উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৮-২০১৯ ইং ০৩:৩৯:৫৯ | সংবাদটি ৮৭ বার পঠিত

শীতের সকাল। রাজার মেয়ে সখিদের নিয়ে প্রতাঃভ্রমণে বেরিয়েছেন। প্রচন্ড শীতে রাজার মেয়েকে কাবু করে ফেলল। শীতে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগলেন তিনি। মনে মনে ভাবতে লাগলেন কিভাবে এই শীত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। হঠাৎ কিছু ঘর তার নজরে পড়ল। বাঁশ ও ছনের তৈরি। তিনি ভাবলেন এই তো পেয়ে গেছি। বললেন ‘এই সখিরা এদিকে আয়। ওগুলোতে আগুন ধরা। সখিরা বুঝাতে চেষ্টা করল যে এগুলোতে প্রজাসাধারণ থাকে। এগুলো পুড়ে গেলে ওরা থাকবে কোথায়? রাজার মেয়ে অতিশয় জেদী তিনি বললেন ‘যা বলছি তাই শোন পরামর্শ দিতে এসো না। কি আর করা? সখিদের একজন প্রজাদের ঘরে আগুন ‘ধরিয়ে দিল। আর রাজার মেয়ে তার শীত প্রশমিত করলেন....।
কবির নাম মনে নেই। তবে সেই বাণীটি এখন আমার প্রচন্ডভাবে মনে পড়ছে। দেশের নীতি নির্ধারকরা কোন নোটিশ, কোন গণশুনানী ছাড়াই হঠাৎ গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিলেন। কত পার্সেন্ট বাড়ল কতটুকু বাড়ল সচেতন মহল সবই অবগত আছেন। আমি সেদিকে যাচ্ছি না। এটা ঐক্যমত্যের ভিত্তিতেই যেন জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া হলো। সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে যুক্তি উপস্থাপিত হলো এই বলে যে- এতটা দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে এত কোটি টাকা। সুতরাং এই বর্ধিত গ্যাস বিল তেমন কিছু না। বিষয়টিতে পরে আসছি।
গত কিছুদিন আগে এক রিপোর্টে দেখা গেল গত অর্থ বছরে বাংলাদেশ বিমানে গচ্ছা গেছে দু’শ কোটি টাকা। এভাবে রেলখাতে, বিদ্যুৎখাতে, বা সরকারি মিল ফ্যাক্টরিতে গচ্ছার পর গচ্ছা। লাভের মুখ খুব একটা দেখা যায় না। অথচ প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্টে দায়িত্বশীল লোক রয়েছে। বিমান চলাচল বিভাগে রয়েছেন মন্ত্রী, সচিব আমলা সবই। এতবড় গচ্ছার পর কি সেই বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জবাবদিহি করা উচিত নয়? একটা স্কুলে যখন রেজাল্ট ভালো হয় না তখন তো সেই স্কুলের এমপিও বাতিল করা হচ্ছে। ব্যর্থতার দায়ভার হেডমাস্টারকে নিতে হয়। একটা পুলিশের দুর্নীতি ধরা পড়লে সেও ক্লোজড হচ্ছে। কিন্তু যে সকল মন্ত্রণালয় বছর শেষে গচ্ছা দিচ্ছে সেসব মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা কী জবাবদিহি করেন বা ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেন- এমন নজীর এদেশের কেউ এই পর্যন্ত স্থাপন করেছে বলে আমার জানা নেই।
গ্যাস এদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ। যথাযথ ব্যবহার করলে এটা একটা লাভজনক খাত হওয়ারই কথা। শুধু উত্তোলন খরচটাই তো মুখ্য। কিন্তু দেখা যাচ্ছে গ্যাস উত্তোলন খরচ দিতে গিয়েই বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখা যাক।
দীর্ঘদিন থেকে আমাদের দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস বাসা বাড়ি বা গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে সরাসরি সংযোগের মাধ্যমে। ইদানিং সরাসরি গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। সিলিন্ডার গ্যাস বাজারজাত করা হয়েছে। আর অতিরিক্ত লাভের আশায় বেশির ভাগ যানবাহনকে সিএনজি কনভার্ট করা হয়েছে। আর এগুলোতে গ্যাস ভরাটের জন্য খোলা হয়েছে সিএনজি পাম্প।
এদেশে চলছে দুটি নিয়ম বা দুই ধরনের ভোক্তা রয়েছে। এটা বিদ্যুৎ ও গ্যাস উভয়ের বেলায়ই প্রযোজ্য।
যেমন গ্যাসের রয়েছে সরাসরি সংযোগের ভোক্তা এবং সিলিন্ডার কনজুমার।
আর বিদ্যুতে রয়েছে প্রি পেইড এবং পোস্ট পেইড ভোক্তা। এভাবে ভোক্তা বিভাজিত হওয়ার কারণে কারো পৌষ মাস আর কারও সর্বনাশ।
একটু ব্যাখ্যা করে বলি। গ্যাস সরাসরি সংযোগের সুবিধা অনেক। এখন দুই চুলা ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৯৭৫ টাকা। এটা নির্ধারিত। আমি আমার বাসায় যদি রোজ বিশ ত্রিশ জন মেহমান আপ্যায়ন করি তাতেও কোন সমস্যা নেই। গ্যাস বিলতো আর বর্ধিত দিতে হবে না। ইচ্ছামত গ্যাস খরচ করতে পারি সেখানে কোন হিসাব নেই, মিটার নেই। ফলে মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস কনজুম করেও আমি পার পেয়ে যাচ্ছি। অন্যদিকে সিলিন্ডারওয়ালাদের হিসাবের গ্যাস। পাঁচ ছয় জনের একটা ফ্যামিলিতে প্রতি মাসে প্রায় দুইটা সিলিন্ডার (১২ কেজির) নিঃশেষ হয়। সেখানে তাকে গুনতে হচ্ছে ২২০০ (বাইশ শত) টাকা। এখন স্বভাবতই একটা বিরাট পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। আর সিলিন্ডারওয়ালারা তো অতিরিক্ত মেহমান খাওয়ানোর চিন্তা করলে অতিরিক্ত টাকা গুনতে বাধ্য। এছাড়া গ্যাস পাম্পগুলোতে মিটার আছে ঠিকই তবে কিভাবে গ্যাস উত্তোলিত হচ্ছে সেটা তো শুধু সংযোগ দাতা ও পাম্প মালিক জানে। বিষয়টিও কড়া নজরে নেই।
এভাবে বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে বৈষম্য। যারা প্রি-পেইড মিটার পেয়েছেন ওরাতো আগাম টাকা দিয়ে কিনে বিদ্যুৎ খরচ করছে। এতে সরকারের লস হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এখনও পোস্ট পেইড মিটার থাকায় দু’মাস/তিন মাস/ পাঁচ মাস বিদ্যুৎ বিল বাকী রয়েছে। বিভিন্ন তথ্যমতে সরকারি ও শায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল বাকী তা সারা বাংলাদেশের সকল গ্রাহকের প্রায় দুই বছরের বিদ্যুৎ বিলের সমান। কাজেই আমি বলতে চাই- সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের বা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল কর্মকর্তা কর্মচারিদের জবাবদিহির মধ্যে থাকা জরুরী। বিদ্যুৎ বিভাগে এত বকেয়া কেন? তা সংশ্লিষ্টজন জবাবদিহি করতে হবে।
আজকের লেখার মূল বিষয়টি হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে। এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ রয়েছে। কী কারণে গ্যাস বিভাগে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। একদিকে ভোক্তারা বাতাসে গ্যাস উড়িয়ে দিচ্ছে। এখানে এ বিষয়টি কারা দেখবে? ভোক্তারা যাতে গ্যাসের অপচয় না করতে পারে সে বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেয়া হলো? এখানে মিটার সংযোগ করলে কেমন হয়? এগুলো চিন্তা না করে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যা সরাসরি গিয়ে আঘাত করলো এদেশের খেটে খাওয়া মানুষ গরিব, কৃষক, ভিক্ষুকের উপর। গ্যাসের দাম বাড়ার সাথে সাথে পরিবহণ ভাড়া বৃদ্ধিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বাড়তে শুরু করেছে। গ্যাস চালিত প্রতিটি মিল ফ্যাক্টরির উৎপাদিত পণ্যে পণ্যের দাম বাড়ছে। গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে যদি একটা কঠোর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্যাস অপচয় রোধ ও দুর্নীতি দমন করা যেত আমার মনে হয় সরকার উপকৃত হতো। প্রি পেইড মিটারে পুরোদেশ চলে এলে আমার মনে হয় কারো কাছে একটি টাকাও বিদ্যুৎ বিল বাকী থাকার কথা নয়। ঠিক একইভাবে গ্যাসের ক্ষেত্রেও চিন্তা করা দরকার।
বাংলাদেশকে ডিজিটাল করতে সরকারের চেষ্টার কমতি নেই। গাড়ি বা যানবাহন গ্যাসে না চালিয়ে তেলে চালালে গ্রামেগঞ্জে গ্যাস পৌঁছে দেয়া যেত। এতে গ্রামোন্নয়ন ত্বরান্বিত হতো।
বর্তমান সরকার জনবান্ধব সরকার। এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এখন এই খেটে খাওয়া মানুষের স্বার্থ বিঘিœত হয় এমন ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। একদিকে বড় লোকেরা বাসা বাড়িতে গ্যাস পুড়াবে, যাচ্ছে তাই ভাবে গ্যাসের অপচয় করবে আর তার মূল্য দিতে হবে যারা কোন দিন গ্যাস পায়নি বা গ্যাস ছুয়েও দেখেনি তা কি করে হয়? সংশ্লিষ্ট মহল সাধারণ জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সচেতন থাকবেন এটাই সকলের প্রত্যাশা।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • এই বর্বরতায় শেষ কোথায়?
  • কি করে ফেরানো যায় ভারতমুখী রোগীর স্রোত
  • প্রসঙ্গ : শিশু হত্যা ও নির্যাতন
  • শব্দের অত্যাচারে নিঃশব্দ ক্ষতি
  • এমন মৃত্যু কাম্য নয়
  • কোন সভ্যতায় আমরা!
  • দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ রোল মডেল
  • বৃক্ষ নিধন রোধে চাই জনসচেতনতা
  • আফ্রিকা-চীনের দ্বিতীয় মহাদেশ
  • শিশুরা নিরাপদ কোথায়?
  • অপেক্ষার অশেষ প্রহরগুলি
  • ঘুষ-জুয়া বন্ধে কঠোর হোন
  • মা ইলিশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হবে
  • ছাত্ররাজনীতি হোক কল্যাণ ও বিকাশের
  • পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমান
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • Developed by: Sparkle IT