উপ সম্পাদকীয়

ডা: বিধান রায় থেকে ডা: বি. চৌধুরী

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৮-২০১৯ ইং ০০:৪৩:০২ | সংবাদটি ১১৪ বার পঠিত

আমাদের গ্রাম অঞ্চলে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, জ্বর, বিশেষ করে ম্যালেরিয়া জ্বরে কেউ আক্রান্ত হলে সিদল শুটকির পাতলা ঝোল খেলে ম্যালেরিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কাছে বা আধুনিক সমাজের মানুষজনের কাছে তা হাস্যকর বিষয় বলেই বিবেচিত হবার কথা। তবে আমাদের দিরাই তথা আমার গ্রাম শ্যামারচর এর মুরুব্বীদের মুখেই ছোটবেলায় এই সিদল-ঝোল খাওয়ার একটা ইতিহাস শুনেছিলাম।
ইতিহাসটা হলো-বানিয়াচং একটি বিশাল গ্রাম। এশিয়ার মধ্যে নাকি সবচেয়ে বড় গ্রাম। ঐ গ্রামে চৌকিদারের সংখ্যাই নাকি ছয় কুড়ি। এরপর গ্রামের জনসংখ্যা তো সহজেই অনুমেয়। একবার নাকি সে গ্রামে মহামারী আকারে ম্যালেরিয়া জ্বর মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রতিটি বাড়ীর প্রতিটি মানুষই নাকি ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত। কে কাকে ঔষধ-পত্র খাওয়াবে? এমনি অবস্থায় মানুষ প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। কোন উপায় না পেয়ে যাওয়া হলো কলিকাতায়। ডাক্তার বিধান রায়ের কাছে। সব কথা শুনে মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে ডাক্তার বিধান রায় এলেন। ঘুরে দেখলেন সারা গ্রাম। তিনি দেখলেন এই ম্যালেরিয়া রোগ-ব্যাধিটি শুধুই ব্যক্তি বা পারিবারিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রইলো না। সামাজিক-ব্যাধির আকার ধারণ করলো। ঔষধ দেবেন তিনি কাকে? কে কাকে ঔষধ খাওয়াবে? সবাইতো শয্যাশায়ী। মানুষের মনে দারুন উৎকণ্ঠা। কি চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র দেবেন বিধান রায় সে নিয়ে সবাই ভীষণ চিন্তিত। শেষ ভরসা বিধান রায়। কিন্তু না। কোন দাওয়াই বা ঔষধই দিলেন না ডাক্তার বাবু। তাহলে উপায়?
চরম হতাশায় নিমগ্ন বানিয়াচংয়ের ম্যালেরিয়া ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষজন। বড়ো আশা ছিল, ভরসা ছিল বিশ্বখ্যাত ডাক্তার বিধান রায়ের ওপর। শেষ পর্যন্ত নিরাশ করেননি ডাক্তার বাবু। যাবার আগে সবাইকে ডেকে পরামর্শ দিয়ে গেলেন। বলেন, অন্য ঔষধ লাগবে না। সবাই সিদল শুটকির পাতলা ঝোল খাবেন। এতেই ম্যালেরিয়া রোগ নির্মূল হবে।’ শুনেছি হয়েছিলও তাই। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এ ধরনের আঞ্চলিক ইতিহাসের সত্য মিথ্যা আমার জানা নেই তবে এলাকার মানুষজন সিদল শুটকির ঝোলের প্রতি আজও বিশ্বাস হারাননি। কারো ম্যালেরিয়া হলে সিদলের পরামর্শ এখনও শুনা যায়।
এতো গেলো এক শারীরিক রোগ-ব্যাধির কথা। মানুষের মন কী সব সময় রোগ মুক্ত থাকে? থাকে না। মনের রোগে আক্রান্ত মানুষ আর মানুষ থাকে না। পশু শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়। কখনো কখনো পশুকেও হার মানায়। আর এই মনের রোগ তথা মানসিক রোগীর সংখ্যা যদি সমাজে বৃদ্ধি পায় এবং বৃদ্ধি পেতে পেতে মহামারী অর্থাৎ সেটি সংক্রামক ব্যাধির আকার ধারন করে তখন সেই সমাজ থেকে মানবিক নীতি-নৈতিকতা-প্রেম-প্রীতি-শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-সভ্যতা-ভব্যতা নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। সমাজের শৃঙ্খলাবোধ প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
দেশ-সমাজ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পাহাড়সম উন্নয়ন মানুষের কাছে অর্থহীন বলে প্রতীয়মান হয়। আজকে এই বাংলাদেশে এই রোগটি হলো ধর্ষণ-ব্যাধি। পৃথিবীর কোন দেশের কোন সমাজই এ রোগ থেকে মুক্ত নয় কিন্তু মহামারী রূপে এর বিস্তার লাভ করলেই সেই সমাজ পৃথিবীর বুকে নিন্ধিত সমাজ রূপে পরিচিত লাভ করে। এমন সমাজতো কারো কাম্য নয়। কিন্তু কিছু কিছু কামুক-কুলাঙ্গার পশুর দল কর্তৃক বাংলার ঐতিহ্যবাহী সমাজ আজ ধর্ষণরোগে আক্রান্ত। এ যেন এক সংক্রামক ব্যাধি। মহামারী। সাম্প্রতিক সময়ের ঘটে যাওয়া ঘটনার ঘটনাবলীরই এর প্রমাণ। আর সে লজ্জা-ঘৃণা-দুঃখের ঘটনাগুলোর খানিক অংশ দেশের পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে মানুষ জানতে পেরেছেন। এসব দুঃখজনক নিন্দিত ঘটনা এক সময় ঘটাতো এক সময় সমারেজ বখাটে ছেলেরা। আর আজ বখাটেদের স্থান দখল করেছেন সমাজের হুমরাচোমড়া শিক্ষক অধ্যাপক কখনো কখনো অধ্যক্ষ পদবীর কেউ কেউ। যেমন-‘প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার, পাবনায় অধ্যক্ষসহ চার জেলায় ৪ ধর্ষক গ্রেফতার। (ভোরের কাগজ ১৪.০৭.২০১৯।
নৈশ প্রহরী মোস্তফার সাক্ষ্য, অধ্যক্ষের যৌন হয়রানির আরো ঘটনা দেখেছি, ‘সিদিরগঞ্জের পর ফতুল্লা ১২ শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেফতার (কালের কণ্ঠ ৫.৭.২০১৯)।
‘মাদ্রাসা অধ্যক্ষের একি কুকর্ম, ১২ ছাত্রীকে ধর্ষণ করে র‌্যাবের কব্জায় (ভোরের কাগজ ৫.৭.২০১৯), ‘দুই পুলিশ সদস্যকে পেটাল ধর্ষণ মামলার আসামী ছাত্রলীগ নেতা, শ্লীলতাহানীর অভিযোগে আ’লীগ নেতার কারাদন্ড, কুষ্টিয়ায় ছাত্রীদের যৌন নির্যাতন শিক্ষক বরখাস্ত বিভিন্নস্থানে গ্রেফতার ৬ (দেশ রূপান্তর ১৪.৭.২০১৯)।
‘জ্বিন ছাড়ানোর ঝাড়ফুঁকের’ নামে নারীদের ধর্ষণ করতেন ইমাম’। (সিলেটের ডাক ২৩.৭.২০১৯)
‘যৌন হয়রানির অভিযোগে মাদ্রাসার বড় হুজুর’ আটক (সিলেটের ডাক ২৮.০৭.২০১৯), ‘মন্ত্রীর ছেলে পরিচয়ে হুইপের মেয়েকে উত্ত্যক্ত, গ্রেফতার আরবি শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ (ভোরের কাগজ ২৬.৭.২০১৯)।
সম্মানীত শ্রদ্ধেয় পাঠক পাঠিকা মহোদয়গণ, এবারের ভোরের কাগজের ২৮.৭.২০১৯ এর শিরোনামটি আপনাদের সমীপে উপস্থাপন করতে গিয়ে নিজের বাকরুদ্ধ হবার উপক্রম এবং বার বার থেমে যায় হাতের কলম, কালো কালিও লজ্জা-ঘৃণায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। তারপরও পশুরও অধম পিতা-মাতার কুৎসিত জঘন্য চেহারা আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরতেই হয় পৃথিবীর বুকে বিরল এ ঘটনাকে। সেটা এ রকম-‘চার ছাত্রীকে যৌন হয়রানি ফতুল্লায় বড় হুজুর আটক, মায়ের সহায়তায় মেয়েকে ধর্ষণে অভিযুক্ত বাবা গ্রেফতার, চাপাইনবাবগঞ্জে ৬ বছরের শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টা ৬০ বছরের বৃদ্ধের, কুলাউড়ায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিপীড়ন মামলা, নোয়াখালীতে কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষণে পিয়ন আটক, বগুড়ায় ২ ধর্ষক আটক’ (ভোরের কাগজ ২৮.৭.২০১৯)।
ধর্ষণ শব্দটি আজ বাংলার আকাশে বাতাসে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। প্রতিটি ঘর প্রতিটি পরিবার ধর্ষণ আতঙ্কে দিশেহারা। তারপরও মানুষ হতাশ নন। সমাজের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষজন প্রতিবাদমুখর। জেলায় জেলায় মানববন্ধন। ব্যানার হাতে প্রতিবাদী সর্বস্তরের জনগণ। এই সমাজের একজন সদস্য হিসেবে আমার হাতে ওতো একটি ব্যানার থাকার কথা। ভাবছি কি লিখবো ব্যানারে। ‘মায়ের সহায়তায় মেয়েকে ধর্ষণে অভিযুক্ত বাবা গ্রেফতার’ এর বিচার চাই’ তা কি লিখা যায়? এতে করে কি বিশ্ববাসী আমাদের আজকের সামাজিক চিত্রটি দেখে ঘৃণায় থুথু ফেলবে না? বাংলার সামাজিক চিত্রটি কি এমন ছিল? ছিল না। সমাজের রূপ নিয়ে ছিল আমাদের গর্ব। আমাদের সুস্থ সমাজকে যারা অসুস্থ করতে, সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত করতে উদ্যত তাদেরকে রুখে দেবার সময় কি এখনো আসেনি? দেখে শুনে মনে হয় এখনো আসেনি সময়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতা-‘কেউ কথা রাখেনি’ এর কথা মনে পড়ে যায়। প্রেমিক-প্রেমিকার মনের আবেগ বহনকারী কবিতাটি যেন আজ সামাজিক বাস্তবতার ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। যেমন দেশজুড়ে সাড়া জাগানো নুসরাত হত্যাকান্ডের পর এদেশের মানুষ আশ্বস্থ হয়েছিলেন এমন একটি খবর শুনে যে, আসামী পক্ষের আইজনীবী হিসেবে কেউ কাজ করবেন না। ঘোষণাই দিয়েছিলেন সমাজ সচেতন দেশের বিজ্ঞ আইনজীবীগণ। কিন্তু আজ কি কেউ কথা রেখেছেন? কেউ কথা রাখেনি। বাস্তবতা হলো আসামী আইনজীবী রয়েছেন ১৬ জন এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আছেন মাত্র হারাধনের নীলমনি মাত্র একজন।
তারপরও জীবন থেমে নেই। আশায় বুক বেঁধে পৃথিবীর দেশে দেশে এগিয়ে চলছে রাষ্ট্রীক-সামাজিক জীবন। ধর্ষণরোগে আক্রান্ত পশুর দল খানিকটা হলেও ভয়ে ভয়ে পা ফেলছে। ইন্ধনদাতারা একেবারেই নিশ্চিত নয়। তারা জেনে গেছে এ প্রসঙ্গে নতুন বার্তা। যেমন-‘ভারতে নতুন আইনে শিশু যৌন নিপীড়নে সাজা মৃত্যুদন্ড’। এতো গেলো ভারতের খবর। বাংলাদেশেও সমাজ-রাষ্ট্র নীরবতা পালন করছে না। ‘ধর্ষণ ও হত্যার বিচার ৬ মাসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ হাইকোর্টের। দেশের প্রতিটি স্কুলে অভিযোগ বাক্স খোলার পরামর্শ হাইকোর্টের। আইনমন্ত্রী বলেছেন, ধর্ষকরা যেন উচ্চ আদালতে জামিন না পায়। শুরু করেছিলাম ভারতীয় ডাক্তার বিধান রায়ের ম্যালেরিয়া নির্মূলে সিদল শুটকি দিয়ে শেষ করতে চাই আমাদের প্রখ্যাত ডাক্তার বি. চৌধুরীর ধর্ষণব্যাধি নির্মূলের সুচিন্তিত পরামর্শ দিয়ে। বানিয়াচং-এর ম্যালেরিয়ার মতো আজ বাংলাদেশে ধর্ষণ মহামারীর আকার ধারণ করেছে। সমাজ এমন ঔষধ চায় যে ঔষধ বিধান রায়ের ঔষধের মতো কার্যকর হয়। সে ঔষধের কথা মানুষ যুগ যুগ ধরে মনে রাখে। বিধান রায়ের ঔষধকে যেন ম্যালেরিয়ার মশার দল ভয় পায় তেমনি বি. চৌধুরীর ধর্ষক নামক মশকের গোষ্ঠী যেন ভয় পায়।
ধর্ষণরোগ নির্মূলে পরামর্শ কী? ডা: একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বাংলাদেশে ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে আমৃত্যু কারাদন্ড করার পরামর্শ দিয়েছেন। ধর্ষণব্যাধি নিয়ে ডাক্তার সাহেরেব আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, আমরা ধর্ষিতার ছবি দেখতে চাই না, ধর্ষকের ছবি বড় বড় করে ছাপাতে হবে।’ খুবই সত্যি কথা। ধর্ষিতার ছবি ছাপানোর মধ্য দিয়ে ধর্ষিতাসহ তার সমগ্র পরিবারকে এক ধরনের ধর্ষণের মানসিক যন্ত্রণায় ফেলে দেয়া। ডা: বি. চৌধুরী ধর্ষণের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পরামর্শ দিয়েছেন। আমরাও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এ ধরনের আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু সাথে সাথে প্রশ্ন এসে যায়-এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন কে বা কারা? আমরা বলি যতদিন পর্যন্ত দেশের সব রাজনৈতিক দল (সরকারী দল সহ) এর নেতৃবৃন্দ ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনে দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে আন্তরিকভাবে আন্দোলনে নেতৃত্ব গ্রহণ না করবেন ততদিন ধর্ষণ নামক সর্বগ্রাসী রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করা সম্ভব হবে না।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট, সাবেক রাষ্ট্রের চাকর।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • প্রয়োজন সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন
  • চোরাকারবার বন্ধে চাই কৌশল
  • জাফলং ভ্যালি বোর্ডিং স্কুল
  • একটি বর্ণনাতীত ভাষ্য
  • Developed by: Sparkle IT