উপ সম্পাদকীয়

প্রিয়া সাহা কেন এমন করলেন?

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৮-২০১৯ ইং ০১:৩৩:০৪ | সংবাদটি ১৩৪ বার পঠিত

প্রিয়া সাহা দেশে বিদেশে আলোচিত সমালোচিত। প্রতিদিন পত্র-পত্রিকায় স্থান পাচ্ছেন, শিরোনাম হচ্ছেন। প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে তার সম্পর্কে সংবাদ দেখে তার সম্পর্কে মানুষ কৌতুহলী হয়ে উঠেছেন। তাকে, তার সম্পর্কে জানার প্রভুত আগ্রহ মানুষজনের মধ্যে।
প্রিয়া সাহা বেসরকারি একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা। তিনি শারি’র পরিচালক। শারি হলো দলিত সম্প্রদায় সম্পর্কিত একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাবেক একজন সাংগঠনিক সম্পাদক। ঐক্য পরিষদ তাকে পরিষদ থেকে বহিষ্কার করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশের অমুসলিম নাগরিক সম্প্রদায় সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিয়ে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে। দেশের পত্র-পত্রিকায় এ সম্পর্কে রিপোর্ট বেরিয়েছে। প্রিয়া সাহার পৈত্রিক বাড়ি বাংলাদেশের পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর গ্রামে। তার স্বামী বাংলাদেশ দুর্নীতিদমন কমিশনের (দুদক) একজন কর্মকর্তা।
গত ১৭ জুলাই বিভিন্ন দেশের লোকজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে প্রিয়া সাহাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি হয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। প্রিয়া সাহা বলেন, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আমাকে পাঠায়নি। তারা একটু চাইলেই সেটা খোঁজ করতে পারেন। আমাকে আইআরআর থেকে সরাসরি ফোন করা হয়েছে, ই-মেইল পাঠানো হয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ঐক্য পরিষদের কেউ ব্যাপারটা জানে না যে, আমি এখানে এসেছি। এবং আমি যে আসবো, সেটাও আমি যেদিন আসছি তার আগের দিন আমি জানতে পেরেছি। বলতে পারেন হঠাৎ করেই আসছি। আমি ই-মেইল পেয়েছি। আমাকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তার মাধ্যমেই আমি এসেছি। পত্র-পত্রিকায় এসব খবর এসেছে। দৈনিক সিলেটের ডাক, দৈনিক সিলেট মিররে এসেছে। প্রিয়া সাহা এবারই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাননি। এর আগেও একাধিকবার তিনি গিয়েছেন।
প্রিয়াসাহার বক্তব্য থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেতে খুবই আগ্রহী। যারা বা যে সংস্থা তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তারাও আগ্রহী। তারা এতোটা আগ্রহী যে, বারবার প্রিয়া সাহাকে তারা তাগদা দিয়েছে, বারবার ই-মেইল করেছে। অনুমান করা যায় এই সফর সম্পর্কে তাদের মধ্যে আগে থেকেই যোগাযোগ ছিলো এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে নালিশ ও বিচারপ্রার্থী হওয়ার এজেন্ডা আগেভাগেই নির্ধারিত করা হয়েছে।
কথিত ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার ২৭ ব্যক্তির সঙ্গে গত ১৬ জুলাই বৈঠক করেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বৈঠকে তিনি প্রিয়া সাহাকে কিছু জিজ্ঞেস বা প্রশ্ন করেননি। তবুও প্রিয়া সাহা আগ্রহী হয়ে ট্রাম্পকে বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নিখোঁজ রয়েছেন। দয়া করে আমাদের লোকদের সহায়তা করুন। আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই।’ সঙ্গতভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে এতো লোক, ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ কোথায় হাওয়া হলো, কেউ কি মেরে ফেলেছে, গুম করেছে, নাকি জোর করে কোথাও তাড়িয়ে দিয়েছে। এমন হলে তো দেশে বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় বইতো, তোলপাড় হতো। একাত্তর সালে বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো। এই অসহায় মানুষজনের আশ্রয়-খাদ্য-বাসস্থান নিয়ে সেকি তোলপাড় আলোড়ন। ভারতের সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর রাতদিন নির্ঘুম পরিশ্রমের ফলে কোনোমতে কেটেছে এক কোটি মানুষের দশটি মাস। বিপন্ন বাংলাদেশ ও জনসংখ্যা ভারে নিপতিত ভারতকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলো তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। প্রিয়া সাহার কথিত তিন কোটি সত্তর লাখ মানুষের নিখোঁজের বিষয়ে কোনো টু শব্দটি হলো না, এটা বিশ্বাস করা যায় না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় প্রিয়া সাহার বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেন, বাংলাদেশ থেকে নাকি ৩ কোটি ৭০ লাখ ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ‘গায়েব’ বা ‘গুম’ হয়ে গেছেন। প্রায় ৪ কোটির কাছাকাছি যে সংখ্যাটি উনি বলছেন তা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের সংখ্যার ১০ গুণেরও বেশি, আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের সংখ্যার কাছাকাছি। এতো মানুষ গুম হলো সবার অজান্তে? ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ গায়েব হলো কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়াই?
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশ গুপ্ত গত ২৫ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রিয়া সাহার ‘সাক্ষা’ ও সাক্ষাৎকার’ বিষয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এক সাংবাদিক সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি প্রিয়া সাহার অভিযোগ ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ‘ডিজএপিয়ার’ প্রসঙ্গে বলেন, প্রিয়া সাহা ‘ডিজএপিয়ার’ বলতে কি বুঝাতে চেয়েছেন, তিনিই ভালো বলতে পারবেন। এটি যদি স্বাধীন বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের গুম বা নিখোঁজ অর্থে বলে থাকেন, তবে তা অসত্য। তিনি অবশ্য বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা উল্লেখ করেন সাংবাদিক সম্মেলনে।
প্রিয়া সাহা বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি আবুল বারাকাত ও বাংলাদেশের তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ টেনেছেন। তিনি মনে হয় ভুলে গেছেন যে, সে সময় বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির দেশ ছিলো না। ক্ষমতায় ছিলো একটি সাম্প্রদায়িক দল। আবুল বারাকাত প্রিয়া সাহার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, গবেষণার তথ্য-উপাত্ত বিকৃত করেছেন প্রিয়া সাহা। প্রতিবাদলিপিতে বারাকাত উল্লেখ করেন, ‘উপরন্তু তিনি কোথাও বললেন না যে আমার গবেষণা তথ্যটির সময়কাল ৫০ বছর (১৯৬৪-২০১৩)।
প্রিয়া সাহা অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাতের গবেষণা তথ্যটির সময়কাল উল্লেখ না করে ষাটের দশকের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন এসে যায়, ২০১৯ সালের ১৭ জুলাইর পূর্বে তিনি কোথায় ছিলেন, এতোদিন তিনি কথা বলেননি কেন?
প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখ করা যায় যে, বাংলাদেশে অমুসলিম নাগরিকদের অবস্থান সম্পর্কে একটি তথ্য আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। বাংলাদেশে আওয়ামীলীগ সরকারের শাসনামলে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের জাতীয় দিবসগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয়। প্রিয়া সাহা বাংলাদেশের নাগরিক। তার স্থায়ী ঠিকানা বাংলাদেশ। তিনি অবশ্যই দেশে বাড়িতে আসবেন। এ ব্যাপারে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, রেল ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, দেশে আসার তার অধিকার আছে। তার দেশে আসায় আমরা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছিনা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেছেন, তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা উচিত। তড়িঘড়ি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন নেই। আত্মপক্ষ সমর্থনের আগে কোনো লিগ্যাল প্রসিডিংস, কোনো মামলা শুরু না করতেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ। প্রিয়া সাহা বাংলাদেশে ফিরতে আগ্রহী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাকে বাংলাদেশে পাঠাতে চায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের পরিপ্রেক্ষিতে প্রিয়া সাহা সম্পর্কে সাংবাদিকরা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ.কে আবুল মোমেনকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকার আয়োজিত মন্ত্রী পর্যায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান শেষে গত ২৪ জুলাই দেশে ফিরলে সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরেন। ড. মোমেন বলেন, প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে এলে তাকে গ্রেফতার বা মামলার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কিনা এ ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অ্যালিফ ওয়েলস আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন। আমি তাকে বলেছি, প্রিয়া সাহাকে গ্রেফতারের পরিকল্পনা আমাদের নেই। আমরা তার বিরুদ্ধে মামলাও করতে চাই না। আমরা তাকে নিরাপত্তা দিতে চাই।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের বক্তব্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রিয়া সাহার বক্তব্য বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার হয়েছে। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি অনন্য দেশ। এখানে সম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই।
সূত্র : বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বক্তব্য, তথ্য, উদ্ধৃতি ও প্রতিবেদনের আলোকে লিখিত।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • এই বর্বরতায় শেষ কোথায়?
  • কি করে ফেরানো যায় ভারতমুখী রোগীর স্রোত
  • প্রসঙ্গ : শিশু হত্যা ও নির্যাতন
  • শব্দের অত্যাচারে নিঃশব্দ ক্ষতি
  • এমন মৃত্যু কাম্য নয়
  • কোন সভ্যতায় আমরা!
  • দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ রোল মডেল
  • বৃক্ষ নিধন রোধে চাই জনসচেতনতা
  • আফ্রিকা-চীনের দ্বিতীয় মহাদেশ
  • শিশুরা নিরাপদ কোথায়?
  • অপেক্ষার অশেষ প্রহরগুলি
  • ঘুষ-জুয়া বন্ধে কঠোর হোন
  • মা ইলিশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হবে
  • ছাত্ররাজনীতি হোক কল্যাণ ও বিকাশের
  • পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমান
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • Developed by: Sparkle IT