ধর্ম ও জীবন

সাবাহি মক্তবের আধুনিক সংস্করণ

সাদিকুর রাহমান প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৮-২০১৯ ইং ০২:০২:৫৬ | সংবাদটি ৩১১ বার পঠিত

সিলেট শহরের চৌহাট্টা পয়েন্ট থেকে পূর্ব দিকে সামান্য এগোলেই মিরবক্সটুলা এম.এস টাওয়ার। এ টাওয়ারের সামনে সাঁটানো কোরানিক গার্ডেনের ছোট্ট একটি সাইনবোর্ড। শহুরে শিশুদের ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষাপ্রদানের জন্যে গড়ে তুলা কোরানিক গার্ডেনের ছোট্ট এ সাইনবোর্ড দেখে এর ভেতরের বিশালতা বুঝার উপায় নেই। ভেতরে ঢুকে মনে হতে পারে এটা হয়তো কোনও অভিজাত শ্রেণির ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কিংবা কোনও বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অফিস ও সবগুলো শ্রেণিকক্ষের ফ্লোরে দৃষ্টিনন্দন সবুজ গালিচা বিছানো। গ্রেট ব্রিটেনের ইভিনিং স্কুলসমূহের আদলে গড়া পুরো প্রতিষ্ঠানটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। শিশুদের পড়ালেখার জন্যে রয়েছে পৃথক পৃথক টেবিল অ্যাটাস্ট চেয়ার। আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ মাল্টিমিডিয়া বা ডিজিটাল ক্লাসরুম। সমৃদ্ধ লাইব্রেরি।
দৃষ্টিনন্দন, শিশুবান্ধব, গোছালো ও পরিপাটি এ প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত পাঠদানের জন্যে রয়েছে নিজস্ব পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচী। রয়েছেন একঝাঁক মেধাবী, উদ্দ্যোমী ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক। যারা সময়ে সময়ে দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষকদের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতাকে ঝালাইও করেন। পাঠদান করেন একান্ত নির্মোহ চেতনায়, পরম ¯েœহে। সফল পাঠদানের জন্যে শিক্ষকগণ ব্যবহার করেন মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরসহ আধুনিক শিক্ষা-উপকরণ।
প্রতিদিন বিকেল হলেই কচিকাঁচাদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠে কোরানিক গার্ডেন। ক্লাসের ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় ছোট্ট সোনামণিরা পড়ছেন মহান প্রভুর নামে। কেউ পড়ছেন কুরআন, কেউ সিপারা, কেউ কায়দা। কেউ মশক করছেন সুরা-কেরাত, মাসনুন দুআ। কেউ বা সালাত ও অযু-গোসলের ব্যবহারিক তালিম নিচ্ছেন। কেউ নিচ্ছেন ইসলামি সঙ্গীতের বিশুদ্ধ সবক। কেউ রপ্ত করছেন অ্যারাবিক হ্যান্ডরাইটিং।
প্রি-কায়দা, কায়দা-১, কায়দা-২, তিলাওয়াহ ও তারতিল এ পাঁচটি ক্লাসে ভাগ করে চলে কোরানিক গার্ডেনের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম। এর বাইরে কুরআনের ভাষার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পরিচালিত হয় কোরানিক ল্যাংগুয়েজ প্রোগ্রাম। শেখানো হয় অ্যারাবিক হ্যান্ডরাইটিং ও বেসিক অ্যারাবিক। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পরিচালিত হয় কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজ শিক্ষাসফর, চিত্তবিনোদন ইত্যাদি। শিশুদেরকে ইসলামি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করে তোলার জন্যে নেওয়া হয় ইসলামি সংস্কৃতির ক্লাস। সঙ্গীতের তালিম দেন প্রশিক্ষণপ্রপ্ত সঙ্গীতজ্ঞ।
একসময় মুসলিম শিশুদেরকে ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষা প্রদান করা হতো মসজিদভিত্তিক মক্তবে। মক্তবই ছিলো শিশুদের ইসলামি জ্ঞানার্জনের সূতিকাগার। ভারতবর্ষে মক্তবের সূচনা হয় ৭১১ সনে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর। প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় মোগল আমলে। মোগল স¤্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় পুরো ভারতবর্ষে মক্তবের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও বিস্তৃতি। মক্তবের পুরো নাম সাবাহি মক্তব। সম্ভবত সাতসকালে পাঠদান শুরু হতো বলেই এ নামকরণ। সময়ের পরিবর্তনে মুসলমানদের হাজার বছরের ঐতিহ্য মক্তবের সে জৌলুস এখন আর নেই। বিশেষত, শহর-নগরে মক্তবের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।
কিন্টারগার্ডেন আর স্কুল সমূহের মর্নিং শিফট-এর ফলে বাচ্চাদের মক্তবে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে মুসলমানদের ঐতিহ্যের সাবাহি মক্তব এখন হারানোর পথে। মুসলিম শিশুরাও বঞ্চিত হচ্ছে মক্তবশিক্ষা থেকে। মক্তবের বিকল্প হিসেবে শহরের বাসা-বাড়িতে প্রাইভেট টিউটরের মাধ্যমে শিশুদের ইসলামের বুনিয়াদি তালিম দেওয়ার রেওয়াজ আছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ না থাকায় এ তালিম সবখানে আশানুরূপ নয়। মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী সাবাহি মক্তবের কার্যক্রমকে ধরে রেখে মুসলিম শিশুদের বুনিয়াদি শিক্ষাপ্রদানের জন্যে কোরানিক গার্ডেনের জন্ম।
কোরানিক গার্ডেনের পরিচালক মাওলানা আব্দুল্লাহ মনসুর। এক সন্ধ্যায় চা খেতে খেতে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। শোনা হয় কোরানিক গার্ডেনের গোড়ার কথা। আব্দুল্লাহ মনসুর জানান, কোরানিক গার্ডেনের সফল স্বপ্নদ্রষ্টা মুতিউর রহমান মতিন। মতিন পেশায় ব্যবসায়ী। নেশায় সমাজসেবী। দ্বিনের খেদমত ও সমাজসেবার একনিষ্ঠ তাড়ানা থেকে কোরানিক গার্ডেনের স্বপ্ন। মুতিউর রহমান মতিন তাঁর স্বপ্নকে শেয়ার করেন তরুণ ইসলামি চিন্তাবিদ সাঈদ নুরুজ্জামান আল মাদানির সঙ্গে। সাঈদ নুরুজ্জামান আল মাদানি সিলেট শহরে এ ধরণের প্রতিষ্ঠানের প্রথম উদ্যোক্তা। তিনিই সর্বপ্রথম নগরীর পাঠানটুলায় প্রতিষ্ঠা করেন বারাকা এ্যরাবিক লার্নিং সেন্টার। মুতিউর রহমান মতিন-এর চিন্তার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন সাঈদ নুরুজ্জামান আল মাদানি। মতিন সহজেই পেয়ে যান তাঁর স্বপ্নের আরেক সহযাত্রী। যাত্রী আর সহযাত্রী উভয়ে মিলে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কোরানিক গার্ডেন।
হাতে গোনা কয়েক শিক্ষক আর শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু করা কোরানিক গার্ডেনে বর্তমানে শিক্ষক সংখ্যা ৯ আর শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৬৪। কোরানিক গার্ডেনে শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদেরও কোরআন শেখানো হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে রয়েছে ‘কোরানিক বেসিক কোর্স’। এ কোর্সে পুরুষ ও মহিলাদের জন্যে রয়েছে আলাদা আলাদা শেখার ব্যবস্থা। মহিলাদের জন্যে রয়েছেন মহিলা শিক্ষিকা। কোরানিক গার্ডেনের শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই শহরের ধনাঢ্য ও অভিজাত পরিবারের সন্তান। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির মাধ্যমে কোরানিক গার্ডেনের আর্থিক ব্যয় নির্বাহ হয়ে থাকে।
কোরানিক গার্ডেনের চলমান অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমগুলোÑ রেগুলার কোর্স, উউকেন্ড কোর্স, আফটার এক্সাম কোর্স, কোরানিক বেসিক কোর্স, শাহরুল কোরআন কোর্স ও এ্যারাবিক ল্যাংগুয়েজ কোর্স শিরোনামে বিন্যস্থ। (চলবে)

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT