উপ সম্পাদকীয়

স্বাগতম ঈদুল আযহা

এডভোকেট কয়ছর আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৮-২০১৯ ইং ০০:৪৩:৩৫ | সংবাদটি ৭১৪ বার পঠিত

পবিত্র ঈদুল আযহা, কুরবানী, হজ্জ্ব সহ অসংখ্য ফজিলতের বার্তা নিয়ে ১৪৪০ হিজরীর পবিত্র মাহে জিলহজ্ব শুভাগমন হয়েছে। চান্দ্র এ মাসটি অত্যন্ত ফজিলত ও মর্যাদার। আরবী বার মাসের মধ্যে চার মাস বিশেষ সম্মানিত। এর মধ্যে জিলহজ্ব অন্যতম। পূর্ণ মাসটিই সম্মানিত ও মর্যাদার। এর মধ্যে প্রথম দশ দিনতো অধিক বটে। সে সাথে উভয় ঈদের রাত্রির মর্যাদা ও ফজিলত অনেক অনেক অধিক। এ জিলহজ্ব মাসের মধ্যেই পবিত্র ঈদুল আযহা, কুরবানী ও হজ্জ্বের সমন্বয় ঘটাতে মাসটি উচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। এ যেন একের ভিতর অনেক।
ঈদ আরবী শব্দ। এর অর্থ খুশী, আনন্দ ও উৎসব। আরবী ঈদ পরিভাষা আউদ ক্রিয়া মূল থেকে উৎকলিত। যার অর্থ ফিরে আসা। প্রতি বৎসর আনন্দের ঢেউ নিয়ে মুসলিম বিশ্বে ফিরে আসে দু’বার ঈদ, যার একটি ঈদুল ফিতর এবং অপরটি ঈদুল আযহা নামে অভিহিত। সমাগত ঈদুল আযহা স্বাগত, আস্সালাম।
অপার আনন্দের উৎসব এ ঈদ। ধনী গরীব বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে অর্থাৎ সকল মুসলমানদের নিকট এ দিনটির তাৎপর্য গুরুত্ব অপরিসীম। সবাইকে ভালোবাসলে, সবাই মিলে এ আনন্দ উৎসবে শরিক হতে পারলে এ মর্তের জীবন যে কতো ভালো, কতো সুন্দর, কতোনা আনন্দময় সুখ শান্তির নীড় হতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ হতে পারে ঈদ উৎসব। ঈদ সবাইকে একই ময়দানে এনে দাঁড় করায় এবং সকলকে বুকে বুকে মিলিয়ে, গলায় গলায় একাকার হয়ে এক আনন্দ সৌকর্য বিমন্ডিত হৃদয় দেয়া নেয়ার অনন্যভাব জাগিয়ে তোলে।
ঈদ শুধু পার্থিব আনন্দ উৎসব নয়। কেবল পার্থিব আমোদ বা লাগামহীনতা নয়। এর সব অনুষ্ঠান শরিয়ত নিয়ন্ত্রিত এবং ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। ঈদ মানুষের আত্মিক উৎকর্ষ ও পরিচ্ছন্ন পরিতৃপ্তির সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের সোপান নির্মাণ করে। পবিত্র ঈদ উৎসবের মধ্যে রয়েছে একটি শাশ্বত ও বিশ্বমানবতার মর্মবাণী যা অপরাপর ধর্মীয় সম্প্রদায়কেও আপ্লুত না করে পারে না। সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির সেতু নির্মাণে ঈদের মর্মবাণীটি যেন আমাদের সর্বত্র প্রতিফলিত হয়। তার আদর্শে গড়ে উঠতে পারে প্রকৃত মানবতাবাদী বিশ্ব।
জিলহজ্ব মাসে ঈদুল আযহার উৎসব সকল মুসলমানদের জন্য পালনীয় ও সর্বজনীন আনন্দ উৎসব। এর ভিতরে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্যাগ ও আনন্দের সমন্বয় ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান হচ্ছে কুরবানী। হযরত ইব্রাহীম (আ:) কতেক কঠিন অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আল্লাহর খলিল (প্রিয় বন্ধু) লকব পান তার মধ্যে কুরবানী অন্যতম। আল্লাহর নির্দেশ ও সন্তুষ্টি চিত্তে আপন প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ:) মতান্তর হযরত ইসহাক (আ:) কে নিজ হাতে কুরবানী (জবাই) এর সকল প্রস্তুতি সহ যখন গলদেশে ছোরা চালান, তখনই আল্লাহ পাক সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তার কুদরতের প্রতীক একটি দুম্বা কুরবানী হলো।
পবিত্র ঈদুল আযহার দিনে আদম সন্তানের জন্য কুরবানী করার চেয়ে উত্তম আমল আর নেই। অবশ্য অবস্থার প্রেক্ষিতে পরবর্তী ৩ দিন পর্যন্ত কুরবানী করা যেতে পারে। একমাত্র মহান আল্লাহপাকের সন্তুষ্টির জন্য যে কোন ত্যাগে কুরবানীদাতা সদা প্রস্তুত, তার প্রতীক প্রমাণী আমল হিসাবে কুরবানী বা পশু জবাই করা। লোক দেখানো, নিজেকে জাহির কিংবা গোশতের জন্য কুরবানী গ্রহণযোগ্য নয়, বরং পশু হত্যার নামান্তর। কুরবানীর পশুর রক্ত মাংস, মূল্য আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে দাতার নেক নিয়ত, আন্তরিকতা, তাকওয়া বা খোদাভীরুতা আর হালাল অর্থের ব্যাপারটি। কুরবানীর দোয়াতে পড়তে হয় ‘নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মৃত্যু বিশ্ব প্রতিপালক মহান আল্লাহপাকের জন্য নিবেদিত। তাঁর কোন অংশীদার নাই। আমাকে এর নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আমি নিজে সর্বপ্রথম অনুগত্যের মস্তক অবনতকারী। (অনুবাদ) মুসলমানদের প্রত্যেকটি নেক কর্ম একমাত্র আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হওয়া আবশ্যক। কুরবানী পশুর গোশতো নিজে, আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী গরীব মিসকিনদের বিতরণ বা রান্না করে খাওয়ানোর মাধ্যমে ঈদ ও কুরবানীর প্রকৃত আনন্দ অনুভূত হয়। কুরবানীর মাধ্যমে নফসের কুপ্রবৃত্তি রোধ, দ্বীন ইসলাম অর্থাৎ শরিয়াতের আওতায় আল্লাহর পথে চলার প্রয়োজনে, দ্বীনের তরে জীবন উৎসর্গ করার এক প্রতীক মহড়াও হচ্ছে এ কুরবানীর আরেক দিক। আমরা প্রত্যেকে যেন তার যাথাযথ গুরুত্ব উপলব্ধি করে মহান আল্লাহতালার সন্তুষ্টির নিমিত্তে সঠিকভাবে কুরবানী করতে পারি। আল্লার কাছে সেই তৌফিক কামনা করি।
পবিত্র জিলহজ্জ্ব মাসেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সর্বশ্রেষ্ঠ সমাবেশ হচ্ছে পবিত্র হজ্জ্ব। এ মাসে সামর্থবান মুসলমানরা পবিত্র হজ্জ্ব পালন করেন। হজ্জ্ব শব্দের অর্থ হচ্ছে কোন কাজের নিয়ত (ইচ্ছা) বা দৃঢ় সংকল্প। ইসলামী পরিভাষায় ৮ই জিলহজ্জ্ব থেকে ১২ই জিলহজ্জ্ব পর্যন্ত মক্কার পবিত্র বায়তুল্লাহ জেয়ারত, সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ে সাই করা, আরাফাতের ময়দানে এবং মিনা মুজদালেফার প্রান্তরে অবস্থান, মিনায় শয়তানের প্রতি প্রস্তর (কক্কর) নিক্ষেপের মত কপিয় সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা নিয়ম মোতাবেক সম্পাদন করার নামই হজ্জ্ব। প্রত্যেক সামর্থবান মুসলিম নরনারী জীবনে কমপক্ষে আল্লাহর ওয়াস্তে একবার হজ্জ্ব পালন আবশ্যক (ফরজ)। মানবজাতির এবাদতের জন্য সর্বপ্রথম যে ঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয় মক্কায় (কাবা) এটি যেমন কল্যাণময় তেমনি সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়তের কেন্দ্র। এ পবিত্র ঘর নির্মাণের পর থেকেই হযরত আদম (আ:) ও তার পরবর্তী বংশধরেরা জিয়ারত ও তাওয়াফ করে আসছেন। মধ্যবর্তী সময়ে হযরত ইব্রাহীম (আ:) পুনঃনির্মাণ দ্বারা তাওয়াফ চলছে, চলবে অনন্তকাল তথা কিয়ামত পর্যন্ত। হজ্জ্বের মাধ্যমে মহান প্রভুর সান্নিধ্য, জিয়ারতের ছওয়াব, নবীদের স্মরণ, মহব্বত সৃষ্টি, নিদর্শনবাদী ইমানকে শান্তি ও জাগ্রত করে। আল্লাহ পাকের কুদরত দৃষ্ট ও স্মরণ হয়। তাকওয়া মজবুদ হয়। আশিক মাসুকের সম্পর্কও গভীর হয়। ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় সর্ব বৃহৎ মানব মানবীর মহা সমাবেশ। স্মরণ হয় মহানবী (স:) এর ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ ও শিক্ষা দিক্ষা। সৃষ্টি হয় মুসলিম ঐক্য ভ্রাতৃত্ব, যোগাযোগ, ব্যবসা বাণিজ্য সহ হৃদয়তার বন্ধন। পরকালের স্মরণ। সব কুফরী ধারণা, লোভ ত্যাগ করে আল্লাহ ও তার রসুলের পথে পরিচালিত হওয়ার দিক্ষা ও নবপ্রেরণায় উজ্জীবিত করা হজ্জ্বের অন্তনির্হিত দিক। হজ্জ্ব ঈমানী চেতনার এক অনন্য উৎস।
মাহে জিলহজ্জ্ব মহান রাব্বুল আলামীনের প্রদত্ত এক মহান নিয়ামত। পবিত্র হজ্জ্ব, কুরবানী আর ইদুল আযহার প্রাক্কালে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করি। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি হজ্জ্ব, কুরবানীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও হযরত ইব্রাহীম (আ:), হযরত ইসমাইল (আ:)কে। দরুদ আর সালাম নবী মুহাম্মদ (স:) এর প্রতি। প্রত্যেকের হজ্জ্ব কুরবানী কবুল হোক। ঈদের আনন্দ পৌঁছে যাক দ্বারে দ্বারে। গড়ে যাক ত্যাগ মহব্বত আর ঐক্যের বন্ধন। সবাইকে সমাগত ঈদুল আযহার সালাম শুভেচ্ছা, ঈদ মোবারক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • প্রয়োজন সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন
  • চোরাকারবার বন্ধে চাই কৌশল
  • জাফলং ভ্যালি বোর্ডিং স্কুল
  • একটি বর্ণনাতীত ভাষ্য
  • Developed by: Sparkle IT