পাঁচ মিশালী

শিক্ষকতা : প্রাসঙ্গিক কথকতা

মো. আতী উল্লাহ প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৮-২০১৯ ইং ০০:৪৩:৩৩ | সংবাদটি ৭৯ বার পঠিত

‘শিক্ষকতা’ সত্যিই একটি মহান পেশা। একজন শিক্ষক! আজীবন তিনি একজন ছাত্র। আজীবন তাঁকে পড়তে হয়, লিখতে হয়। এ লেখাপড়ার শেষ নেই। তাঁর লেখাপড়া শেষ-এর অর্থ হচ্ছে, তাঁর শিক্ষকতাও শেষ। প্রতিটি দিন ক্লাশে ঢোকার আগে তাঁকে নতুন কিছু পড়তে হয়, নতুন কিছু লিখতে হয়, নতুন কিছু শিখতে হয়- তবেই তিনি শিক্ষক। তাঁর ছাত্রত্ব থেকে মুক্তি নেই।
শিক্ষকতার ৪২ বছর পূর্তি উপলক্ষে আজ আমার এ উপলব্ধি এসেছে। এবং এটা একটা বলিষ্ট উপলব্দি। অধ্যয়ন এবং গবেষণা না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া নিরর্থক। আমার পিএইচডি সুপারভাইজার ছিলেন প্রফেসর ড. শিরিন হক। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছিলেন আমার ক্লাস-রুম শিক্ষক। ভীষণ ভয় করতাম। পিএইচডিতে যখন রেজিস্ট্রেশন করি, ভাবতেও পারিনি যে, তিনিই আবার হয়ে যাবেন আমার গাইডিং টিচার। অফিশিয়্যাল চিঠি পাওয়ার পর ভয়ে ভয়ে গেলাম ম্যাডামের কাছে। ও! আপনি এসেছেন, আমি তো এখন নামাজে দাঁড়াচ্ছি, পরে আসেন।’ হতাশ হলাম না। ভাবছিলাম শুধু, যা হবার তা-ই তো হয়েছে। যেন আমি এরকম কিছু একটা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। পরে যখন সাক্ষাৎ করলাম, ‘আপনি কিসের উপর কাজ করতে চান?’ ‘ম্যাডাম, রবার্ট ফ্রস্ট।’ ‘আজ চলে যান, আমি হজ্জে যাচ্ছি, দু’মাস পর যোগাযোগ করে আসবেন, কেমন?’ মনে হলো, ‘হায় আল্লাহ, কপালে যেন কি আছে।’
সময়মত যখন সাক্ষাৎ করলাম, ‘ফ্রস্ট বাদ দেন, ফেমিনিজমের (নারী অধিকার) কোন এ্যারিয়া নিয়ে চিন্তা করেন।’ রিসার্চ প্রপোজেল জমা দিলাম। তিনবার থিসিস্ টাইটেল পরিবর্তন হলো। রীতিমত হাঁপিয়ে উঠলাম। চতুর্থ অর্থাৎ শেষবার ম্যাডাম নিজেই টাইটেল বা শিরোনাম চূড়ান্ত করে দিলেন। শিরোনামের প্রতিটি শব্দ চয়ন নিয়েও আমাকে দীর্ঘদিন চিন্তা করতে হয়েছিল। আজও আমার তত্ত্বাবধায়ক ম্যাডাম সদর্পে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহায় তবিয়তে আছেন।
এক পর্যায়ে একই বৈঠকে আমার সুপারভাইজিং টিচার অন্ততঃ ৫০টি পুস্তকের নাম দিয়ে দিলেন। বইয়ের রাজ্যে আমাকে অকুল দরিয়ায় সাঁতরাতে হলো- কখনো ফ্রান্স, কখনো বৃটেন, কখনো আফ্রিকার কোনো দেশ। কখনো আমেরিকা বা কানাডা, কখনো মধ্যপ্রাচ্য, কখনো বা এশিয়ার কোন দেশের বই। বাদ যায়নি নিজ বাংলাদেশও। ‘ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, অমুকের সাথে সাক্ষাৎ করুন, ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে যান, অমুক বই এবং জার্নাল পড়ে আসুন।’ একসময় বললেন, ‘এখন আপনাকে সশরীরে ঐ ঐ দেশে যেতে হবে।’ বললাম- ‘ম্যাডাম, বিদেশে শিক্ষকতার সময় আমি বেশ কয়েকটি দেশেই গিয়েছি। এখন ছেলেমেয়ে, পড়াশুনা করছে, যদি দয়া করে অব্যাহতি দেন।’ রেফারেন্স টানতে পারবেন? আর, এ কয়েকটি বই দেশে না পেলে বিদেশ থেকে আনাতে হবে। সুযোগ আছে তো’? সবকিছুতেই আমার ‘জি, হাঁ’। করেছিও তা-ই। একটি বই : Schools of Feminist Thoughts কোথাও পাচ্ছিলাম না। ভাগ্য প্রসন্ন। এটি সহ আরো অনেক বই ম্যাডাম নিজ সংগ্রহ থেকে দিয়ে আমাকে সাহায্য করলেন। পরপর তিনটি পাবলিক সেমিনারও অফার করালেন। সার্টিফিকেটও পেলাম। প্রথম পাঁচটি বছর আমার লেখার উপর খড়গ-হস্তে লালকলম চালিয়েছেন। এক পর্যায়ে উনার নিজ থিসিসসহ অনেকগুলো নমুনা-থিসিস্ সরবরাহ করে আমাকে পাকাপোক্ত করে তুললেন। ৬টি বছর পর আসল থিসিস সাবমিশনের গ্রীণ সিগনাল।
ব্রিটিশ-আমেরিকান-আফ্রিকান-এশিয়ান-ফিকশন সমূহ এবং সংশ্লিষ্ট সমালোচনা গ্রন্থাবলী পড়তে পড়তে, নিজ প্রস্তুতি লেখা শিখতে লিখতে আর কম্পোজ করতে করতে রীতিমত নাভিশ্বাস। এক সময় পবিত্র ক্বোরআন-হাদিস ঘাটতে হলো- যতটুকু সম্ভব। দেখলাম, ক্বোরআন-সূন্নাহ আর বিদায় হজ্জের ভাষণেও রয়েছে নারী অধিকারের বিশদ বর্ণনা। আর লেখক-লেখিকা হিসেবে প্রথম পেলাম Christine de Pisan এর দুটো Treatises- যা বেরিয়েছিল পর পর ১৩৯৯ এবং ১৪০০ সালে। লেখক-লেখিকা হিসেবে তার পূর্বের কোন রেফারেন্স পাইনি- বিশেষ করে নারীবাদ, নারী শিক্ষা, নারীর মর্যাদা, নারী অধিকার এগুলোর উপর।
আল-ক্বোরআনে পেলাম, নারীর অধিকার এসেছে আগে, আর ঐ অধিকারকে নিক্তি হিসেবে ধরে নির্ধারিত হয়েছে পুরুষের অধিকার। কন্যা-সন্তানের জন্ম সংবাদকে বলা হয়েছে ‘সুসংবাদ’। আর, হাদিসে এসেছে- ‘তোমাদের সন্তান সন্ততিদের মধ্যে কন্যা-সন্তান শ্রেয়:’। তখনই মিলে গেল ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, সমালোচক এবং কবি D.H. Lawrence এর সাথে: My son is my son, till he gets a wife/My daughter is my daughter, all her life’. ভাষা ভাষা অর্থে প্রথম লাইনে নারীর দিকে কালো ইঙ্গিত করা হলেও দায়ী কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পুরুষ। এর যেকোন অপবাদ থেকে নারী মুক্ত। Lawrence এর ভাষায় নারী হচ্ছে পুরুষের life sharer. রবীন্দ্রনাথের কথায়- ‘শ্রান্ত দেহে আসি গৃহে/ নারী চিত্ত হতে অমৃত করিতে পান।’ বাউলের ভাষায়: ‘ঘরের শোভা চেরাগদানী/রাইতের শোভা চন্দনী/ নারীর শোভা আপন স্বামী/ পুত্রের শোভা জননী।’
গবেষণা করতে গিয়ে দেখলাম, একজন নারী কখনো ‘আশ্রিতা’ নন, বরঞ্চ পুরুষ তার দাস। শিশুকালে একটি কন্যা সন্তানের যাবতীয় দায়দায়িত্ব পিতার উপর বাধ্যতামূলক, যৌবনে স্বামীর উপর এবং বার্ধক্যে পুত্রের উপর। নারী আজীবন ফ্রি। আমার প্রিয় সহকর্মী প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলমগীর তৈমুরের ভাষায়- ‘স্যার, পৃথিবীর সবচাইতে ধনাঢ্য মহিলাকেও যদি কোন পুরুষ বিয়ে করে, তবুও সে বলতে পারবে না- ‘তুমি তো পৃথিবীর সবচাইতে ধনাঢ্য মহিলা, তোমার ভরণপোষণ আবার করব কেন আমি? ভরণ-পোষণ করার শর্তেই বিয়ে হয়।’ শর্ত ভঙ্গ করলে বিয়েও শেষ। আর বিয়ের সময় স্বামী দেয়, আর স্ত্রী পায়- এটা তার অধিকার। এখানেই নারীর মর্যাদা এবং তার অর্থনৈতিক ভিত্তি। আর হিন্দু শাস্ত্রে বিয়ের অপর নাম ‘ভার বহন করা’। একজন নারী এবং তার মাধ্যমে আগত সন্তানদের ভার বইতে পারলেই একজন পুরুষ বিয়ে করবে। নারী Housewife নয়, সে Home queen নারী যদি উপার্জনকারী হয় তার উপার্জনের উপর স্বামীর কোন অধিকার নেই। স্বামীর পরিবারের তো নয়-ই।
এজন্যই ইসলাম ধর্মে দেন-মোহর বাধ্যতামূলক। প্রেমে পাগল হয়ে আদালতে গিয়ে বিয়ে করলেও যদি সে সময় কোন কারণে দেনমোহর ধার্য্য না হয়ে থাকে, তবে পাগলামী যখন থামবে, মেয়ের সম্মান এবং যোগ্যতা অনুসারে দেনমোহর অটোমেটিক এসে বর্তাবে। এবং তা অমাফযোগ্য। নিজ ইচ্ছায় বা চাপে পড়ে মুখ দিয়ে ১০০ বার বললেও মোহর মাফ হয় না। এটা অন্য যে কোন ঋণের মত ঋণ। আর কেউ কারো ঋণ মাফ করে না। স্বামী মরে গেলেও মোহর মাফ হয় না। এখানে একটা কথা বলা আবশ্যক। আমাদের দেশে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, যে কোন বয়সের স্বামী মারা গেলে দেখা যায়, বিধবা স্ত্রী ঘরের অন্ধকার প্রকোষ্টে বসে কাঁদছে, আর কয়েকজন মাতবর গিয়ে ঐ অবস্থায় বলে ‘মাগো, মোহরটা মাফ করে দাও। দাফন-কাপনতো করতে হবে।’ সদ্য বিধবা এই নারী সন্তান-সন্ততি নিয়ে আগামীকাল হয়ত ভিক্ষায় বেরুতে বাধ্য হবে, এর উপর এই নির্যাতন। লাশের জন্য মাতবরদের এতই দরদ থাকলে তারাই তো মোহরটা দিয়ে দিতে পারে। আর তালাক দিলে দেনমোহর প্রদান আরো মারাত্মক, যদি একদিনের জন্যও ঘর-সংসার হয়ে গিয়ে থাকে। আর কোন ঘর-সংসার আদৌ না হয়ে থাকলে এই কুমারী নারীকে বা কুমারী বিধবাকে অর্ধেক মোহর প্রদান বাধ্যতামূলক। আর দেনমোহর মাফ চাইতে যাওয়া, পুরুষের জন্য অপদার্থ কাপুরুষের লক্ষণ নারীর সম্মানের আরও একটা বড় দিক হলো : কোন পুরুষ যদি বিয়ের সময় গরীব হয় এবং সে কারণে ঐ স্ত্রীর দেনমোহর, উদাহরণ স্বরূপ যদি এক লক্ষ টাকা ধার্য হয়ে থাকে, অথচ বিয়ের পর ঐ স্বামী যদি ধনী বা কোটিপতি হয়ে যায়, তবে প্রথমে ধার্যকৃত মোহর প্রদান করে থাকলে বাধ্যতামূলক অবস্থা থেকে সে মুক্তি পেয়ে যাবে; কিন্তু আল্লাহর শুকরিয়া স্বরূপ তার উচিৎ হবে, স্বেচ্ছায় তার স্ত্রীর মোহর যতটুকু সম্ভব উপরে তুলে সাব্যস্থ করা এবং সকলকে জানিয়ে দেয়া যে ঐ স্ত্রীর মোহর ১ লক্ষ-র স্থলে ১৫ লক্ষ করা হয়েছে। অন্যদিকে, গরীব থেকে আরও গরীব হয়ে গেলেও মোহর কমানোর কোন সুযোগ নেই। স্ত্রী নিজে তালাক দিলেও বা নিলেও পুরুষের জন্য ঐ একই আইন। তুমি কেমন পুরুষ-স্ত্রীকে ধরে রাখতে পারনি এখন তার পাওনাটা দিয়ে দিতে হবে এবং পাওনা অধিকারটা পাওয়ার পর ঐ নারী ঐ বাড়ীর উঠান থেকে বিদায় নেবে, যদি ৩ মাসের ভরন-পোষন খরচও ইতিমধ্যেই প্রদত্ত হয়ে গিয়ে থাকে। আর গর্ভে সন্তান থাকলে ভরন-পোষন খরচ সন্তান জন্ম নেয়া পর্যন্ত বাধ্যতামূলক, অতিরিক্ত ৩ মাস সহ। আর মায়ের সাথে সন্তান আগেরও যদি ছোট অবস্থায় আরও থেকে থাকে, তবে তাদের খরচ দিতেও স্বামী বাধ্য। এরপরও স্বামীর রেহাই নেই। তুমি ভাল মানুষের পুত্র, আর খারাপ স্ত্রীকে তালাকের সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়ে দিয়েছ। এবার ভাল মানুষের পরিচয় হিসেবে তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিদায়বেলা কিছু উপঢৌকনও দিয়ে দাও। নারীর সম্মানের আরও একটা বড় দিক হলো: কোন পুরুষ যদি বিয়ের সময় গরীব হয় এবং সে কারণে ঐ স্ত্রীর দেনমোহর, উদাহরণ স্বরূপ, যদি এক লক্ষ টাকা ধার্য হয়ে থাকে, অথচ বিয়ের পর ঐ স্বামী যদি ধনী বা কোটিপতি হয়ে যায়, তবে প্রথমে ধার্যকৃত মোহর প্রদান করে থাকলে বাধ্যতামূলক অবস্থা থেকে সে মুক্তি পেয়ে যাবে; কিন্তু আল্লাহর শুকরিয়া স্বরূপ তার উচিত হবে, স্বেচ্ছায় তার স্ত্রীর মোহর যতটুকু সম্ভব উপরে তুলে সাব্যস্থ করা এবং সকলকে জানিয়ে দেয়া যে ঐ স্ত্রীর মোহর ১ লক্ষ-র স্থলে ১৫ লক্ষ করা হয়েছে। অন্যদিকে, গরীব থেকে আরও গরীব হয়ে গেলেও মোহর কমানোর কোন সুযোগ নেই। আর যে পুরুষ বিয়ের রাতে শ্বশরবাড়ির খাট-পালংকে ঘুমাতে চায়, সেও সমান অপদার্থ, লজ্জাহীন। আস্ত একটা জ্যান্ত মানুষ পেয়েও সে শ্বশুর শাশুড়ির কাছে কৃতজ্ঞ হয় না; বরং gift এর নামে করে মহাচাতুরী। আর যৌতুক তো আইনী অপরাধ। একজন নারী, যে কোন পুরুষের মতই, একজন ব্যক্তি, একটি স্বাধীন সত্তা। বিয়ের পরও তার এই স্বাধীন সত্তার সদ্ব্যবহার করতে পারা একজন নারীর অধিকার।
বাপের বাড়ির ইফতারী, আম-কাঁঠলি, ঈদের সময় স্বামীপক্ষের ৪০ জনকে খাওয়ানো ইত্যাদি বন্ধ করতে হবে। এগুলো অত্যাচার এবং নির্যাতন। হাদিয়া-চাতুর্যপনা নির্মূল করতে হবে। নারী-অধিকার সম্পর্কিত আইন আরও কঠোর এবং তা বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। তবেই শুধু সুখী পরিবার এবং সুন্দর সমাজ আশা করা যায়।
পাওনা অধিকারটা পাওয়ার পর ঐ নারী ঐ বাড়ির উঠান থেকে বিদায় নেবে, যদি ৩ মাসের ভরণ-পোষণ খরচও ইতিমধ্যেই প্রদত্ত হয়ে গিয়ে থাকে। আর গর্ভে সন্তান থাকলে ভরণ-পোষণ খরচ সন্তান জন্ম নেয়া পর্যন্ত বাধ্যতামূলক, অতিরিক্ত ৩ মাস সহ। আর মায়ের সাথে সন্তান আগেরও যদি ছোট অবস্থায় আরও থেকে থাকে, তবে তাদের খরচ দিতেও স্বামী বাধ্য। এরপরও স্বামীর রেহাই নেই। তুমি ভাল মানুষের পুত্র, আর খারাপ স্ত্রীকে তালাকের সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়ে দিয়েছ। এবার ভাল মানুষের পরিচয় হিসেবে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিদায় বেলা কিছু উপঢৌকনও দিয়ে দাও।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT