উপ সম্পাদকীয়

নিরাপত্তাহীনতায় নারী

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৮-২০১৯ ইং ০০:৪৪:০৬ | সংবাদটি ৩২ বার পঠিত

মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব। এ শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেচনার জন্য। কারণ অন্য জীবের তা নেই। বিবেকের দংশন থেকে আমরা ভাল কাজ করি। বিবেক হলো প্রথম বিচারক। যার কাছে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু বর্তমানকালে আমাদের সমাজে যেসব ঘটনা ঘটছে তা দেখে সত্যিই অবাক হই, আমরা আসলে মানুষ নাকি পশু? এই ভেবে।
সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমাকে দারুণভাবে আবেগতাড়িত করে। যে শিশুকে আমরা ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হতে দেখি। যার প্রাণোচ্ছলতায় আমরা জীবনে ছন্দ খুঁজে পাই, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাই। সেই শিশুকেও যখন নরপিশাচের থাবা, আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়, তখন নিজেকে বড় অসহায় আর তুচ্ছই মনে হয়। ঢাকার ওয়ারিতে ছোট্ট ছয় বছরের শিশুকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। এই সব ঘটনা আমাদের নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনা হয়ে গেছে।
তাহলে কীভাবে আমরা সভ্য সমাজের বাসিন্দা বলে নিজেদের দাবি করি। যে সমাজে প্রতিনিয়ত শিশু, নারী নির্যাতিত হচ্ছে। এই নির্যাতনকারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছিল বখাটে, মধ্যপায়ী, লম্পট টাইপের অল্পশিক্ষিত লোকই। কিন্তু এখন আবার তাদের সাথে যোগ হয়েছে মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে পরিচিত শিক্ষক। এরা কলেজ অথবা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীটে এই নরপশুরা থাকলে কীভাবে রেহাই পাবে আমাদের কোমলমতি মেয়েরা। কাকে বিশ্বাস করবে? কার কাছে সে নিরাপদ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কিন্তু আমাদের কাছে নেই। ঘরে, যাত্রাপথে (বাসে, অটো রিকশায়), শিক্ষাঙ্গনে, এমনকি কর্মস্থলে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তারপর বিচারপ্রার্থী হয়ে থানায় গেলে পুলিশ কর্তৃক নির্যাতিত হচ্ছে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে নারী সমাজের করণীয় কী, এটাও আমার বোধগম্য নয়। শুধুই মনে হচ্ছে, আমরা আজ প্রতি মুহূর্তে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।
যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মধ্যে বিবেকবোধ জাগ্রত হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত নারীরা এই সহিংসতা থেকে মুক্তি পাবে না। যে নারীকে সম্মান দেয় না, সে কখনো সভ্য মানুষ হতে পারে না।
আমাদের এই দেশটা এক সময় পরাধীন ছিল। তারপর পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার লড়াই শুরু হয়। সেই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সৈন্য কর্তৃক নির্যাতিত হন দুই লক্ষ নারী। কিন্তু এখন তো এদেশ স্বাধীন তবে কেন আমরা নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারি না। পদে পদে লাঞ্ছিত হতে হয়, আক্রোশের শিকার হয়ে দুনিয়া থেকে পর্যন্ত আমাদের চলে যেতে হয়।
এসব বিষয় নিয়ে লিখতে আমার মোটেও ভাল লাগে না। ভাবতেও ভীষণ কষ্ট হয়। এগুলো আমাকে মানসিকভাবে অনেক দুর্বল করে দেয়। আর নিজেকে আমি মানুষ ভাবতে পারি না। তবে সবচাইতে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো শিক্ষক সমাজের অধঃপতন। অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদেরকে শিক্ষকের কাছে নিরাপদ মনে করতেন। কিন্তু এখন তারা তাদেরকে (শিক্ষকদেরকে) আর বিশ্বাস করবেন কীভাবে?
আসলে আজ সমাজের এই অবস্থার মূলে রয়েছে নৈতিক অবক্ষয়। কেউ নীতি নৈতিকতার ধার ধারে না। যে যার মতো চলতে পছন্দ করে। ভোগবাদী মানসিকতা মানুষকে নানারকম অপরাধের দিকে ধাবিত করছে। লোভ-লালসা মানুষের বিবেককে গ্রাস করে ফেলেছে। সর্বোপরি আমরা এক অন্ধকার আগামীর পথে এগিয়ে যাচ্ছি। যদি এখনই এগুলোর কারণ অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেয়া যায়, তবে হয়ত আমরা এই ভয়াবহ অন্ধকার থেকে আলোর মুখ দেখতে পারি। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), নয়টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সংবাদ ও নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। তাদের হিসেবে ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে মোট ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৬৩০টি। এগুলোর অর্ধেকের মতো ঘটনায় ভুক্তভোগীর বয়স ১৮ বা তার নিচে। আর ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার কারণে শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২১টি।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পুরুষকেও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আমি প্রথমেই বলব আইনজীবীদের কথা। তারা যেন কোনোভাবেই ধর্ষকের পক্ষে আদালতে না দাঁড়ান। পেশাগত দায়িত্ব পালনে তারা যেন সততার পরিচয় দেন। তবেই মানুষ ন্যায়বিচার পাবে। ধর্ষণের মতো গুরুত্ব অপরাধের শাস্তি অবশ্যই মৃত্যুদন্ড হবে। আমরা নারীরা এর বাস্তবায়ন দেখতে চাই প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে।
মানবাধিকার ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, সামাজিক, পারিবারিক জটিলতা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে এসব ঘটনা ঘটছে।
নারী নির্যাতন শুরু হয় পরিবার থেকে। আর এটা হয় সাধারণত যৌতুকের কারণে। আমাদের নি¤œবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তদের মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা যায়। স্বামী, শ্বশুড় বাড়ির লোকজন কর্তৃক নারী নির্যাতিত হয়ে আত্মহননের পথও অনেকে বেছে নিচ্ছে।
আমি ইতিবাচক চিন্তাধারার মানুষ। তাই আমি পরিশেষে বলতে চাই, হাতেগোনা দু’একজন বিকৃত রুচির মানুষকে দিয়ে আমরা পুরো সমাজকে বিবেচনা করব না। এখনও এই সমাজে ভালো মানুষের সংখ্যাই বেশি, যারা নারীকে যথাযথ সম্মান দেন।
তবে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের-এখনই সময় সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার, যাতে করে আর কোনো নারী নির্যাতিত না হয় এবং কোনো শিশু যেন এই কুৎসিত পরিস্থিতির শিকার না হয়।
আমি লক্ষ্য করেছি, আমরা কোনো একটা ঘটনা ঘটলেই প্রথম প্রথম খুব দৌঁড়ঝাপ করি (অর্থাৎ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ করি) এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধীকে আটকও করা হয়। কিন্তু পরক্ষণেই এর রেশ কেটে গেলে তারা সমাজে কিছু কর্তা ব্যক্তিদের দ্বারা মুক্ত হয়ে যায়। এই বিচারহীনতার ফলই তো আমরা ভোগ করছি। যদি অপরাধীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হয় তবে পরবর্তীতে কেউ এমনটা করার সাহস পাবে না। তারপর সামাজিক নিরাপত্তা দানে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে হবে। তাদের নিজেদেরকে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। মেয়েদের প্রতিও আমার অনুরোধ থাকবে তারা যেন একটু সতর্কতা অবলম্বন করে জীবন যাপনের ক্ষেত্রে। যেমন কোথাও দূরে যাবার সময় রাতের বেলার পরিবর্তে দিনে যাত্রা করা, অধিক জনবহুল জায়গায় না যাওয়া, কর্মস্থলে নারী সহকর্মীর সাথে বোঝাপড়া করে এক সাথে কাজ করা, ধর্মীয় অনুশাসনের ভিত্তিতে জীবন যাপন করা, চলাফেরা কথাবার্তায় শালীনতা বজায় রাখা, পোশাকের ক্ষেত্রে যতœবান থাকা অর্থাৎ এমন পোষাক পরা যেটা দৃষ্টিকটু নয়-এরকম কিছু বিষয় খেয়াল রেখে চললে আমরা এসব দুর্ঘটনা থেকে কিছুটা হলেও বাঁচতে পারব বলে আমার ধারণা।
সর্বোপরি নারী-পুরুষ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নারী নির্যাতন এবং শিশু নির্যাতন রোধ করে একটি সুস্থ সমাজ আমরা গঠন করতে পারি। নারীই হচ্ছে মাতা, ভগ্নি, কন্যা-তাই আসুন তাদেরকে সম্মান করি, নিজে সম্মানিত হই।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • খাদ্য নিরাপত্তায় বিকল্প চিন্তা
  • জন্মাষ্টমী ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ
  • বৃহত্তর সিলেটবাসীর একটি গৌরবগাঁথা
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • Developed by: Sparkle IT