পাঁচ মিশালী

একজন সাদা মনের মানুষ

আব্দুল কাদির জীবন প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৮-২০১৯ ইং ০০:৩৭:৫৩ | সংবাদটি ৬১ বার পঠিত

যেহীন আহমদ চৌধুরী ছিলেন একজন মানবতাবাদি, সৎ, পরোপকারী, সুস্থির, প্রাণবন্ত, ন্যায় পরায়ন, কৌতুক প্রিয়, খোদাভীরু, মিশুক ও একজন সাদা মনের মানুষ।
যেহীন আহমদ চৌধুরী ১৯৫২ সালের ১৪ এপ্রিল সিলেট শহরের মিরের ময়দানে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস হবিগঞ্জ জেলার নবিগঞ্জ উপজেলার মোস্তফাপুর গ্রামে। তার বাবা মরহুম নজমুল হোসেন চৌধুরী এবং মা মরহুমা আনজুমুনন্নেসা চৌধুরী। যেহীন আহমদ চৌধুরী’র ৬ ভাই বোন, ৬ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। বড় ভাই মোস্তাক হোসেন চৌধুরী, মেঝ ভাই আফসার হোসেন চৌধুরী এবং বোনদের মধ্যে দুর আফসান চৌধুরী, সাওয়ার বিবি ও মরহুমা রাজু চৌধুরী।
সিলেটের প্রগতিশীল সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে এই পরিবারের ছিল গভীর সম্পর্ক। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে সভাপতি ও আজীবন সদস্য হিসেবে রয়েছে যেহীন আহমদ চৌধুরী’র পরিবারের অবদান। যেহীন আহমদ চৌধুরী ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের আজীবন সদস্য। যেহীন আহমদের বাবা ছিলেন কেমুসাসের সাবেক দুই বারের সভাপতি, মরহুমের বড় ভাই মরহুম মোশতাক হোসেন চৌধুরী ছিলেন সিলেটের প্রথম আইন মহাবিদ্যালয় (সিলেট ল কলেজ) প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা এবং এ প্রতিষ্ঠানের উপাধ্যক্ষ হিসেবে দীর্ঘদিন তিনি নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
কর্মজীবনে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা “ফ্রেন্ডস ইন ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ (এফআইভিডিবি)’র নেতৃত্ব দেয়া ছাড়াও অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠায় যেহীন আহমদ চৌধুরী’র ভূমিকা রয়েছে। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে একা নয়, সংগঠিতভাবে অগ্রসর হতে হয় এই প্রত্যয়ে আস্থাশীল যেহীন আহমদ চৌধুরী আজীবন প্রত্যন্ত জনপদেও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠির জন্য তার সমস্ত কাজের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট এন্ড রিসার্চ (আইডিআর) এর সিনিয়র ফেলো যেহীন আহমদ চৌধুরী দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্মেষকালীন আজীবন সদস্য হিসেবে ব্যাপৃত ছিলেন। এরই মধ্যে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশন, এএলআরডি, আরডিআরএস, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি পেয়েছেন দেশে-বিদেশের স্বীকৃতি ও সম্মাননা। আইসিএই কানাডা তাকে ১৯৯৫ সালের জেরবি কিড এওয়ার্ড প্রদান করেছিল অ-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের নকশা প্রণয়নে উদ্ভাবনী অবদানের জন্য।
সক্রিয় শিখন পদ্ধতিতে প্রাথমিক শিক্ষায় একটি বিশেষ শিখন প্রক্রিয়া প্রবর্তনে তিনি অবদান রেখেছেন। নব্বইয়ের দশকে ফ্রেইরিয়ান তত্ত্ব সহজিকরণে দেশব্যাপি তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন। বয়স্ক ও ব্যবহারিক সাক্ষরতা কর্মসূচি ও উপকরণ উন্নয়নে যেহীন আহমদ চৌধুরী’র উদ্ভাবনী চিন্তা এ দেশের সাক্ষরতার হার উন্নীতকরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। সাহিত্য ও সংগীতের রসজ্ঞ হিসেবে তিনি ছিলেন পরিচিত আপনজনদের গ্রাহ্য একজন ব্যক্তি। নির্মোহ চরিত্রের নির্লোভ ওই ব্যক্তি চিরদিন বঞ্চিত মানুষের কাছে থেকে কাজ করে গেছেন। সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়নে তার অসামান্য অবদান রয়েছে।
সাহিত্য চর্চা ছিল তার নিত্য দিনের সঙ্গী। তিনি ছিলেন প্রচার বিমুখ। তিনি পাবলিসিটি বা প্রচারণা পছন্দ করতেন না। বাংলা ও ইংরেজীতে রয়েছে তার অসংখ্য কবিতা, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ও রচনা। অনুবাদেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। বিভিন্ন ভাষা থেকে তিনি অনুবাদ করেছেন। তার গবেষণাধর্মী অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে “যেহীন আহমদ স্মরণে” স্মারকের মধ্যে, যেটি প্রকাশ করেছে কিডনি ফাউন্ডেশন সিলেট (জানুয়ারী ২০১৯)।
যেহীন আহমদ হচ্ছেন এক সাধারণ মানুষ যার মধ্যে আছে অসাধারণ গুণাবলী। যেহীন আহমেদ একজন সফল মানুষ এবং আদর্শের প্রতীক। জীবনকে অতি সহজ সরলভাবে পরিচালনা করে নিজ অসাধারণ কর্ম প্রেরণা দিয়ে সর্বস্ব ত্যাগ করে উপেক্ষিত গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করা ছিল তাঁর প্রতিনিয়ত প্রচেষ্টা। মৃদুভাষী একজন অসাধারণ জ্ঞানী ব্যক্তি দীর্ঘদিন সমাজসেবামূলক কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
এফআইভিডিপি’র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দীর্ঘ ৩০ বৎসর বিশেষ করে সিলেটের মানুষের দুঃখ-কষ্টে নিজেকে সামিল করে তাদের উন্নতিকল্পে তাঁর অবদান অপরিসীম। পারিবারিক সূত্রে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা, গবেষণা ছিল তাঁর একটি আকর্ষণ। যেহীন স্যারের কাছে ছিল কবিতা ও সংগীতের এক অফুরন্ত ভান্ডার। ছাত্র থাকা সময়েও তিনি গান পছন্দ করতেন এবং ভালবাসতেন। ক্লাসিক্যাল মিউজিক, গজল, ভজন ছিল তাঁর দৈনন্দিন কর্মতৎপরতার এক চালিকাশক্তি। কর্মজীবন, তার নিজ সংগঠন, সহকর্মী ও বন্ধু বান্ধবরাই ছিল তাঁর সংসার। স্যারের নিজ পরিবার গঠনে ছিল সম্পূর্ণ অনীহা। তিনি তাঁর জীবনের সমস্ত কর্মক্ষমতা ও সময় দেশ ও মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছিলেন।
গরিব মানুষের কিডনি রোগের চিকিৎসার জন্য “কিডনি ফাউন্ডেশন সিলেট” স্থাপনায় তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তার সাহায্য সহযোগিতায় এই প্রতিষ্ঠান আজ দৃশ্যমান এবং অগ্রসরগামী।
যেহীন আহমদ চৌধুরী ২৮ অক্টোবর ২০১৮ইং, ১২ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৮ সফর ১৪৪০ হিজরী, রোজ রবিবার সকাল ৬.৫০ ঘটিকার সময় ঢাকা বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৬৭ বছর। তিনি দীর্ঘদিন থেকে কিডনী রোগে ভোগছিলেন। কিন্তু আগস্ট মাসে চোখের অপারেশনের জন্য ঢাকা চলে যান এবং অপারেশন শেষে তিনি বাসায় আবার ফিরে আসেন। কিছুদিন পর চোখে আবার সমস্যা দেখা দিলে তিনি আবার ঢাকা চলে যান এবং সেখানে হঠাৎ করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সব চেষ্টা ব্যার্থ করে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। রবিবার সকালের দিকে মারা গেলেও দাফন করার কাজটি সম্পন্ন করা হয় পরের দিন সোমবার। হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার মসজিদে যোহরের নামায শেষে মরহুমের জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয় এবং মাজারেই তাঁর মার কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
বিশিষ্ট মানবতাবাদি যেহীন আহমদ চৌধুরী’র আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদে দেশের এনজিও সুশীল সমাজের বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিশেষ করে তাঁর হাতে গড়া সংগঠন বে-সরকারি উন্নয়ন সংস্থা, বাংলাদেশ তৃণমূল পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও কর্মী বাহিনীর উন্নয়নে যেহীন আহমদের অবদান স্মরণ করে বিভিন্ন পেশাজীবি ব্যক্তিবর্গ শোক প্রকাশ করেন। আমৃত্যু কর্মস্থল এফআইভিডিবিতে কর্মরত সহ¯্রাধিক কর্মীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল।
চিরকুমার যেহীন আহমদ চৌধুরী সিলেটের আলোকিত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। যেহীন আহমদ চৌধুরী এবং তাঁর আর দুই ভাই কেউই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হননি। মরহুমের ভাগ্না ডাক্তার নজমুস সাকিব বাংলাদেশের একজন কিডনি বিশেষজ্ঞ। তার সমাজ সেবা মূলক কাজের অবদান জন্য সিলেটের সর্বমহলে পরিচিত।
যেহীন স্যার ভ্রমণ করেছেন অসংখ্য দেশ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- আমেরিকা, ইংল্যান্ড,কানাডা, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, পাকিস্তান, মিশর, নেপাল, সিঙ্গাপুর, ভারত, মালয়েশিয়া, কুয়েত, কাতার, নাইজেরিয়া, লেবানন, আফগানিস্তান। তিনি যেমন ছিলেন ভ্রমণ পিয়াসি তেমনি তার ভাষা সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছিল খুব। তিনি অনেক ভাষা সম্পর্কে জানতেন, যেমন বাংলা, ইংরেজী, আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষা ইত্যাদি।
যেহীন স্যার সম্পর্কে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদ কেসিএমজি স্যার বলেন, “যেহীনের এইভাবে হঠাৎ চলে যাওয়াটা আমাদের সবাইকে বিমুঢ় করে রেখে দিয়েছে। আমার কাছে সে ছিল অত্যন্ত আপন জন। বিশেষ ¯েœহের পাত্র। তার জীবনদর্শন, কর্মপ্রণালি, চিন্তাধারা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবোধ সবই আমাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করত। ব্র্যাকের সূচনালগ্ন থেকে যেহীনের সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। ১৯৭৯ সালে যেহীন যখন এফআইভিডিবি প্রতিষ্ঠা করে, তখন তার সঙ্গে আমাদের সংযোগ আরও দৃঢ় হয়। দরিদ্র মানুষের জন্য তার সহানুভূতিকে আমি আরও নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করতে পারি”।
তিনি আরও বলেন, “যেহীন ছিল একজন সত্যিকারের মানুষ। দেশ ও সমাজের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ। আমার বিশ^াস, বিভিন্ন সময়ে যারাই যেহীনের সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের সকলের কাছেই তা মূল্যবান স্মৃতি হয়ে আছে। আমি মনে করি, যেহীনের হাতে গড়ে তোলা সংগঠনের সকল কর্মী তার ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে লক্ষ্য বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাবেন। যেহীনকে সম্মান দেখানোর এবং তাকে মনে রাখার এটাই শ্রেষ্ঠ পথ।”
সব মানুষ সৃষ্টশীল হয়না। মানুষ তার কর্মগুণেই উজ্জ্বলতার স্বর্ণশিখরে আরোহন করে। সেইসব মানুষ যারা সমাজকর্মে নিজেদের নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়ে নিজের জন্মকে স্মরণীয় করে রেখেছেন; তাদের মধ্যে অন্যতম যেহীন আহমদ চৌধুরী। যেহীন স্যার তার কর্মগুণে পৃথিবীতে যুগযুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT