ইতিহাস ও ঐতিহ্য

গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা

এডভোকেট মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০৭-২০১৯ ইং ০০:৪৯:৫৯ | সংবাদটি ২১৬ বার পঠিত

সিলেটের প্রাচীন নাম শ্রীহট্ট যা সনাতন ধর্মের আরাধ্য দেবতা হট্টনাথ বা দেবী শ্রীহস্থার নামানুসারে বা এ এলাকায় শিলা/ পাথরের হাট/ বাজার ছিলো বলে এলাকার নাম হয় শ্রীহট্ট বা শিলাহাট থেকে শিলহট। মুসলমানামলে তুর্কি, ফার্সি ও আরবি ভাষার প্রভাবে নাম হয় ছিলাহেত বা ছিলহেত যা ইংরেজ আমলে ইংরেজি ভাষার প্রভাবে হয়ে যায় সিলহেট। বাংলা সংক্ষেপে সিলেট হলেও ইংরেজি শব্দ সিলহেট হিসাবে অধ্যাবধি লেখা হয়। উল্লেখ্য, ফার্সি/ আরবি বর্ণ ছ ও ত ইংরেজিতে স ও ট লেখায় ফার্সি/ আরবি শব্দ ছিলহেত ইংরেজিতে সিলহেট লেখা এবং বাংলায় সংক্ষেপে সিলেট বলা ও লেখা হয়।
সুদূর অতীতে হিমালয় পর্বতের দক্ষিণ দিকের ঢালু অঞ্চলের পাহাড়িয়া এলাকা খাসিয়া-জৈন্তা, কাছাড় ও ত্রিপুরা রাজ্যের নিম্নের দক্ষিণাঞ্চলই সাগর এলাকা বঙ্গোপসাগরের অংশ ছিলো। হিমালয় পর্বত থেকে আসা বরাক নদবাহিত উর্বর পলিমাটি জমে বঙ্গোপসাগর থেকেই বরাক নদের নিম্নাংশ কুশিয়ারা নদীকে কেন্দ্র করে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত টিলাটুলি পরিপূর্ণ দীপাঞ্চলদ্বয়কেই শ্রীহট্ট বা সিলেট নামে অভিহিত করা হয়। তাই শ্রীহট্ট এলাকা প্রাকৃতিকভাবেই উত্তর ও দক্ষিণাংশে বিভক্ত হওয়ায় অতীতে উভয় এলাকাকেই উত্তর শ্রীহট্ট ও দক্ষিণ শ্রীহট্ট বলা হতো যা বর্তমানে কেবল শ্রীহট্ট ও মৌলভীবাজার জেলারই অংশ হিসাবে পরিচিত। উল্লেখ্য, বিভিন্ন দ্বীপসহ আমাদের বাংলাদেশও এভাবেই গড়ে উঠেছে এবং উঠছে। সুদূর অতীতে বর্তমান মৌলভীবাজারের মনু নদীর উত্তরদিক থেকে কুলাউড়া ব্রহ্মচালা/ বরমচাল, ভট্টরায়/ ভাটেরা ও ফেঞ্চুগঞ্জের টিলাটুলি পাশ দিয়ে প্রবাহিত কুশিয়ারা নদীকে কেন্দ্র করে নিকটস্থ জলাশয় হয়ে বর্তমান দক্ষিণ সুরমাস্থ সুরমা নদীর উত্তর দিকের টিলাটুলি যা পূর্বে হরিপুর ও বটেশ্বর থেকে পশ্চিমে কুমারগাঁও অর্থাৎ বর্তমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। তাই অতীতে চারদিকে অর্থাৎ দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর সংশ্লিষ্ট দক্ষিণ-বঙ্গিয় ভাটি অঞ্চল উত্তরে খাসিয়া-জৈন্তা, কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট এলাকা, পশ্চিমে সমতল লাউড় রাজ্য এবং পূর্বে কাছাড় ও ত্রিপুরা এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে বিস্তৃত জলাশয় ছিল।
উল্লেখ্য, বর্তমান সুরমা নদী আসলে কানাইঘাট হয়ে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় থেকে আসা লোভাছড়ারই নিম্নাংশ। পরবর্তীতে দ্রুত যোগাযোগের জন্য খাল কেটে বরাক নদের সাথে সংযুক্ত করায় সুরমা নদীর জল প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে সুরমা নদী বরাক নদের শাখায় রূপান্তরিত হয়। সিলেটের চারদিকের অতল জলরাশির কারণেই ষষ্ঠ শতাব্দির ত্রিশের দশকে উত্তর ভারত থেকে ত্রিপুরা ও কাছাড়ের পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে কামরূপ যাওয়ার পথে প্রখ্যাত চীনা পরিব্রাজক নিম্নের শ্রীহট্ট এলাকাকে সাগর হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
সপ্তম শতাব্দিতে ত্রিপুরার নাথ বংশিয় রাজাগণই তাঁদের আরাধ্য দেবতা হট্টনাথের বা শ্রীহস্তা দেবীর বিগ্রহ স্থাপনের মাধ্যমে নিজেদের রাজ্যের পাশেই শ্রীহট্ট নামের জনবসতির সূচনা করেন। শ্রীমঙ্গলের কালিপুরে প্রাপ্ত তাম্রশাসন যা দ্বারা ত্রিপুরার সামন্ত নৃপতি মরগুনা নাথ নিজ এলাকার উত্তরে বর্তমান মৌলভীবাজার এলাকায় কিছু ভূমি দান করেন। এ দানপত্র বর্তমান কুমিল্লা যা ত্রিপুরার প্রাক্তন সমতলাংশে প্রাপ্ত সামন্ত নৃপতি ও সাধক লোক নাথের তাম্রলিপির অনুরূপ। লোকনাথ ও মরগুনাথ উভয়ই ত্রিপুরা রাজা শ্রীনাথের বংশিয় ছিলেন। উল্লেখ্য, অতীতে কোন নতুন বসতি স্থাপিত হলে তা ধর্মিয় ভিত্তিতেই হতোÑহিন্দু হলে দেব-দেবীর বিগ্রহ, বৌদ্ধ হলে ভগবান বৌদ্ধের বিগ্রহ, মুসলমান হলে মসজিদসহ পীর-ফকিরদের রওজাকে এবং খ্রিস্টান হলে চার্চকে কেন্দ্র করেই তা হতো।
মৌলভীবাজারের রাজনগরের পশ্চিমভাগ গ্রামে প্রাপ্ত তাম্রলিপি থেকে জানা যায়, অষ্টম থেকে দশম শতাব্দি পর্যন্ত দক্ষিণ শ্রীহট্ট এলাকা আরাকান থেকে আসা বিক্রমপুরের চন্দ্রবংশিয় বৌদ্ধ রাজাদের অধীনে ছিল। ঐসময় ঐ রাজাদের পৌ-্রবর্ধন ভূক্তি বা প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়ে দক্ষিণ শ্রীহট্ট রাজ্যে একটি ম-ল বা বিভাগে পরিণত হয়। কোন কোন ঐতিহাসিক শ্রীহট্ট এলাকাকে প্রাচীন হরিকল রাজ্যের অংশ ছিল বলেও মনে করেন। উল্লেখ্য, সুদূর অতীতে বাংলাদেশ, বংগ, পু-্র, রাঢ়, গৌড়, সমতট, হরিকেল ইত্যাদি জনপদে বিভক্ত ছিল। সপ্তম শতাব্দিতে রাজা শশাঙ্ক এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত রাজা গোপাল প্রমুখ গৌড়-বঙ্গ একিভূত করেন। দশম শতাব্দির শেষ দিকে চন্দ্রবংশীয় রাজা গৌড় বাংলার বৌদ্ধ রাজা মহিপাল কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে নিজ রাজ্যের শ্রীহট্ট মন্ডলে এসে বর্তমান রাজনগরের পশ্চিমভাগ এলাকাকে কেন্দ্র করে শ্রীহট্টের ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন শ্রীহট্ট রাজ্যের সূচনা করেন। পরবর্তিতে চন্দ্র বংশিয় রাজত্ব দুর্বল হয়ে পড়লে তাদেরই অধীনস্থ স্থানীয় দেব বংশিয় সামন্ত শাসকরা নিজেদের এলাকায় স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করে ভাটেরা এলাকার হোমের টিলায় রাজ্যের রাজধানি স্থাপন করেন যা ভাটেরায় প্রাপ্ত তাম্রলিপি এবং পরবর্তীতে আবিস্কৃত ধ্বংসাবশেষ থেকেই জানা যায়। দেব বংশিয় রাজাগণও তাঁদের আরাধ্য দেবতা হট্টনাথের বিগ্রহ স্থাপন করে সে নামে ভূমিও দান করেন। এ দেব বংশিয় রাজাগণই সম্ভবত: ষোলশত শতাব্দির সূচনা পর্যন্ত ভাটেরা কেন্দ্রিক এবং কুশিয়ারা ও মনু নদী বিধৌত দক্ষিণ শ্রীহট্ট এলাকা নিয়ে গঠিত শ্রীহট্ট রাজ্যে রাজত্ব করেন। রাজা গোবিন্দ কেশব দেব ছিলেন এ বংশের শেষ রাজা। তখনো কুশিয়ারা নদের উত্তর দিকে গড়ে ওঠা উত্তর শ্রীহট্ট দ্বীপাঞ্চল গভীর জঙ্গলাকীর্ণ ছিল এবং জনবসতি বলতে পাশের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় থেকে আসা মঙ্গোলিয়ান গোত্রিয় যাযাবর খাসিয়া শাখার কিছু লোকজন যারা খাদ্যের অন্বেষণে পশু-পক্ষী ও মৎস্য শিকারার্থে নীচের দিকে এসে কিছু কিছু বসতি স্থাপন করেন।
বারশত শতাব্দির শেষের দিকে গজনীর সুলতান মোহাম্মদ ঘুরির ভারত জয়ের পর তুর্কি, ফার্সি ও আরবি ভাষার প্রভাবে ভারতের নাম হয় প্রথমে সিন্দুস্থান এবং পরে হিন্দুস্থান এবং ভারতে আর্য মুসলমানদের আসার এবং ইসলামধর্ম প্রচারেরও পথ সুগম হয়। তেরশত শতাব্দির প্রথমদিকে সম্ভবত তুরান/ তুরস্ক থেকে বাবা আদম নামে এক ইসলাম ধর্ম প্রচারক দিল্লি হয়ে ভারতের গৌড় রাজ্যে আসেন। তখন গৌড় রাজা ছিলেন কট্টর হিন্দু বর্ণবাদি রাজা বল্লাল সেন। রাজার অমানবিক বর্ণবাদি নীতির প্রতিবাদ করলে রাজার সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে বাবা আদম (রাহ.) শহীদ হলে পরবর্তীতে তাঁর রওজার সাথে বড়দীঘি খনন করায় ঐ এলাকার নাম হয় আদম দীঘি যা বর্তমানে বগুড়ার একটি উপজেলা। পরবর্তীতে বিক্রমপুরের কাছে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি করায় এ এলাকায় আরেকটি আদমদীঘির সৃষ্টি হলেও আসল আদমদীঘি বগুড়ায়ই বর্তমান। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি বখতিয়ার খিলজি গৌড়রাজ্য জয় করার পর দিল্লী থেকে আগত হযরত শাহজালাল (রহ.) নামক এক ইসলাম ধর্ম প্রচারক তদানিন্তন গৌড় রাজ্যের পশ্চিম-উত্তর এলাকা যা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মালদা এলাকা-তথায় সঙ্গী-সাথিসহ বসতি স্থাপন করে ধর্মপ্রচারের পর সেখানে সমাধিস্থ হন। তাঁকেই গৌড়িয় শাহজালাল পীর বলা হয়। বখতিয়ার খিলজি ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে প্রাক্তণ কামরূপ রাজ্যের রাজধানী পা-ুয়া বর্তমান আসাম রাজ্যের রাজধানী গোয়াহাটি জয় করলে সেখানে ইসলাম ধর্ম প্রচারার্থে পারস্য/ ইরানের প্রখ্যাত তাব্রীজ শহর থেকে হজরত শেখ জালাল উদ্দিন তাব্রীজী (রহ.) গৌড় নগরি হয়ে পা-ুয়ায় গিয়ে ধর্ম-প্রচারের পর তথায় সমাধিস্থ হন। তাঁর সাথি আরেক ধর্মপ্রচারক হযরত জালাল উদ্দিন বোখারির মাজার শরীফও সাথে রয়েছে। হযরত শেখ জালাল উদ্দিন তাব্রিজীর মাজারকে বাইশহাজারী মাজার শরীফ বলা হয়। তিনিই সেখানকার বিখ্যাত আদিনা মসজিদ নির্মাণ করেন। আসাম/ গোয়াহাটি যাওয়া প্রায় সকল পর্যটকগণই প্রখ্যাত সে দরগা শরীফ পরিদর্শন/ জিয়ারত করতে ভুলেন না। শেখ জালাল উদ্দিন তাব্রিজী ১২৪৪ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ওফাতের প্রায় একশত বছর পর মরোক্কোর প্রখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা কামরূপ/ পা-ুয়ায় গিয়ে শেখ জালাল উদ্দিন তাব্রিজীর মাযার শরীফ জিয়ারত করলেও কেউ কেউ পরিব্রাজক ইবনে বতুতাকে উল্টো সিলেটে এসে সিলেটের রাজার গল্লি এলাকা যা পরবর্তীতে দরগাহ মহল্লায় বসতি স্থাপনকারি প্রখ্যাত ইসলাম ধর্ম প্রচারক ও সুফি সাধক হযরত শাহ জালালের সাথে সাক্ষাৎ করেন বলে লিখলেও তখনও প্রাচীন উত্তর শ্রীহট্ট দ্বীপাঞ্চল যা বর্তমানে শহরসহ সদর সিলেটে যথাযথ জনবসতিও গড়ে ওঠেনি। হয়নি মুসলিম বিজয়ও। সুদীর্ঘ ভ্রমণের অনেকদিন পর অন্য লোকের দ্বারা লেখানো ইবনে বতুতার ভ্রমণ কাহিনী যা বাংলায় অনুবাদ হয়ে প্রকাশিত হয়েছে তাতে স্মৃতি-বিস্মৃতির অনেক ভুল-ভ্রান্তি থাকাই স্বাভাবিক।
মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মোনায়েম খাঁন ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে গৌড় বঙ্গের শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ কররানিকে পরাজিত করে গৌড় রাজ্য দখল করেন। দাউদ কররানির উত্তরাধিকারি বায়োজিদ কররানি এবং মোগল সেনাপতি মানসিংহ কর্তৃক দখলকৃত বিহারের পাঠান শাসক কতলু খান লোহানির উত্তরাধিকারি ফতেহখাঁন লোহানি এবং ভ্রাতুষ্পুত্র উসমান খান লোহানি ওরফে খাজা উসমান প্রমুখ সদলবলে ভাটি বাংলার দিকে পালিয়ে আসেন। বায়োজিদ কররানি সোনারগাঁয়ের স্বাধীন শাসক ঈশা খাঁর আশ্রয় গ্রহণ করেন। খাজা উসমান ভাটির দিকে ময়মনসিংহের ক্ষুদ্র সামন্ত রাজ্য বোকাইনগর দখল করে সেখানে নিজ স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন। ফতেহখান লোহানি লাউড় রাজ্যে যাওয়ার পথে বানিয়াচুঙ শাসকের সাহায্যে ত্রিপুরার মহারাজের আশ্রয় লাভ করেন। প্রয়োজনে শ্রমিক সরবরাহের শর্তে ত্রিপুরার মহারাজা নিজ বিরাট রাজ্যের পশ্চিমাংশে আশ্রয় নেয়ায় ঐ অংশকে ফার্সি/ আরবি ভাষায় তরফ বলা হয় এবং তাকে তা পরিচালনার ভারও দেয়া হয়। মোগলদের তাড়া খেয়ে বঙ্গে পালিয়ে আসা বর্ণিত কররানি ও পাঠান বংশিয় লোকজন সোনারগাঁয়ের স্বাধীন শাসক ঈশা খাঁসহ অন্যান্য হিন্দু মুসলিম সামন্ত শাসকদের বারোজন মিলিত হয়ে অগ্রসরমান মোগলদেরকে প্রতিহত করে নিজ নিজ স্বাধীনতা রক্ষা করতে কাজ করায়ই এরা ফার্সি ভাষায় বাংলার প্রখ্যাত বারো ভূইয়া/ সামন্ত রাজা নামে ইতিহাসে খ্যাত। পালিয়ে আসা বায়োজিদ কররানি পরবর্তিতে ভূইয়া বায়োজিদ নামে খ্যাত হয়ে স্বাধীন শ্রীহট্ট রাজ্যের প্রথম মুসলিম বিজয় শাসক ফতেহ খাঁন লোহানিকে তাড়িয়ে সিলেটেরও শাসক হয়েছিলেন।
১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে প্রখ্যাত মোগল সেনাপতি খাঁন-ই-জাহান সোনারগাঁসহ বঙ্গের নিম্নাঞ্চল দখল করতে অগ্রসর হলে মহান মোগল সম্রাট আকবরের অহিংস নীতি অনুযায়ী বঙ্গের ছোট ছোট শাসকগণ মোগল সম্রাটের বশ্যতা স্বীকার করলে তাঁদেরকে নিজ নিজ রাজ্য পরিচালনার অধিকার বহাল রাখা হবে ঘোষণা হয়। এতে উৎসাহিত হয়ে সোনারগাঁ শাসক ঈশা খাঁন প্রথমে কিছু প্রতিরোধের সৃষ্টি করলেও পরবর্তিতে মোগল বাহিনীর বিশালত্ত্ব ও শক্তি অনুধাবন করে সম্রাট আকবরের বশ্যতা স্বীকার করলে ঈশা খাঁনকে মসনদে আলা উপাধি প্রদান করে নিজের রাজ্য পরিচালনার অধিকার বহাল রাখা হয়। এভাবে অন্যান্যরাও মোগল বশ্যতা স্বীকার করে নিজ নিজ মর্যাদানুযায়ী পদবি প্রাপ্ত হন। বানিয়াচুঙ্গের রাজা গোবিন্দ নারায়নসিংহ মোগল বশ্যতা স্বীকারের সাথে সাথে সাম্যবাদি ইসলাম ধর্মের মানবতাবাদি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে হবিব নাম গ্রহণ করলে মোগল সেনাপতি তাঁকে সম্মানি খাঁন উপাধিতে ভূষিত করলে তাঁর নাম হয় হবিব খাঁন। হবিব খাঁনের ভাই লাউড় রাজা জগন্নাথ নারায়নসিংহ ও মোগলবশ্যতা স্বীকার করে নিজ রাজ্য বহাল রাখেন। হবিব খান নিজ রাজ্যে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসারেও বিশেষ অবদান রাখেন। সেনাপতি খান-ই-জাহান পরবর্তিতে দক্ষিণবঙ্গে ইসলামধর্ম প্রচারার্থে বাগেরহাটে বসতি স্থাপন করে সেখানে সমাধিস্থ হন। প্রখ্যাত ষাটগম্বুজ মসজিদ তারই অমরকীর্তি।
ষোলশত শতাব্দির প্রথম দিকে রাজধানি ভাটেরা কেন্দ্রিক শ্রীহট্ট রাজ্যের দেব বংশিয় শেষ রাজা গোবিন্দ কেশবদেব ত্রিপুরার রাজা বা এলাকার পাহাড়িদের আক্রমণে স্বদলবলে পলায়ন করে উত্তর শ্রীহট্ট দ্বীপাংশের নদী তীরবর্তি এলাকায় বসবাসরত নগন্য সংখ্যক খাসিয়াদেরকে এলাকার পূর্বদিকে বিতাড়িত করে ঐ এলাকায় বসতি স্থাপনসহ নতুন রাজ্য স্থাপন করেন। রাজা গোবিন্দ নিজ দখলকৃত এলাকায় খাসিয়াগণ যাতে কোন উপদ্রব বা আক্রমণ করতে না পারে সেজন্য নিজ বসতি এলাকার পূর্বদিকের টিলাটুলি ঘেরা স্থানে একটি শক্ত দূর্গ বা গড় নির্মাণ করায় এলাকার নাম হয় টিলাগড়। এ গড়ের ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান। পরবর্তিতে খাসিয়াদেরকে বিতাড়িত করে সম্পূর্ণ এলাকা তথা বর্তমান বটেশ্বর/ হরিপুর পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। রাজা গোবিন্দ সুরমা নদীর উত্তর দিকে উচু টিলার পাদদেশে নিরাপদ স্থানে নিজ বসতি স্থাপনার্থে যে গড় বা দুর্গ স্থাপন করেন সে এলাকাকে আজো রাজার গড় এবং বর্তমান আম্বরখানা বাজারের উত্তর দিকে রাজার গড়ে প্রবেশের যে পথ তৈরী করা হয় সে এলাকাকে আজো গড়দোয়ার বলা হয়। এ গড়ের কারণেই কেউ কেউ পরবর্তিতে শ্রীহট্টকে গৌড় রাজ্য হিসাবে বর্ণনা করেছেন যা সঠিক নয়। কারণ ঐতিহাসিক গৌড়-নগরি কেন্দ্রিক গৌড় রাজ্য উত্তরবঙ্গের চাপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত যা তুর্কি বংশিয় আফগান সেনাপতি বখতিয়ার খিলজি ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে জয় করে গৌড়-বঙ্গে মুসলমানদের আগমনের সূচনা করেন। এলাকার পানি সমস্যা সমাধানের জন্য রাজা গোবিন্দ নিজ মাতার নামে দুর্গ/ গড়িয় এলাকায় যে দীঘি খনন করান সে রাণীর দীঘি আজো তথায় বিদ্যমান। আম্বরখানা বাজারের উত্তরপূর্বদিকে বর্তমান বনশ্রী এলাকায়ও একটি বিরাট দীঘি খনন করা হয় যা আজো রাজার দীঘি নামে পরিচিত। এলাকায় রাজ্য ও বসতি স্থাপনকালেই রাজা নিজ আরাধ্য দেবতা হট্টনাথের বিগ্রহ স্থাপন করে তথায় যাতায়াতের যে রাস্তা নির্মাণ করেন তা রাজারগল্লি নামে আজো পরিচিত। হট্টনাথের মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আজো দরগা গেইটস্থ কেন্দ্রিয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ এলাকায় সংরক্ষিত। পাশের টিলায় মন্দিরের সেবায়েতদের আখড়া ছিল এবং সাথের অন্য টিলায় রাজার মন্ত্রী মনা রায়ের বাসস্থান ছিল বলে ঐ টিলাকে আজো মনা রায়ের টিলা বলা হয় যেখানে বর্তমানে জেলা জজ এবং গণপূর্ত প্রকৌশলির বাসস্থান। ঐ বাসস্থানাদি নির্মাণকালে খননের সময় বর্ণিত আখড়ার তৈজসপত্রের খন্ডাংশ পাওয়া যায়। রাজার গড় বা দুর্গের পূর্বদিকের পাহারার এলাকা আজো চৌকিদেখি এলাকা হিসাবে পরিচিত যা বর্তমান পীর-মহল্লারই পূর্বাংশ মাত্র।
রাজকবি ছিলেন প্রখ্যাত সংস্কৃত পন্ডিত ঋষিকেশ বিদ্যাবিনোদ ঐসময় পন্ডিত রঘুনাথ শিরোমণি কর্তৃক হট্টনাথের পাঁচালি নামক কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে শ্রীহট্টসহ এলাকার প্রাচীন ইতিহাস লিখিত হয়। রাজা গোবিন্দ পীড়িত হলে রাঢ় দেশ থেকে আনিত প্রখ্যাত রাজবৈদ্য চক্রবানী দত্তের পরিচর্যায় তিনি রোগমুক্ত হলে রাজার অনুরোধে চক্রবানী দত্ত নিজ বৈদ্যপুত্রদ্বয় মহিপতি দত্ত ও মুকুন্দ দত্তকে রেখে নিজ দেশে চলে গেলে পুত্রগণ বর্তমান আম্বরখানা বাজারের উত্তর দিকে গড়-দোয়ার এলাকার কাছে যে এলাকায় বসতি স্থাপন করেন সে এলাকা আজো দত্তপাড়া নামে পরিচিত। শ্রীহট্ট শহরের পূর্বদিকে কালাগুল এবং দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ী এলাকায় হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মহাভারতে বর্ণিত সীতা দেবীর খন্ডিত দেহখন্ডের গ্রীবা-পীঠাংশের জমাট পাথর খন্ডের আবিস্কার শ্রীহট্টকে হিন্দু ধর্মের তীর্থস্থান হিসাবে খ্যাতি দিলেও উত্তর শ্রীহট্ট এলাকায় অধ্যাবধি কোন প্রাচীন তাম্রলিপি না পাওয়া দক্ষিণ শ্রীহট্টের ন্যায় এ এলাকার প্রাচীন বসতি ও সভ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দে

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • সিলেটে আরবি ভাষাচর্চা
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় এবং সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম আজিজপুর
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধ্যায়
  • কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয়
  • শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক দাউদিয়া মাদরাসা
  • পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরিগুলো
  • আল হামরা : ইতিহাসের অনন্য কীর্তি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • Developed by: Sparkle IT