সাহিত্য

‘রোদের জখম’ : নিবিড় পাঠ

সাইদুর রহমান সাঈদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৮-২০১৯ ইং ০০:১০:২৮ | সংবাদটি ১২৯ বার পঠিত

একজন কবির দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির নির্যাসের শৈল্পিক উচ্চারণ যদি কবিতা হয়, তাহলে জীবন ও জগৎ সম্পার্কিত সব অনুষঙ্গই কবিতায় উঠে আসতে বাধ্য। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ যখন বলেন কবিতা অনেক রকম, তখন সেখানে আমাদের আর কোন বক্তব্য থাকে না। কবির উপলব্ধিজাত সন্তান কবিতাকে লালন করতে হয় আমাদের স্বার্থেই। মানুষ কবিতার মাঝে আলো দেখে; অমানুষ দেখে অন্ধকার। যাপিত জীবনের প্রতিটি পদে পদে কবিতাকে আমরা সহযোদ্ধা হিসেবে চাই। কবিতার জমিন যত উর্বর হবে, ততই দূরীভূত হবে মানুষের মন ও মগজের অন্ধকার।
কবি এম মোসাইদ খানের কাব্যগ্রন্থ ‘রোদের জখম’। পরপর তিনটি ছড়াগ্রন্থ প্রকাশের পর তিনি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের দিকে মনযোগ দিয়েছেন। বুকের ভেতর কবিতার আগুন যেমন রূপ ধরে, তা দেখা যাবে ‘রোদের জখম’ গ্রন্থে। যদিও এ গ্রন্থের আগে তাঁর আরো কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সুদূর প্রবাসে শত কর্মব্যস্ততার মাঝেও তিনি নিরলসভাবে কবিতা চর্চা করে যাচ্ছেন। তাঁর কবিতা পড়লে মনে হয় ঝরনার স্রোতের মতো কলকল করে মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে আসে কবিতার পঙক্তি মালা। অর্থাৎ তাঁর কবিতার স্বতঃস্ফূততাই একটি বৈশিষ্ট্য।
আলোচ্য গ্রন্থটিকে তিন পর্বে ভাগ করা হয়েছে। পর্ব বিন্যাসে রয়েছে মুন্সিয়ানার পরিচয়। প্রথম পর্ব অক্টোপাসের হাত। এখানে রয়েছে ৪৪ টি কবিতা। দ্বিতীয় পর্ব- পালক সমাচার, এখানে রয়েছে ৪০ টি কবিতা। তৃতীয় পর্ব আগুনের জলাশয়। এখানে রয়েছে ৩৮ টি কবিতা। তিন পর্বে বিভিন্ন স্বাদের ১২২টি কবিতা স্থান পেয়েছে। বাসিয়া প্রকাশনী থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯ সালে বইটি প্রকাশিত।
কবিতায় উঠে আসে মানুষের যাপিত জীবনের করুণ প্রতিচিত্র বা সমাজবাস্তবতার নানা অনুষঙ্গ, কবিতায় যখন মানুষে মানুষে পাহাড় সমান বিভেদ-বৈষম্যের প্রতিচিত্র উঠে আসে, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার ভয়ংকর ছবি। আমরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হই, সাধারণ মানুষের বক্তচোষে সমাজের একদল প্রভাবশালী মানুষ কিভাবে ফুলেফেঁপে মোটাতাজা হয়। আর রাষ্ট্র ও সমাজে বাড়ে বৈষম্য। অসহায় মানুষ কথা বলার অধিকারও হারিয়ে ফেলে। এম মোসাইদ খান তাঁর ‘অক্টোপাসের হাত’ কবিতায় বলেছেন, ‘বোয়ালের পোনাগুলো বিদেশের কারখানায় আর কয়লা পোড়া আমাদের কবুতর জীবন? মরা কোলে আমরা শুধু মাথা আছাড়ি আর বুক থাপড়াই আমাদের পিঠ সোজা হয় না আর।’
এম. মোসাইদ খানের কবিতায় চিন্তা-ভাবনা ও উপলব্ধি এবং অভিজ্ঞতার যে প্রতিফলন ঘটেছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। তিনি তাঁর কবিতায় সমকালকে ধারণ করার ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর কবিতার বিষয় আশয়, ভাষা ও শব্দবিন্যাস এবং কবিতার অনিবার্য উপাদান উপমা উৎপ্রেক্ষা রূপক চিত্রকল্প ছন্দ অলংকার রূপকল্প প্রভৃতি সচেতনভাবে ব্যবহার করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর কবিতায় তিনি বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ভঙ্গিতে বিভিন্ন ব্যঞ্জনার মানুষ, প্রকৃতি সমাজ সময় প্রেম বিরহ দুঃখ যন্ত্রণা হতাশা আশা স্বপ্ন বিভেদ-বৈষম্যসহ মানবজীবনের বহুমাত্রিক অনুষঙ্গকে উপস্থাপন করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর মনোজগতের বৈচিত্রময় চিন্তা ভাবনাকে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। ‘আগুনের তেজ’ কবিতায় উঠে এসেছে দেশভাগ, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অবরুদ্ধ নয় মাসের প্রতিচিত্র। সহজ সরল ভাষায় মানবতারবোধের প্রকাশ কবিতার গায়ে জ্যোৎস্না ঢেলে দিয়েছেন। কোনো

কোনো কবিতায় শৈশবের স্মৃতিকাতরতাও কবিতাকে প্রাণবন্ত করেছে। তাঁর কবিতাগুলো পড়ার পর মনে হয়েছে তিনি নিজস্ব কাব্যভাষা, স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর ও শব্দবিন্যাসে নতুনত্ব সৃষ্টির আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কবিতার কাঠামো নির্মাণেও নতুনত্বের স্পর্শ রয়েছে।
সমাজের নানা কুসংস্কার, অন্যায়-অবিচার, গোঁড়ামি, বর্বরতা, মানুষের সীমাহীন আত্মকেন্দ্রিকতা প্রভৃতির বর্ণনা আছে এ গ্রন্থের অনেক কবিতায়। আমরা দেখি মানুষের পৃথিবীতে কেবল বাড়ছেই অমানুষের ভিড়। কবির বিনীত জিজ্ঞাসা, তাহলে কি আমরা আবার ফিরে যাচ্ছি মধ্যযুগীয় বর্বরতার দিকে। কবি এলেন না, সভ্যতার আলোর নীচে অন্ধকার জমে জমে আর কতো ভারী হবে। এই অন্ধকারে অপরাধীদের রামরাজত্ব। সমাজে নারীরা প্রায় সবদিক থেকেই নিপীড়িত। এ গ্রন্থের ‘উলটো ভোরের মোড়ে’ কবিতার শেষ স্তবকে আদৃত কবির জিজ্ঞাসা, ‘তোমার বিরান বাজারে/ পাগলিরা মা হয় বাবা হয় না কেউ/ হায় প্রতিমার ঈশ্বর তোমার এ কেমন আশীর্বাদ/ মানুষে মানুষে এ কোন জঙ্গলি ক্ষুধা?
সুদূর প্রবাস জীবনে কবির যখন আনন্দময় শৈশবের কথা মনে পড়ে। সবুজ-শ্যামলিমাঘেরা রূপসী বাংলার ছায়া সুনিবিড় গ্রামীন জনপদের অপার সৌন্দর্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখন তিনি নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হন। বুকের গহিন থেকে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। এ সবের চমৎকার চিত্রকল্প তাঁর কবিতাকে সার্থক করে তোলে। সাধারণ মানুষের চেনাজানা জগতের বাইরে কবির বিচরণ হলেও তার উপস্থাপনাঞ্চলে সেই জগতের সাথে সাধারণ মানুষের পরিচয় ঘটতে সময় লাগে না। কবিতাকে অনেকেই স্বপ্ন ও সংগ্রামের শিল্পভাষ্য হিসেবে দেখতে স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করেন। গণমানুষের স্বপ্ন-আশা-আকাক্সক্ষার কথা ওঠে আসে কবিতায়। মানুষের চরম আত্মকোন্দ্রিকতা কবিকে পীড়া দেয়। সমাজের সুবিধাবাদী লুটেরা-দুর্বৃত্ত মানুষের আপকর্ম কবির চোখ এড়াতে পারে না। যেকোনো মহৎ কবি ন্যায়-সত্য ও সুন্দরের পুঁজারি। তাই কবিকে শত প্রতিকুলতার মাঝেও সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হয়, সুন্দরের পক্ষে দাঁড়াতে হয়, মানবতাবাদের পক্ষে দাঁড়াতে হয়। অসুন্দরের বিরুদ্ধে কবিকে কঠোর অবস্থান নিতে হয়। মানবাকৃতির জন্তু-জানোরাগুলোকে প্রচন্ড ঘৃণা করতে হয়।
জাতীয় সংকটের সময় কবিকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হয়। এম মোসাইদ খানের কবিতার ভেতর দিয়ে তাঁর আদর্শিক অবস্থান বুঝে নিতে কারো বেগ পেতে হবে বলে মনে হয় না। ‘রকমারি রাত’ কবিতায় বলা হয়েছে ‘ইচ্ছে করে খামছে ধরে টেনে আনি ভেতরের মানুষ/ দিনের মঞ্চ যারা মাতিয়ে রাখে সফেদ কথার/ যাদের ভুঁড়ির ভাঁজে আটকে আছে শান্তির বাতাস।/ ইচ্ছে করে জিহবার মলাট খুলে ফেলি/ থু থু ছুঁড়ে মারি রংকরা দেয়ালে, নিয়ন আলোয়, যে মানুষ বদলায়/ অভিজাত বান্ডের সাইন বোর্ড গায়ে উর্Ÿর মগজে পুষে হেরোইন।’ এ গ্রন্থের কবিতাগুলো পড়লে বুঝা যায় পাহাড় ঝরনার চঞ্চল স্রোতের মতো এর প্রবহমানতা বা গতিশীলতা।
এ গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতাই উপমা প্রধান। চমৎকার উপমার ব্যবহার কবির দক্ষতার পরিচয় বহন করে। উপমার ব্যবহার আমার কাছে মনে হয়েছে গতানুগতিকতার বাইরে এক নতুন সংযোজন। কবিতার ছন্দময় গতিশীলতা কবির সাধনা ও পরিশ্রমের ফসল। সমকালকে বুকে ধারণ করে মহাকালের দিকে যাবার প্রয়াস ‘পথির সময়’ কবিতায় আমরা দেখি, শ্বাপদ-সংকুল এই জনপদে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ব্যতিব্যস্ত কবি। গ্রন্থের শেষ কবিতা ‘মানুষ হবো’ তবে কিভাবে? কবি বলেন, ‘আমাদের পকেটের বৃষ্টির বীজ ছিটিয়ে দিব আধমরা/ দুর্বা ঘাসের মাথায়/ আর সেখানেই সোনা ফলবে নরম দিনের।/ মানুষের চামড়া পরে নেবো আমরা/ আমাদের দেখে আর লজ্জিত হবে না শেয়াল কিংবা কুকুর, মুখ/ লুকাবে না বন্য শূকুর।’ কবিতাকে আমরা ছুটি দিতে চাই না। কবিতার শক্তি দিয়েই আমরা ক্ষুধার রাজ্য জয় করতে চাই।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT