উপ সম্পাদকীয়

খেলাপী ঋণ ও উত্তরণের পথ

চৌধুরী শাহেদ আকবর প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৮-২০১৯ ইং ০০:৩৪:৩৪ | সংবাদটি ৭২ বার পঠিত

বিশ্ববিখ্যাত কল্প গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমস একবার একটি ব্যাংক-কে আসন্ন ডাকাতির হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। ব্যাংকের ভল্ট ডাকাতি করার জন্য এক অভিনব, সুচতুর ও সুকৌশল পরিকল্পনা করে ঔযড়হ ঈষধু নামের এক কুখ্যাত অপরাধী। কিন্তু সম্পূর্ণ এক ভিন্ন রহস্য উদঘাটনের জন্য এক বন্ধক দোকান-এর মালিক শার্লক হোমসের দ্বারস্থ হলে, শার্লক হোমস তার প্রবল বুদ্ধিমত্তা ও অসামান্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিয়ে আসন্ন ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা অনুমান করেন এবং ব্যাংকের একজন পরিচালক ও পুলিশের সহায়তায় ব্যাংককে বিরাট ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করেন। শার্লক হোমসের এই গল্পটির কথা মনে পড়লো দেশের সাম্প্রতিককালের ব্যাংকিং খাতের খেলাপী ঋণের কারণে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, মার্চ ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশে মোট খেলাপী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ১০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই খেলাপী ঋণের এই পরিমাণ ছিলো ৯৩ হাজার ৯ শত ১১ কোটি টাকা। আর এই বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে (জানুয়ারী-মার্চ ২০১৯) আরো যোগ হয়েছে ১৬ হাজার ৯ শত ৬২ কোটি টাকা। গত এক দশকে খেলাপী ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। আবার এই খেলাপী ঋণের প্রায় শতকরা ৫০ ভাগই আছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয়টি ব্যাংকে। অতি উচ্চমাত্রার এই খেলাপী ঋণ নিয়ে বর্তমানে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। হচ্ছে সমালোচনাও। এই খেলাপী ঋণের একটি অংশ ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী এবং বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে অনেকেই এদেরকে ব্যাংক ডাকাত হিসেবে উল্লেখ করেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত হলমার্ক কেলেঙ্কারীকে ডাকাতি আর বেসিক ব্যাংকের ঘটনাকে লুটপাট বলে অভিহিত করেছিলেন। শার্লক হোমসের গল্পটির ঘটনাকাল ছিলো ১৮৯০ সাল। সময়ের সাথে সাথে তাই এখন ব্যাংক ডাকাতির ধরণ পাল্টেছে। সময়ের প্রেক্ষাপটে এই ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী বা এদের সহযোগীরা বর্তমান সময়ের ঔযড়হ ঈষধু। কিন্তু এদের থামানোর জন্য নেই কোনো শার্লক হোমস।
সাধারণত ব্যাংক জনগণের আমানত থেকে সৃষ্ট তহবিল এর অর্থ থেকেই ঋণ প্রদান করে। ঋণ গ্রহীতা যখন এই ঋণের টাকা ফেরত দেয় না, তখন সেটা পরিণত হয় ব্যাংকের ক্ষতিতে। তাই ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংক ঋণ গ্রহীতা সম্পর্কে সম্ভাব্য সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে, ঋণযোগ্যতা যাচাই করে এবং ঋণের বিপরীতে যথাযথ জামানত আদায় করে ঋণটিকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারপরও গ্রহীতার ঋণযোগ্যতা এবং পূর্ব ইতিহাস ভালো থাকা সত্ত্বেও ঋণ আটকে যেতে পারে নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত অনেক কারণেই। আবার অনেকেই হয়ে পড়েন ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে মাননীয় অর্থমন্ত্রী দেশে খেলাপী ঋণ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেনÑ১. দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কারণ, ২. সঠিকভাবে ঋণগ্রহীতা নির্বাচন না করা, ৩. ঋণের তুলনায় অপর্যাপ্ত জামানত রাখা, ৩. একই সম্পদ বিভিন্ন ব্যাংকে জামানত রাখা, ৪. জামানতকৃত সম্পত্তির অতিরিক্ত মূল্য ধরা, ৫. ঋণ গ্রহীতার তহবিল ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা, ৬. প্রয়োজন ও সামর্থ্য বিবেচনা না করেই অতিরিক্ত ঋণ দেওয়া এবং ৭. ঋণসীমা বাড়ানো, পুনঃতফসীল ও পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়া। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর উল্লেখকৃত কারণগুলোর সাথে আরেকটি কারণ যোগ করা যেতে পারে, সেটা হচ্ছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ঋণ দেওয়া, ঋণ সীমা বাড়ানো, পুনঃতফসিলীকরণ ও পুনর্গঠন।
উপরোক্ত কারণগুলোর মধ্য থেকেই বুঝা যায় যে দেশে খেলাপী ঋণের একটি অংশে ইচ্ছাকৃত খেলাপী। এদের অনেককেই আমরা জানি। আবার অনেককেই তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক চিনে। বর্তমান এই খেলাপী ঋণের কতটুকু ইচ্ছাকৃত তা সংখ্যায় ব্যক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তার একটা বড় কারণ হচ্ছে, এখনও দেশে ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণ নিয়ে কোনো নীতিমালা নেই। কোনগুলো বা কিভাবে এদের চিহ্নিত করা হবে সেই সম্পর্কিত কোনো নির্দেশনা নেই। কিন্তু ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপীদের চিহ্নিত না করলে, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করাও সম্ভব হবে না। আর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ইচ্ছাকৃত এই খেলাপী ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা বা কমানোও সম্ভব হবে না যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে ব্যাংকিং খাতে তথা সামগ্রিক অর্থনীতিতে। অতিরিক্ত মন্দ ঋণের কারণে ব্যাংক এর লাভজনকতা কমে যায়, ব্যাংকের ঋণ প্রদানের ক্ষমতা কমে যায় যার দরুণ প্রকৃত উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা অনেক সময় ঋণ পান না এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দেয়।
বিশে^র অনেক দেশেই ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণ নিয়ে নীতিমালা আছে। আইন আছে। আমাদের পাশ^বর্তী দেশ ভারতে ও ইচ্ছাকৃত খেলাপী নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। ভারতে সর্বপ্রথম ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী চিহ্নিত করার উদ্যোগ শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। তারপর বিভিন্ন পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংযোজনের মাধ্যমে ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী ওই সকল ঋণগ্রহীতা ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী হিসেবে চিহ্নিত হবেন : ১. যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করেননি, ২. যারা প্রদত্ত ঋণ নির্দিষ্ট খাতে ব্যবহার না করে অন্য খাতে ব্যবহার করেছেন, ৩. যারা ঋণের অর্থ নির্দিষ্ট ব্যবসায় ব্যবহার না করে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার পর গৃহীত ঋণের অর্থ সেই প্রকল্প বা প্রকল্পের বাইরে অন্য কোনো সম্পদ হিসাবেও অস্তিত্বশীল নেই, ৪. যারা ঋণের বিপরীতে প্রদত্ত জামানত বা বন্ধকী সম্পত্তি ব্যাংকের অজ্ঞাতসারে সরিয়ে ফেলেছেন।
প্রদত্ত খাতে ঋণ ব্যবহার না করে অন্যখাতে ব্যবহারকে তহবিলের অন্যত্র ব্যবহার বা পাচার এই দুই শ্রেণীতে ফেলে তাদেরকেও সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অন্যত্র ব্যবহারের সংজ্ঞা হিসেবে বলা হয়েছেÑ১. গৃহীত ঋণ থেকে স্বল্প মেয়াদী চলতি মূলধন দীর্ঘ মেয়াদী কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করা, ২. মূল প্রকল্পের বাইরে ভিন্ন কোনো সম্পদ আহরণের জন্য গৃহীত ঋণের অর্থ ব্যবহার করা, ৩. একই মালিকানাধীন গ্রুপের অন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানে ঋণের অর্থ স্থানান্তর করা, ৪. ভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করা, ৫. ঋণের অর্থ ব্যাংকের অনুমতি ব্যতীত অন্য কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করা ইত্যাদি।
অর্থ পাচারের সংজ্ঞা হিসেবে বলা হয়েছে, ঋণ গ্রহীতা যদি ঋণের অর্থ তার ব্যবসা বা শিল্পের সাথে সম্পর্কহীন কোনো খাতে ব্যবহার করেন এবং তার জন্য যদি ব্যাংক বা কোম্পানী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেটাকে পাচার হিসেবে গণ্য করা যাবে। নীতিমালাটির যাতে অপব্যবহার না হয় এর জন্য উপরোক্ত কারণগুলোর সাথে ঋণ গ্রহীতার অতীত ইতিহাস ও লেনদেনের উপর ভিত্তি করে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপীদের চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে। শুধুমাত্র কোনো একক ঘটনা বা লেনদেনের উপর ভিত্তি করে নয়। ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপীদের বিরুদ্ধে কি কি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে তাও বলা হয়েছে নীতিমালাতে। এই নীতিমালার আলোকে প্রস্তুতকৃত ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণ গ্রাহকের তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে। সম্প্রতি ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সিতারাম লোকসভার আলোচনাতে জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে ভারতে ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণ আদায় করা হয়েছে ৭ হাজার ৬ শত ৫৪ কোটি টাকা। আমরা চাইলে ভারতের এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগতে পারি। কারণ আমাদের দেশের খেলাপী ঋণের অনেকগুলোই উল্লিখিত কারণে হয়েছে। যা হয়ত ব্যাংকিং খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না।
খেলাপী ঋণ আদায়ের জন্য সরকারকেই কিন্তু কঠোর হতে হবে। তা না হলে ঋণগুলো আদায় করা সম্ভব হবে না। ইতিমধ্যে বহুবার খেলাপী ঋণ গ্রহীতাদের ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ, পুনর্গঠন-এর সুযোগ দিয়ে ঋণ থেকে উত্তরণ হওয়ার মত যথেষ্ট বাস্তবসম্মত সময় ও সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই খেলাপী ঋণের কবল থেকে ব্যাংকিং খাত বের হতে পারছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, অসাধু ব্যবসায়ীরা অনেকটাই ব্যাংকিং সিস্টেমের এবং প্রচলিত রীতিনীতির অপব্যবহার করেছেন। সময়ের সাথে সাথে এর আকৃতি ও প্রকৃতি বড় হচ্ছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপীদের আর সুযোগ নয় বরং নীতিমালার আওতায় আনা হোক। ঋণ উদ্ধার বা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
শুরুতে শার্লক হোমসের একটা গল্পের কথা মনে পড়েছিল। শেষে এসেও শার্লক হোমসের আরেকটা গল্পের কাহিনী মনে পড়ে গেলো। পাঁচজনের একটা দল মিলে ‘ডড়ৎঃযরহমফড়হ ইধহশ’ নামে একটি ব্যাংক ডাকাতি করেছিলো। এই ডাকাতির সময় ব্যাংকের তত্ত্বাবধায়ককে তারা হত্যা করে এবং পরে ওই পাঁচজনের একজন ক্ষমা পাওয়ার শর্তে বাকি চারজনের বিরুদ্ধে ব্যাংক ডাকাতি ও হত্যার প্রমাণাদি যোগাড় করে এবং সাক্ষী দেয়। ফলে ওই চারজনের একজনের ফাঁসি হয় এবং বাকি তিনজনের ১৫ বছরের দীর্ঘ কারাবাস হয়। কিন্তু তারা মেয়াদ শেষের আগেই মুক্তি পায় এবং পরে ওই তিনজন মিলে বদলা হিসেবে যে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণাদি সংগ্রহ করে সাক্ষ্য দিয়েছিলো তাকে হত্যা করে। পরে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড হত্যার জন্য আবার ওই তিনজনকে খুঁজতে থাকে এবং ওই তিনজন পালিয়ে যাবার সময় জাহাজ ডুবিতে মারা যায়। প্রচলিত আইনে হোক বা তার বাইরেই হোক, সর্বশেষে তাদের করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল। এটা কি নিছকই গল্প? না এতে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপীদের জন্য চিন্তার উপকরণ রয়েছে? ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপীদের নিয়ন্ত্রণ না করলে, তাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন না ঘটলে, মূল্যবোধকে উন্নত করতে না পরলে, হয়ত এই গল্পের মতই তাদের শেষ পরিণতি অপেক্ষায় থাকা ছাড়া দেশ ও জাতির কিছুই করার থাকবে না।
লেখক : কলামিস্ট।

 

 

খেলাপী ঋণ ও উত্তরণের পথ
চৌধুরী শাহেদ আকবর
বিশ^বিখ্যাত কল্প গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমস একবার একটি ব্যাংক-কে আসন্ন ডাকাতির হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। ব্যাংকের ভল্ট ডাকাতি করার জন্য এক অভিনব, সুচতুর ও সুকৌশল পরিকল্পনা করে ঔযড়হ ঈষধু নামের এক কুখ্যাত অপরাধী। কিন্তু সম্পূর্ণ এক ভিন্ন রহস্য উদঘাটনের জন্য এক বন্ধক দোকান-এর মালিক শার্লক হোমসের দ্বারস্থ হলে, শার্লক হোমস তার প্রবল বুদ্ধিমত্তা ও অসামান্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিয়ে আসন্ন ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা অনুমান করেন এবং ব্যাংকের একজন পরিচালক ও পুলিশের সহায়তায় ব্যাংককে বিরাট ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করেন। শার্লক হোমসের এই গল্পটির কথা মনে পড়লো দেশের সাম্প্রতিককালের ব্যাংকিং খাতের খেলাপী ঋণের কারণে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, মার্চ ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশে মোট খেলাপী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ১০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই খেলাপী ঋণের এই পরিমাণ ছিলো ৯৩ হাজার ৯ শত ১১ কোটি টাকা। আর এই বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে (জানুয়ারী-মার্চ ২০১৯) আরো যোগ হয়েছে ১৬ হাজার ৯ শত ৬২ কোটি টাকা। গত এক দশকে খেলাপী ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। আবার এই খেলাপী ঋণের প্রায় শতকরা ৫০ ভাগই আছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয়টি ব্যাংকে। অতি উচ্চমাত্রার এই খেলাপী ঋণ নিয়ে বর্তমানে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। হচ্ছে সমালোচনাও। এই খেলাপী ঋণের একটি অংশ ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী এবং বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে অনেকেই এদেরকে ব্যাংক ডাকাত হিসেবে উল্লেখ করেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত হলমার্ক কেলেঙ্কারীকে ডাকাতি আর বেসিক ব্যাংকের ঘটনাকে লুটপাট বলে অভিহিত করেছিলেন। শার্লক হোমসের গল্পটির ঘটনাকাল ছিলো ১৮৯০ সাল। সময়ের সাথে সাথে তাই এখন ব্যাংক ডাকাতির ধরণ পাল্টেছে। সময়ের প্রেক্ষাপটে এই ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী বা এদের সহযোগীরা বর্তমান সময়ের ঔযড়হ ঈষধু। কিন্তু এদের থামানোর জন্য নেই কোনো শার্লক হোমস।
সাধারণত ব্যাংক জনগণের আমানত থেকে সৃষ্ট তহবিল এর অর্থ থেকেই ঋণ প্রদান করে। ঋণ গ্রহীতা যখন এই ঋণের টাকা ফেরত দেয় না, তখন সেটা পরিণত হয় ব্যাংকের ক্ষতিতে। তাই ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংক ঋণ গ্রহীতা সম্পর্কে সম্ভাব্য সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে, ঋণযোগ্যতা যাচাই করে এবং ঋণের বিপরীতে যথাযথ জামানত আদায় করে ঋণটিকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারপরও গ্রহীতার ঋণযোগ্যতা এবং পূর্ব ইতিহাস ভালো থাকা সত্ত্বেও ঋণ আটকে যেতে পারে নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত অনেক কারণেই। আবার অনেকেই হয়ে পড়েন ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে মাননীয় অর্থমন্ত্রী দেশে খেলাপী ঋণ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেনÑ১. দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কারণ, ২. সঠিকভাবে ঋণগ্রহীতা নির্বাচন না করা, ৩. ঋণের তুলনায় অপর্যাপ্ত জামানত রাখা, ৩. একই সম্পদ বিভিন্ন ব্যাংকে জামানত রাখা, ৪. জামানতকৃত সম্পত্তির অতিরিক্ত মূল্য ধরা, ৫. ঋণ গ্রহীতার তহবিল ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা, ৬. প্রয়োজন ও সামর্থ্য বিবেচনা না করেই অতিরিক্ত ঋণ দেওয়া এবং ৭. ঋণসীমা বাড়ানো, পুনঃতফসীল ও পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়া। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর উল্লেখকৃত কারণগুলোর সাথে আরেকটি কারণ যোগ করা যেতে পারে, সেটা হচ্ছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ঋণ দেওয়া, ঋণ সীমা বাড়ানো, পুনঃতফসিলীকরণ ও পুনর্গঠন।
উপরোক্ত কারণগুলোর মধ্য থেকেই বুঝা যায় যে দেশে খেলাপী ঋণের একটি অংশে ইচ্ছাকৃত খেলাপী। এদের অনেককেই আমরা জানি। আবার অনেককেই তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক চিনে। বর্তমান এই খেলাপী ঋণের কতটুকু ইচ্ছাকৃত তা সংখ্যায় ব্যক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তার একটা বড় কারণ হচ্ছে, এখনও দেশে ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণ নিয়ে কোনো নীতিমালা নেই। কোনগুলো বা কিভাবে এদের চিহ্নিত করা হবে সেই সম্পর্কিত কোনো নির্দেশনা নেই। কিন্তু ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপীদের চিহ্নিত না করলে, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করাও সম্ভব হবে না। আর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ইচ্ছাকৃত এই খেলাপী ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা বা কমানোও সম্ভব হবে না যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে ব্যাংকিং খাতে তথা সামগ্রিক অর্থনীতিতে। অতিরিক্ত মন্দ ঋণের কারণে ব্যাংক এর লাভজনকতা কমে যায়, ব্যাংকের ঋণ প্রদানের ক্ষমতা কমে যায় যার দরুণ প্রকৃত উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা অনেক সময় ঋণ পান না এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দেয়।
বিশে^র অনেক দেশেই ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণ নিয়ে নীতিমালা আছে। আইন আছে। আমাদের পাশ^বর্তী দেশ ভারতে ও ইচ্ছাকৃত খেলাপী নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। ভারতে সর্বপ্রথম ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী চিহ্নিত করার উদ্যোগ শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। তারপর বিভিন্ন পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংযোজনের মাধ্যমে ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী ওই সকল ঋণগ্রহীতা ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী হিসেবে চিহ্নিত হবেন : ১. যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করেননি, ২. যারা প্রদত্ত ঋণ নির্দিষ্ট খাতে ব্যবহার না করে অন্য খাতে ব্যবহার করেছেন, ৩. যারা ঋণের অর্থ নির্দিষ্ট ব্যবসায় ব্যবহার না করে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার পর গৃহীত ঋণের অর্থ সেই প্রকল্প বা প্রকল্পের বাইরে অন্য কোনো সম্পদ হিসাবেও অস্তিত্বশীল নেই, ৪. যারা ঋণের বিপরীতে প্রদত্ত জামানত বা বন্ধকী সম্পত্তি ব্যাংকের অজ্ঞাতসারে সরিয়ে ফেলেছেন।
প্রদত্ত খাতে ঋণ ব্যবহার না করে অন্যখাতে ব্যবহারকে তহবিলের অন্যত্র ব্যবহার বা পাচার এই দুই শ্রেণীতে ফেলে তাদেরকেও সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অন্যত্র ব্যবহারের সংজ্ঞা হিসেবে বলা হয়েছেÑ১. গৃহীত ঋণ থেকে স্বল্প মেয়াদী চলতি মূলধন দীর্ঘ মেয়াদী কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করা, ২. মূল প্রকল্পের বাইরে ভিন্ন কোনো সম্পদ আহরণের জন্য গৃহীত ঋণের অ

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • শিক্ষার রাজ্যে এক বিস্ময়
  • ডেঙ্গু ও বানভাসি মানুষ
  • শিল্প-সাহিত্যে ১৫ আগস্ট
  • ইমাম-মুয়াজ্জিন সার্ভিস রোলস-এর প্রয়োজনীয়তা
  • বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা
  • শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবেশ
  • তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির
  • ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়
  • বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা
  • শিক্ষা ও নৈতিকতা
  • কুরবানির সূচনা
  • কুরবানি ও আমাদের করণীয়
  • উন্নয়নের মানবিকতা বনাম গতানুগতিকতা
  • Developed by: Sparkle IT