ধর্ম ও জীবন

পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারার মর্যাদা

মো. আব্দুশ শহীদ নেগালী প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৮-২০১৯ ইং ০১:২৯:২০ | সংবাদটি ৬৫ বার পঠিত

মদিনা শব্দের অর্থ হচ্ছেÑ মহানগরী, মদিনা শরীফের পূর্ব নাম ছিলো ইয়াসরীব আরবীয় কিছু কিছু সূত্র মতে হযরত নূহ (আ.) এর অধঃস্তন এক পুরুষের নাম ইয়াসরীব, যার হাতে এ নগরীর গোড়াপত্তন হয়। তার নামানুসারেই এ নগরীর নাম রাখা হয়েছিলো। তবে নির্ভরযোগ্য মতে ইসলাম পূর্ব যুগে আমালিকা গোত্রের হাতে এ নগরীর গোড়া পত্তন হয়। তাদের সর্দারের নাম ছিলো ইয়াসরীব, তার নামানুসারেই এ নগরীর নাম। ইয়াসরীব শব্দের অর্থ হচ্ছেÑ অভিযোগ, ধমকি, হুসকি ইত্যাদি। যেমন পবিত্র কালামে পাকে এসেছে, হযরত ইউসুফ (আ.) তাঁর ভাইদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, লা তাছরীবা আলাইকুমুল ইয়াউম, ইয়াগফিরুলল্লাহু লাকুম ওয়াহুয়া আরহামুর রাহিমীন। অর্থ : আজ তোমাদের উপর কোনো অভিযোগ নেই, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ক্ষমা করুন। তিনি হচ্ছেন অধিক দয়ালু। (সূরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯২)
রাহমাতুল লিল আলামীন প্রিয় রাসুল (সা.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে ২রা জুলাই পবিত্র মক্কা ভূমি থেকে মদিনা শরীফে হিজরত করে যাবার পর এ নগরীর নাম রাখা হয় ‘মদিনাতুন নবী’ অর্থাৎ নবীর নগরী। কারণ রাসুলে করিম (সা.) তাওহিদ ও রিসালতের আলোয় আলোকিত করেছিলেন এ মহানগরীকে। আমূল পরিবর্তন আনয়ন করলেন গোটা জাতির মধ্যে। তখন থেকে প্রিয় রাসুল (সা.) নিষেধ করলেন পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারাকে ইয়াসরীব নামে ডাকতে। কেহ যদি এ নামে ডাকে তাহলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। পবিত্র মদিনা শরীফের আরও অনেক সুন্দর সুন্দর অর্থবহ নাম রয়েছে, যেগুলো হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যেমনÑ আল মদিনা, আত তাইয়্যিবাহ, আল মুহাব্বাহ, আশ শাফীয়াহ, আল নাজিয়াহ, আল মাহবুবাহ, আল মুহার রামাহ ইত্যাদি আরও অনেক। এসকল নাম সমূহ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মাধুর্য চরিত্রের গুনাবলির স্পর্শে মদিন শরীফ যে সকল গুণে গুণান্বিত হয়েছিলো, সে সকল গুণের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নামকরণ করা হয়েছে। প্রিয় নবী (সা.) এর বাণী : আমার ঘর এবং মিম্বরের মধ্যখান হচ্ছে জান্নাতের উদ্ব্যান সমূহের মধ্য হতে একটি উদ্যান এবং আমার মিম্বর হচ্ছে হাউজে কাউছারের উপর। (বুখারী)
ময়দানে মাহশারে যে হাউজে কাউছার থাকবে রাসুলে আকরাম (সা.) এর একচ্চত্র মালিকানাধীন। সে হাউজ বা প্রসবণ ও জান্নাতের একটি অংশের অবস্থান হচ্ছে পবিত্র মদিনা শরীফে হাউজে কাওছার হচ্ছে জান্নাতের সুপেয় একটি ঝর্ণা। যার ¯্রােতধারা থাকবে অনন্তকাল সদা প্রবাহমান। মদিনা শরীফের রয়েছে আরও অসংখ্য ফজিলত। মক্কা শরীফকে যেভাবে হেরম শরীফ বলা হয়েছে, তদ্রুপ মদিনা শরীফকেও হেরম শরীফ বলা হয়েছে। বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’ এর মধ্যে একটি অধ্যায়ের নাম রয়েছে বা-বু হারামীল মাদিনাতি। এ অধ্যায়ের মধ্যে ‘ছিহাহ ছিত্তাহ’ থেকে পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারার মর্যাদা বিষয়ক অনেক হাদিস সংকলিত হয়েছে এবং বুখারি, মুসলিম শরীফেও রয়েছে ঐ বিষয়ক অনেক হাদিস তা থেকে ক্রমান্বয়ে কিছু হাদিস উল্লেখ করছি।
ইমাম মালিক, শাফেয়ী ও আহমদের মতে মক্কার হেরম শরীফের এরিয়ায় যেভাবে যুদ্ধ করা, শিকার করা এবং গাছকাটা নিষিদ্ধ, অনুরূপভাবে মদিনার হেরমের বেলায়ও। ইমাম আবু হানিফার মতে মদিনার হেরম ও সম্মানিত, যুদ্ধ বিগ্রহ তাতে হারাম, তবে শিকার করা মাকরূহ। হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন কুরআন শরীফ এবং এ কাগজে যাহা লিখা রয়েছে তাহা ব্যতিত আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) হতে আর কিছু লিখে রাখি নাই। তিনি (আলী) বলেন এ কাগজে লিখা আছে রাসুলে আকরাম (সা.) বলেছেনÑ ‘আইর’ (মদিনার সীমান্ত পর্বত) হতে ‘সউর’ (মক্কার পর্বত) পর্যন্ত এর মধ্যবর্তি স্থান হচ্ছে মদিনার হেরম শরীফ। যে উহার মধ্যে কোনো খারাপ প্রথা সৃষ্টি করবে অথবা কোনো অসৎ প্রথা সৃষ্টিকারীকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহর ফিরিস্তাগণের এবং সকল মানুষের অভিশাপ। তার কোনো ফরজ কিংবা নফল ইবাদতি কবুল করা হবে না। (বুখারি)
মদিনা যে, হেরম শরীফ, তা অনেক হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যেমনÑহযরত আবু সাইদ খুদরী (রা:) হতে বর্ণিত, রাসুলে করীম (সা:) বলেছেন, হযরত ইব্রাহিম (আ.) মক্কাকে সম্মানিত করে হারাম (হরম শরীফ ঘোষণা) করেছেন, আর আমি মদিনাকে উহার দু-সীমানার মধ্যবর্তি স্থলকে যথাযোগ্য সম্মানে সম্মানিত করলাম (হেরম ঘোষণা)। উহাতে রক্তপাত করা যাবে না। যুদ্ধের অস্ত্র বহন করে নেওয়া যাবে না এবং পশুর খাদ্য ব্যতিত বৃক্ষের পাতা ঝরানো যাবে না। (মুসলিম)
সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনÑরাসুল (সা.) বলেছেন যে, আমি এমন একটি বস্তিতে হিজরতের জন্য আদিষ্ট হলাম, যে বস্তি অন্য সকল বস্তিকে গ্রাস করিবে। লোকেরা উহাকে ইয়াসরীব বলে। উহা হচ্ছে মদিনা। উহা মানুষকে খাটি করে, যেভাবে (কর্মকারের) হাপর খাদ ময়লা ঝাড়িয়া লোহাকে খাটি করে। (বুখারি)
এ হাদিসের তাৎপর্য হচ্ছে দুনিয়ার সমস্ত এলাকা মদিনার কাছে পরাভূত হবে। কেহ মদিনাকে পরাভূত করতে পারবে না। ইতিহাস সাক্ষ্য, রোম ও পারস্য সাম্রাজ্য পৃথিবীর দু’টি অপ্রতিদ্বন্দ্বি রাষ্ট্র ছিলো কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তাহা মদিনার করতলে এসেছিলো। খোলাফায়ে রাশেদার যুগ শেষ হবার আগেই প্রায় সাড়ে বারো লক্ষ বর্গমাইল এলাকা মদিনার শাসনাধীনে এসেছিলো। ইসলামী সভ্যতার সূচনা হয়েছিলো পবিত্র মদিনা হতে। সব কিছুর প্রাণকেন্দ্র ছিলো এ সম্মানিত নগরী। হজরত জাবের বিন সামুরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আমি রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন- মহান আল্লাহ তা’আলা মদিনা শরীফের নাম রেখেছেন ত্বা-বা, (মানে পবিত্র)। মহান রাব্বে করিম যে ভূমির নাম রেখেছেন ত্বা-বা, বা পবিত্র, সে ভূমির মর্যাদা কতোটুকু হতে পারে, তা-কি আর বিস্তারিত বলার অপেক্ষা রাখে! এজন্যই আয়ীম্মাহগণের জীবনী তালাশ করলে দেখা যায় যে, ঐ সমস্ত বুজুর্গ ব্যক্তিবর্গ মদিনা শরীফে অবস্থানকালে খুব অল্পই পানাহার করতেন। যাহাতে কোনো হাজতের প্রয়োজন না হয়। হাজতের বেগ অনুভূত হলে পবিত্র মদিনার হেরমের বাহিরে গিয়ে সেরে আসতেন। হজরত আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে আকরাম (সা.) বলেছেনÑ যে ব্যক্তি মদিনাতে থাকিয়া মরিতে সামর্থ্য রাখে, সে যেন মদিনাতেই মারা যায়। কেননা যে ব্যক্তি তথায় মারা যাবে, আমি তার জন্য সুপারিশকারী হবো। (তিরমিযী)
তবে এটা মনে রাখা উচিত যে, মক্কা শরীফের ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও ফজিলত রয়েছে। এ দু’টি নগরীর প্রতি মহব্বত রাখা এবং তথায় অবস্থান করার আকাক্সক্ষা অন্তরে পোষণ করা ও ছাওয়াবের কাজ। খাত্তাব পরিবারের জনৈক সাহাবী (হাদিসে উনার নাম উল্লেখ করা হয়নি) নবী করিম (সা.) হতে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কেবল আসরে যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদিনায় এসে আমার যিয়ারত করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য সাক্ষী এবং সুপারিশকারী হবো। আর যে, ব্যক্তি এই দুটু হেরম শরীফের কোনো একটি মৃত্যুবরণ করবে, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তা’আলা তাকে নিরাপত্তা ও বিপদ মুক্তদের অন্তর্ভুক্ত করে ওঠাবেন। (মিশকাত)
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের পূর্বক্ষণে ইসলামী জনপদ সমূহের মধ্যে সর্বশেষ ধ্বংস হবে মদিনা মুনাওয়ারা। (তিরমিযি)
নবী করিম (সা.) এর শরীর মোবারক তথায় বিদ্যমান থাকায় কোনো শক্তিই পবিত্র মদিনা ভূমিকে ধ্বংস করতে পারবে না। অবশ্য পরে মহান আল্লাহ তা’আলার হুকুমে এ নগরী ধ্বংস হবে। হযরত আবী বাকরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেনÑ মদিনায় কানা দাজ্জালের প্রভাব বা ভীতি কখনও পৌঁছাবে না। সে সময় মদিনার সাতটি দরজা হবে, এবং প্রত্যেক দ্বারেই দু’জন করে ফিরিস্তা থাকবে। (বুখারি)
হযরত সাদ বিন আবী ওয়াক্কাছ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসুল (সা.) বলেছেন, যে কেহ মদিনাবাসীদের ব্যাপারে প্রতারণা বা দুরভিসন্ধি করিবে, সে ঐ ভাবে গলিয়া যাবে, যেভাবে লবন পানিতে গলে যায়। (বুখারি)
মদিনা শরীফের ফজিলত অসংখ্য, মহান আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসুল (সা.) পবিত্র মদিনা শরীফের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি করেছেন। হাদিস শরীফে ও সাহাবাদের বিভিন্ন বর্ণনায় এ নগরীর ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণনা করেন যে, নবীয়ে আকরাম (সা.) মদিনার জন্য এভাবে দোয়া করেছেন যে, হে আল্লাহ মদিনাকে আমাদের কাছে প্রিয় কর, যেভাবে আমরা মক্কাকে ভালোবাসি। কিংবা করো তার চেয়েও আরো প্রিয়। হে আল্লাহ এ নগরীকে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী করে দাও এবং এর সা’ ও মুদকে আমাদের জন্য কল্যাণকর করো এবং এর জ্বর ব্যধিকে ‘জুহফায়’ নির্বাসিত করো। প্রিয় রাসুল (সা.) এবং দোয়ার ফসলই বর্তমান মদিনা শরীফ। হাদিস শরীফ দ্বারা তাও প্রমাণিত আছে যে, যদি কোনো লোক মদিনা শরীফ থেকে বসবাসের জন্য অন্য কোন শহরে চলে যায়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার চেয়ে অন্য একজন ভালো লোকরক মদিনায় বসতি গড়ার সুযোগ করে দেন।
অবশেষে বলা যায় মদিনার মাটি ও মানুষ পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম। ওরা অতিথি পরায়ণ, কোমল হৃদয়ের অধিকারী। ভ্রাতৃত্ববোধে তাদের অন্তর ভরপুর। উদারতা তাদের চির সাথী। এসকল বৈশিষ্ট্যাবলি আমার প্রিয় রাসূর (সা.) ওসিলায়। মহান আল্লাহপাক সকলকে মক্কা ও মদিনা যিয়ারতের তাউফিক দান করুন। আমীন

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  •   সুস্থতা আল্লাহ তা’আলার মহান নেয়ামত
  • মুমিনের মেরাজ
  • যে আমলে মিলবে জান্নাতের ফল লাভ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • মুসলমানদের পারস্পরিক সর্ম্পক ভ্রাতৃত্বের
  • মসনবি শরিফের একটি ঘটনা
  • ইসলামে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব
  • বাইতুল্লাহর সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর বন্ধন
  • তাফসিরুল কুরআন
  • আরাফাহের খুতবা : মুসলিম জাহানের অনবদ্য দিকনির্দেশনা
  • কোরবানি ও প্রাসঙ্গিক মাসাইল
  • পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারার মর্যাদা
  • তাফসিরুল কুরআন
  • সাবাহি মক্তবের আধুনিক সংস্করণ
  • মুসলিম উম্মাহর একতার নিদর্শন হজ্ব
  • তাফসিরুল কুরআন
  • ন্যায়বিচার একটি ইবাদত
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় : স্নেহ-ভালবাসা
  • মধুর ডাক
  • তাফসিরুল কুরআন
  • Developed by: Sparkle IT