উপ সম্পাদকীয়

দুর্নীতি দূর করতে গেলে সার্বিক অস্ত্রোপচার প্রয়োজন

স্থিতধী বড়ুয়া প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৮-২০১৯ ইং ০০:৪১:৫৮ | সংবাদটি ১১৪ বার পঠিত

গত ২৬ জুলাই সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের উপ-মহা-কারাপরিদর্শক পার্থ গোপাল বনিকের গ্রীণরোডের ভূতের গলির বাসায় দুর্নীতি দমন কমিশন তল্লাশি চালিয়ে তার বাসায় জ্ঞাত আয় বহিঃর্ভূত নগদ ৮০ লক্ষ টাকা পাওয়ায় তাকে কমিশনের কর্মকর্তারা গ্রেফতার করেন। বর্তমানে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে। সিলেটের আগে তিনি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের উপ-মহা-কারাপরিদর্শক থাকাকালে তার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি এবং অনিয়মের বহু অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রাম কারাগারের সাবেক জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস গত বছর ২৬ অক্টোবর ময়মনসিংহ গামী ট্রেন হতে ভৈরব বাজার রেল স্টেশনে নগদ ৪৪ লক্ষ ৪৩ হাজার টাকা, ২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার স্থায়ী আমানত, ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার নগদ চেক এবং ১২ বোতল ফেনসিডিল সহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে ভৈরব কারাগারে আছে। তারা উভয়ে চট্টগ্রাম কারাগারে এক সাথে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে তাদের উভয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের বহু অভিযোগ সোহেল রানা গ্রেফতারের পর গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়।
গত জুন মাসে পুলিশের উপ-মহা-পুলিশ পরিদর্শক মিজানুর রহমান অবৈধ সম্পদ অর্জনের জন্য আনীত অভিযোগ হতে বাঁচার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক খোন্দকার এনামুল বসিরকে ৪০ লক্ষ টাকা ঘুষ দেওয়ার তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে তারা উভয়ের বিরুদ্ধে ঘুষ দেওয়া ও নেওয়ার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের গ্রেফতারের পর বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে।
অতি সম্প্রতি পাবনা রূপগঞ্জ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমকে প্রকল্পের জন্য ফার্নিচার ক্রয়ে অসংগতি এবং দুর্নীতির জন্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি একটি বালিশ ক্রয়ে ৫,৯৫৭/- টাকা এবং প্রতিটি বালিশ নবনির্মিত দশ তলা ভবনের উপরের তলায় তোলার খরচ ৭৮০/- টাকা, একটি ইলেকট্রিক স্টোবের দাম ৭,৭৪৭/- টাকা এবং উপরে তোলার খরচ ৬,৬৫০/- টাকা, একটি ইলেকট্রিক কেটলি’র দাম ৫,৩১৩/- টাকা এবং উপরে তোলার খরচ ২,৯৪৫/- টাকা দেখান, যা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হয়। এধরণের দুর্নীতিকে পুকুর চুরি না বলে দিঘী চুরি বললেও কমই বলা হবে!
আগের দিনে ঘুষ, দুর্নীতি সরকারের নিম্ন পদস্থ কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ইদানীং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ঘুষ ও দুর্নীতির সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর হতে ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্রিটিশ আমলে বিভিন্ন প্রশাসনের নিম্নস্তর ছাড়া উচ্চস্তরে ঘুষ, দুর্নীতি ছিল না। ঘুষ, দুর্নীতি তখন পুলিশ বিভাগে সীমিত আকারে থানার দারোগা (এসআই) পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। এর উপরের স্তরে ছিল না। আমার প্রয়াত পিতা ব্রিটিশ আমলে পুলিশের ডিএসপি ছিলেন। তাঁর মুখে শুনেছি দারোগা (এসআই) থেকে ইন্সপেক্টর হয়ে যাওয়ার পর ঘুষ কিংবা অন্য প্রকার দুর্নীতির সাথে জড়িত এমন অভিযোগ কারো বিরুদ্ধে পাওয়া যেত না। আমার পিতার মুখে শুনেছি তাঁর ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। ব্রিটিশ আমলে সিভিল প্রশাসনের উপর স্তর সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ছিল এমনও শুনেছি।
১৯৪৭ এর ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল জাতির জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্’র মৃত্যুর কিছুদিন পর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। উভয়ের মৃত্যুর পর পাকিস্তানের সামরিক জান্তা এবং সিভিল প্রশাসন রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। তখন হতে পাকিস্তানে ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সংক্রামক ব্যাধির মত আস্তে আস্তে বিস্তার লাভ করতে থাকে। যার খেসারত পাকিস্তানকে এখনো দিতে হচ্ছে। পাকিস্তানের পশ্চিম ভূ-খ-ের তুলনায় পূর্ব ভূ-খ-ে দুর্নীতির মাত্রা অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে ছিল, এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের এই দ্বন্দ্বে সামরিক জান্তাই জয়ী হয়। যার ধারাবাহিকতায় জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের ২৮ অক্টোবর সারা পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করেন। সামরিক আইন জারির পর শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে পাকিস্তানে ১৩৩ জন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা, ২২১ জন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা এবং ১৩০৩ জন তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাকে তিনি চাকুরিচ্যুত করেন। তাঁর দশ বছরের শাসনামলে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ঘুষ, দুর্নীতির বহু ইতিহাস এদেশের জনগণ এখনো ভুলতে পারেনি। ১৯৬৯ সালের ২৩ মার্চ আইয়ুবের পতনের পর সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের মসনদে বসেন। তিনিও ঘুষ, দুর্নীতি এবং আইয়ুব ঘেঁষা এই অপবাদ দিয়ে তার আমলেও ৩০৩ জন উচ্চ পদস্থ বেসামরিক কর্মকর্তাকে চাকুরিচ্যুত করা হয়। এদের মাঝে আহমেদ ফজলুর রহমানের মত জাঁদরেল বাঙালি সিএসপি, মুহাম্মদ মহসিন এবং এম.এ. হকের মত জনপ্রিয় পুলিশের বাঙালি ডিআইজিও রয়েছে। অথচ ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি, মাদকাসক্তি, ঘুষ, দুর্নীতির মত বহু অভিযোগের কথা জনগণের এখনো স্মরণে আছে।
আমরা যারা ৬০ দশকে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পুলিশ, প্রশাসন কিংবা অন্য কোন সরকারি সংস্থায় চাকুরিতে যোগদান করি তারা নিঃসন্দেহে বলতে পারি তখন প্রশাসন যন্ত্র সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ছিলেন। পুলিশ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সংস্থায় ঘুষ, দুর্নীতি, তখন অনেকটা সহনীয় মাত্রায় ছিল। অর্থের পেছনে পাগলা ঘোড়ার মত তখন কেহ দৌঁড়ায়নি কিংবা কেহ অতিদ্রুত সময়ে গাড়ি বাড়ির মালিক হওয়ার খোয়াবও দেখেনি। ৭০ দশকেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। ৮০ দশকে এই প্রবণতা আরম্ভ হয় এবং বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন এই প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে এই মুহূর্তে এর গবেষণার প্রয়োজনীতায় দেখা দিয়েছে। ঐ সময় কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন অভিযোগ হতে অব্যাহতি পাওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। কোন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপরাধ কিংবা অপরাধীদের সহতায়তা দানের সামান্যতম অভিযোগ পাওয়া গেলে চাকুরিচ্যুতি এর একমাত্র শাস্তি ছিল। সর্বক্ষেত্রে চেইন অব কমান্ড বজায় ছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দুর্নীতির উর্ধ্বে ছিল বিধায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহ প্রশাসনের সকল কর্মকর্তার কাছে তারা ছিল শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। এর ব্যত্যয় কোন সময় চোখে পড়েনি।
১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে শাসকদলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দুর্নীতির উর্ধ্বে ছিল বিধায় এদেশে ঘুষ, দুর্নীতি তখনও অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর এদেশের রাজনীতিতে সামরিক প্রভুদের আবির্ভাব ঘটে। প্রথম সামরিক প্রভু মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত এবং ত্যাগী নেতৃবৃন্দকে দলে টানতে না পেরে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি করা কঠিন করে তোলে। তিনি পাকিস্তানী ভাবধারায় বাতিল রাজনীতিবিদ এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের সমন্বয়ে দল গঠন করে রাজনীতি নামক মহৎ একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে সৎ থাকলেও তার পরিবার ও তার গড়া দলের অনেকে দুর্নীতির সাথে যুক্ত ছিল এমন তথ্য এখন গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। তখন থেকে এদেশে সর্বস্তরে দুর্নীতির বিস্তার আরম্ভ হয়। তার উত্তরসূরি জেনারেল এরশাদও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তার আমলে রাজনীতি, প্রশাসন সহ জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি শিকড় গেড়ে বসে। তার বিরুদ্ধে রজুকৃত দুর্নীতির মামলা সমূহ এরই প্রমাণ বহন করে। ৯১ তে এদেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন হলেও রাজনীতি নামক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটি এখনো দুর্নীতির বৃত্ত হতে বের হয়ে আসতে পারেনি। রাজনীতিবিদরা দেশ শাসন করবে এটাই গণতান্ত্রিক রীতি। রাজনীতিবিদরা যদি দুর্নীতির উর্ধ্বে থাকে তাহলে সরকারি আমলারা যতবড় ক্ষমতাবানই হউক না কেন সহনীয় মাত্রার অতিরিক্ত কিছু করার সাহস কোনদিন পাবে না।
বাংলাদেশে দুর্নীতি এখন একটি রাষ্ট্রীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ট্রান্সফারেন্সী ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট মোতাবেক ২০১৭ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৩ তম এবং ২০১৮ সালের জরিপে ১৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৪৯তম অবস্থানে আছে। এদেশের বর্তমান সময়ে রাজনীতি সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির শিকড় এতো গভীরে প্রবেশ করেছে যে, সার্বিক অস্ত্রোপচার ছাড়া এর থেকে পরিত্রাণের কোন পথ খোলা নেই। তবে এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • প্রয়োজন সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন
  • চোরাকারবার বন্ধে চাই কৌশল
  • জাফলং ভ্যালি বোর্ডিং স্কুল
  • একটি বর্ণনাতীত ভাষ্য
  • Developed by: Sparkle IT