উপ সম্পাদকীয়

সুন্দরবনের প্রকৃতি ও জীবন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৮-২০১৯ ইং ০১:১৪:১৯ | সংবাদটি ১৪০ বার পঠিত

সুন্দরবন বাংলাদেশের এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ। শান্ত, সৌম্য, ¯িœগ্ধ বনরাজির গভীরে রয়েছে প্রকৃতির এক অপূর্ব আয়োজন। যেমনই বিচিত্র তার রূপ, তেমনিই রহস্যময়ী তার আচরণ। তাই বনকে ঘিরে যেসব মানুষের বিচরণ তারা ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে নানান আচার, কৃষ্টি পালন করে থাকে। সুন্দরবনের বিপদসঙ্কুল রহস্যময়ী বনরাজির গহীনে প্রকৃতি ও জীবনের যে বিচিত্র রূপ, মানুষ ও প্রকৃতির যে বিনিময়, তার স্বরূপ বুঝতে হলে সুন্দরবনকে জানতে ও বুঝতে হবে। অথচ প্রকৃতির এই আশীর্বাদ কিংবা উপহারকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করে তাকে লুণ্ঠন করছি ইচ্ছেমত। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এমন বিরূপ আচরণ ধ্বংসাত্মক ও অনৈতিক।
প্রতি বছর বন থেকে কোটি কোটি টাকার কাঠ কেটে নেয়া হচ্ছে। সুন্দরবনের সুন্দরী কাঠ কেটে নেয়ার জন্য গড়ে উঠেছে একটি অসাধু চক্র। রয়েল বেঙ্গল টাইগার দিনের পর দিন বিলুপ্ত হচ্ছে। খাদ্য সংকটে ভোগছে ব্যাঘ্রকূল। খাদ্যের জন্য লোকালয়ে গিয়ে মারা পড়ছে বাঘ। হরিণ শিকার করছে শখের শিকারিরা। মাছ শিকার হচ্ছে অবাধে। সুন্দরবনের ‘জলে কুমির, ডাঙ্গায় বাঘ’-প্রবাদ এখন রূপকথার গল্পে পরিণত হয়েছে। বাঘ, বানর, হরিণ, শুকর, বক, মাছরাঙ্গার দলে দলে, ঝাঁকে ঝাঁকে ভিড় করার দৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় কদাচিৎ।
বাংলাদেশে সুন্দরবনের আয়তন হচ্ছে ৬ হাজার ৬শ’ ১৭ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবনে আছে ৮শ প্রজাতির উভচর প্রাণী। ২৭০ প্রজাতির পাখি। স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে ৪২ প্রজাতির। ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ। ৪শ প্রজাতির মাছ, এর মধ্যে ১২০ প্রজাতির মাছ বাণিজ্যিকভাবে রফতানি করা হয়। ৫০ প্রজাতির আছে গাছ গাছালি। নদী ভাঙ্গন, মানুষের দখল প্রক্রিয়া নানা কারণে সুন্দরবন ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে।
সুন্দরবনের কাঠ, মাছ হচ্ছে অন্যতম অর্থকরী উপাদান। এসব পণ্যের ওপর ভিত্তি করে ৫ লাখের বেশি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সৃন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। অবাক বিষয়, চারিদিকে গহীন অরণ্য আর বিস্তীর্ণ জলাশয় থাকলেও সুন্দরবনে মশা নেই। মশা না থাকার কারণ-সুন্দরবনের জোয়ার ভাটা। মশা ডিম পাড়ার পর জন্ম নিতে যে সময়ের দরকার জোয়ার ভাটার ফলে তা সম্ভব হয় না। ফলে সুন্দরবনে মশার বিস্তার আব সম্ভব হয় না। সুন্দরবনের পানি লোনা বলে সুন্দরবনের প্রকৃতি খুবই রুক্ষ। এখানে গাছপালা, পশু-পাখি, বন্য প্রাণী প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে। কেউ যদি সুন্দরবনে অন্য কোনো গাছ রোপণ করে, তা সেখানকার প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে পারবে না। সুন্দরবনের প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেখানে গাছপালা, পশু পাখি, বন্যপ্রাণী আপনা-আপনি জন্ম নিচ্ছে আবার বিলীন হয়ে যাচ্ছে আপন নিয়মেই।
সুন্দরবনে আছে জলদস্যুর ঘাঁটি। জলদস্যুরা সাধারণত পর্যটকদের উপর হামলা করেনা। তারা সুন্দরবনের জেলেদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে থাকে। সুন্দরবনের জেলেরা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেয় কিংবা মহাজনের শর্তানুযায়ী মাছ ধরে সুন্দরবনের নদ-নদী ও বঙ্গোপসাগরে। সুন্দরবনে শত শত জেলে নৌকা নদ-নদীর বুকে ভেসে বেড়ায় মাছের আশায়। নদী বা সাগর মোহনায় মাছের প্রাচুর্য থাকলেও তা জেলে সম্প্রদায়ের ভাগ্য ফেরাতে তেমন কোনো ভূমিকা রাখে না। কারণ মহাজনদের জাল ও জলের জটিল অংক এবং ঋণ সঙ্কটের কারণে জেলেরা খুবই দরিদ্র জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। তারা যখন দীর্ঘদিনের জন্য নদীতে মাছ ধরতে যায় তখন মহাজনই তাদের সংসারে ভরণ-পোষণের খরচ বহন করে থাকে। একেকজন মহাজনের নিয়ন্ত্রণে অসংখ্য নৌকা ও জেলে রয়েছে, যারা তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ আয়ের উৎস। তাদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করে সুন্দরবনের জলদস্যুরা। জলদস্যুরা অবস্থান করে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে। তাদের আছে ট্রলার বা স্পিডবোট। জলদস্যুদের নিয়ে নানা কথা প্রচলিত আছে সুন্দরবনে, যা অনেকটা রূপকথার মতো।
সুন্দরবনের দক্ষিণ-পূর্বাংশে পশু-পাখি প্রাণীদের খাদ্য সহজলভ্য বলে তাদের আচরণে কোনো রকম হিং¯্রতা বা উগ্রতা প্রকাশ পায় না। কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে খাদ্য সঙ্কট থাকায় এবং প্রকৃতি রুক্ষ হওয়ায় সেখানকার পশু-পাখি-প্রাণী বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার খুবই উগ্র প্রকৃতির হয়ে থাকে।
সুন্দরবন এলাকায় বঙ্গোপসাগরে প্রতি ছয় ঘন্টা পর জোয়ার-ভাটা হচ্ছে। বন রক্ষী সহ সুন্দরবন এলাকার জেলে, বাওয়ালী, মৌয়াল সবাই বঙ্গোপসাগরের জোয়ার-ভাটাকে বলে ‘গুন’। জোয়ারকে বলে ভরা গুন আর ভাটাকে বলে মরা গুণ। ভরা গুনে বঙ্গোপসাগরের পানি সুন্দরবনে উঠে এসে মাটি ভিজিয়ে দিয়ে যায়। আর মরা গুনে সুন্দরবনের মাটি থেকে পানি নেমে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। ভরা গুন আর মরা গুনকে কেন্দ্র করে সুন্দরবনে জনজীবনের নানা হিসাব-নিকাশ রয়েছে।
খাদ্যের সঙ্কট থেকে কিভাবে বাঘের আচরণের স্বরূপ বদলে যায়, তার সঙ্গে জনজীবনের সুস্থিরতা কিভাবে বিপন্ন হয়, জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের জীবন-সংস্কৃতির ছন্দ কিভাবে রচিত হয় তার এক অনুপম দৃশ্য অঙ্কিত হয়ে আছে সুন্দরবনের বিশাল ক্যানভাস জুড়ে। তাছাড়া জলদস্যুদের নিয়ে যেসব কাহিনী প্রচলিত আছে সুন্দরবনে, যা রূপকথাকে হার মানায়। মানুষ ও প্রকৃতির যৌথ প্রয়াসে সুন্দরবনে যে জীবন রচিত হয়েছে তা বহু বৈচিত্র্যময়।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • প্রয়োজন সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন
  • চোরাকারবার বন্ধে চাই কৌশল
  • জাফলং ভ্যালি বোর্ডিং স্কুল
  • একটি বর্ণনাতীত ভাষ্য
  • Developed by: Sparkle IT