ধর্ম ও জীবন

কোরবানি ও প্রাসঙ্গিক মাসাইল

মুহাম্মদ ইমদাদুল হক ফয়েজী প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৮-২০১৯ ইং ০১:৩১:৪৭ | সংবাদটি ১২৫ বার পঠিত

যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব :
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিস্কসম্পন্ন, স্থায়ী নিবাসে অবস্থানকারী প্রত্যেক ওই মুসলমান ব্যক্তি, যিনি নেসাব পরিমাণ সম্পদ তথা প্রয়োজনের অতিরিক্ত এবং ঋণ থাকলে তা পরিশোধের পর ৭.৫ (সাড়ে সাত) ভরি স্বর্ণ বা ৫২.৫ (সাড়ে বায়ান্ন) ভরি রৌপ্য কিংবা সমমূল্যমান (আনুমানিক ৫৫ হাজার টাকা বা এ পরিমাণ মূল্যের) সম্পদের অধিকারী। ওপর কুরবানি ওয়াজিব। উল্লেখ্য, নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ব্যক্তি বিশাল সম্পদশালী হলেও তার ওপর একটি পশু কুরবানি করাই আবশ্যক। তবে একাধিক পশু কুরবানি করতেও কোনো অসুবিধে নেই, বরং পরিস্থিতির আলোকে করা উত্তম।
কেউ কোরবানির মান্নত করলে তার জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়। মান্নতকারী ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হলে তাকে দু'টি পশু কোরবানি করতে হবে। একটি শরিয়ত কর্তৃক ওয়াজিব হিসেবে, অপরটি মান্নতের। অপ্রাপ্তবয়স্ক, পাগল বা মুসাফির ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হলেও তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।
কোরবানির দিনসমূহ :
জিলহজ্জ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ হচ্ছে কোরবানির দিন। সর্বোত্তম ১০ তারিখ, তারপর যথাক্রমে ১১ ও ১২ তারিখ। কেউ এ তিন দিনের যে কোনো দিন নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হলে তার জন্যও কোরবানি করা আবশ্যক।
কোন কোন পশু দিয়ে কোরবানি করা যাবে :
কোরবানির জন্য ৬টি পশু নির্দিষ্ট। যথা- গরু, মহিষ, উট, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা। এগুলো ব্যতিত অন্যান্য পশু দিয়ে কোরবানি আদায় হবে না। ছাগল ও ভেড়ার জন্য ১ বছর, গরু ও মহিষের জন্য ২ বছর এবং উটের জন্য ৫ বছর বয়স হওয়া আবশ্যক। অবশ্য, ভেড়া যদি মোটাতাজা হয়, যা দেখতে ১ বছরের মনে হয়, তবে সেটি দিয়েও জায়েয।
ত্রুটিযুক্ত পশু দিয়ে কোরবানি :
উপরোল্লিখিত কোনো পশুর কান বা দৃষ্টিশক্তি এক তৃতীয়াংশের কম নষ্ট বা কাঁটা পড়লে, তা কোরবানি দেয়া জায়েয। এক তৃতীয়াংশ বা তার বেশি হলে জায়েজ নয়। যে পশুর লেজ অর্ধেকের বেশি আছে, তা কোরবানি করতে কোনো অসুবিধে নেই। এর বিপরীত হলে জায়েয নয়। যে পশুর শিং মোটেই ওঠেনি তা কোরবানি দেয়া জায়েয। যদি শিং গোড়ায় ভেঙ্গে যায় এবং এর ক্ষতি মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছে, তবে তা দিয়ে কোরবানি আদায় হবেনা। যে পশুর দাঁত মোটেই ওঠেনি বা অর্ধেক পড়ে গেছে তা কোরবানি দেয়া যাবে না। যে পশুর জন্মগতভাবে কান নেই তা কোরবানি দেয়া যাবে না। যে পশুর জিহ্বা এ পরিমাণ কাঁটা যে, ঘাস-পাতা খেতে পারেনা, তা কুরবানি দেয়া যাবে না। যে পশু তিন পা দিয়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা রাখতে পারে কিন্তু এটি দিয়ে চলতে পারে না, তা কোরবানি দেয়া যাবে না। যে পশু, স্তন কাঁটা বা জখম হওয়ার কারণে বাচ্চাকে দুধ পান করাতে পারেনা, তা দিয়ে কুরবানি বৈধ নয়। জেনেশুনে চুরিকৃত পশু ক্রয় করা এবং তা কোরবানি করা জায়েয নয়। হিজড়া পশু কোরবানি করা জায়েয নয়। বন্ধ্যা পশু কোরবানি করা জায়েয। গর্ভবতী পশু কোরবানি করা মাকরুহ। ত্রুটিহীন পশু ক্রয় করার পর তাতে যদি এমন কোনও ত্রুটি জন্ম নেয়, যা কোরবানি শুদ্ধ হওয়ার জন্য প্রতিবন্ধক, তবে নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ব্যক্তির জন্য এরূপ পশু দিয়ে কোরবানি বৈধ নয়, দরিদ্র ব্যক্তির জন্য বৈধ।
শরিক হয়ে কোরবানি :
গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ ৭ জন শরিক হয়ে কোরবানি দেয়া যায়। অংশিদারগণ সম্পূর্ণ পশু অংশ অনুযায়ী সঠিকভাবে ওজন করে ভাগ করে নেবেন। কোনোভাবেই কম-বেশি করা যাবেনা। নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ব্যক্তি পশু ক্রয় করার পর অন্যকে শরিক করতে পারবেন। কোরবানি ওয়াজিব নয়, এমন ব্যক্তি পশু ক্রয়কালে বা পূর্বে অন্যকে শরিক করতে পারবেন বা শরিক করার ইচ্ছা নিয়ে পশু ক্রয় করে থাকলে পরবর্তীতেও শরিক করতে পারবেন। অন্যথায় পারবেন না। পশু জবাই করার পর তাতে শরিক করা বা হওয়ার কোনোও সুযোগ নেই।
সন্তান, মৃত ব্যক্তি বা অন্যের পক্ষ থেকে কোরবানি :
কোরবানি ওয়াজিব এমন ব্যক্তির অনুমতি বা বলে দেয়া ব্যতিত, তার পক্ষ থেকে অন্য কেউ কোরবানি করলে তা আদায় হবেনা। কারোও অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হলে তার পক্ষ থেকে তার অভিভাবক কোরবানি করা মুস্তাহাব। সন্তান বা তার ওপর আবশ্যক নয়। মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি দেয়া এবং কোরবানিকৃত পশুর গোশত খাওয়া জায়েয, কিন্তু মৃত ব্যক্তির ওসিয়্যতকৃত হলে সম্পূর্ণ গোশত বন্টন করে দেয়া ওয়াজিব। রাসূল সা. ও তাঁর পরিবার-পরিজন, মৃত পিতা-মাতা, ভাই-বোন বা অন্যান্যদের পক্ষ থেকে কোরবানি দেয়া মুস্তাহাব।
কোরবানির পশুকে যেভাবে রাখবেন :
কোরবানির পশুকে যতœসহকারে রাখা এবং কোরবানির পূর্বে ভালোভাবে পানাহার করানো মুস্তাহাব। কোরবানির পশু থেকে কোনোও প্রকার ফায়দা গ্রহণ মাকরুহ। এমনকি দুধ দোহনও। পশু নাপাক খাদ্য খায় বলে জানা থাকলে, কিছুদিন আবদ্ধ রেখে কোরবানি করতে হবে। অন্যথায় জায়েয হবেনা। এক্ষেত্রে উট ৪০ দিন, গরু-মহিষ ২০ দিন এবং ছাগল-ভেড়া ১০ দিন বেঁধে রাখতে হবে।
কোরবানির পশুতে আকিকা :
কুরবানির গরু, মহিষ ও উটে যেহেতু সর্বোচ্চ ৭টি অংশ রয়েছে, তাই এক বা একাধিক অংশ দিয়ে আকিকা করতে কোনোও অসুবিধে নেই।
কোরবানির পশু হারিয়ে গেলে কি করবেন :
নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ব্যক্তি কোরবানির জন্য পশু ক্রয় বা নির্দিষ্ট করার পর সেটি যদি হারিয়ে যায়, তবে আরেকটি পশু কোরবানি করতে হবে। পরে যদি আবার হারানোটা পাওয়া যায় তবে তা কোরবানি করা উত্তম, আবশ্যক নয়। দরিদ্র ব্যক্তি পশু ক্রয় বা নির্দিষ্ট করার পর সেটি যদি হারিয়ে যায়, তবে আরেকটি কোরবানি করা আবশ্যক নয়।
কোরবানি আদায় না করে থাকলে করণীয় :
কোরবানি ওয়াজিব এমন ব্যক্তি পশু ক্রয় করার পর কোনো কারণবশত কুরবানি করতে না পারলে ক্রয়কৃত পশু যে কোনো দরিদ্র ব্যক্তিকে সদকা করে দেবেন। কোরবানি ওয়াজিব এমন ব্যক্তি কোরবানি না করে থাকলে তার জন্য একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব।
জবাই সংক্রান্ত মাসাইল :
মুসলিম ব্যক্তি 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলে পশু জবাই করবেন। জবাইকারী অমুসলিম হলে কুরবানি আদায় হবেনা এবং গোশত খাওয়া জায়েয হবেনা। যে স্থানে জবাই করা হবে, সেখানে পশুকে কিবলার দিকে মুখ করে সহজভাবে শোয়ানো ও তাড়াতাড়ি জবাই করা মুস্তাহাব। জবাইকারী কিবলার দিকে চেহারা করে জবাই করা মুস্তাহাব। পশু কোরবানি করার পর জীবিত বাচ্চা পাওয়া গেলে কুরবানির দিনসমূহের মধ্যে তা কুরবানি করে দিতে হবে। বাচ্চার গোশত খাওয়া জায়েয। ধারালো ছুরি-চাকু দিয়ে জবাই করা মুস্তাহাব। এর বিপরীত মাকরুহ। এক পশুর সামনে আরেক পশু জবাই করা মাকরুহ। জবাই করার পর অঙ্গ-প্রতঙ্গের নাড়াচাড়া পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পূর্বে কাঁটা-ছেঁড়া করা মাকরুহ।
কোরবানিদাতার জন্য মুস্তাহাব কাজ সমূহ :
কোরবানিদাতা ব্যক্তি জিলহজ্জ মাসের চাঁদ ওঠার পর থেকে কোরবানি করার পূর্ব পর্যন্ত চুল, গোঁফ, নখ ইত্যাদি না কেঁটে কোরবানি করার পর কাঁটা মুস্তাহাব। চল্লিশ দিন বা বেশি হলে এরূপ করবেন না। ঈদের দিন কিছু না খেয়ে কোরবানির গোশত দিয়ে খাওয়া শুরু করবেন। কোরবানিদাতা নিজ হাতে জবাই করবেন। সম্ভব না হলে জবাইকালে সামনে থাকবেন। পশু জবাই করা, গোশত কাঁটা, চামড়া ছাড়ানো ইত্যাদি কোনোও কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির পশুর গোশত, হাড্ডি, চামড়া তথা পশুর কোনোকিছু দেয়া জায়েয নয়। টাকা বা অন্য কোনোকিছু দিয়ে পারিশ্রমিক দেবেন। কোরবানিদাতার জন্য কোরবানি পশুর চামড়া ব্যতিত গোশত, হাড্ডি ইত্যাদি কোনোকিছুই বিক্রি করা জায়েয নয়।
গোশত বন্টন পদ্ধতি :
কোরবানির গোশত বন্টনের মুস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে- আহার যোগ্য সবকিছু তিনভাগ করে একভাগ নিজের জন্য রাখবেন, একভাগ পাড়া-পড়শী, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বন্টন করবেন এবং একভাগ দরিদ্রদের দেবেন।
চামড়া কি করবেন :
কোরবানিদাতা ইচ্ছা করলে চামড়া নিজের কোনো কাজে ব্যবহার করতে পারবেন বা অন্য যে কাউকে দান বা হাদিয়া করতে পারবেন। চামড়া বিক্রি করে দিলে তা দরিদ্রের অধিকার হয়ে যায়। তাই এর বিনিময় মূল্য, অবশ্যই নিঃস্ব-অসহায়, দরিদ্র-মিসকিন তথা (এক বা একাধিক) হকদারকে দিয়ে দিতে হবে। লিল্লাহ বোর্ডিং, এতিমখানায়ও দেয়া যাবে। মসজিদ, মাদরাসা, মক্তব ইত্যাদি ধর্মীয় বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান, জনসেবামূলক কাজ, কোনোকিছুর পারিশ্রমিক বা ঋণ পরিশোধ কাজে ব্যবহার করা বা দেয়া জায়েজ নয়। পশুর শরীর থেকে সম্পূর্ণ চামড়া ছাড়ানোর পূর্বে চামড়া বিক্রি করা জায়েয নয়। কোনকিছুর পারিশ্রমিক হিসেবে চামড়া বা তার মূল্য দেয়া জায়েয নয়।

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  •   সুস্থতা আল্লাহ তা’আলার মহান নেয়ামত
  • মুমিনের মেরাজ
  • যে আমলে মিলবে জান্নাতের ফল লাভ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • মুসলমানদের পারস্পরিক সর্ম্পক ভ্রাতৃত্বের
  • মসনবি শরিফের একটি ঘটনা
  • ইসলামে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব
  • বাইতুল্লাহর সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর বন্ধন
  • তাফসিরুল কুরআন
  • আরাফাহের খুতবা : মুসলিম জাহানের অনবদ্য দিকনির্দেশনা
  • কোরবানি ও প্রাসঙ্গিক মাসাইল
  • পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারার মর্যাদা
  • তাফসিরুল কুরআন
  • সাবাহি মক্তবের আধুনিক সংস্করণ
  • মুসলিম উম্মাহর একতার নিদর্শন হজ্ব
  • তাফসিরুল কুরআন
  • ন্যায়বিচার একটি ইবাদত
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় : স্নেহ-ভালবাসা
  • মধুর ডাক
  • তাফসিরুল কুরআন
  • Developed by: Sparkle IT