ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস

পরাগ মাঝি প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০৭-২০১৯ ইং ০০:৫২:২৩ | সংবাদটি ৩৭৪ বার পঠিত
Image

পিট (peat) হচ্ছে পানিতে ডুবে পচে যাওয়া ও আংশিক অঙ্গারিভূত শৈবাল বা উদ্ভিজ্জ পদার্থ। কোনো জলাশয়ে অনেক দিন ধরে জমে থাকা পিট ধীরে ধীরে জলজ ভূমির জন্ম দেয়। সময়ের বিবর্তনে এখানে কোনো পানি না থাকলেও উদ্ভিজ্জ উপাদানগুলো বিদ্যমান থাকে। এ ধরনের পিট বগে যদি কোনো মৃতদেহ অবস্থান করে, তবে তা প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক নানা জটিল বিক্রিয়ার মাধ্যমে অবিকৃত থেকে যায়। এমনকি হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও মৃতদেহে পচন ধরে না। মানুষের প্রচেষ্টা ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় এই মমি। পৃথিবীজুড়ে সংরক্ষিত এসব মৃতদেহকে বলে বগবডি বা জলাভূমির মানুষ। এ ধরনের জলাভূমিতে অক্সিজেনের পরিমাণ থাকে খুবই কম, থাকে খনিজ লবণের প্রাচুর্য এবং উচ্চমাত্রার এসিডযুক্ত পানি, যা পচনশীল ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্ষমতা হ্রাস করে দেয়। এভাবে হাজার বছরের রহস্যময় এই মানবদেহগুলো যখন আবিষ্কৃত হয়, তখন জন্ম দেয় নানা প্রশ্নের, বিজ্ঞানীদের বাধ্য করে নতুন করে ভাবতে। এ পর্যন্ত ঠিক কতটি বগবডি পাওয়া গেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। কারণ আবিষ্কারের পর তা সংরক্ষণের অভাবে বেশ কিছু বগবডি নষ্ট হয়ে গেছে।
এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বগবডিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো হচ্ছে ডেনমার্কে পাওয়া কোয়েলবার্গ নারী (Koelbjerg woman)। ডেনমার্কের কোয়েলবার্গ অঞ্চলে পাওয়া গিয়েছিল এই মৃতদেহটি। এটির রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান বিজ্ঞানীরা। কারণ তারা দেখেন ওই নারীটি যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও আট হাজার বছর আগে পৃথিবীতে বেঁচেছিলেন।
সবচেয়ে বেশি বগবডি পাওয়া গেছে উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে জার্মানি, ডেনমার্ক, হল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে। এই বগবডিগুলো বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এরা সবাই লৌহযুগের মানুষ। বহুল আলোচিত কিছু বগবডির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑটোলান্ড মানব (Toulland man), গ্রাউবল মানব (Grauballe man) আর লিন্ডাউ মানবের (Lindwo man) মতো অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত বিখ্যাত সব বগবডি। এই মৃতদেহগুলো গবেষণা করে দেখা গেছে, এর মধ্যে প্রায় সবারই মৃত্যু হয়েছে অস্বাভাবিক এবং সহিংস উপায়ে। এমন সহিংসতার প্রকৃত কারণ জানা না গেলেও বেশির ভাগ প্রতœতত্ত্ববিদরা মনে করেন, বগ মানুষদের নির্মমভাবে হত্যা করে পিট বগে ফেলে রাখা হয়েছিল। তখন হয়তো কেউ জানতই না, এখানে ফেলে রাখলে মৃতদেহ সংরক্ষিত থেকে যাবে এবং হাজার হাজার বছর পর এগুলো নিয়ে মানুষ গবেষণায় মেতে উঠবে।
কিন্তু কী কারণে হত্যা করা হয়েছিল এদের? কারও কারও মতে, হয়তো দেবতাদের উদ্দেশে বলি দেওয়া হয়েছিল। আবার কারও মতে কোনো অপরাধের কারণে এদের হত্যা করা হয়েছে। বগবডির মধ্যে সাম্প্রতিক সংযোজন হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের হাতে নিহত রুশ সৈন্যরা। এবার দেখা যাক কয়েকটি বগবডি থেকে প্রাপ্ত গবেষণা কী বলে
টোল্যান্ড মানব (Toulland Man)
১৯৫০ সালে ডেনমার্কের সিল্কবার্গ প্রদেশের টোল্যান্ডে এক জলাভূমিতে পাওয়া যায় প্রস্তর যুগের একটি মানবদেহ। জলাভূমির কাছে স্থানীয় দুই বালক মাটি খুঁড়তে গিয়ে সন্ধান পায় মিশমিশে কালো এই মানবদেহটির। নিজেদের অজান্তেই তারা ইতিহাসের আর একটি পাতার রহস্য উদ্ঘাটন করে ফেলে। তার বয়স ছিল আনুমানিক ৪০ বছর। আর উচ্চতা ছিল পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি।
সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় মানবদেহটি। এর শরীরের কোনো অংশেই পচন ধরেনি। জানা গেছে, ওই মানবদেহটির মাথায় মেষ চামড়ার টুপি, মুখে হালকা দাড়ি, শক্ত পেশিবহুল মুখ। বিখ্যাত ‘টোল্যান্ড মানব’ জন্ম দেয় নানাবিধ জল্পনা-কল্পনার। রুপালি-ধূসর শরীরের এই মানুষটির শরীরকে যেন খোদাই করা হয়েছে গ্রাফাইট দিয়ে। দেখে মনে হয়, এইমাত্র মৃত্যু হয়েছে তার। অথচ প্রতœতত্ত্ববিদরা বলছেন, তার বয়স কমপক্ষে আড়াই হাজার বছর! পিট বগের প্রাকৃতিক সুরক্ষায় তার মৃতদেহটিকে এতটাই সুরক্ষিত ছিল, তার চোয়ালের খোঁচা খোঁচা দাড়ি আজও অবিকৃত।
এই মৃতদেহটির সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো এর গলায় দড়ির ফাঁস লাগানো রয়েছে। দড়িটি কোনো মেশিনে তৈরি করা নয়, হাতে বানানো। গলায় জড়ানো ফাঁস থেকে ধারণা করা হয়, তার মৃত্যু ঘটেছিল শ্বাসরোধের মাধ্যমে। মাথা জুড়ে থাকা ঘোমটাকৃতির টুপিটি চামড়া ও উলের সংমিশ্রণে নির্মিত। তবে তার সারা শরীরে কোনো কাপড় ছিল না। মাতৃগর্ভে সন্তান যেভাবে থাকে অনেকটা সেভাবেই তাকে পাওয়া যায় পিটের দুই মিটারেরও গভীরে নিমজ্জিত অবস্থায়। তার মুখভঙ্গিতে একটি প্রশান্ত ভাব লক্ষ করা যায়। তাই মৃতদেহটির অবস্থান এবং প্রশান্ত মুখভঙ্গির কারণে ধারণা করা হয়, তাকে উৎসর্গ করা হয়েছিল সে সময়েরই কোনো দেবতার উদ্দেশে। বর্তমানে টোল্যান্ড মানবের শবদেহটি সংরক্ষিত আছে ডেনমার্কের সিল্কবার্গ জাদুঘরে।
উইন্ডেবির দুর্ভাগা কিশোর (Windeby boy)
১৯৫২ সালে জার্মানির উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত উইন্ডেবিতে পাওয়া আরেকটি সাড়া জাগানো বগবডি হচ্ছে উইন্ডেবির কিশোর (Windeby boy)। প্রাথমিকভাবে এই শবদেহটি নিয়ে গবেষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডেকোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-তত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. হ্যাথার গিল-রবিনসন। তিনি মত দেন, এটি ১৪ বছরের এক বালিকার মৃতদেহ।
যদিও পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আরেকটি গবেষণায় জানা যায়, ওই দেহটি আসলে ১৬ বছরের এক কিশোরের, যে লৌহযুগে পৃথিবীতে বাস করত। সে সময় কেউ মারা গেলে সাধারণত তার লাশটি পুড়িয়ে দেওয়া হতো। হত্যা করার ফলেই হয়তো কিশোরের লাশটি পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। প্রায় দুই হাজার বছর আগের ওই কিশোরটির চোখ বাঁধা ছিল উলের কাপড়ে। তার মাথার অর্ধাংশ ছিল কেশবিহীন। এ থেকেই ধারণা করা হয়, তাকে হয়তো নির্মম কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এও ধারণা করা হয়, তাকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় জলাশয়ের দিকে। এরপর শরীরের সঙ্গে ভারী পাথর আর ডালপালা বেঁধে দিয়ে তাকে পানিতে নিক্ষেপ করা হয়। আর এভাবে নিজের অজান্তেই সে তলিয়ে যায় পিটের গভীরে। কে জানত যে হাজার হাজার বছর পর সে নিজেই সাক্ষী হয়ে থেকে যাবে এক নির্মম হত্যাকা-ের।
লিন্ডো মানব (Lindow Man)
১১ হাজার বছর আগে সর্বশেষ বরফ যুগ শেষ হলে বরফ গলে ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি জলাভূমির সৃষ্টি হয়, যা পিট বগে রূপ নেয়। ১৯৮৪ সালে ইংল্যান্ডের ওই অঞ্চলেই পাওয়া যায় সাড়া জাগানো ‘লিন্ডো ম্যান’ নামের মরদেহটি। এন্ডি মোল্ডসহ আরও কয়েকজন পিট উচ্ছেদনকারী চাষিরা একে খুঁজে পান লিন্ডো মস নামক এলাকায়। এ জন্য মরদেহটির নামকরণ করা হয় ‘লিন্ডো ম্যান’। এই মরদেহটি যখন আবিষ্কার করা হয়, তখন ইংল্যান্ডের পুলিশ সন্দেহ করেছিল এটি হয়তো স্থানীয় রিন বার্ডিথের কাজ, যে তার স্ত্রীকে খুন করে গুম করেছিল। জানা যায়, মালিকা ডি ফার্নান্দেজ নামে এক নারীকে বিয়ে করেছিল রিন। কিন্তু রিনের ছিল সমকামিতার অভ্যাস। সে সময় সমকামিতার জন্য নির্মম শাস্তির বিধান ছিল। স্ত্রী মালিকা রিনের এই যৌনাচার হাতেনাতে ধরে ফেলেছিল এবং অর্থ দাবি করেছিল। অন্যথায়, সে এটি ফাঁস করে দেবে বলে হুমকি দেয়। ধারণা করা হয়, এরপরই নিজের স্ত্রীকে খুন করে গুম করে দেয় রিন। কিন্তু পুলিশের এই ধারণা কয়েক দিনের মধ্যেই ভুল প্রমাণিত হয়। মরদেহটির ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে গবেষকরা হতবাক হয়ে যান। উচ্চতর গবেষণা করে দেখা যায়, এটি আসলে দুই হাজার বছর আগের একটি মানুষের মরদেহ। ২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে যার মৃত্যু হয়েছিল। তার মৃত্যুর সম্ভাব্য ইতিহাসও বেশ মর্মান্তিক ও নির্মম। ডিএনএ পরীক্ষা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ২০ বছরের কাছাকাছি। তার পাকস্থলী আর অন্ত্রে পাওয়া পোড়া রুটির টুকরাই ছিল তার শেষ খাবার। কিন্তু এই খাবারে পাওয়া যায় বিষের উপস্থিতি। তবে এটা বলা কঠিন যে, শুধু বিষক্রিয়ার ফলেই তার মৃত্যু হয়েছে। কারণ তার সারা শরীরে ছিল অসংখ্য আঘাতের কাটাছেঁড়া চিহ্ন, যা তার যন্ত্রণাদায়ক অন্তিম মুহূর্তকে নির্দেশ করে। তার মাথার উপরিভাগে ছিল সাড়ে তিন সেমি দীর্ঘ ‘ভি’ আকৃতির কাটাচিহ্ন। মাথার পেছনে ছিল ভোঁতা কোনো অস্ত্রের আঘাতে সৃষ্ট ক্ষত। শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা ঘাড়টি ভেঙে গিয়েছিল। পাঁজরের হাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং বুকের ডান পাশে ছুরিকাঘাতের গভীর ক্ষত ছিল। এই চিহ্নগুলো তার ভয়াবহ মৃত্যুর সাক্ষ্য দেয়।
লিন্ডো ম্যানের মৃত্যুর কারণ বিষয়ে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য হচ্ছে তৎকালীন উৎসর্গ প্রথা। সমসাময়িক কালে, দেবতাদের সন্তুষ্টি লাভের আশায় উৎসর্গ করা হতো সাধারণ মানুষকে। তার মৃত্যুর ধরন দেখে ধারণা করা হয়, এমনই কোনো একটি ঘটনার শিকার সে। বিষমিশ্রিত খাবার খাওয়ানোর পর তাকে আঘাত করে আর শ্বাসরোধের মাধ্যমে মেরে ফেলা হয়। সবশেষে তার গলা কেটে দিয়ে নিশ্চিত করা হয় মৃত্যুকে।
লিন্ডো ম্যানের পুরো শরীর কিন্তু একবারে পাওয়া যায়নি। ১৯৮৪ সালে যখন তাকে প্রথম পাওয়া যায়, সেদিন পিট উচ্ছেদনকারী মেশিনের ধারালো অংশে তার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সেদিন তার শরীরের কোমর পর্যন্ত অংশ পাওয়া যায়। এ ঘটনার চার বছর পরে তার বাম পা খুঁজে পাওয়া গেলেও তার ডান পাটি খুঁজে পাওয়া যায়নি কখনোই। হয়তো তা লুকিয়ে আছে পিটেরই গভীর কোনো অংশে সাক্ষী হয়ে হাজার বছরের নির্মমতার। কিংবা নির্যাতনের ফলে ওই পা-টি হয়তো ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, যার ঠিকানা হয়েছে অন্য কোনো স্থানে।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Image

    Developed by:Sparkle IT