শিশু মেলা

ভূতের মান ইজ্জত

সুলতান মাহমুদ প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৮-২০১৯ ইং ০০:৪৬:৩৫ | সংবাদটি ২৩০ বার পঠিত

আমার বড় চাচা, নাম আবুল কালাম। আমরা ছোটবেলা থেকেই তাকে কালা চাচা বলে ডাকতাম। তাঁর গাত্র বর্ণ একটু কালো ছিল বলেই হয়তো বা আমাদের ডাকার সাথে তাঁর নামটা মিলে মিশে যেত। আমাদের ছোট বড় মাঝারী সবার কাছেই কালা চাচা একজন প্রিয় মানুষ ছিলেন মজার মজার গল্প বলার কারণেই। তিনি অল্প কথায় গল্প বলে যেতেন আর আমরা হেসে হেসে লুটোপুটি খেতাম।
সন্ধ্যে হলেই আমাদের বাড়িতে গল্পের আসর বসত। কালা চাচাকে সবাই ঘিরে ধরতাম। আমাদের ছোটদের মাঝখানে তিনি বসতেন। গল্প বলার সময় তিনি নিজে একটুও হাসতেন না, অথচ শ্রোতাদের মাঝে তিনি হাসির বন্যা ছুটাইয়ে দিতেন। এসব আসরে আমরা ছোটরাই শুধু থাকতাম না, বাড়ির বড় বড় কর্তারাও শুনে মজা লুটতেন। একদা সন্ধ্যায় আমাদের কালা চাচা, ভূতের গল্প বলছিল। আমি তাঁর ভাষাতেই গল্পটা লিখে যাচ্ছি। কালা চাচা বলছে, ‘শুন তোরা সবাই।
একদিন অমাবস্যা রাতে আমি মেলান্দহ বাজার থেকে বাড়ি ফিরছি। অনেক রাত হয়ে গেছে তখন। অত রাতে রিকশা টিকশা পাচ্ছিলাম না, তাই হেঁটে হেঁটেই বাড়িতে আসছিলাম। চার কিলোমিটার পথ। তার মধ্যে দুই কিলোমিটার পথে কোথাও কোণ বাড়ি ঘর নেই। খাসা নির্জন এলাকা। দু’পায়ের মেঠো পথ। আমি সম্পূর্ণ একা। রাস্তাঘাটে একটা লোক দেখা তো দূরে কথা একটি কাকপক্ষিও দেখতে পাচ্ছিনে। ভূত পেতœীর ভয় ডর আমার মনে তেমন ছিল না। হন হন করে হেঁটে আমি বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। একদম খাটি ঘুটঘুটে অন্ধকার। হাঁটছি তো হাঁটছি, আপন মনে হাঁটছি। নির্জন প্রান্তরে এসে গেলাম। সেখানে তিনটি তাল গাছ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। অন্য কোন গাছ পালা নেই। কেন যে বেক্কল তাল গাছ তিনটি এই নির্জন প্রান্তরে বসতি গড়েছে বুঝতে পারলাম না।
গাছগুলোকে দেখেই আমার মনে কেমন জানি একটু ভয় ভয় লাগছে। তাল গাছগুলোর স্বভাব চরিত্র তেমন ভাল না, ভূত-পেতœীদের নিয়ে বসবাস করে। অনেকের মুখেই এ কথা শুনেছি। আমি নিজেও এক রাতে দেখেছি দুটো কুঁজো বুড়িকে তরতর করে তাল গাছে উঠতে এবং নামতে। গাছে উঠতে এবং নামতে তাদের সে কী খিল-খিলানী হাসি! দেখলে পিত্তি জ্বলে যায়।
আমি হাঁটছি আর ভাবছি, যদি ভূতের দেখা পাই তবে ডরানো যাবে না। ওরালে ওরা পেয়ে বসবে। ডরাবো, তো মরছি। মনে সাহস রাখতে হবে। না ডরালে ওরা আমার কোন ক্ষতিই করতে পারবে না। আমি জানি ভূতেরা আসলে মানুষের গায়ে স্পর্শ করতে পারে না। শুধুমাত্র ভয় দেখানোর জন্যে বিভিন্ন রকমের ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। মনে মনে আমি সাহস সঞ্চয় করে চলেছি। ‘ব্যাটা ভূতের পো-যত রূপই ধারণ কর না কেন আজকে রাতে আমি কালা পাহাড়ই হয়ে থাকব।’
আমি হাঁটছি। হঠাৎ আমার মনে হল আমার পিছু পিছু কে যেনো হাঁটছে। আমাকে অনুসরণ করছে। আমি থেমে পিছনে তাকালাম। নাহ্। কাউকে দেখতে পেলাম না। মনে একটু ভয়ের শংকা দেখা দিল। আমি হাঁটা বন্ধ করলাম না। এতে বিপদ বাড়তে পারে। আমি স্পষ্টই বুঝতে পারলাম আমার পিছনেরটা আমার তালে তালেই হাঁটছে। আমি আড় চোখে ডাইনে বামে তাকালাম। যা দেখলাম তাতে আমি চমকে উঠলাম। আবছা ছায়ায় মতো কিছু। আমার উচ্চতায় দ্বিগুণ তাদের ছায়া। আমাকে অনুসরণ করে এরা এগুচ্ছে।
এই ছায়া বস্তুটি যদি আমায় থাবা দিয়ে ধরে ফেলে তবে আমি কালা আর কালা থাকব না। কালিদহ সাগরে পতিত হবো। মনে মনে কিছু ভয় পেলাম। কিন্তু ভয়কে প্রকাশ করার কোন লক্ষণ দেখালাম না। আমি আমার গতিতে এগুতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম, আমার পিছনে ছায়া একটি নয়, দু’টি ছায়া আমার ডানে এবং বামে। আমি আল্লাহর নাম জপতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত তাল গাছের একদম নিচে এসে গেলাম। ঠিক তখনই ঘটল আসল ঘটনা।
আমার পিছনের ছায়া দুটো আর নেই। মনে মনে ভাবলাম বিপদ কেটে গেছে। প্রথম তাল গাছটা পেরিয়ে ২য় তাল গাছের নীচে আসতেই ‘দেখতে পেলাম আমার সামনে দুটো বুড়ো পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে। উচ্চতায় আমার দ্বিগুণ। দাঁত কেলিয়ে হাসছে। চোখ চারটিতে যেনো আগুনের ফুলকি। মুলার মতো বড় বড় দাঁত। খেয়াল করে দেখলাম- তাদের পা দুটো শূন্যে ঝুলানো। আমি ধমকে বললাম, ‘সামনে থেকে সরে যা।’
ভূতুড়ে গলায় ওরা বলল, ‘কিঁ রেঁ কাঁলা ভঁয় পেঁলি।’
ঃ ভয় পাবো কেন? আমার কাছে আদি ও আসল সুলেমানী তাবিজ আছে। আমাকে যদি তোরা স্পর্শ করিস, তবে পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে যাবি।’
ঃ হেঁ হেঁ-হেঁ-হেঁ.... আঁমরাও আঁদি ও আঁসল ভূঁত। মঁনুষ্য সঁমাজে এঁমুন কেঁউ নেঁই যে আঁমাদের ভঁয় পাঁয় না।
ঃ আমি কালা পাহাড়। তোদের চৌদ্দগোষ্ঠীর যত ভঁত প্রেত আছে, ডেকে আন। একেকটাকে টুটি চেপে ধরব আর থাপড়ায়ে থাপড়ায়ে বত্তিশ পাটির দাঁত একটা একটা করে খুলে ফেলব। আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই আমি তাল গাছের আগায় খিল-খিলানী হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। সম্ভবত ভূতের নাতি পেতিœরা আমার কথায় মজা পেয়ে হাসাহাসি করছে। ওদেরকে বলতে শুনলাম, ওঁ দাঁদা ভূঁত- এ ব্যাঁটা তোঁ তোঁমারে ডঁরায় না। ওঁল্টা আঁরও তোঁমার দাঁত খুঁলবার চাঁয়। আবার হাসি।
দাদা ভূত বলল ’আঁচ্ছা। কাঁলা, তুঁই না ডঁরালে তোঁ আঁমাদের ভূঁতগিরি থাঁকে নাঁ। একটু ডঁরা ভাঁই।
আমি শক্ত গলায় তাদের বললাম, আমি একটুও ডরাব না। তোদের ভূতগিরি আজ ছুটাবো।
দেখলাম দাদা ভঁত দুটো এতে প্রচন্ডভাবে হতাশ হয়ে পড়লো। তাদের উচ্চতা কমে অর্ধেক হয়ে গেল। আবার তারা নাকি গলায় বলতে শুরু করলো ‘ওঁ কাঁলা, লঁক্ষ্মি ভাঁই আঁমার, তুঁই যঁদি নাঁ ডরাস তবে নাতি পেতিœর সাঁমনে আঁমাদের মাঁন ইঁজ্জত এঁক্কে বাঁড়ে পাঁংচার হঁয়ে যাঁবে। আঁমাদের জুঁনিয়ররা তোঁ আঁমাদের মাঁন্যি গঁণ্যি কঁরবে নাঁ।
মুরুব্বী ভুত দাদাদের প্রতি আমার একটু মায়া হলো। আমি তাদেরকে বললাম, আচ্ছা, ঠিক আছে তোমাদের ইজ্জও রক্ষার্থে আমি একটু ভয় পাইলাম। আমি চিৎকার করে বলতে লাগলাম ‘তোমরা কে কোথায় আছো গো? আমার ভূতে পাইছে। আমি ডরায়ে মইরা গেলাম।’
আমার চিল্লাচিল্লিতে মুরুব্বি ভঁতদ্বয় তো মহা খুশি। খুশিতে ওরা একজন অপরজনকে বলছে ‘যাক অবশেষে নাতি পোতির সামনে আমাদের মান ইজ্জত রক্ষা হলো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT