সাহিত্য গল্প

চান বিবি

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৮-২০১৯ ইং ০০:০৭:০৩ | সংবাদটি ৫৩ বার পঠিত

ঘড়ির কাটা তখন রাত আড়াইটায়। মোবাইলে রিং শুনে মামুন জীবন-মৃত্যু বিষয়ক ভাবনায় কিছুটা আতংকিত। মামুনের স্ত্রী শায়লা মোবাইল রিসিভ করে স্বামীর দিকে এগিয়ে মুচকি হেসে বললো, তোমার ফোন। মামুন মোবাইল হাতে নিতে নিতে জিজ্ঞাস করলো, কে? শায়লা বললো, হাতে নিয়ে দেখ। মামুন মোবাইল হাতে নিয়ে হ্যালো বলে চমকে ওঠে। অপর পাশ থেকে অপরিচিত নারী কণ্ঠে শুনতে পায়, আপনি কি মামুন ভাই? প্রথমে সে হ্যাঁ কিংবা না’র ফাঁকে আটকে যায়। বউয়ের দিকে দৃষ্টি দিয়ে সরাসরি সত্যই কিছুটা ভয় পায়। অপর পাশ থেকে আবার প্রশ্ন, কথা যে বলছেন না, আমি মামুন ভাইকে চাচ্ছি। মামুন বললো; হ্যাঁ, আমি মামুন। আপনি কে এবং এত রাতে কেন ফোন দিয়েছেন?
মেয়েটি হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে, কিছুই বলছে না। মামুন পড়লো আরও ভাবনায়। জানতে চাইলো, কী হয়েছে? আমি তো আপনাকে চিনতে পারছি না? মেয়েটি বললো; আমি আহমদ ভাইয়ের শালি। মামুন আরও চমকে ওঠে। কারণ, আহমদ তার মেঝমামা। মামার শালি মানে খালা, অথচ মেয়েটি মামুনকে ভাই ডাকছে? বিষয় বুঝতে মামুন একটু থামে, অতঃপর প্রশ্ন করে; আপনার সমস্যা কী? মেয়েটি বলে, আমার মা ব্রেইনস্ট্রোকে হাসপাতালে, আমাদের কোন গার্জিয়ান নেই, যদি আপনি একটু সহযোগিতা করেন। মহিলার কাছ থেকে রেহাই নিতে বলে, এখন তো আপনি ডাক্তারের অধীনে, আমি আগামীকাল আপনার সাথে দেখা করবো। মহিলার নাম সাজনা।
সাজনার সাথে কথা শেষ হলে মামুনের স্ত্রী শায়লা জানতে চায়, কে এবং কেন? মামুন মেঝমামার শাশুড়ী হাসপাতালে বলেই লন্ডনে ফোন করলো তার মেঝমামাকে। অপরদিক থেকে রিসিভ হলো, ‘কিতাবা, কিতা খবর’? মামুন তার মামার কণ্ঠে অনুভব করলো না তাঁর শাশুড়ীর শরীর যে খারাপ। সে ভাল-মন্দ কিছু কথা বলে মামাকে সরাসরি প্রশ্ন করে; বাংলাদেশে তুমি কাউকে আমার নাম্বার দিয়েছো কি? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন; কেন? মামুন বলে; না, এক মহিলা আমাকে ফোন দিয়ে বললো তোমার শালি এবং তার মা সিলেট মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে। মামা বললেন, বুঝেছি। তোমার জহরুল মামা আমার কাছ থেকে ফোন নম্বার নিয়েছেন। আমার এক ফুফু শাশুড়ী হাসপাতালে। যতটুকু সম্ভব তাদেরকে সহযোগিতা করো।
পরদিন সকালে মামুনের দুটি মিটিং ছিলো। এরমধ্যে সাজনা দু’বার ফোন দেয়। মামুন দুপুরের দিকে হাসপাতালের আট তলায় যায়। সেখানে ‘সি সি ইউ’-তে আছেন সাজনার মা চান বিবি। সাজনাকে দেখে মামুনের মনে হলো সদ্য ইউরোপ কিংবা আমেরিকা থেকে এসেছে। সাজনা মামুনকে দেখেই সালাম দিয়ে ভাঙা ভাঙা সিলেটি বাক্যে প্রশ্ন করলো; ভাই আপনি আইছইন? মামুন বলে; হ্যাঁ। সাজনা মামুনকে খালি চেয়ারে বসতে অনুরোধ করে। অন্যান্য চেয়ারে পূর্ব থেকেই বসা ছিলো সাজনার স্বামী কবির, বাবা মতিন উদ্দিন এবং ছোট বোন শিরি, শবনম এবং শাবানা। সাজনা মামুনকে তার মায়ের ব্রেইনস্ট্রোকের কাহিনী বললো। মামুন কাহিনী শোনার পরও বুঝতে পারলো না মূলত তারা তার কাছে কী ধরণের সাহায্য চাচ্ছে। গরীব হলে টাকা চাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। চেহরা এবং কাপড়ে মনে হচ্ছে ওরা ধনী এবং ইউরোপ-আমেরিকার বাসিন্দা। সাজনার স্বামী শর্ট প্যান্ট এবং টি শার্ট গায়ে দিয়ে একেবারে বিলাতি। তারও কথাবার্তা অনেকটা ইউরোপিয়ান বাঙালীদের মতো ভাঙা-ভাঙা সিলেটী মামুন বেশ সন্দিহান। সাজনার বাবা মামুনকে কিছু একটা বলতে চাইলেন। সাজনা তাকে বাধা দিলো এই বলে, বাবা তুমি চুপ থাক।
সাজনা মামুনকে বললো, বাবা অনেক কিছু বলতে পারবেন না। তিনি কানে কম শোনেন। বাকি মেয়েরা সাজনার কথায় সায় দিলো। ভদ্রলোক মেয়েদের প্রতিবাদে মাথা নত করে শুধু বললেন, ৩২ বছর মিডিলিস্ট কাটালাম, আর এখন আমি বুঝি না। বিষয়টি মামুনকে আরও ভাবনার গভীরে নিয়ে যায়। মামুনের অভিজ্ঞতা তাকে অনেক কিছুই বলে দিচ্ছে, সে বিষয়টিকে পর্যবেক্ষণে রাখছে। সে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলো আর মেয়েদের বাবাকে গুরুত্ব না দিয়ে মেয়েদের সাথেই কথা বলবে। সে সাজনাকে বললো, ঘটনা কীভাবে ঘটেছে আমাকে একটু বলতে পারবে?
সাজনা বলতে শুরু করে, মা গত তিনদিন থেকে এই হাসপাতালের সি সি ইউ-তে। আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। ঘটনাটা হলো, মূলত আমার স্বামী। সে তো বিভিন্ন সমস্যা করে। মা আমার জন্য ভাবনায় আটকে গিয়ে এই অবস্থা হয়েছে। মামুন এখানে নতুন সূত্র লাভ করে, সাজনা তার স্বামীর সাথে পূর্ণাঙ্গ সুখী নয়। মামুন জানতে চাইলো, তোমার স্বামী কাজ কী করে? সাজনা বললো, সে বেকার এবং আমার শশুড়ের দ্বিতীয় পক্ষের। শশুড় থাকেন ইংল্যান্ড। সেও গিয়েছিলো, কিন্তু থাকতে পারেনি। একটু নেশার অভ্যাস আছে। এরই মধ্যে সাজনার স্বামী এসে যাওয়ায় এ প্রসঙ্গ থামিয়ে সাজনা জানতে চাইলো, ভাই, আমরা এখন কি করবো? আমরা তো বুঝতে পারছি না মায়ের অবস্থা কি। হাসপাতালের ব্যাবস্থাপক ডা. আখলাক আহমদ মামুনের কৈশোরের বন্ধু। মামুন আখলাক সাহেবকে ফোন দিয়ে বিষয়টি জেনে তাকে জানাতে অনুরোধ করে। ডা. আখলাক ফোন রেখে কিছু সময় পর আবার ফোন দিয়ে বলেন, রুগীর অবস্থা তেমন ভাল নয়। রোগীর রক্তক্ষরণ বন্ধ হলেও আশঙ্কামুক্ত নয়। আজকে একটি পরীক্ষা হবে, অতঃপর কিছুৃটা বুঝা যাবে। এ রকমের রোগি সাধারণত স্পটডেড হয়। কেউ কেউ হাসপাতালে আসতে আসতে শেষ হয়। কেউ কেউ হাসপাতালে এসে শেষ। দশভাগ রুগি ভাল হয় এবং খুব ধীরে ধীরে। মামুন বিষয়টি সাজনাদেরকে এভাবে না বলে একটু কৌশলে বলে; আমাদেরকে সব ধরণের সমস্যা মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে হবে। তারা প্রশ্ন করলো, এখন আমরা কি করবো? মামুন বললো, দোয়া করেন। মামুন তাদেরকে শান্তনা দিতে কিছু দোয়াও শিখিয়ে দিতে চেষ্টা করে। তবে সে লক্ষ্য করলো, তারা কোন প্রকার দোয়া শিখার প্রত্যাশা করছে না। তারা অন্যকিছু বলতে চাচ্ছে, কিন্তু বলছে না। সে এগিয়ে আর কিছু জানতে চাইলো না।
দুই.
লন্ডন থেকে মামুনের মামার সমন্দিক ওয়ারসাপে ফোন দিয়ে বললো, ভাগিনা আমি তোমাকে বেশ কষ্টে ফেলে দিয়েছি। আল্লাহ তোমাকে এর বিনিময় দিবেন। আমার ফুফু অসুস্থ, ওরা অত্যন্ত গরীব, তুমি একটু চেষ্টা করো যাতে তাদের অল্প খরচে সুচিকিৎসা হয়। মামুন ভাবে ওদের চলাফেরা-কথাবর্তায় তো গরীব মনে হলো না। সিলেটের সবচে উন্নত প্রাইভেট হাসপাতাল এটা। এখানে ভর্তি মানে টাকা। টাকা না থাকলে কি কেউ এই হাসপাতালে ভর্তি হয়? মামুন প্রশ্ন করে, মামা তারা কি অর্থনৈতিকভাবে গরীব? তিনি বললেন, হ্যাঁ বাবা, তারা খুবই গরীব। তাদের ছোট এক ভাই মিডিলিস্ট সদ্য গিয়েছে। আমি অনেক কষ্ট করে টাকা খরচ করে পাঠিয়েছি। বাকী তারা চার বোন। তিন বোনের বিয়ে হয়েছে। ভগ্নিপতিদের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভাল নয়। আমার ফুফা এক সময় মিডিলিস্ট ছিলেন, কিন্তু কিছুই সঞ্চয় করতে পারেননি। এখন তো অসুস্থ্য এবং বেকার। মামুন সাহেব জানতে চাইলেন, তাহলে হাসপাতালের খরচ বহন করবে কীভাবে? মামা জানতে চাইলেন কত খরচ হবে? মামুন সাহেব বললেন, সি সি ইউ-তে বিভিন্ন চিকিৎসা, পরীক্ষা, মেডিসিন, ডাক্তার ইত্যাদি সহ চারদিনে ষাট হাজারের মতো হবে। প্রতিদিন কম হলেও দশ-বারো হাজারের মতো যাবে, অতঃপর ডাক্তার কিংবা পরীক্ষা পৃথক হলে পৃথক খরচ। তিনি বললেন, আমার তো খুব বেশি খরচ করা সম্ভব হবে না, পঞ্চাশের মতো দিতে পারবো। মামুন বললো, এগুলো দিয়ে কিছুই হবে না। মামা বললেন, সস্তা কোথাও নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে বাবা। আমি কতটুকু আর বহন করতে পারবো? মামুন বিষয়টি ইশারা-ইঙ্গিতে সাজনাদেরকে বলে। কিন্তু তারা মামুনের কথার গুরুত্ব না দিয়ে আরও বড় ডাক্তার এবং আরও উন্নত চিকিৎসার চিন্তা করতে থাকে। সাজনার স্বামী মামুনকে বলে, এই হাসপাতাল ভাল নয়, এখানে বড় বড় ডাক্তার আসে না। উচিৎ অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া। মামুন বললো, সিলেটে এ থেকে উন্নত নেই, এখন পকেটে টাকা থাকলে ঢাকা কিংবা কোলকাতায় নিয়ে যেতে পারেন। সে বললো, কমপক্ষে মতিউর রহমান স্যার কিংবা নজরুল স্যারকে দেখানো উচিৎ। মামুন বললো, রুগি চাইলে তারা এখানেও আসেন। বিষয় হলো টাকার। আপনারা ভেতরে ডাক্তারদের সাথে আলাপ করেন, তারা প্রয়োজনে ব্যবস্থা করবে। তবে আমার জানা মতে এখনও প্রয়োজন নেই। অবশ্য টাকা খরচ করতে চাইলে কারো কোন আপত্তি নেই। ভদ্রলোক মামুনের প্রতি একটু নারাজ হয়ে বললো, আমার টাকা থাকলে কি আপনাকে জিজ্ঞাস করতাম? মামুন মনে মনে হাসে। ভদ্রলোকের টাকা থাকলে তাকে জিজ্ঞাস করতো না ভেবে।
মামুন সাজনা ও তার বোনদেরকে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা, হাসাপাতালের বিল, লন্ডনীদের বক্তব্য এবং তাদের করণীয় বিষয় নিয়ে ভাবতে বললে তারা কিছুটা ভাবিত হয়। কিন্তু খুব বেশি হয়েছে বলে মনে হলো না। মামুন জানতে চাইলো, তোমাদের ফুফু, চাচাদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তারা বললো, ফুফু তো ফোন ধরছেন না। চাচা তো অসুস্থ্য। শুধু মামাতো ভাই ছাড়া কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। মামুন আবার জানতে চাইলো, এখন কি করবে? তারা বললো, আমরা জানি না। ভাই আপনি আমাদের আম্মাকে বাঁচান। মামুন বললো, আমি তো বাঁচাতে পারবো না, হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহ। আমরা চেষ্টা করতে পারি মাত্র। মেয়েরা বললো, ভাইসাব আমরার আম্মা না বাঁচলে আমরা বাঁচমু কিলা? মামুন প্রশ্ন করলো, তোমরা কি জান, বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হযরত মুহাম্মদ (স.) পৃথিবীতে আসার আগেই তাঁর বাবা হযরত আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেছিলেন এবং তিনি শিশুকালে তাঁর মা আমিনাকে হারিয়েছেন? তাঁর কোন ভাইবোনও ছিলো না, ছিলো না ধন-সম্পদ কিছুই। এরপরও তিনি বেঁচে ছিলেন এবং বিশ্ব জয় করেছেন। চিন্তার কোন কারণ নেই।
তিন.
কেউ যখন বলে আমার মাকে সাহায্য করুন কিংবা আমার মাকে বাঁচান, তখন মামুন সেই মায়ের মধ্যে নিজের মাকে দেখতে পায় বলে জীবন বাজি রেখে চেষ্টা করে। চান বিবির জন্যও মামুনের ভেতরে মমতা জেগে ওঠে। ইতোমধ্যে চান বিবির যে ক’বার হুশ এসেছে তিনি শুধু জিজ্ঞাস করেছেন, আমার হায়দার এসেছে কি? মামুন তা জানতে পারেন সাজনার কাছ থেকে। সে সাজনাকে প্রশ্ন করে, কে এই হায়দার? সাজনা জানায়, তার মায়ের আগে একটি বিয়ে হয়েছিলো, হায়দার সেই তরফের ছেলে। মামুনের কাছে বিষয়টি অরেকটু ভাবনার হলো। কারণ, সে হায়দারকে ছোটবেলা থেকে জানে। হায়দার থাকে লন্ডনে। সে আশ্চর্য হয় এই ভেবে, ছোটবেলা থেকে সে হায়দারের মা হিসাবে যাকে জানে, তা হলে তিনি তার মা নন। আশ্চর্য, হায়দার কিংবা তার সৎভাইরা তো কোনদিন এ বিষয়টি বলেনি। মামুন হায়দারদের বাড়ি কিংবা ইংল্যান্ডে হায়দারদের ঘরে অনেক গিয়েছে, খেয়েছে, কিন্তু এই বিষয়টি আবিস্কার করতে পারেনি! এমন কি হায়দারের বাবা যেদিন লন্ডনে মারা যান, সেদিনও মামুন হায়দারদের লন্ডনের ঘরে গিয়েছে এবং দীর্ঘক্ষণ হায়দারের সাথেও কথা বলেছে। হায়দার তো তখনও তার স্ত্রী নিয়ে সৎ মায়ের সাথেই ছিলো? মামুনের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দেয় হায়দার, তার বাবা এবং মাকে নিয়ে। সে গ্রামে জিজ্ঞেস করে করে আবিস্কার করে চান বিবির অতীত কাহিনী।
চার.
চান বিবি এক সময় বেশ সুন্দরী এবং স্মাট ছিলেন। তার প্রথম বিয়ে টিকেনি। অবশ্য সে-পক্ষের কোন সন্তান নেই। হায়দারের বাবা তখন লন্ডন ফেরত। তালাকপ্রাপ্তা হলেও চান বিবির স্টাইল ও রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে সেইকালে বিশ হাজার টাকা কাবিন দিয়ে বিয়ে করেন হায়দারের বাবা হাশিম আলী। হায়দারের জন্মের পর চান বিবি মামলা করে হাশিম আলীর কাছ থেকে তালাক নিয়ে বিয়ে করেন গ্রামের মুকাদ্দস আলীকে। লোকের ধারণা, মুকাদ্দসের সাথে চান বিবির প্রেম-পরকীয়া ছিলো বলেই তিনি হাশিম আলীর কাছ থেকে তালাক নিয়েছিলেন। এক মাসের শিশু হায়দারকে হাশিম আলীর কাছে ফেলে চান বিবি মুকাদ্দসকে বিয়ে করেছিলেন। মুকাদ্দিসের কাছ থেকে চান বিবির এক ছেলে এবং চার মেয়ে। মানুষের কাছ থেকে মামুন জানতে পারে, হাশিম আলীর কাছ থেকে কাবিনের পাওয়া বিশ হাজার টাকা দিয়ে তখন চান বিবি মুকাদ্দসকে মিডলইস্ট পাঠিয়েছিলেন। মুকাদ্দস আলী পয়ত্রিশ বছর মিডলইস্ট ছিলেন, অনেক টাকা উপার্জন করেছেন, এখন তিনি বেকার এবং অর্থশূন্য। মামুন এক ফাঁকে মুকাদ্দস আলীকে জিজ্ঞেস করে, আপনি যে পয়ত্রিশ বছর মিডলইস্টে রুজী করলেন সেই টাকা কোথায়? তিনি সহজভাবে মাথায় হাত দিয়ে বলেন, সবই আমার আজলের দোষ, আমার সবকিছু জলের কুমির খেয়েছে। আমি এখন নিঃস্ব বলতে পারো। মুকাদ্দস আলীর বাড়ীর পাশের এক বৃদ্ধা মহিলা মামুনের আত্মীয়। তিনি সেদিন মামুনের বাসায় এলে কথা প্রসঙ্গে বিষয়টি আলোচনায় আসে। মহিলা তখন খুব মজা করেই বলেন, মুকাদ্দস মিডলইস্ট ছিলো। তখন তাদের হাতে অনেক টাকা ছিলো। তার বউ-এর দাপট তখন কে দেখে। তারা তো অনেক টাকা বেহুদা খরচ করতো। ওর টাকাগুলো কোন কাজে লাগায়নি। ধর্ম-কর্মেও তারা তেমন একটা নেই। শুধু ফ্যাশন আর ফ্যাশন। বাড়ীর লোকদের সাথে মিল নেই বলে তারা এখন শহরে। চান বিবি নিজে যেমন আবেগি, তেমনি আবেগি তার সন্তানরাও। টাকা হাতে এলে তারা কাউকে মানে না, যেমন ইচ্ছে তেমন চলে। তারা মোটেও ভাবে না আগামীকাল কীভাবে চলবে।
পাঁচ
মামুন সাহেবের মোটেও ইচ্ছে ছিলো না চান বিবিকে ওই হাসপাতাল থেকে বের করে অন্য কোথাও নেয়ার। তবে ইচ্ছে ছিলো তার সন্তানদেরকে একথা বুঝানো যে, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ দুর্বল। এই দামি হাসপাতাল তাদের জন্য নয়। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা খারাপ নয়, শুধু একটু সীটের সমস্যা। তোমরা একটু ধীর গতিতে চলার চেষ্টা করো। আর যাদের উপর তোমরা ভরসা করে অগ্রসর হচ্ছো তাদের অবস্থাও তেমন নয়। এই সহজ কথাটি তাদেরকে বুঝাতে বেশ সময় লাগে। তারা তো তরুণ মহিলা, কিছুটা সুন্দরীও। যার কাছে যায় সে-ই বলে আমরা আছি, কিন্তু কেউ আসে না কাছে, কেউ দাঁড়ায় না পাশে। সবাই মনে করে, যদি আছি বলে কাজ সমাধা হয়ে যায় তবে তো হয়েগেলো। উপস্থিত সময় সরি বলে নেয়া যাবে। কেউ টাকা পাঠায় না, সবাই শুধু আশ্বাস দেয়। এদিকে হাসপাতালের বিল হয়ে যায় এক লাখ টাকা। মেয়েগুলো যখন দেখলো সর্বচেষ্টার পর মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, তখন তারা হতাশ হয়। তারা মামুনকে বলে এখান থেকে বের হয়ে অন্য কোথাও যেতে চায়। তারা তাদের এক আত্মীয়ের কাছে গিয়ে অন্য হাসপাতালে ব্যবস্থা করে আসে। বিল দেওয়ার সময় মামুনকে খবর করা হলে সে ডা.আখলাক আহমদের সাথে বিষয়টি আলাপ করে। ডা.আখলাক আহমদের অনুরোধে মূল বিল থেকে হাসপাতাল বাদ দেয় দশ হাজার টাকা, মামুন তার ছোটবোনের কাছ থেকে এনে দেয় দশ হাজার। এক লাখে রইলো আশি হাজার। লন্ডন থেকে সাহায্য আসে পঞ্চাশ হাজার। বাকি ত্রিশ হাজার ব্যবস্থা করে চান বিবির মেয়েরা। মামুন নিজের পক্ষ থেকে প্রাসঙ্গিক অনেক খরচ করে। বিল পরিশোধের পর তাদের আরও কিছু আত্মীয়ের উপস্থিতিতে মামুন একটি মিটিং এ চলে যায়। রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত মিটিং চলে। মিটিং শেষ হওয়ার সাথে সাথে তার মোবাইল বেজে ওঠে। রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে কান্নার আওয়াজ, ওই হাসপাতালে সিট পাওয়া যায়নি। আর কোন হাসপাতালেও সিট পাওয়া যাচ্ছে না। সংবাদে মামুন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়। বলে কী? এই রুগী তো এভাবে ফেলে রাখার মতো নয়। মামুন সাথে সাথে সিএনজি নিয়ে আরেকটি হাসপাতালে যেতে যেতে মিনহাজকে মোবাইল করে বিষয়টি দেখতে বললো। মিনহাজ একজন নাট্যকর্মী এবং ওই হাসপাতালে চাকুরী করে। মামুন সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে সাজনাদের এক ফুফু-তো ভাই অন্য হাসপাতালে আলোচনা করে সীট কেটে রোগীকে এম্বোলেন্সে উঠাতে শুরু করে। মামুন একটু ক্লান্তির নিঃশ্বাস নিলো ব্যবস্থা হয়েছে ভেবে। যেহেতু একজন গার্জিয়ান পাওয়া গেছে, তাই মামুন এখানে থামতে চাইলো, কিন্তু সাজনারা দাবী করলো মামুনকে তাদের সাথে যেতে হবে। মামুন ভাবলো, এমনি এমনি গিয়ে লাভ কি, একটু পরিচয় না থাকলে। সেই হাসপাতাল তো তার কোন পরিচিত লোক নেই। সে মিনহাজকে বললো, পরিচিত কেউ আছে কি? মিনহাজ বললো, সমসু ভাই আছে। মামুন প্রশ্ন করলো, শমসু? মিনহাজ বললো, ঐ যে নাটক করে। মামুন মিনহাজকে বললো, একটু ফোন দিয়ে বলে দাও আমি আসছি এবং আমাকে নাম্বারটা দাও। মিনহাজ নাম্বার দিল

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT