সম্পাদকীয়

রাস্তা কেন বন্ধ থাকবে?

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৮-২০১৯ ইং ০০:৩৬:৪৭ | সংবাদটি ৬২ বার পঠিত


বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ডক্টর আসিফ নজরুলের একটি বক্তব্য নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা হচ্ছে। একজন ভিআইপির অপেক্ষায় তিন ঘন্টা ফেরি আটকানোর ফলে ফেরিতে পারাপাররত এম্বুলেন্সে রোগীর মৃত্যুর ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি এই মন্তব্য করেন। তাঁর কথাগুলো এরকম-‘রাস্তা কি আপনার? নাকি আপনার বাপ-দাদার? রাস্তা কেন বন্ধ থাকবে আপনার জন্য? ফেরি-রেল-বিমান কি আপনার টাকায় কেনা? কেন থেমে থাকবে এসব আপনার অপেক্ষায়? কেন লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন কষ্ট পাবে আপনার আরামের জন্য? মানুষের করের টাকায় বেতন পান তাদের সেবা করার জন্য। আপনার গাড়িতে কেন থাকবে ফ্ল্যাগ? কেন বাজবে মানুষকে থামানোর হুইসেল, দেখানো হবে পুলিশের লাল ডান্ডা। কোন অধিকারে? প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী আর এম্বুলেন্সের মানুষ ছাড়া কারও চলার সময়ে এক মিনিটও রাস্তা বন্ধ থাকতে পারবে না। মন্ত্রী পর্যায়ের নীচে কারও গাড়িতে ফ্ল্যাগ থাকতে পারবেনা।’
ডক্টর আসিফের এই বক্তব্যে ওঠে এসেছে এদেশের সাধারণ তথা দেশপ্রেমিক মানুষদের অন্তরের কথাগুলো। সত্যি বলতে কী, বৃটিশ বেনিয়াদের দেয়া শাসন ব্যবস্থায়ই আমাদের সরকার, দেশ পরিচালিত হচ্ছে এখনও। তারাই শিখিয়েছিলো এদেশের নিরীহ সাধারণ জনগণের ‘শাসক’ হচ্ছে সরকারি আমলা, মন্ত্রী, এমপি। মানে এই ‘শাসকেরা’ ইচ্ছেমতো শাসনের স্টিমরুলার চালাতে পারবে জনগণের ওপর। আর তাদের শাসনামলে তারা ঠিকই জনগণের ওপর শাসনের স্টিমরুলার চালিয়েছিলো। কিন্তু বৃটিশ বেনিয়াদের বিতাড়নের পর পাকিস্তানও গেলো, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশও এখন সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে। অথচ এখনও আমাদের ঘাড়ে বৃটিশদের ভূত আসন গেড়ে বসে আছে। ছোট বড় আমলাদের কাজে কর্মে তারা এখনও সাধারণ জনগণের ‘শাসক’ হিসেবেই জাহির করে। সরকারও সেই সুযোগ দিয়ে রেখেছে। উদাহরণ স্বরূপ প্রতিটি জেলার ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার পদবী ‘ডেপুটি কমিশনার’দের বাংলায় বলা হয় ‘জেলা প্রশাসক’। অর্থাৎ এই পদবীতেই ‘শাসক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে ডেপুটি কমিশনারদের। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিককালে সরকারি চাকুরিজীবী ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত শতভাগ বেতন ভাতা বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করার ফলে তাদের মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব জন্ম হয়েছে। সাধারণ মানুষকে তারা অতীতে খুব একটা হিসাবে ধরতো না, এখনতো আরও ডেমকেয়ার। তাদের ঘুষের মাত্রা বেড়েছে দ্বিগুণ তিনগুণ। মোটামোটি অফিসার লেভেলের কোন ঘুষখোর দুর্নীতিবাজ চাকরিজীবীর এখন মাসিক বেতন-ভাতাও লাখ টাকার ওপরে। আর অবৈধ আয়ের হিসাব তো অনেক সময় সে নিজেও জানেনা। এই যে এতো আয় তাদের, এগুলো আসে কোত্থেকে? সাধারণ জনগণের ট্যাক্স-এর টাকায়ই তাদের বেতন ভাতা হয়। আবার এই জনগণের পকেট কেটেও তারা ঘুষের টাকা আদায় করছে। অর্থাৎ সাধারণ কৃষক, দিনমজুর, শ্রমিকদের দেয়া ট্যাক্স আর ঘুষ দুটিই দুর্নীতিবাজ আমলাদের পকেট ভারী করছে। অথচ এতোকিছু দেয়ার পরও এই হতভাগা জনগণ সরকারি আমলাদের কাছ থেকে সেবা নয়, বরং পাচ্ছে অসম্মান, অবজ্ঞা।
সরকারি আমলাদের উদ্দেশ্যে জাতির জনকের একটি বক্তব্য-‘এই কৃষক দিন মজুরের ট্যাক্সের টাকায় আপনারা বেতন পান। এদের সম্মান দিয়ে কথা বলেন’। যতোই দিন যাচ্ছে, জাতির জনকের সেই উক্তির গুরুত্ব যেন পানসে হয়ে উঠছে। সরকারি আমলাদের জনগণের সেবক হিসেবে ‘রূপান্তরিত’ করা কি সম্ভব? সম্ভব কি মন্ত্রী এমপিদের প্রকৃত জনসেবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ করা। দেশব্যাপী ডেঙ্গুর ভয়াবহ আক্রমণের মধ্যে যখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সপরিবারে থাকেন বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণে, তখন এই মন্ত্রীরাও যে দেশপ্রেমিক, জনসেবক হয়ে উঠবে একদিন, সেটা দুঃস্বপ্ন। তারপরেও আমরা আশাবাদী। যা হয়নি ৭০ বছরে, তা যে এখন হবেনা বলে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে হবে সেটা নয়। দেশে যথাযথ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে, সকল ক্ষমতার উৎস যে জনগণ, সেই জনগণকে উপযুক্ত মর্যাদার আসনে বসিয়ে, আমলাগণ-প্রতিনিধিদের প্রকৃত জনসেবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ করতে বাধ্য করতে হবে। আর তার জন্য দরকার ক্ষমতার অপব্যবহারকারী, দুর্নীতিবাজ ঘুষখোরদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রদান। সর্বোপরি এক্ষেত্রে সবচেয়ে দরকার দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন নেতৃত্ব।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT