মহিলা সমাজ

মেঘের কাছে মাঘের চিঠি ও অন্যান্য

শারমিন সুমি প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৭-২০১৯ ইং ০২:০৩:৩৯ | সংবাদটি ১১৩ বার পঠিত

সিলেটে যে কজন নারী সাহিত্য চর্চায় খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন তাঁর মধ্যে একজন জেবা আমাতুল হান্না। ইতিমধ্যে তাঁর নয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দির্ঘদিন ধরে অধ্যাপনাও করছেন মদনমোহন কলেজে। স্কুল জীবন থেকে লেখালেখি শুরু। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে দেশপ্রেম এবং গভীর জীবনবোধ প্রজ্জ্বলিত। একই সঙ্গে সত্য উচ্চারণ ও প্রকৃতি পাঠ করার জন্য তাঁর লেখাগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কবিতার মতো লেখকের ছড়া গ্রন্থগুলোও ব্যাপক সমাদৃত। ‘স্বপ্ন লোকের চাবি’ এবং ‘মাঘের কাছে মেঘের চিঠি’ নামে সম্প্রতি লেখকের দুটি ছড়াগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বরেণ্য সাংবাদিক ও শিশু সংগঠক রোকনুজ্জামান খান ছড়া সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন-‘কবিতার বক্তব্য বুঝতে একটু চিন্তা করতে হয়, কিন্তু ছড়া পাঠের সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে সেই দৃশ্য ভেসে ওঠে। ছড়ার রস আস্বাদন করতে পাঠককে খুব গভীরে যেতে হয়না। এর মানে এই নয় যে, ছড়ায় চিন্তার খোরাক থাকে না। থাকে, তবে তা সহজ, স্বচ্ছ, জটিল নয়।’ কবি জেবা আমাতুল হান্নার ছড়ায়ও আমরা সহজ ও স্বচ্ছ ভাষা ও ছন্দের প্রয়োগ দেখতে পাই :
স্বপ্ন আছে উঠব পাহাড় চূড়ে/ হাত বাড়িয়ে দেখব তখন/ আকাশ কত দূরে।/ স্বপ্ন আছে সাগর অতল তলে/ খুঁজব হীরে মানিক রতন/ সুযোগ যদি মেলে। কিংবা/ ‘প্রজাপতির রূপকে নিয়ে/ কবি লেখেন পদ্য :
গিরগিটির ওই ক্ষুধার কাছে/ সে যে নিছক খাদ্য।/ প্রজাপতি উড়ছে তবু/ ফুলের পরাগ মেখে/ কবিরা সব তাকে নিয়ে/ কাব্য তবু লেখে।/ গিরগিটি কি মর্ম বোঝে/ প্রজাপতির হায়।/ তার বোঝাতে না বোঝাতে কার কী আসে যায়।’
চটুল ছন্দের ধ্বনিময় প্রয়োগ আর তত্ত্বের এমনই কিছু রস খুঁজে পাওয়া যায় কবি জেবা আমাতুল হান্নার ‘স্বপ্ন লোকের চাবি’ আর ‘মাঘের কাছে মেঘের চিঠি’ ছড়াগ্রন্থ দুটোতে। ছড়া মানেই যেন ছন্দের হাট, ছড়া মানেই যেন আনন্দ পাঠ। ছড়া কি সবাই লিখতে পারি? ছন্দের যাদু কি সবার কলমে আসে! জেবা আমাতুল হান্নার ছড়ায় আমরা ছন্দের একটা অপূর্ব অন্তমিল আর চিত্রকল্প দেখতে পাই।
‘শুভ জন্মদিন’ ছড়ায় কবি বলেছেন :
করুণ চোখে তাকিয়ে থাকি/ গ্রুপ ছবিটার দিকে/ ছবির মতই ঝাপসা স্মৃতি/ ছবির মতই ফিকে।/ আব্বা তো নেই আম্মা আছেন/ ভাই বোন যে দূরে/ ছবির সবাই আমার দিকে/ তাকায় কেমন করে।/ বলছে যেন কেমন আছ/ কাটছে কেমন দিন/ সবাই মিলে ছবি তোলার/ আসবে কি আর দিন।
লেখকের ছড়াগুলো পড়লেই মনে হবে এ যেন আমার কথা, এ যেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের কথা। জীবনের এই সুন্দর কথাগুলোকে ছড়ায় আবদ্ধ করেছেন কবি জেবা আমাতুল হান্না।
‘বেলা শেষে’ ছড়ায় কবি জীবনের কিছু বিষয়কে তুলে ধরেছেন এভাবে :
সারা জীবন কাটল যে তার/ হেঁশেল ঠেলে ঠেলে/ জায়নামাজে কাটবে সময়/ সবাই এখন বলে।/ তসবি যখন জপতে বসেন/ কেবল মনে হয়/ কাঁচা সীমের বিচিগুলো/ না শুকালেই নয়।/ নামাজ পড়ার সময় যেত/ চুলোর আঁচে বসে/ কত আমল চুলোয় গেছে/ ভাবছে বেলা শেষে।
কবিদের কবিতা কিংবা ছড়ায় পরিবার, জীবনের কোনো আঘাত, বিরহ, বেদনা কিংবা বিধাতার প্রতি অনুযোগ এই পর্যায়ের ভাবধারা ও রূপায়িত হয়ে থাকে। কবি জেবা আমাতুল হান্নার ছড়ায়ও আমরা সেই বিষয়গুলোর প্রয়োগ দেখতে পাই।
যেমন ‘মেয়ে’ ছড়ায় কবি বলেছেন :
পরের ঘরে থেকেও মেয়েরা/ হয়না মোটেও পর/ সেই মেয়েরাই দ্বন্দ্বে থাকে/ কোনটা নিজের ঘর।
কবির কথা নিতান্তই সহজ। শুধু ছন্দময় সুরের যোগ এক অপূর্ব জ্যোতিতে উজ্জ¦ল হয়ে উঠেছে। জীবন ছন্দময়, বস্তুজগতই হোক আর ভাব জগতই হোক, ছন্দের নূপুর ধ্বনি যেন প্রতিনিয়ত শুনতে পাই। ‘আমার দিন ফুরাইল রে’ ছড়ায়।
কবি লিখেছেন :
দিন ফুরাইল সন্ধ্যা অইল/ অইল আন্ধাইর রাতি/ আন্ধাইর ঘরো একলা কান্দি/ কেউ দিল না বাতি/ আমার দিন ফুরাইল রে।
সমসাময়িক চিন্তাধারার সাথেও কবির একটা নিবিড় সম্পর্ক পাওয়া যায়। তাঁর ডিজিটাল লেখায় আমরা পাই :
‘এখন দেখি সব ডিজিটাল/ মেশিনরাই দিচ্ছে সামাল/ চায়না বানায় প্লাষ্টিক চাল/ ডিমও নাকি বনে আজকাল।
কবি জেবা আমাতুল হান্নার ছড়ায় আমরা প্রকৃতি এবং প্রাকৃত স্বাদও পেয়ে থাকি। তেমনি একটি ছড়া ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’
শীতের সকালে রোদ ভালোবাসি/ নদীটির কলতান/ ভালোবাসি ভোর অলস দুপুর/ পাখপাখালির গান/ যত শিশু আছে এই পৃথিবীতে/ উজাড় করে এ প্রাণ/ সবারে আমি খুব ভালোবাসি/ শুনে নাও পেতে কান!
ছড়া পরিবর্তনশীল, এটা বিশেষ কোন উদ্দেশ্য নিয়ে রচিত হতে পারে, আবার নিছক আনন্দের জন্যও হতে পারে। বাংলা কবিতার প্রাচীনতম ছন্দ হলো ছড়ার ছন্দ। তবে আধুনিককালে এই ছন্দ ছড়ার বিষয় বস্তুর পরিধি ছাড়িয়ে নানা বিষয়ের বাহন হয়ে উঠেছে। কবির লেখা ছড়াগুলোর বিষয়বস্তু খুবই বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং ভিন্নধারায় প্রবাহিত। প্রতিটি লেখায় শিল্পরসের প্রাধান্য পাওয়া যায়। ছন্দ ঝংকারে মন কিছুটা হলেও বিমুগ্ধ হয়। কবি জেবা আমাতুল হান্নার লেখা ছড়া গ্রন্থ দুটোতে আমরা সেই বিষয় ও ভাবের খোরাক যে একেবারেই পাইনি সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। বই দুটোর প্রচ্ছদ প্রশংসার দাবী রাখে। প্রচ্ছদ শিল্পী তামিম তার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন চিত্রকল্পে। বইগুলো প্রকাশ করেছে ঘাস প্রকাশন। চাররংয়ের প্রচ্ছদে মোড়া বই দুটি বর্তমানে সিলেটের লাইব্রেরীগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে। আমরা গ্রন্থ দুটির বহুল প্রচার প্রত্যাশা করি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT