ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০৭-২০১৯ ইং ০০:৪৯:৩২ | সংবাদটি ৭০ বার পঠিত

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে তাঁত শিল্পের ভূমিকা অপরিসীম। তাঁত শিল্পের মানোন্নয়নে ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তাঁত শিল্প শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা ভারতীয় উপ-মহাদেশে অর্থনৈতিক দিক থেকে কার্যকরী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তাঁত হচ্ছে এক ধরণের যন্ত্র যা দিয়ে তুলা হতে উৎপন্ন সুতা থেকে কাপড় বানানো যায়। তাঁত বিভিন্ন ধরণের হতে পারে।
তাঁত বোনা শব্দটি এসেছে ‘তন্তু বরণ’ থেকে। তাঁত বোনা যার পেশা সে হলো তন্তুবায় বা তাঁতী। তাঁত বিভিন্ন রকমের হয়। ছোট আকারের হাতে বহনযোগ্য তাঁত থেকে শুরু করে বিশাল আকৃতির তাঁত দেখা যায়। সাধারণতঃ তাঁত নামক যন্ত্রটিকে সূতো কুন্ডলি আকারে টান টান করে ঢুকিয়ে দেয়া থাকে। যখন তাঁত চালু হয় তখন নির্দিষ্ট সাজ অনুসারে সূতো টেনে নেওয়া হয় এবং তাতে ভিতরের কলাকৌশল বিভিন্ন রকমের হতে পারে।
বাংলার তাঁত যন্ত্রের ঝুলানো হাতল টেনে সূতো জড়ানো মাকু আড়াআড়ি ছিটানো হয়। তাঁত শিল্পের ইতিহাস সঠিক বলা মুশকিল। জানা যায়, আদি বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতীরাই হচ্ছে আদি তাঁতী। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ইতিহাস কৃষি বর্হিভূত সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রটি হচ্ছে নিঃসন্দেহে তাঁত শিল্প।
প্রচলিত অর্থে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরানো এবং বৃহত্তম শিল্প হলো তাঁত শিল্প। সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে এ অঞ্চলে তাঁত শিল্পের প্রচলন শুরু হয়। তাঁত শিল্পে মনিপুরীরা অনেক আদিকাল থেকে তাঁত বস্ত্র তৈরি করে আসছে। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় টাঙ্গাইল জেলা সুপ্রাচীন ঐতিহ্যে প্রসিদ্ধ। সম্প্রতি দু’তিন বছর ধরে পাওয়ার লুমে শান্তিপুরের তাঁত শাড়ী উৎপাদন শুরু হয়েছে ব্যাপকভাবে। একই সূতোয় রং ডিজাইন করে উৎপাদিত হচ্ছে শাড়ী।
১৯৯০ সালে নরসিংদী জেলায় সবচেয়ে বেশি ২০ হাজারের মতো তাঁত ছিলো। গত ২৮ বছরে তা কমে টিকে আছে মাত্র ১ হাজারে। হুসিয়ারী শিল্পের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ১৯১৮ সালে পাবনা শহরের আশেপাশে তাঁত শিল্পের বিকাশ ঘটে। তাঁত শিল্পের প্রয়োজনে সূতা, রং ও রাসায়নিক দ্রব্যের বাজার ও পাবনায় গড়ে ওঠে।
১৯২২ সালে নেতাজি সুভাষ বসু একবার পাবনায় আসেন। এ সময় তিনি পানবায় ৭টি হুসিয়ারী শিল্প পরিদর্শন করেন। তিনি এ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দেখে মুগ্ধ হন। এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত দ্রব্যের মান ও চাহিদা দেখে তিনি এই শিল্পকে বস্ত্র শিল্পের ‘মা’ বলে আখ্যায়িত করেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পাবনায় হুসিয়ারী শিল্পের উৎপাদিত দ্রব্য গেঞ্জি, পাবনার তাঁত শিল্পের শাড়ী, লুঙ্গি, গামছা ব্যবহার করতেন। বর্তমানে পাবনা জেলাতে প্রায় ৫০০ হুশিয়ারী শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। এ প্রতিষ্ঠান সমূহে বহু শ্রমিক নিয়োজিত আছে। পাবনায় তৈরি গেঞ্জি বর্তমানে নেপাল, ভারত, ভূটান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে ঢাকা মারফৎ রপ্তানি হয়।
তাঁত শিল্পের উদ্ভব সঠিক কবে থেকে এসেছে তা বলা মুশকিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, আদি বসাক সম্প্রদায় এর তাঁতীরাই হলেন আদি তাঁতী। এরা আদিকাল থেকে প্রধানত তাঁত বুনে আসছে। এই পোশাক শিল্পের সাথে যুক্ত মানুষরা ‘তন্তুবায় বা তাঁতী নামে পরিচিত। এরা প্রধানত যাযাবর শ্রেণির অন্তর্গত ছিলো। প্রথমে এরা সিন্ধু উপত্যকায় অববাহিকায় বসবাস করতো কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তারা সেই স্থান পরিত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে এসে তাঁতের কাজ শুরু করে। আবহাওয়া প্রতিকূলতার কারণে পরে তারা রাজশাহী অঞ্চলে চলে আসে। তাঁত শিল্পের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, মনিপুরে অনেক আগে থেকেই তাঁত শিল্পের কাজ আসছে। মনিপুরীরা মূলত নিজেদের পোশাকের প্রয়োজনে তাঁতের কাপড় তৈরি করতো। তাদের তৈরি তাঁতের সামগ্রী পরবর্তীকালে বাঙালি সমাজে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কুটির শিল্প হিসেবে হস্ত চালিত তাঁত শিল্প ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের পূর্বকালে কেবল দেশেই নয় বর্হিবাণিজ্যেও বিশেষ স্থান দখল করেছিলো। বংশ পরম্পরায় দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়ে বয়ন উৎকর্ষতায় তাঁতিরা সৃষ্টি করেছিলো এক অনন্য স্থান।
দেশের সর্ব বৃহৎ কাপড়ের হাট নরসিংদীর শেখের মাঠ ও গ্রামে গড়ে ওঠেছিলো যা, তা বাবুর হাট নামে পরিচিত। দেশের বিভিন্ন স্থানে হস্ত চালিত তাঁতে কাপড় বোনা হলেও বাণিজ্যিকভাবে শেখের চড়ের কাপড়ের সমকক্ষ কেউ নেই। সুলতানি ও মোগল যুগের উত্তরাধিকারী হিসাবে এখনকার তাঁতিদের বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁতের রং নকশা, বুনন পদ্ধতি অন্যান্য সমস্ত এলাকা থেকে আলাদা।
এক সময় তাদের পূর্ব পুুুরুষরাই জগদ্বিখ্যাত মসলিন, জামদানী ও মিহি সুতি বস্ত্র তৈরি করে সারা বিশ্বে বাংলা তথা ভারত বর্ষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছিলো। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে অসম কর গ্রহণ তাঁতের ওপর আরোপিত নানা বিধি-নিষেধ এবং ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের জন্য ভারতীয় তাঁত শিল্পের সর্বনাশ ঘটে।
মুক্ত বাজার অর্থনীতির ফলে নানা ডিজাইনের নানা রং এর নানা ধরণের কাপড়ের ভারতীয় বাজারে অবাধ প্রবেশের ফলে তাঁত শিল্পীরা আরো সমস্যায় আক্রান্ত হন।
ধনেখালী তাঁত বালুচুরি আর তসরের হাজারো বৈশিষ্ট্যে প্রসিদ্ধ যেমন তেমনি তার রং ও বাহার। হুগলি জেলার এই অঞ্চলের কারিগররা নানা সূতোর নিপুন বুননে তাদের শাড়িকে যেভাবে তৈরি করেন তা এক কথায় অনবদ্য। ধনেখালী ও মামুদপুর পাশাপাশি এই দুই এলাকাকে নিয়ে মোট চারটি তাঁত সমবায় রয়েছে তাঁতীদের। এই সমবায়গুলি তাঁতীদের সব রকম সহায়তা করতো কিন্তু বর্তমানে এখানে তাঁতীর সংখ্যা ক্রমশঃ কমে যাচ্ছে। কেননা তাদের দাবী যে, একটা শাড়ী বুনে তারা ১০০ টাকা পান কিন্তু তা দিয়ে সংসার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই কোনো তাঁতীই চাচ্ছেন না তাদের সন্তানেরা এই শিল্পে আসুক। তাঁতীরা সমবায়গুলি থেকে এখন আর তেমন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। ধনেখালীর তাঁত ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে সরকারিভাবে নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে তাঁতীদের জন্য।
বাংলার আরেক তাঁত শিল্প পীঠস্থান শান্তিপুর সারা ভারত বর্ষের জন্য বিখ্যাত। মহারাজা কৃষ্ণ চন্দ্র রায় ও এই শিল্পের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। শান্তিপুরের তাঁত শিল্প সম্পর্কে দীন বন্ধু মিত্র লিখেছিলেন ‘শান্তিপুরের ডুরে শাড়ী শরমের অরি/ নীলাম্বর উলাঙ্গিনী সর্বাঙ্গ সুন্দরী।
কিন্তু সময় বদলেছে, ঘটেছে অনেক কিছুর পরিবর্তন। সেই স্বর্ণযুগ এখন আর নেই। বর্তমানে তাঁত শিল্পের অবস্থা নি¤œগামী। বর্তমান যুগের সাথে তাল মেলাতে পারছে না তাঁতীরা। কিন্তু তারপরেও তাঁতীরা এই পিতৃ পুরুষের পেশা ছেড়ে যাচ্ছে না কারণ এ শুধু তাদের জীবিকা নয় এ তাদের বংশ গৌরব।
এই প্রকল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এতে আশা করা যাচ্ছে শান্তিপুরের তাঁত শিল্প তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • ইতিহাস গড়া সাত শক্তিমান
  • ভেজাল খাবার প্রতিরোধের ইতিহাস
  • বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ
  • বর্ষা এলো বর্ষা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • নবীদের স্মৃতিচিহ্নে ধন্য যে জাদুঘর
  • দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র
  • ঐতিহ্যে অম্লান গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়
  • বিলুপ্তির পথে গরীবের ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত’ মাটির ঘর
  • হারিয়ে যাচ্ছে হিজল গাছ
  • তালের পাখা প্রাণের সখা
  • Developed by: Sparkle IT