সৈয়দ শাহনুর নিজে আশিক সেজেছেন।
সৈয়দ শাহনুর আত্মার স্বরূপ-অবস্থান ও দেহের সাথে আত্মার সম্পর্কের বিষয়টিও গানের মাধ্যমে তুলে ধরেন। সৈয়দ শাহনুর বলেন-
(১) তনের মাঝে সপ্ত ধরিয়া বস্তা জঙ্গল আছে,/ তনের মাঝে মক্কা মদিনা চন্দ্র সূর্য নাচে। (২) নাই তার সঙ্গী সাথী নাই তার পর,/ মন ডুবে নাই থাকে সদায় চরাচর। / নাই তার মুন্ডু আঙ্খী, নাই তার অঙ্গ/ নাই তার রবি শশী নাই তার সঙ্গ। (৩) সরূপার নিকটে আছে নিরুপার বাস/ সেই ফুল বিকশিলে ভুবন বিনাশ। / নিকুজে ফুটে ফুল ভ্রমরা হতাশ,/ মুরশিদের গুপ্তবাণী রাখিছে পরকাশ। (৪) সৈয়দ শাহনুরে বলে দুনিয়া মিছা মায়া,/ বাজীকরের বাজী দিয়া বন্দী কৈল কায়া ॥ (৫) উদাসিনী কৈলে মোরে পাগলিনী কৈলে/ কও তোমার পিরিতে মোরে উদাসিনী কৈলে।
আল্লাহ আমাদের কত নিকটে- আমরাবা আল্লাহর কত নিকটে তাও সৈয়দ শাহনুর সহজভাবেই বলে গেছেন-
সৈয়দ শাহনুর বলেন-
আঙ্খীর নিকটে আছে আল্লাহ নিরঞ্জন,/ সামনে মানিক থৈয়া কেনে ভাঙ্গ বন। / ডাইনে গদা বায়ে যমুনা মাঝে এক কয়বর/ গঙ্গা না কইতা পারইন যমুনার খবর ॥
সুফী সাধক সৈয়দ শাহনুর এর কেরামতি নিয়ে আজো লোকমুখে অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। দেশের প্রাচীনতম সাহিত্য পত্রিকা ‘আল-ইসলাহ’র ৪৯শ বর্ষের ১৩৮৭ বাংলার ৩৫-৩৬ পৃষ্ঠা’য় এক কেরামতির ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ঘটনাটি ছিল এমন যে, এক সময় সৈয়দ শাহনুর লামুয়া থেকে বের হয়ে পশ্চিম দিকে উদ্দেশ্যহীনভাবে যাত্রা করলেন। শুকনো মৌসুম হওয়ার সুবাধে রাস্তায় হাওরের মাঝে কয়েক গরু রাখালের সাথে তার দেখা হয়। গরু রাখালরা সৈয়দ শাহনুরকে ঘেরাও করে এবং একটি মরা পাখিকে জীবিত করে দিতে বলে। পাখিকে এই রাখালরাই তিন দিন আগে মেরে রেখেছিল। সৈয়দ শাহনুর অনেক বলার পরও রাখালরা তাকে পাখিকে জীবিত না করলে যেতে দেবে না বলে পথ রোধ করে। রাখালদের কাছ থেকে রক্ষা পেতে মরা পাখিকে হাতে নিয়ে সৈয়দ শাহনুর পাঠ করলেন-
দেখাও দাও পরাণ বন্ধু দেখা দাও আমারে/ বেপারি দেখিলে বন্ধু দুখ যাইব দূরে রে।/ কিঞ্চিত নয়নে যদি বন্ধে দয়া ধরে/ শাহনুর বাউলে কই, মরা জিততে পারে রে/ যদি বন্ধের দয়া দরে রে............
এই চরণগুলি পাঠের পর পাখীটি জীবন পেয়ে আকাশে উড়ে যায়। শুকনোতে নাও দৌড়ানোসহ সৈয়দ শাহনুরের অসংখ্য কেরামতির ঘটনা রয়েছে।
সৈয়দ শাহনুরের জীবনীকার লিখেছেন,- এক সময় সৈয়দ শাহনুর জগন্নাথপুরের সৈয়দপুরে এসে হাজির হন। তার পূর্বপুরুষ সৈয়দ রুকুন উদ্দিনের ছোটো ভাই সৈয়দ শামসুদ্দিন (রহ:) এর মাজার সৈয়দপুরে অবস্থিত। হয়তো এমনও ছিল যে সৈয়দ শাহনুর তার পূর্বসুরীর টানে সৈয়দপুরে ছুটে যান। ১৮৪২ সালে সৈয়দপুর আসার পর এখানে তিনি দীর্ঘদিন বসবাস করেন। দীর্ঘদিন বসবাসের পর সৈয়দ শাহনুর একসময় সৈয়দপুর থেকে চলে যেতে চাইলেন। পরে সৈয়দপুর থেকে তিনি নবীগঞ্জের জালালসাফে এক মুরীদের বাড়ীতে এসে হাজির হন। মুরশিদকে কাছে পেয়ে মুরিদ খুবই খুশী হন। জালালসাফের উত্তরপূর্ব দিকের প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আমকোনা গ্রামে বসবাস শুরু করেছিলেন। এখানে থাকাকালে সৈয়দ শাহনুরের অনেক কেরামতি প্রকাশ পেলে এলাকার লোকজন মুগ্ধ হয়ে তাকে একটি বাড়ী দান করেন। লোকজন এই বাড়ীকে সৈয়দ শাহনুরের বাড়ী বলে জানেন। এই জালালসাফেই ১৮৫৬ সালে ১৬৬ বছর বয়সে তিনি দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। জালালসাফেই চির নিদ্রায় শায়িত আছেন সুফী সাধক হযরত সৈয়দ শাহনুর (রহ:)।
সৈয়দ শাহনুর অল্প বয়সে ঘর থেকে বেরিয়ে যান এবং তিনি কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাস করেননি। ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ, বৃহত্তর সিলেটের অসংখ্য এলাকায় ঘুরেছেন। বাড়ীবিহীন-ঘরবিহীন জীবনের সম্পর্কে তিনি তার গানেও উল্লেখ করেছেন। সৈয়দ শাহনুর বলেন-
সমুদ্রের ফেনা অইয়া ভাসি ভাসি ফিরি/ ফকিরের সাথে দুস্তি করি দিবানিশি ঘুরি। / সৈয়দ শাহনুর আরো বলেছেন, এইভাবে-/ ইষ্টি নাই কুটুম নাই নাই দেশ খেশ/ লাহুতে বসত করি নানান দেশ দেশ ॥
প্রখ্যাত লোক গবেষক ও সাহিত্যিক সৈয়দ মোস্তফা কামাল লিখেছেন,- মরমী কবি সৈয়দ শাহনুর (রহ:) হলেন হযরত শাহজালাল (রহ:) এর সঙ্গীয় দরবেশ সৈয়দ রোকন উদ্দিন (রহ:) এর বংশধর। মৌলভীবাজারের ঘরগাঁওয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মাজার রয়েছে নবীগঞ্জ উপজেলার জালালসাফ গ্রামে। তিনি রাজনগরের কদমহাটা, নবীগঞ্জের দিনারপুর ও জালালসাফ গ্রামে বসবাস করেছেন। প্রতি বছর জালালসাফে ৬ ও ৭ মাঘ সৈয়দ শাহনুরের ওরস উদ্যাপন করা হয়। ওরসে বৃহত্তর সিলেটসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার ভক্তরা এসে অংশগ্রহণ করেন। সৈয়দ শাহনুরের গান তাঁর মৃত্যুর ১৬৬ বছর পরও এখনো দেশ-বিদেশে বাউল-ফকিরসহ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT