সাহিত্য

বৃষ্টিভেজা ক্যামেরা

আনোয়ারা আল্পনা প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৭-২০১৯ ইং ০১:১৯:৩৩ | সংবাদটি ১৯৪ বার পঠিত

স্কুলটার সামনে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম, তখন সন্ধ্যা হয় হয়। বাস থেকে যখন নামলাম, তখনও বৃষ্টি ছিল না, এখন একটু একটু শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে বাড়বে। জানতামই হবে, তাকে নিয়ে আমার সবকিছুতে বৃষ্টি ছিল। আমার বৃষ্টিরা সবসময় সে-ময়। কিংবা সে আমার জন্য বৃষ্টিময়।
এখানে যে স্কুলটার সামনে এখন দাঁড়িয়ে আছি, এখানে সে পড়ত চল্লিশ বছর আগে। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে সেই কোন বিকালে! এখন এই সুনসান স্কুলের মাঠে আমি দৌড়ে যেতে দেখলাম তাকে, দুষ্টু বালকের মতো আমার দিকে একবার তাকিয়ে হাসল সে। তারপরই ছুটে চলে গেল। আশে পাশে কেউ নেই, আমি বেশ জোরে জোরেই বললাম, তুমি যখন বালক ছিলে, তখন কোথাও ছিলাম না আমি। বল পায়ে নিয়ে ছুটে এলো সে, বলল, ‘ছিলে তো!’ আমি রেইন কোটের হুডটা মাথায় তুলে দিলাম। বৃষ্টি বাড়ছে। বৃষ্টিরোধী একটা ব্যাকপ্যাক আমার সঙ্গে। আমি তার শৈশব, কৈশোর এই ব্যাকপ্যাকে ভরে নিয়ে যেতে এসেছি। সে যেদিন তার বালক বয়সের ছবি আমাকে দেখিয়েছিল, আমি ভীষণ অভিমানে বালিকার মতো বলেছিলাম, ‘তুমি তখন আমাকে একটুও ভালোবাসতে না!’ সে হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘এখনও বাসি না।’
আমি যে এখানে এসেছি, জানে না সে। এখন আর আমার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ জানা নয় তার। অনেক দূরে চলে গেছে, সে দেশে যখন সন্ধ্যা নামে, আমি রোদের দিকে তাকিয়ে সন্ধ্যা নামাই রোজ। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে কেবল কোনো কোনোদিন দুপুর, মেঘে কালো হয়ে এলে, তার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার মতো আমার আকাশে আলো কমে আসে। কিন্তু একটা চাঁদ আর একসঙ্গে দেখতে পাই না আমরা।
‘তোমাকে নিয়ে একটা সিনেমা বানাব আমি’ বলেছিলাম যেদিন, খুব অবাক হয়েছিল সে। বলেছিল, ‘ডকু নাকি?’ আমি তার অ্যাশ কালারের টি-শার্ট খামচে ধরে ধাক্কা মেরে বিছানায় ফেলে দিয়ে তার গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পড়তে বলেছিলাম, ‘একদম না, পুরাদস্তুর ফিচার ফিল্ম। আর গল্পও আমি লিখব, বুঝেছ?’ সে বলেছিল, ‘আগে জানলে তোমাকে এত কথা বলতাম না।’
‘তার মানে তুমি রাজি নও?’- আমি রাগ করে জানতে চাই। সে বলে, ‘আমার মেয়ে অনুমতি দিলে তবেই পারবে।‘ আমি মাথা নেড়ে বলেছিলাম, ‘ঠিক আছে, ওর অনুমতি নিয়েই হবে ওটা, কথা দিলাম।’
এসব কতদিন আগের কথা! তাকে আমি ভুলে থাকতেই চেয়েছিলাম। তাকে নিয়ে লেখার কথা মনে হয়েছে মাঝেমাঝে। ভেবেছি, থাক, কী হবে লিখে! কিন্তু চারদিন আগে এক বন্ধুর সঙ্গে একটা বারে বসে সামান্য দুই পেগ পান করতে করতে পুরোদমে ফিরে এলো সে। ঝট করে আমার মনে হলো, তাকে নিয়ে লিখতেই হবে আমাকে। কোনো উপায় নেই, না লিখলে মুক্তি নেই আমার। সেই রাতেই ফোন করে খুলনার বাসের টিকিট বুকিং দিয়েছি, সকালে উঠেই আমি খুলনার বাসে চেপে বসেছি। এখন তিন দিন ধরে চষে বেড়াচ্ছি খুলনা। এখানে কেটেছে তার শৈশব-কৈশোর। এখানে আসতেই হতো আমাকে। তার স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে, একমাথা ঝাঁকড়া চুলের বালক তাকে ছুটতে দেখে আমার স্পষ্ট মনে হলো, তাকে নিয়ে লিখব বলেই, লেখা শিখেছি আমি।
গতকাল গিয়েছিলাম তাদের বাড়িতে। ভয়ে ভয়েই গিয়েছিলাম। কেমন অদ্ভুত লাগে না, কী বলব গিয়ে? কিন্তু তারা সবাই খুব ভালো ব্যবহার করেছেন। বৃদ্ধ বাবা তার জন্মের গল্প শুনিয়েছেন। ভীষণ বৃষ্টির এক রাতে জন্ম তার! শুনে চমকে উঠেছি আমি। আমার সঙ্গেও এক বৃষ্টির দিনে দেখা হয়েছিল তার। যেদিন সে চলে গেল, সেদিন ঢাকায় বৃষ্টি ছিল না। কিন্তু সেই দূর দেশের এক শহরের এয়ারপোর্টে নেমে সে ফোন করেছিল আমাকে। বলেছিল, ‘এখানে বৃষ্টি পড়ছে।’ আর বলেছিল, ‘আমাদের আর যোগাযোগ হবে না।’ সেই পাঁচ বছর আগের বৃষ্টি আবার ফিরে এলো আজ। তার ডাক্তার বাবা মিষ্টি হেসে বললেন, ‘আমাদের খুব মেয়ের শখ ছিল, আগের দুজন ছেলে ছিল বলে।‘ আমি মনে মনে বললাম, আপনি জানেন না, ওকে ছেলে হয়েই জন্মাতে হতো। তিনি বললেন, ‘ওর মা মেয়ের নাম ঠিক করে রেখেছিল- নয়ন।’ তিনি আর আমি দুজনেই খুব হাসলাম। বললাম, ‘নয়ন ছেলে মেয়ে দু’জনের নামই হয়, ভাগ্যিস!’ আমাদের গল্পে তখন তার মা এসে বসলেন। বললেন, ‘কী নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে?’ আমি বললাম, ‘আপনার মেয়ের নাম নিয়ে।’ হাসলেন তিনি, ‘আর বোলো না।’ এবার তার বাবা বললেন, ‘নয়নের মা তারপরে বায়না ধরল, ছেলেকে কোরানে হাফেজ বানাবে! আগের দুজন আমার মতো ডাক্তার হোক কিন্তু ছোট জনের অত পড়ালেখায় কাজ নেই। সে হাফেজ হবে আর মায়ের কাছে থাকবে!’ আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘সর্বনাশ!’ মনে মনে বললাম, এই রকম বাউ-ুলে, দুনিয়া চষে বেড়ানো ফটোগ্রাফারকে নিয়ে এই স্বপ্ন ছিল মায়ের! তার মা বললেন, ‘ও কাছে থাক, চেয়েছিলাম সবসময়। আর দেখ, বছরের পর বছর চোখেই দেখতে পাই না!’ মনে মনে বললাম, আমিও চেয়েছিলাম, সে আমার কাছে কাছে থাকুক। কেউ আসলে থাকে না, কেউই না। ওর মা বললেন, ‘কী সুন্দর আরবি পড়ত! সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর টুপি মাথায় দৌড়ে যেত আরবি পড়তে! তার পর একদিন বলল, আর যাব না; স্কুলে যাব!’
স্কুলটার টানা লম্বা বারান্দা দিয়ে হাঁটলাম, সপ্তম-অষ্টম-নবম-দশম সব ক্লাসরুমের দরজায় হাত রেখে রেখে দাঁড়ালাম। চল্লিশ বছর আগেও এই পাল্লা ছিল? স্কুলগুলি মায়ের মতো, সহজে বদলায় না। বৃষ্টি একটু কমেছে, শহরে ফিরব, কাল যাব তার কলেজে। কতদিন থাকব তার খুলনায়, জানি না এখনও। তার কোনো বন্ধুর সঙ্গে কি দেখা হয়ে যাবে আমার? দাদির নামে মেয়ের নাম রেখেছিল সে- সালেহা। শুনে হেসেছিলাম আমি, ‘কী সাহস তোমার! আমাদের জেনারেশনেই বাতিল হয়ে গেছে এই নাম, তুমি তারও পরের জেনারেশনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছ এইরকম গেঁয়ো নাম!’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে স্কলারশিপ নিয়ে সে ফটোগ্রাফি শিখতে গিয়েছিল হাঙ্গেরি। সেখানেই মেক্সিকান মেয়ে ম্যারিসোলের সঙ্গে পরিচয়, প্রেম, বিয়ে। সাত বছরের বড় ম্যারিসোলের সঙ্গে বিয়ে টেকেনি তার। সালেহাকে নিয়ে মেক্সিকো ফিরে গেছে বউ। মনে মনে গুনে দেখলাম, সালেহার এখন পনেরো। আমি যদি তিন বছর ধরে স্ক্রিপ্ট লিখি, তাহলে সালেহার আঠারো হবে। তখন তাকে পা-ুলিপি পাঠিয়ে অনুমতি চেয়ে নেব। কিন্তু সে কি বাংলা পড়তে পারে? বছরে একবার অল্প কিছুদিনের জন্য মেয়ের সঙ্গে দেখা হয় তার। বাকি সময় ঘুরে ঘুরে বেড়ায় সে।
পরের দিন ঝকঝকে রোদের দুপুরে গিয়ে দাঁড়াই প্রাচীন কলেজটার সামনে। খুলনা সরকারি কলেজ। কিন্তু এই দুপুরেও কলেজটা একলা দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও কেউ নেই। কলেজের মাঠে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ল- ও হো, শুক্রবার আজ! করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখি একটা রুম খোলা! উঁকি দিয়ে দেখি তন্ময় হয়ে দাবা খেলছে নয়ন, একা! দাবা বোর্ডের অন্য পাশে কেউ নেই। আমি হাসলাম, ‘কাল তো সুন্দর ছুটে ছুটে ফুটবল খেলছিলে, আজ গম্ভীর হয়ে দাবা? সে হেসে বলল, ‘কাল তো বালক ছিলাম, আজ প্রায়-যুবক, দ্যাখো গোঁফ!’ আমি তার নাকের নিচে হালকা গোঁফের রেখা দেখলাম! বললাম, ‘বড় হলে তোমার মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল হবে, জানো?’
পুরা কলেজ হেঁটে বেড়িয়ে যখন বাইরে এলাম, তখন রোদ নেই, আকাশ ছেয়ে গেছে কালো মেঘে! সকালে রোদ ছিল বলে রেইন কোটটা আনিনি। শ্রাবণ মাসের রোদে এত ভরসা কেন রেখেছি! আর আমি তো এখানে নয়নের সঙ্গে থাকব বলে এসেছি, বৃষ্টি তো হবেই! কলেজের গেট থেকে চারপাশে তাকাতে তাকাতে হাঁটছি, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। হঠাৎ দেখি নয়ন ফার্মেসি নামে এক ওষুধের দোকান। দৌড়ে ওখানেই উঠলাম। দোকানে লোকজন নেই, শুধু মাঝবয়সী দোকানি বসে বসে ঝিমাচ্ছে। সালাম দিয়ে পানি খেতে চাইলাম। তন্দ্রা ছুটে গেল তার। অবাক হয়ে তাকালেন আমার দিকে। তাকিয়েই রইলেন! আমি হেসে বললাম, চলে যাব? তিনি নড়েচড়ে বসলেন, ‘আরে না না; চলে যাবে কেন?’ দোকানের এক পাশের সাদা পর্দায় লাল যোগ চিহ্ন হাসছে, সেটা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন। ওখানে হয়তো বিকালের দিকে কোনো ডাক্তার রোগী দেখেন। ফিরলেন ছোট একটা ট্রে হাতে, এক গ্লাস পানি আর একটা পিরিচে কয়েকটা বিস্কুট। এক হাতে পানি আর অন্য হাতে বিস্কুট নিলাম। বললাম, ‘ঢাকা থেকে এসেছি, আপনাদের খুলনা দেখতে।’ বিস্কুট খেয়ে পানি খেলাম। বললাম, ‘আজ এসেছি কলেজ দেখতে। এই কলেজে পড়তেন আপনি?‘ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ পড়তাম; চা খাবে?’ আমি মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তার দোকানটা দেখছি, নিচু একটা শেল্ফের ওপাশে তিনি বসেছেন, এপাশে চেয়ারে আমি। তার পেছনে বড় শেল্ফে অনেক ওষুধ সাজানো, তার মাথার বরাবর একটু উপরে শেল্ফের গায়ের পেরেকে ঝুলছেন সেনসেশন আর কিয়োরেক্স। বললাম, ছিয়াশি-সাতাশি সালের দিকে এই কলেজে পড়তেন? চা খাওয়া যায়।’ বাইরে বৃষ্টির জোর বেড়েছে, তিনি ছাতা নিয়ে বেরোতে বেরোতে বললেন, ‘তুমি বসো, চা নিয়ে আসি।’ আমি অচেনা শহরের অচেনা এক ওষুধের দোকানে একা বসে বসে কনডমের প্যাকেটের ছবি দেখতে লাগলাম। নয়নের সঙ্গে এক কনডোমিক বিকালের স্মৃতি কাবু করে ফেলল আমাকে। সেদিনও খুব বৃষ্টি ছিল, আমার বৃষ্টিভেজা ছবি তুলেছিল সে, তার বন্ধুর বাসার ছাদে। ছবি তুলতে তুলতে বৃষ্টি ভুলে সে ছাতা ফেলে আমার কাছে চলে এসেছিল, তার প্রিয় ক্যামেরা ভিজছিল বৃষ্টিতে! বলেছিল, ‘তুমি তাহলে আমার প্রেমে পড়নি? আমি তোমার সাবজেক্ট?’ আমি তাকে চুমু খেতে খেতে বৃষ্টির পানি খেয়ে বলেছিলাম, ‘একদম পড়িনি, আর শোনো, তোমার ক্যামেরা ভিজে শেষ হয়ে গেল কিন্তু!’ ক্যামেরার কথা মনে হতেই দৌড়ে বাসায় ঢুকে গিয়েছিল।
চা নিয়ে ফিরে তিনি আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন। বললাম, ‘আহা, এত কষ্ট না করলেও পারতেন।’ তিনি বললেন, ‘কষ্ট হয়নি। ছিয়াশি সালে আইয়ে পাস করেছি।’ আমি চা হাতে নিয়ে ধুম করে বললাম, ‘রাশেদুল হাসানকে চিনতেন?’ তিনি বড় বড় চোখ করে অবাক হয়ে বললেন, ‘নয়ন!’ এবার আমি অবাক, ‘হ্যাঁ, চেনেন?’ হাসতে বললেন, ‘আরে মেয়ে, কী বলো তুমি! এই দোকানটাই তো নয়নের নামে। নয়ন আমার বন্ধু!’ বাইরে তাকিয়ে দেখি বৃষ্টি থেমেছে, রোদ উঠে যাচ্ছে। তিনি বললেন, ‘নয়নকে কীভাবে চেনো তুমি?’ যেন আমাকে ঢিল মেরে ফেলে দিলেন দীঘির জলে। বললাম, ‘অনেকেই চেনে তাকে, ফটোগ্রাফার না?’ কীভাবে চিনি শুনে যে ধুকপুক শুরু হয়েছে সেটা কাটাতে বললাম, ‘ওনাকে নিয়ে একটা বই লিখব আমি, সে জন্যই এসেছি খুলনা। নয়নের গল্প বলবেন আমাকে?’
তিনি কাকে যেন ফোন করে বললেন, দোকান বন্ধ করে বাইরে যাচ্ছি, ‘ঢাকা থেকে মেহমান এসেছে, পাশের দোকানে চাবি রেখে গেলাম, ডাক্তার সাহেব আসার আগে এসে দোকান খুলিস।’
দোকানে তালা দিয়ে আমার সঙ্গে বেরিয়ে এলেন নয়নের বন্ধু রিয়াদ। হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘নয়ন যে বড় হয়ে এত ছবি তুলবে, সেটা কিন্তু ছোটবেলায়ই বুঝতাম আমি। ধরো, স্কুল থেকে ফিরছি, রাস্তার পাশে ছোট কোনো জংলি গাছে ফুল ফুটেছে, ও সেখানে বসে পড়ত, চেয়ে থাকত অনেকক্ষণ ধরে!’ তারপর লাজুক হেসে বললেন, ‘তখন যদি জানতাম, ও বড় হয়ে এত বড় ছবিতুলিয়ে হবে, তাহলে বিরক্ত হতাম না, জোর করে তুলেও নিয়ে যেতাম না।’ আমরা দুইজনেই খুব হাসতে হাসতে বললাম- ‘ছবিতুলিয়ে!’ দূর থেকে একটা রেল ব্রিজ দেখালেন আঙুল তুলে, বললেন, ‘ওখানে যাবে?’ আমি হ্যাঁয়ের মাথা নাড়লাম। রিয়াদের কথা শুনতে শুনতে রেল ব্রিজের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমি চারপাশ দিয়ে বিভিন্ন বয়সী নয়নকে ছুটে ছুটে যেতে দেখলাম। রেল ব্রিজে পৌঁছে তিনি বললেন, ‘তোমাকে এখানে নিয়ে এলাম কেন, জানো? এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত আঠারোর নয়নের জীবন!’ এটা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আমি। অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। তিনি বললেন, ‘একদিন আমাকে এখানে নিয়ে এসে নয়ন বলেছিল, আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দে!’ একটা মেয়ের জন্য মরে যেতে চেয়েছিল সে! বিদায় নেওয়ার সময় হঠাৎ বললেন রিয়াদ, ‘তুমি ওকে খুব ভালোবাস, না?’ বললাম, ‘আপনার মতো বেশি না, নয়নের নামে আমার কোনো দোকান নেই!’ হো হো করে হাসলেন রিয়াদ।
পরের দিন গেলাম যশোর, নয়নের সুইসাইডাল প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে। ভদ্র মহিলাকে দেখে চমকালাম। নয়নের একটা ড্রয়িং বুক ছিল; সেখানে পাতার পর পাতা একটা মেয়ের ছবিই আঁকা, সে সব এই মহিলার বিভিন্ন বয়সের মুখ। ড্রয়িং বুকটা খুব মন দিয়ে দেখেছিলাম, ছবিও তুলে রেখেছিলাম, আগের ফোনটায় ছিল কয়েকটা। ওয়ালেটের ছোট পকেটে কি মেমোরি কার্ডটা আছে?
হাসিকে কিছুই বলতে হলো না আমার, রিয়াদ কথা বলে রেখেছেন। ঘরে নিয়ে বসালেন, আমি বললাম, ‘আপনার শাড়িটা খুব সুন্দর।’ বড় বড় ফুলের এই ছাপা শাড়ি পরা একটা ছবিও আছে নয়নের আঁকায়। হাসির সঙ্গে নয়নের দেখা তো হয় না, হাসি কি নয়নকে নিয়মিত ছবি পাঠান? শাড়ির প্রশংসায় হাসলেন হাসি। বললেন, ‘এই শাড়ি? এ তো খুব সাধারণ ঘরে পরার শাড়ি!’ বলেই উঠে গেলেন। আমার জন্য চা-টা আনতে গেলেন মনে হয়। আমি আগের মেমোরি কার্ডটা খুঁজে পেয়ে ফোনে লাগালাম। হ্যাঁ, এই তো হাসির মুখ! মগ হাতে ফিরে এলেন হাসি; কফি! কফিতে চুমুক দিয়ে এত ভালো লাগল আমার! গত চার দিনে এক কাপ কফিও খাইনি। অথচ কফিতে রীতিমতো নেশা আমার। আর কফির স্বাদটাও পারফেক্ট, ঠিক এ রকম কফিই খাই আমি। আমি খুশি হয়ে বললাম, ‘আপনি যে আমাকে এত ভালো কফি খাওয়ালেন, সে জন্য আপনাকে দারুণ একটা জিনিস দেখাই, আসেন।’ হাসির টিনের চালে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো হঠাৎ। তিনি উঠে এসে আমার পাশে বসলেন। ফোন বের করে ছাপা শাড়ি পরা তার ছবি দেখালাম। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার বড় বড় দুই চোখ পানিতে ভরে গেল। ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘নয়নের আঁকা?’ আমি তার হাত ধরে বললাম, ‘নয়নকে ভুলে গেছেন?’ তিনি চোখ ভরা পানি নিয়ে হাসলেন, এমন হাসি আমি কখনও দেখিনি। বললেন, ‘তুমি তো জানো, ওকে ভোলা যায় না!’ হাসির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দেখা হল। সবার ছবি তুললাম। নয়নের সঙ্গে কখনও যোগাযোগ হলে চমকে দিতে পারব।
হাসির বাড়ি থেকে যখন বেরোলাম, বৃষ্টি আর নেই; সন্ধ্যা হয়ে আসছে। কফি খেয়ে খুব ফুরফুরে লাগছে। মাথা হালকা লাগছে। নয়ন এখন কোন শহরে? সেখানে এখন দুপুর? রাতের বাসেই ঢাকা ফিরে যাব। খুলনায় বন্ধুর বাড়িতে উঠেছিলাম, যশোরে হাসি ছাড়া কাউকে চিনি না আমি।
ঢাকায় ফিরেই জ্বরে পড়লাম, সঙ্গে মাইগ্রেনের তীব্র ব্যথা। তবু স্ক্রিপ্টের কাজ শুরু করলাম। খানিক লিখি আবার ঘুমিয়ে যাই, পুরা আধো ঘুম আধো জাগরণ অবস্থা। তিন দিন পর ফোন করল নয়ন। সর্দি-কাশিতে গলা বসে গেছে আমার, গলা দিয়ে শব্দ প্রায় বেরোয়ই না। নয়ন বলল, ‘খুলনা গেছিলে?’ আমি ফ্যাঁসফ্যাঁসানো গলায় বললাম, ‘নয়ন?’ হাসল সে, ‘খুলনা ঘুরে এসে নয়ন ডাকছ?’ বললাম, ‘জি রাশেদুল হাসান, আপনি বেঁচে আছেন?’ সে বলল, হ্যাঁ, দিব্যি বেঁচে আছি। তুমিও তো আছ।’ বললাম, ‘তুমি কি ভেবেছিলে তোমার বিরহে মরে ভূত হয়ে যাব?’ তার পরেই বললাম, ‘তোমার মেয়ে বাংলা পড়তে পারে?’ সে বলল, ‘না পারে না, পড়ে শোনালে বুঝতে পারে। স্ক্রিপ্টের কাজ শুরু করেছ?‘ আমি বললাম, ‘তোমার হাসির সঙ্গে দেখা হয়েছে। কীভাবে জানলে, খুলনা গিয়েছিলাম?’ সে বলল, ‘রিয়াদের সঙ্গে কথা হয়েছে, আব্বা-আম্মার সঙ্গেও। তুমি তাহলে সিনেমা বানিয়েই ছাড়বে?’ বললাম, ‘সিনেমা বানানো কি অত সহজ? টাকা কোথায় আমার? স্ক্রিপ্ট বিক্রি করে দেব।’
সে বলল, ‘হাসিকে কেমন দেখলে?’ আমি বললাম, ‘আচ্ছা, তুমি হাসির ওই ফ্লাওয়ার প্রিন্টের শাড়িটা কীভাবে দেখলে?’ সে বলল, ‘প্রিন্টের শাড়ি খুব কমন তো, জানো না?’ রাগ হয়ে গেল আমার, ‘প্রিন্টের শাড়ি কমন, জানি আমি, হুবহু প্রিন্ট কীভাবে এঁকেছ, বল আমাকে।’
সে বলল, ‘ঢাকায় খুব বৃষ্টি?’
আমি রেগে বলি, ‘হ্যাঁ শ্রাবণ মাসে বৃষ্টি হবে না? বলবে না, কীভাবে এঁকেছ?’
সে বলল, ‘আমি ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে ভুলে যাবে।’
আমি বললাম, ‘তুমি আমার প্রোজেক্ট না? কীভাবে ভুলি?’
সে বলল, ‘তুমি আমাকে খুব ভালোবাস?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তুমি তো বাসো না, তাই দ্বিগুণ করে বাসতে হয়।’
সে বলল, ‘দিল্লিতেও আজ খুব বৃষ্টি!’
এতক্ষণ এলিয়ে বসেছিলাম, এবার তড়াক করে উঠে দাঁড়ালাম, ‘দিল্লি? দেশে আসতেছ?’
সে হাসতে হাসতে বলল, ‘হ্যাঁ, এসে বলব, প্রিন্টের শাড়ি কোথায় পেলাম। আর তুমি জ্বর-টর সারাও, প্লিজ। তোমার গলা বিশ্রী শোনাচ্ছে।’

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT