সম্পাদকীয় মো. মাসুদ রানা

দুধে এন্টিবায়োটিক, ভুলটা আসলে কোথায়?

প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৮-২০১৯ ইং ০১:৪৬:০৫ | সংবাদটি ৬৭ বার পঠিত

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের একজন সম্মানিত শিক্ষক গাভির পাস্তুরিত ও খোলা বাজারের দুধ নিয়ে দুই দফা গবেষণা করেছেন। প্রথম দফায় তিনি তার পরীক্ষাকৃত স্যাম্পলে এন্টিবায়োটিক পেয়েছেন তিনটি। এরপর দেশের মানুষের মাঝে গাভির দুধ নিয়ে হই চই শুরু হয়ে গেছে। শুরু হওয়ারই কথা। কারণ মানুষের দেহ বিভিন্নভাবে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হয়ে যাচ্ছে। চার দিনের শিশুর দেহও এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স থেকে মুক্তি পাচ্ছে না? তিনি আবার দ্বিতীয়বার পাস্তুরিত দুধের স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষা করলেন। সেবারও তিনি চারটি (অক্সিটেট্রাসাইক্লিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, লিভোফ্লোক্সাসিন ও এনরোফ্লোক্সাসিন) এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি দুধে প্রমাণ করলেন। আমি গবেষণা ততটা বুঝি না, সবেমাত্র মাস্টার্সে ভর্তি হলাম। তবে একজন ভেটেরিনারি মেডিসিনের ছাত্র হিসেবে আমার মনে প্রশ্ন আসে, দুধে কিভাবে লিভোফ্লোক্সাসিন ও এনরোফ্লোক্সাসিন নামক এন্টিবায়োটিক আসল? যেহেতু এই দুটো জেনেরিক নামের কোনো এন্টিবায়োটিকই ডেইরি এনিমেলে ব্যবহার করা হয় না। অর্থাত্ আপনি গরু-ছাগলের ওষুধ হিসেবে লিভোফ্লোক্সাসিন ও এনরোফ্লোক্সাসিন নামক এন্টিবায়োটিক দুটির কোনো প্রকার সলিউশন, ট্যাবলেট কিংবা ইনজেক্ট্যাবল ফর্ম বাজারে খুঁজে পাবেন না। এর উত্তরটা কেউ দেয়নি। তবে আমি নিজে-নিজেই উত্তরটা বের করছি। তার আগে আসুন জেনে নেই গাভির দুধে এন্টিবায়োটিক কিভাবে আসতে পারে- এক. কোনো একটা গাভিকে এন্টিবায়োটিক দেওয়া হলে সেই এন্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা শেষ হওয়ার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। সে সময় পার না হওয়া পর্যন্ত ঐ গাভির দুধ কিংবা মাংস আপনি খেতে পারবেন না। সেটা সাধারণত ওষুধভেদে ৭-২১ দিন পর্যন্ত হতে পারে। যাকে আমরা বলি উইথড্রয়াল পিরিয়ড কিংবা উইথহোল্ডিং পিরিয়ড। এই নির্দিষ্ট সময় পার না হওয়ার আগেই যদি আপনি সেই গাভির দুধ পান করেন কিংবা মাংস খান তবে আপনার শরীরে এন্টিবায়োটিকের রেসিডিউয়াল পার্টটা চলে যাবে। অর্থাত্ এভাবে দুধে এন্টিবায়োটিক চলে যেতে পারে এবং তা আপনার দেহেও চলে যেতে পারে।
দুই. দুধ যে কোম্পানি পাস্তুরাইজ করার জন্য নেয় তারাও দুধে ভেজাল হিসেবে এন্টিবায়োটিক মিশিয়ে দিতে পারে। যেমন গরুর ক্ষেত্রে কখনোই লিভোফ্লোক্সাসিন ও এনরোফ্লোক্সাসিন ব্যবহার করা হয় না। তাহলে এসব যদি দুধের মধ্যে পাওয়া যায় তবে সেটার জন্য কোম্পানিই দায়ী থাকবে। কারণ তারাই হয়ত পাস্তুরাইজ করার সময় দুধে হিউম্যান ড্রাগ হিসেবে ঐ দুটো এন্টিবায়োটিক দুধে মিশিয়ে দিয়েছে। কিংবা এমনটাও হতে পারে যে, মানুষে ব্যবহূত এই দুটো এন্টিবায়োটিকের রেসিডিউয়াল পার্ট মানুষের মলমূত্রের মাধ্যমে ঘাস, লতাপাতাসহ বিভিন্নভাবে প্রাণী দেহে আসতে পারে। আর তখন হয়ত এনরোফ্লোক্সাসিন ও লিভোফ্লোক্সাসিন এন্টিবায়োটিক দুটো থাকতে পারে গাভির দুধে।
তিন. কোনো গাভি ম্যাস্টাইটিস বা ওলান প্রদাহে আক্রান্ত হলে ইন্ট্রা ম্যামারী রুট দিয়ে এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। এমন অবস্থায় যদি সেই গাভি থেকে দুধ দোয়ানো হয় তবে সেই দুধে এন্টিবায়োটিক থাকবে। চার. ফিড কোম্পানিগুলো তাদের খাদ্যে অতিমাত্রায় এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে গাভি থেকে উত্পন্ন দুধ ও মাংসে এন্টিবায়োটিক পাওয়া যেতে পারে।
অনেকেই মনে করেন যে, এন্টিবায়োটিক খাওয়ালে গরুর দুধ বৃদ্ধি পায়, খামারিরা দুধের সেলফ লাইফ বৃদ্ধি করার জন্য দুধে এন্টিবায়োটিক মিশিয়ে দেয়। কিন্তু আমি আমার ডিভিএম লাইফের পুরো পাঁচ বছরে কোথাও পড়িনি যে গরুকে এন্টিবায়োটিক খাওয়ালে দুধ বেশি হয় কিংবা দুধে ভেজাল হিসেবে এন্টিবায়োটিক মিশানো হয়। তারা এন্টিবায়োটিক না মিশিয়ে ভেজাল হিসেবে ডিটারজেন্ট, স্যালিসাইলিক এসিড, বেনজোয়িক এসিড, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড প্রভৃতি মিশিয়ে থাকে। তাই আমার মনে হয় দুধে এন্টিবায়োটিক থাকার জন্য খামারিরা ততটা দায়ী নয় (একটু দায়ী বটে, কারণ অনেকেই না জেনে কিংবা জানার পরও উইথড্রয়াল পিরিয়ড মেইনটেইন করে না। কিন্তু সব গরুই তো আর এক সাথে অসুস্থ হয় না)।
দেশ ও জাতিকে নিরাপদ প্রাণীজ আমিষ সরবরাহের লক্ষ্যে এদেশের প্রাণী সম্পদের দিকে আরো বেশি করে সরকারের নজর রাখা উচিত। ভিএফএ, কম্পাউন্ডার দিয়ে চিকিত্সা নয় রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ান দিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে হবে। এজন্য মান্ধাতার আমলে তৈরি করা অর্গানোগ্রামে পরিবর্তন নিয়ে এসে প্রতিটা উপজেলা প্রাণী হাসপাতালগুলোতে কমপক্ষে চার জন ভেটেরিনারি সার্জনের পদ সৃষ্টি করতে হবে। এমনকি প্রাণী সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন পর্যায়েও একজন করে ভেটেরিনারি সার্জন নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
তরল দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ভেজাল রুখতে বিএসটিআইকে আরো সক্রিয় হতে হবে। বাজারে যেসব বিদেশি গুঁড়া দুধ প্রচলিত আছে সেসবও অতিদ্রুতই পরীক্ষা করা হোক। সেসবে ভেজাল থাকলে বাংলাদেশে সেগুলোর আমদানি বন্ধ করা হোক। যেসব কোম্পানি দুুুুধে ভেজাল মেশায় তাদের লাইসেন্স বাতিল করাসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রাণীর খাদ্যে মাত্রাতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেলে সেই কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। আর এভাবেই দেশ ও জাতি পাবে নিরাপদ আমিষের সন্ধান।
লেখক :শিক্ষার্থী, এমএস ইন ফিজিওলজি

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT