সাহিত্য

বিশ্বকবির শিশুকিশোর ভাবনা

মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৮-২০১৯ ইং ০০:০৭:৪২ | সংবাদটি ৫০ বার পঠিত

একজন কবি স্বপ্নও আঁকেন তার লেখায়। স্বপ্নের বীজ বোনেন কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে। বিশ্বকবি শিশুকিশোরদের নিয়ে ভেবেছেন অনেক। কবি ছোটদের আলোর সন্ধান দিতে চেয়েছেন। আলোর পথ দেখিয়েছেন শিশুকিশোরদের। এই আলো দিয়েই ভালোর সমাজ গঠনে অনুপ্রাণিত করেছেন ছোটদের। আলোর বানে প্রাণে বুনতে বলেছেন সত্যের বীজ। আলোর স্রোতে শিশুকিশোরদের পাল তোলার স্বপ্ন দেখেছেন। কবির ভাষায়-
আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন-ভরা,/ আলো নয়ন-ধোওয়া আমার, আলো হৃদয়-হরা।/ নাচে আলো নাচে, ও ভাই, আমার প্রাণের কাছে-/ বাজে আলো বাজে, ও ভাই, হৃদয় বীণার মাঝে- / জাগে আকাশ, ছোটে বাতাস, হাসে সকল ধরা।/ আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি/ আলোর ঢেউয়ে উঠল নেচে মল্লিকা মালতী।/ মেঘে মেঘে সোনা, ও ভাই, যায়না মানিক গোনা-/ পাতায় পাতায় হাসি, ও ভাই, পুলক রাশি রাশি-/ সুরনদীর কূল ডুবেছে সুধা-নিঝর-ঝরা।
(আলো আমার আলো)
কবি শিশুকিশোরদেরকে সোনা আর মানিক ভেবেছেন। যা গুনে গুনে শেষ করা যায় না। এরা ধরার পাতায় পাতায় রাশি রাশি হাসির পুলক ছড়ায়। নদীতে এরা বয়ে চলে কুলুকুলু ছন্দে। এরা নদীর ছন্দে ছন্দে সুধা ঝরায়। কবির স্বপ্ন বলে কথা! কবির স্বপ্ন সত্যি হোক সেই কামনাই করি।
কবি শিশুকিশোরদের মনের আকুতি বোঝেন। ভাবেন শিশুকিশোরদের ইচ্ছামতীর কথা। শিশুকিশোরদের সূর্য-নদীর সাথে খেলার স্বপ্ন আঁকেন ছড়া-কবিতায়। কবি শিশুকিশোরদের দিন ও রাতের সাথে কথা বলার আকুতি খুঁজে পান কবিতার পরতে পরতে। ছড়ার ছন্দ মালায়। ছড়ার ডালিতে। কবির ভাষায়-
যখন যেমন মনে করি/ তাই হতে পাই যদি/ আমি তবে এক্ষণি হই/ ইচ্ছামতী নদী। / রইবে আমার দখিন ধারে/ সূর্য ওঠার পার/ বাঁয়ের ধারে সন্ধ্যেবেলায়/ নামবে অন্ধকার।/ আমি কইব মনের কথা/ দুই পারেরই সাথে/ আধেক কথা দিনের বেলায়/ আধেক কথা রাতে।
(ইচ্ছামতী)
কবি নিজেও যেন নদীর সাথে কথা বলেন। সূর্য ওঠা আর ডোবার সাথে আছে কবির মিতালী। তাইতো শিশুকিশোরমনের আকুতি উঠে তাঁর ছন্দ ছড়ায়। ছড়ার গাঁথুনিতে। আমরাও কবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করছি।
একজন কবি শিশুকিশোরকে যেমন আদর্শবান করে গড়ে তুলতে চান, ঠিক তেমনি দেশপ্রেমও জাগ্রত করতে চান শিশুকিশোরের কোমল হৃদয় মনে। তাইতো কবি দেশকে নিয়ে ভাবেন। ভাবেন দেশের মাটি ও মানুষকে নিয়ে। কবির ভাবনা সুদূরে। কবি নিজের জন্মভূমিকে মায়ের সাথে তুলনা করেছেন। কবি তার দেশের ধন সম্পদকে রানীর মত করে ভেবেছেন। এদেশের গাছের ছায়ায় এসে কবির অঙ্গ জুড়ায়। কবির ভাষায়-
সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে/ সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে।/জানি নে তোর ধনরতন আছে কি না রানীর মতন,/ শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।/ কোন বনেতে জানি নে ফুল গন্ধে এমন করে আকুল,/ কোন গগনে ওঠে রে চাঁদ এমন হাসি হেসে।/ আঁখি মেলে তোমার আলো প্রথম আমার চোখ জুড়ালো, / ওই আলোতে নয়ন রেখে মুদব নয়ন শেষে।
(সার্থক জনম আমার)
সবুজ শ্যামল মায়ায় ঘেরা আমাদের এই দেশ বাংলাদেশ। এদেশের ফুল, পাখি, নদী-নালা, খাল-বিল, চাঁদ-সুরুজ বন-বাদারের সবকিছুই আমাদের আকুল করে। আপনার করে কাছে টানে। হৃদয়ের একটি পাশে আপনার করে ভাবতে শেখায়। শিশুকিশোরেরা যাতে জীবন চলার শুরু থেকেই দেশ প্রেমের জন্য প্রস্তুত হতে পারে কবির চাওয়া তাই। কবির আশার বাতিঘর এখানেই। আমরাও আমাদের দেশকে আপনার করে ভালোবাসব। দেশের কল্যাণে কাজ করব।
দেশ নিয়ে শত্রুতা করে অনেকেই। এদেশের স্বাধিনতা অনেকের কাছেই ভালো লাগেনা। 'যে দেশে জন্ম সে দেশ নিয়েই শত্রুতা' কবি সেটা মেনে নিতে পারেন নি। তাই কবি ওদেরকে ঘৃণা করেন। ওদেরকে কীট ভাবেন! কবির চিন্তায় ওরা অমানুষ। ওদের চরিত্র কালিমায় ভরা। ওদের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন কবি। কবি ওদেরকে চুপ করতে বলেছেন। কবির ভাষায়-
কেঁচো কয়, নিচ মাটি, কালো তার রূপ।/ কবি তারে রাগ করে বলে, চুপ চুপ!/ তুমি যে মাটির কীট, খাও তারি রস,/ মাটির নিন্দায় বাড়ে তোমার কি যশ!
(স্বদেশদ্বেষী)
আমরা একটু সচেতন হলে দেখব এরকম অনেক মানুষ রয়েছে, যারা মুখে মুখে দেশ প্রেমের বুলি ফুটায় অথচ ওদের মনে রয়েছে দেশের শত্রুতা। এদের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে আমাদেরকে। সচেতন করতে হবে আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ কান্ডারী শিশুকিশোরদেরকে।
সময় মানুষের জীবনে এক অমূল্য সম্পদ। সময় জ্ঞান নাই যাদের তারা জীবনে সফল হতে পারে না। জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিজয়ী হতে হলে সময়ের স্বদব্যবহার করতে হবে। শিশুকিশোরেরা সময় সচেতন হবে না, সময়ের সদ্ব্যবহার করতে শিখবে না এমনটি কোন কবিই আশা করেন না। তাই সময়ের ব্যাপারে শিশুকিশোরেরা যাতে সচেতন হতে পারে সেদিকেও নজর দিয়েছেন বিশ্বকবি। হাস্যচ্ছলে শিশুকিশোরদের সচেতন করেছেন সময়ের ব্যাপারে। কবির ভাষায়
যত ঘন্টা, যত মিনিট, সব আছে যত/ শেষ যদি হয় চিরকালের মতো,/ তখন স্কুলে নেই বা গেলেম; কেউ যদি কয় মন্দ,/ আমি বলব, 'দশটা বাজাই বন্ধ।'/ তাধিন তাধিন তাধিন।/ শুই নে বলে রাগিস যদি, আমি বলব তোরে,/ 'রাত না হলে রাত হবে কী করে।/ নটা বাজাই থামল যখন, কেমন করে শুই?/ দেরি বলে নেই তো মা কিচ্ছুই।'/ তাধিন তাধিন তাধিন।
(সময়হারা)
শিশুকিশোরদের বায়নার শেষ নাই। হাজারো অজুহাত দাঁড় করায় ওরা। যুক্তিরও শেষ নাই ওদের। তবে ওরা সহজ সরল। ওদের প্রাণটা কাঁচা। কাঁচা হৃদয়ের বাগানে যাতে ভালো ফুল ফুটতে পারে সেজন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। জাগ্রত করতে হবে আমাদের জ্ঞানের বাতিকে। ইয়ারকির ছলে কবি আমাদের শিশুকিশোরদেরকে সময় সচেতন করতে উদ্ভুদ্ব করেছেন। আসুন আমরাও শিশুকিশোরদের পাশাপাশি সময়ের প্রতি সচেতন হই।
বিপদ-আপদ মানুষের জীবনের নিত্যসঙ্গী। জীবন চলার পথে বিপদ আসবে এটা অস্বাভাবিক নয়। তাই বলে কী ভেঙে পরবে শিশুকিশোরেরা? ওরা কী হতাশায় ভুগবে? নাকি সাহসী ভুমিকা নিয়ে এগিয়ে যাবে সামনে! কবির যুক্তি ভয়ের কিছু নাই। এগিয়ে যেতে হবে সামনে। ক্রমাগত বিজয়ের মঞ্জিল পানে। কেউ শান্তনার বাণী নিয়ে এগিয়ে না এলেও শিশুকিশোরকে আগাতে হবে। দুঃখকে করতে হবে জয়। বিজয়ের মালা পরতে হবে গলায়। স্বপ্ন বীজ বুনতে হবে মানুষের হৃদয় জমিনে। হৃদয়ের গহীণে। কবির ভাষায়--
বিপদে মোরে রক্ষা করো/ এ নহে মোর প্রার্থণা/ বিপদে আমি না যেন করি ভয়।/ দুঃখতাপে ব্যাথিত চিতে/ নাই-বা দিলে সান্ত¦না,/ দুঃখ যেন করতে পারি জয়।
(আত্মত্রাণ)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT