পাঁচ মিশালী

‘হৃদয়ে আমার মক্কা মদিনা’

শাহ নজরুল ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৮-২০১৯ ইং ০০:৩৮:২৩ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত

‘হজ্জ করিবার তরে শক্তি করো দান/ কা‘বারো গিলাফও ধরি- কান্দি যে হয়রান’ ......(শায়খে বর্ণভী রহ.)
লেখক বেলাল আহমদ চৌধুরীর ‘হৃদয়ে আমার মক্কা মদিনা’ বইটি আধ্যত্মিক সুখপাঠ্য ভ্রমণ কাহিনী। এর আগেও তিনি ‘অস্ট্রেলিয়ার স্মৃতিকথা’ নামে আরেকটি ভ্রমণ কাহিনী লিখেন, যা প্রকাশের পথে। এবারে ৩১০ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি যে কেউ দেখলেই হাতে নেবার ইচ্ছে হবে। পা-ুলিপি প্রকাশন কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থটি আমাদের ভ্রমণ সাহিত্যের একটি অনবদ্য সংযোজন হয়ে থাকবে। হজ্জ ও উমরা পালনে আমরা অনেকেই মক্কা মদিনা যাই। কিন্তু ক’জন একে কেন্দ্র করে গ্রন্থ রচনা করেন? তাও আবার ৬৪ বছর বয়সে। ‘হৃদয়ে আমার মক্কা মদিনা’ তাঁর দ্বিতীয় সফরনামা।
লেখক গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর মা-বাবাকে এ বলে-‘আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন পিতা আব্দুল মুমিত চৌধুরী, মাতা আমেনা খাতুন চৌধুরীর রূহের মাগফিরাত কামনায়।’ অফসেট কাগজে ছাপানো বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ৫০০/=।
গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন লেখক ও গবেষক আবদুল হামিদ মানিক। তিনি লিখেছেন ‘হৃদয়ে আমার মক্কা-মদিনা। না, শুধু লেখকের নয়, ধর্মপ্রাণ মুসলিম নরনারীর সবাই মক্কা-মদিনাকে হৃদয়ে ধারণ ও লালন করেন। স্বপ্ন দেখেন জীবনে অন্তত একবার হজ্জ পালন করবেন। দেখে আসবেন পবিত্রভূমি এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর জন্ম ও কর্মভূমি। কিন্তু সকলের সেই সৌভাগ্য হয় না। আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ এবং আল্লাহর মেহেরবানি প্রয়োজন। লেখক বেলাল আহমদ চৌধুরীর সৌভাগ্য যে, দু’দুবার ২০০৯ ও ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি হজ্জ পালন করতে পেরেছেন। প্রথমবার সহধর্মিনীও সাথে ছিলেন। হজ্জ থেকে ফিরে আসার পর হাজীদের হৃদয়ে স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় স্মৃতি ও অনুভূতি। কিন্তু তা লিখে অন্যের মন ও মননে পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতা সকলের থাকে না। বেলাল আহমদ চৌধুরী বিশেষ সেই সৃজনশীল পারদর্শিতার অধিকারী। তাই আবেগ, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ হৃদয়ে আমার মক্কা-মদিনা বইটি পাঠকদের উপহার দিতে সফল হয়েছেন।
তিনি আরো লিখেছেন-‘লেখক প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। হজ্বের আনুষ্ঠানিকতা, হুকুম-আহকাম এর প্রাসঙ্গিক অনেক তত্ত্ব তথ্য ও রেফারেন্স উল্লেখ করেছেন। যা দেখেছেন, যা শুনেছেন তাতেই সন্তুষ্ঠ থাকেন নি। এর পটভূমি ও ইতিহাস সন্ধান করে উপস্থাপন করেছেন। সূচিপত্রে চোখ ফেললেই পাঠক সহজে বুঝতে পারবেন বইটির আওতা কতদূর বিস্তৃত। এটি শুধু হজ্জের সফরনামা নয়, বরং সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহের ইতিহাস হয়ে উঠেছে। প্রথম অধ্যায়ের ৮৮টি এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৩০টি শিরোনামে বিষয়সমূহ বিন্যাস্ত করেছেন লেখক। শব্দ চয়ন ও শৈল্পিক বাক্য বিন্যাসে তিনি সাহিত্যরস সৃষ্টির চেষ্টা করেন নি। সহজ সরল স্বতঃস্ফূর্ত ভাষার দিয়েছেন বিবরণ। পাঠক তাঁর সরলতায় মুগ্ধ হবেন বলেই বিশ্বাস করি।
আমরা জানি হজ্জ ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির অন্যতম। কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন : ‘মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ্জ করা তার অবশ্য কর্তব্য।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯৭)। পবিত্র হজ্জ মহান আল্লাহর একটি বিশেষ বিধান। আল্লাহর জন্য হজ্জ পালনের মধ্যে মহান উদ্দেশ্য নিহিত রেখেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রকৃত হজ্জের পুরস্কার বেহেশত ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না। সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে যাঁরা হজ্জ পালন করবেন আল্লাহ তাঁদের হজ্জ কবুল করবেন এবং তাঁদের জন্য অফুরন্ত রহমত ও বরকত অবধারিত করে দিবেন।
হজ্জ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুবিদিত মাসসমূহে হজ্জ সম্পাদিত হয়। যে কেউ এই মাসগুলোতে হজ্জ করা স্থির করে, তার জন্য অশ্লীলতা, কুৎসা, অন্যায় আচরণ, ঝগড়া ও কলহ-বিবাদ করা নিষিদ্ধ।’ (সূরা বাকারা; আয়াত : ১৯৭)। তাই সর্বদা তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করে চলতে হবে। কারও ব্যবহার পছন্দ না হলেও রাগ করা যাবে না বা কটু কথা বলা যাবে না, কারও মনে কষ্ট দেওয়া যাবে না। কারও দ্বারা যদি কারও কোনো ক্ষতি হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। অন্যের বিপদে সর্বদা সাহায্য করার চেষ্টা করতে হবে। খেদমত নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করা যাবে না; বরং খেদমত করাকে সৌভাগ্য ও গৌরবজনক মনে করতে হবে। সর্বত্র সর্বদা নিয়মশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। দেহ ও মন সব সময় পবিত্র রাখতে হবে। সব সময় উযূর সঙ্গে থাকার চেষ্টা করতে হবে এবং মনে মনে সব সময় আল্লাহর যিকির জারি রাখতে হবে। নিজের স্বার্থ আগে উদ্ধার করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। নিজের আগে অন্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো মুসলমান ভাইয়ের হক নষ্ট করা যাবে না। নিজেকে নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ, নম্রতা, ভদ্রতা ও উদারতার শিক্ষায় দীক্ষিত করতে হবে।
হজ্জের বিষয় আশয় নিয়ে প্রচুর বইপত্র বাজারে আছে। তারপরও বেলাল আহমদ চৌধুরী রচিত ‘হৃদয়ে আমার মক্কা মদিনা’ এ বিষয়ে একটি সমৃদ্ধ ও নতুন সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করি। লেখকের বর্ণনাতে এক ধরণের আকর্ষণ আছে। বইটি পড়লে মনে হবে যে দেখাও যাচ্ছে। সাথে সাথে ইতিহাস পাঠও হবে। লেখকের একটি নিজস্ব বর্ণনা শৈলী এ গ্রন্থে ফুটে উঠেছে। এটাই একজন লেখকের মুন্সিয়ানা। বেলাল আহমদ চৌধুরী এ ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন।
বিচিত্র বিষয় চলে এসেছে কিন্তু তার পরও একটি ধারা বাহিকতা রক্ষিত হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে ৮০টি শিরোনামে মক্কা, মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় হজ্জ ও উমরা পর্ব আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে ৩০টি শিরোনামে মদীনা যিয়ারত ও আনুসাঙ্গিক বিষয় বিবৃত হয়েছে। গ্রন্থটি পড়ে হজ্জ ও উমরা যাত্রীরা উপকৃত হবেন নিঃসন্দেহে। গ্রন্থটিকে হজ্জ ও উমারার গাইড বুক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। মহান আল্লাহ লেখকের আন্তরিকতা ও পরিশ্রম কবুল করুন। পরকালে নাজাতের উসিলা বানান। আমীন

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT