সাহিত্য

চমৎকার উপন্যাস অথবা মূল্যবান প্রেসক্রিপসন

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৭-২০১৯ ইং ০১:১৮:২০ | সংবাদটি ৯৩ বার পঠিত

অনেকদিনপর একটানে একটা উপন্যাস শেষ করলাম। লেখকের নাম বলতে বললে, প্রথমেই উচ্চারণ করবেন হুমায়ুন আহমেদ, এরপর আরো অনেকের। আমাকে এইভাবে কেউ জিগ্যেস করলে আমিও এমনি করে বলতাম।
এবারের কেমুসাস বইমেলায় একটি কিশোরের সাথে আমার পরিচয় হলো। বললো উপন্যাস লেখে। বেশ কনফিডেন্সের সাথে। ভাবলাম এমনি অনেকে বলে। কিছুসময় পরে আমাদের ‘‘কৈতর’’ প্রকাশনের স্টলে ওর বইটি দিয়ে যায়। চমৎকার নাম ‘আপন বৃদ্ধাশ্রম’। প্রচ্ছদটা মারাত্মক (যুথসই শব্দ পাচ্ছিনে!) চমৎকার। এইভাবে অনেক বই আসে। সবগুলো পড়া হয় না। পড়ার বাসনা মনে গেঁথে সযতেœ বুক সেলফে রেখে দিই। ওরটাও সেইভাবে সেলফে রাখার প্রথম ধাপ আমার ওয়ারড্রোবের উপর রাখি। শুক্রবার দুপুরে। এমনি এমনি পাতা উল্টালাম। প্রথম দু’পাতা পড়ে রেখে দেবো, কিন্তু তৃতীয় পাতা ছেড়ে এগুতে গিয়ে আটকে গেলাম। তারপর একটানে, অনেকটা রুদ্ধশ্বাসে বইটা শেষ করি।
লেখকের নাম ‘মিদহাদ আহমদ’। নামটা উচ্চারণ করতে বেশ সময় লেগেছে। আগামী ৫ নভেম্বর ওর বয়স হবে আঠারো বছর। জাতিসংঘের সংজ্ঞানুসারে যে কিনা এখনো শিশু। কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। আবৃত্তি করে, গাছ লাগায়, ছবি আঁকে। ‘‘আপন বৃদ্ধাশ্রম’’ ওর প্রথম উপন্যাস। বৃদ্ধাশ্রমে বাস করা একজন মায়ের করুণ কাহিনী। বৃদ্ধাশ্রম কালচারটা এখনো আমাদের এখানে মাথা চড়া দিয়ে উঠেনি। আসবো আসবো করছে। বিষয়টি নিয়ে এখনো অনেকের সুস্পষ্ট ধারণা নেই। সেই প্রেক্ষাপটে মিদহাদ লিখেছে, বৃদ্ধাশ্রমে বাস একজন মায়ের কথা। পুরো কাহিনীটা হচ্ছে, একজন মাকে তার ছেলে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছে। অভাগী মায়ের মৃত্যু হয় সেই বৃদ্ধাশ্রমে। মায়ের মৃত্যুর পর তার অনেকগুলো জিনিসপত্রের সাথে পাওয়া যায় একটি ডাইরি। মা সেই ডাইরিতে বৃদ্ধাশ্রমে যাবার দিন থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টুকরো টুকরো স্মৃতিকথা লিখে গেছেন। পড়তে পড়তে চোখটা ভিজে উঠে। মিদহাদের বয়সের লেখকরা কাহিনীতে সাধারণত নাটকীয় কিছু ঘটিয়ে বসতে ভালোবাসে। কিন্তু মিদহাদ বড়োই সতর্ক থেকেছে। সে বৃদ্ধাশ্রমে বাস করা একজন মায়ের হৃদয়ের রক্তঝরার ছবি আঁকার প্রয়াস চালিয়েছে, যেমন সে তুলি চালায় একটি গ্রাম কিংবা শহরের ছবি আঁকতে। মাকে নিয়ে একটি কাহিনী আছে।
এক প্রেমিকা তার প্রেমিককে বলেছিলো তুমি যদি আমাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসো তবে তোমার মায়ের হৃৎপিন্ড আমার জন্যে নিয়ে আসো। প্রেমিক তার মায়ের হৃৎপিন্ড ছিড়ে পাগলের মতো প্রেমিকার বাড়ির দিকে ছুটছিলো। পথে হোচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলে হৃৎপিন্ডটা হাহাকার করে উঠে, বাবা ব্যথা পেয়েছিস?
মিদহাদের পুরো উপন্যাসে মা তার বেদনার কথা লিখেছেন। ছেলের শৈশবের কথা, শৈশবে ব্যবহার করা জিনিস হাতে নিয়ে মা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছেন। আনন্দের দিনে, ইদের দিনে ছেলের একটু ছোঁয়া পেতে, নাতিদের সাথে কিছুটা সময় কাটাতে মা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন। ছেলে আসে না, কিন্তু মা একটিবারের জন্যেও বদ দোয়া করেন না ছেলেকে। পুরো উপন্যাসটা আমার কাছে মনে হয়েছে একটি প্রেসক্রিপসন। পড়তে পড়তে হঠাৎ খটকা লেগেছে, এই কথাগুলো কি সত্যি সত্যি মিদহাদের লেখা?
উপন্যাসের শেষটা চমৎকার। মা একদিন তার নাতিকে বলেছিলেন তার ছেলে যদি কাঁদে তিনিও কাঁদবেন। মায়ের ডাইরি পড়ে পড়ে যখন ছেলে কাঁদছিলেন, তখন আকাশ বেয়ে বৃষ্টি নামে।
নাতি তখন তার বাবাকে বলে,দাদি আকাশ থেকে বৃষ্টি হয়ে কাঁদছেন।
বইটা যদি কেউ পড়ে, তাহলে তার মা বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে অন্তত: একটিবার ভাববে। আর রেখে আসলেও সে পারবে না শান্তিতে তার ঘরে বাস করতে। এমন একটি প্রেসক্রিপসন তার উপন্যাস।
প্রশংসা করতে ভয় হয়, যদি মিদহাদের মধ্যে চলে আসে অহংবোধ অথবা আলস্য। আর এতো লিখে কি হবে, ‘বাঘের এক বাচ্চাইতো যথেষ্ট’ তাহলে আমরা বেদনাহত হবো। আমরা মনে করি মিদহাদ ভালো উপন্যাস লেখার সিঁড়ির প্রথম ধাপে রেখেছে পা। আমরা তার কাছ থেকে পাবো আরো চমৎকারসব উপন্যাস।
আবার প্রচ্ছদ দিয়ে শেষ করি। লুৎফুর রহমান তোফায়েলের করা প্রচ্ছদ। বরাবরই ওর প্রচ্ছদ অনেক সুন্দর হয়। পুরনো নি:সঙ্গ একটি দালান, এ যেন বৃদ্ধাশ্রমের সেই মা। পুরো প্রচ্ছদ জুড়ে বেদনার রং ছড়ানো। প্রচ্ছদকার যেনো সেই বেদনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন বাস্তবে। শিল্পীরা বেদনার রং বলতে কোন একটি রংয়ের নাম বলবেন। কিন্তু এই প্রচ্ছদটি দেখলে মনে হবে এটিই বেদনার রং। আমি ভেবেছিলাম হয়তো খরচা বাঁচানোর জন্যে এক কালার কভার করা হয়েছে, পরে দেখলাম লেখক পরিচিতিতে কিশোর লেখকের চার রং মেশানো ছবি। অনেকে হয়তো বইটাতে নন্দন তত্ত্ব, উপন্যাসের ব্যাকরণ খুঁজবেন। আমি আপাতত ওইসবে নেই। আমার এক কথা, এক কিশোরের লেখা চমকার উপন্যাস অথবা একটি মূল্যবান প্রেসক্রিপসন। আপন বৃদ্ধাশ্রম, মিদহাদ আহমদ, প্রাকৃত প্রকাশ, সিলেট, একুশে বইমেলা ২০১৯, মূল্য ১৪০ টাকা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT