উপ সম্পাদকীয়

ডেঙ্গু রোগে আতঙ্ক নয়, সতর্কতা ও সচেতনতাই জরুরি

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৮-২০১৯ ইং ০১:১৬:৫৮ | সংবাদটি ২২৭ বার পঠিত

সারাদেশে যেভাবে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে, তা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। তাছাড়া প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে ফলে ভিড় বাড়ছে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে। গত জানুয়ারি/১৯ থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৬০০০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ১৮ জন। অথচ একটু সতর্কতা অবলম্বন করলে বা নিজে থেকে একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকলে, নিজেদের আঙ্গিনা নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখলে অনায়াসে ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। মানুষের সচেতনতাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় ও উত্তম ভূমিকা রাখতে পারে। তারপরও ডেঙ্গু রোগটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ায় জাতি যেভাবে ঝাকুনি খাচ্ছে তাতে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। অথচ ডেঙ্গু থেকে মুক্তি পেতে আতঙ্ক নয় বরং সচেতনতাই উত্তম ব্যবস্থা। কেননা ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল মন্ত্র হচ্ছে এডিস মশা ধ্বংস ও বিস্তার রোধ করা এবং এডিস মশা যেন কামড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সতর্কতাই উত্তম ও জরুরি তাই সচেতনতা ও প্রতিরোধই হলো একমাত্র ও মুখ্য হাতিয়ার।
প্রায় দুই যুগ পূর্বে এদেশে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলেও এর বিস্তার রোধে কখনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া বা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অসতর্কতার কারণেই আজ আমাদের দেশে ডেঙ্গুর আক্রমণ অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিগত ২০০০ সালেও বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল তখন এডিস মশা নিধনে ব্যাপক ব্যবস্থা নেয়া হলেও পরবর্তীতে তা আর গুরুত্ব দিয়ে কাজ না করার কারণে আজ এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়ে মহামারি রূপ নিয়েছে। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা শুধু কীটনাশক বা মশার ঔষধ ছিটালেই ধ্বংস করা সম্ভব নয় বরং ঔষধ ছিটানোর পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা ও সতর্কতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই নিজ নিজ বাসস্থান ও আঙ্গিনা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। কাজেই ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে বরং সচেতনতা সৃষ্টির প্রতিই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
বর্তমানে শুধু ঢাকা শহরেই নয় বরং সিলেটসহ সারাদেশেই রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এবং দিন দিন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত মোট ২০০ জনের উপরে ডেঙ্গু রোগী সনাক্ত করা হয়েছে। যা সিলেটবাসী ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনকে সতর্ক হওয়ার জরুরি বার্তা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত এবং জরুরি ভিত্তিতে এডিস মশা নিধনের কার্যক্রম ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরম্ভ করা উচিৎ। সিলেট শহরে রাস্তায়, ড্রেনে, বাসা বাড়ির আঙ্গিনায় এক কথায় যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই শুধু ময়লা আবর্জনার স্তুপ চোখে পড়ে। হাজার হাজার দোকান পাট থাকা সত্ত্বেও একদল দখলবাজ রাস্তা দখল করে যেখানে সেখানে বাজার সাজিয়ে ময়লা, আবর্জনা, পানি ইত্যাদি ফেলে ডেঙ্গু মশার উৎপত্তিস্থল আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে তাই রাস্তাঘাটের ঐসব হকারদেরকে সরিয়ে বা রাস্তা দখলমুক্ত করে জরুরিভাবে সিলেট শহরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা সিলেট সিটি কর্পোরেশন সহ সিলেটবাসীর কর্তব্য ও নৈতিক দায়িত্ব এবং আতঙ্কহীন বসবাসের জন্য উত্তম পথ।
বর্তমান অবস্থায় শুধু সিলেট নয় বরং জাতীয়ভাবেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। আগামী অন্তত তিন/চার মাস এই দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য অতি দ্রুত ও জরুরি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশেই ডেঙ্গু রোগ হয়ে থাকে বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতেই বেশি। সেক্ষেত্রে যেসব দেশ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে প্রয়োজনে সেইসব দেশের পরামর্শ গ্রহণ করতঃ আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া উত্তম। বর্তমান অবস্থায় ডেঙ্গু বিস্তার রোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এডিস মশার বংশ বৃদ্ধি রোধ করার পাশাপাশি আক্রান্ত রোগীকে সতর্কতার সঙ্গে মশারির মধ্যে রাখা, যাতে আক্রান্ত রোগীকে এডিস মশা কামড়ানোর পর পুনঃরায় ডেঙ্গু ছড়াতে না পারে। একই সঙ্গে জনমনে সৃষ্ট আতঙ্ক দূর করার কাজ জরুরি কাজ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সরকার তথা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক অবশ্যই রাষ্ট্রের জনগণকে সতর্ক ও সচেতন করা জরুরি। শুধু তাই নয় বাড়ির আঙ্গিনা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্যও সচেতন করা জরুরি। কেননা এডিস মশার আবাসস্থল হলো বাড়ি, বাড়ির চারপাশসহ আশেপাশে জমে থাকা পাত্রের পানি। স্বচ্ছ ও দীর্ঘদিন জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এরা ডিম পাড়ে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এসিড মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার করতে হবে এবং পাশাপাশি মশা নিধনের জন্য ঔষধ ছিটিয়ে দিয়ে বাড়ির আশেপাশে জলাশয়, ঝোপ ঝাড়, জঙ্গল ইত্যাদি থাকলে তাও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেতন করতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক নয় বরং ডেঙ্গু প্রতিরোধে যা করণীয় তা সচেতনতার সাথে পালন করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে উত্তম ভূমিকা রাখা সম্ভব। এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং মশক নিধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘরবাড়ি ও এর চতুর্পাশের পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা টিনের কৌটা, মাটির পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল, নারিকেলের চার বা বৃষ্টিতে পানি আটকে থাকতে পারে এমন পাত্র ইত্যাদি ধ্বংস ও পরিষ্কার করতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগীই সাধারণত ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়। তবে রোগীকে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। ভালো না হওয়া পর্যন্ত রোগীকে বিশ্রামে থাকতে হবে। প্রচুর পরিমাণে পানি, শরবত, ডাবের পানিসহ তরল খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চললে স্বল্প সময়ে রোগটি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যেহেতু ডেঙ্গু রোগের কোনো ভ্যাকসিন নেই তাই এডিস মশা নিধন ছাড়া ডেঙ্গু থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়ও নেই। তাই মশার জন্মস্থান ধ্বংস ও সতর্কতামূলক প্রতিরোধই একমাত্র ভরসা। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের জেলা, উপজেলা, সিটি ও পৌরসভাগুলোসহ গ্রামে গঞ্জে আমরা আমাদের আত্মীয় স্বজন নিয়েই বসবাস করছি। আমরা সবাই আতঙ্কহীন শান্তিতে বসবাস করতে চাই। তাই যে কোনো দুর্যোগে আতঙ্ক না ছড়িয়ে বরং সতর্কতামূলক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাই ডেঙ্গু আতঙ্ক, ছেলেধরা আতঙ্ক, গণপিটুনি আতঙ্ক, ডাকাত আতঙ্ক বা বিভিন্ন ধরনের মহামারি আতঙ্ক না ছড়িয়ে শান্তিতে বসবাসের জন্য সবাই মিলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করি এবং প্রতিটি অঞ্চল তথা দেশকে শান্তিতে বসবাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে পরস্পরকে সহযোগিতা করি। রোগ, ব্যাধি ও আতঙ্কহীন শান্তিতে নিজে বসবাস করি এবং অন্যকেও শান্তিতে বসবাসের সুযোগ সৃষ্টি করে দেই।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • প্রয়োজন সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন
  • চোরাকারবার বন্ধে চাই কৌশল
  • জাফলং ভ্যালি বোর্ডিং স্কুল
  • একটি বর্ণনাতীত ভাষ্য
  • Developed by: Sparkle IT