পাঁচ মিশালী

পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার দায়িত্ব মানুষের

শেখ মো. আব্দুর রশীদ প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৮-২০১৯ ইং ০০:৪৭:২৭ | সংবাদটি ৩৪ বার পঠিত


দিনটি ছিল ২৭১৩ সালের ২০ মার্চ ভোর ৪.৩০ মিনিট মহাকাশ ভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত মহাকাশ যানটির দিকে পৃথিবীর ২ হাজার কোটি মানুষের চোখ নিবদ্ধ ছিল। গুড়–মমম..শব্দ আর ধোয়ার কুন্ডুলী ছাড়া সাধারণ চোখগুলো কিছুই দেখলো না। ৩-২-১-০ কাউন্ট ডাউন করতেই সেকেন্ডেরও কম সময়ে সৌরজগতের সবগুলো গ্রহ-নক্ষত্র বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, সূর্যকে ছাড়িয়ে মহাকাশপানে ছুটছে মহাকাশযানটি।
পৃথিবীর হাজারো মহাকাশ বিজ্ঞানী তাদের শক্তিশালী টেলিস্কোপ দ্বারা মহাকাশযানটিকে আমাদের সবচেয়ে কাছের ছায়াপথ এন্ড্রমিডা অতিক্রম করা পর্যন্ত সেকেন্ডেরও কম সময় দেখতে পেয়েছেন।
বিশ্বব্রহ্মান্ডের ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সির মধ্যেকার একটি গ্যালাক্সির একটি নক্ষত্র হচ্ছে আলফা সেঞ্চুরি। যেটি পৃথিবী থেকে চার বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। এক মিলিয়ন হচ্ছে দশ লক্ষ আর এক বিলিয়ন হচ্ছে একশ কোটি।
আলোর গতি সেকেন্ডে তিনশ হাজার বা তিন লক্ষ কিলোমিটার, এভাবে এক বছর ধরে চলতে থাকলে যে দুরত্ব হয় তা হচ্ছে এক আলোকবর্ষ।
মহাবিশ্বে বা বিশ্বব্রহ্মান্ডে বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র নিয়ে তৈরি হয় একটি গ্যালাক্সি, আর এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের একটি ক্ষুদ্র গ্রহ হচ্ছে পৃথিবী। একমাত্র এই পৃথিবীতে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে এবং এই প্রাণীজগতের শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ।
মহাকাশযানটি ৮ ঘন্টা বিশ মিনিটে পৃথিবী থেকে ৪ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে আলফা সেঞ্চুরিতে এসে পৌঁছালো।
এ যাত্রার টিম লিডার ছিলেন তাজিম তার সাথে তার বড় বোন ডা. নাদিরা নুসরাত আরও ছিলেন তাওসিফ, নাফি, রাদিয়াত ও রোহিত। উদ্দেশ্য পৃথিবী গ্রহের বাইরে মানুষের বসবাসের জায়গা খোঁজা। আলফা সেঞ্চুরিতে পৌঁছার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ রাদিয়াতকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ১০/১৫ মিনিট এদিক সেদিক খোঁজা খোঁজি করে না পেয়ে তারা বৈঠকে বসলেন কি করা যায়। পৃথিবীতে রাদিয়াতের বাবা মাকে জানানো হবে কিনা বিষয়টি, তারা ভাবতে শুরু করলেন। সিদ্ধান্ত হলো জানানো হবে তবে তার আগে মহাবিশ্বের অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্রের বিভিন্ন স্টেশনে তথ্য পাঠিয়ে দেয়া যাতে বোঝা যায় আলফা সেঞ্চুরির বাইরে কোথাও সে চলে গিয়েছে কিনা। মহা বিশ্বের সকল স্টেশনে খবর পাঠানো হল। ইতিমধ্যে আলফা সেঞ্চুরির ভ্রমণ গাইড সেখানে চলে এসেছেন। তিনি সবকিছু অবহিত হয়ে বললেন, বিভিন্ন স্টেশনে যেহেতু তথ্য পাঠানো হয়েছে অসুবিধে নেই আমরা অপেক্ষা করি নিজেরা পরিচিত হয়ে নিই।
পরিচয় পর্বে টিম লিডার তাজিম আলফা সেঞ্চুরির গাইডকে পৃথিবীতে তার দেশের অবস্থান এবং মহাবিশ্বে পৃথিবীর অবস্থান কোথায় তার একটা ধারনা দিলেন।
গাইড বললেন পৃথিবী সম্পর্কে আমরা যারা আলফা সেঞ্চুরিতে বাস করছি আমাদের কিছু ধারনা আছে। মহাবিশ্বে বা বিশ্বব্রহ্মান্ডে মানুষই শ্রেষ্ঠ জীব। কারণ মানুষ চিন্তা করতে পারে, নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারে। এই যে তোমরা এসেছো ৪ বিলিয়ন আলোকবর্ষ পথ পাড়ি দিয়ে তা আমরা পারি না। নতুন কিছু চিন্তা করা বা আবিষ্কার করার ক্ষমতা আমাদের নেই। তোমরা মানুষের মধ্যে হিংসা, স্বার্থ, লোভ-লালসা আবার মানবিকতা এসব কিছু বিষয় আছে, আমাদের মধ্যে এসব বিষয়ে কোন ধারনা নেই। এই বিষয়টা তোমাদের পৃথিবীর মানুষের খুব ভালো করে জানা ছিল যে মহাবিশ্বে বা বিশ্বব্রহ্মান্ডে মানুষের জন্যে বসবাসের উপযোগী একমাত্র পৃথিবীই। তোমাদের এই জানাকে আমলে না নিয়ে নিজেদের স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়েছো। ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূম-লীয় উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়ে পৃথিবী এখন অনেকটা তোমাদের বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। তোমরা পৃথিবীর পুরো মানবজাতি এক পরিবার। যেমনÑআমরা আলফা সেঞ্চুরিতে যারা থাকি আমরা এক পরিবার। বসবাসের সুবিধার্থে তোমরা পৃথিবীকে দেশে দেশে ভাগ করেছো। তোমরা পৃথিবীতে যে এক পরিবার বিষয়টা ভুলে গিয়ে নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের একটা মানসিকতা তোমাদের মধ্যে রয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে তোমরা তোমাদের পৃথিবীতে বিপর্যয় নিয়ে এসেছো।
দীর্ঘ সময় এক নাগাড়ে কথা বলে গাইড একটু দম নিলেন। তারপর আবার কথা বলতে শুরু করলেনÑতার আগে আরো একটা কথা বলি সেটা হচ্ছে, তোমরা আমাদের গ্রহে এসেছো বাসযোগ্য জায়গা খুঁজতে, এতে কোন লাভ নেই। কারষ প্রথমত আমাদের আলফা সেঞ্চুরিতে সবসময় দিন, আলো আর আলো। কারণ আমাদের সবদিকে নক্ষত্র। দিন রাতে কোন আবর্তন হয় না। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রথম যে প্রয়োজন সেটা আমাদের এখানে নেই। এরপর ফসল, ফল-ফলাদিও উৎপন্ন হওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই।
সর্বোপরি তোমাদের মানুষের শরীরে কোষগুলো তৈরি হয় হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, আয়রন, সোডিয়াম পটাশিয়াম এরকম অসংখ্য মৌলিক পদার্থ দিয়ে তৈরি। এই মৌলগুলো তোমাদের পৃথিবীতেও তৈরি হয় না। মানুষের শরীরের এই মৌলগুলো তোমাদের পৃথিবীর বাইরের কোন নক্ষত্রের সুপারনোভা বিস্ফোরণে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল, তারপর সেখান থেকে পৃথিবীতে এসে তোমাদের দেহে স্থান নিয়েছে। তাই আমরা জানি তোমরা মানুষ এমনি এমনি মহাবিশ্বে শ্রেষ্ঠ হওনি এর কারষও রয়েছে। তোমরা তুচ্ছ নও, তোমাদের শরীরে নক্ষত্রের অংশ রয়েছে। আমি আসলে বলতে চাচ্ছি মানুষের দেহ গঠনের এই যে মৌলিক পদার্থ তা কিন্তু আমাদের আলফা সেঞ্চুরিতেও নেই।
বিধাতা তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্বের শক্তিকে তোমরা নিজেদের পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছো। পৃথিবীতে তোমরা নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করতে যেয়ে মারণাস্ত্র তৈরি করেছো। তোমরা তৈরি করেছো পারমানবিক বা এটম বোমা, হাইড্রোজেন বোমা ইত্যাদি। ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে তোমরা পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছো। যে বোমার আঘাতে তাৎক্ষণিক মারা পড়েছিল প্রায় দুই লক্ষ মানুষ, হতাহত হয়েছিলো লক্ষ লক্ষ এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিলো শত বছর। এই বোমা বিস্ফোরণে পৃথিবীতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিলো। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে সেই বোমা বিস্ফোরণের পরে আরো হাজারো বার পরীক্ষামূলকভাবে এবং প্রদর্শনের জন্য এ বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এই পারমানবিক বোমা তোমাদের পৃথিবীর অনেক দেশেই মজুদ রয়েছে। যা পুরো পৃথিবীটাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
স্টিফেন হকিং তোমাদের পৃথিবীর বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি কিন্তু মৃত্যুর আগে পৃথিবীর ভবিষ্যত সম্পর্কে ২০১৭ সালের নভেম্বরে চীনের বেইজিংয়ে টেনসেন্ট ডব্লিউ শীর্ষ সম্মেলনে ভিডিও বার্তায় বলেছিলেনÑ৬০০ বছরের মধ্যেই পৃথিবীর অস্তিত্ব হারিয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। ৬০০ বছরে পৃথিবী এতটাই উষ্ণ হয়ে উঠবে যে পৃথিবী বদলে যাবে অগ্নিপিন্ডে। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন যে দ্রুত জন বিস্ফোরণের জন্য শক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তার জেরে বাড়বে উষ্ণায়নের মাত্রা। তার ফলে পৃথিবী গ্রহ পুরোমাত্রায় অগ্নিপিন্ডে পরিণত হয়ে আর বাসযোগ্য থাকবে না।
আজ থেকে ৭০০ বছর পূর্বে স্টিফেন হকিং সতর্ক করেছিলেন। তখনো মানুষের একটা ধারনা ছিলো যে বায়ুমন্ডলীয় উষ্ণতা কত ডিগ্রি পর্যন্ত মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। সেই ২০১১ সালের দিকে গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে, পৃথিবীর কয়েকটি স্থান কয়েক শতাব্দীর মধ্যে এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠবে যে আর বসবাসযোগ্য থাকবে না। তেল আবিব বা সাংহাই এর মত ব্যস্ত শহরগুলো হয়ে পড়বে জনশূন্য বা আফ্রিকা, চীন, ব্রাজিল, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার অনেক অংশে মানুষের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই সব অঞ্চল এত উষ্ণ আর্দ্র হয়ে উঠবে কেউই আর এয়ার কন্ডিশনের আশ্রয় ছাড়া বেঁচে থাকতে পারবে না। ২০০৩ সালে ১৪৮০০ জন মানুষ হিট-স্ট্রোকে মারা গিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যত মানুষ হারিকেন, টর্নেডো এবং বন্যায় মারা যায় তার থেকেও বেশি মানুষ তীব্র তাপ প্রবাহে মারা যায়। এই তাপ প্রবাহের তীব্রতা যত বাড়বে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাও তত বাড়বে।
উষ্ণতার ফলে মানুষের মৃত্যু কেন হয় তার কারণ সঠিকভাবে না জানলেও শরীরের উত্তাপ বেড়ে গেলে তা কমানোর জন্য রক্ত ত্বকের নীচে দিয়ে বেশি করে প্রবাহিত হয়। ফলে পেটে অন্ত্রে প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহ কমে যায়। অন্ত্রের ক্ষতিগ্রস্থ অংশ থেকে ব্যাকটেরিয়াজনিত বিষাক্ত পদার্থ নিঃসৃত হয়ে রক্তপ্রবাহের সাথে মিশে যায় এবং এটাই পরবর্তিতে অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি সাধন করে।
শুষ্ক আবহাওয়াতে ত্বক ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপ সহ্য করতে পারে। কিন্তু যদি জলবায়ুতে আর্দ্রতা থাকে তাহলে এই সহ্য ক্ষমতা কমে যায়। তখন মানুষের ত্বক ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপ সহ্য করতে পারে না। অতএব মানুষের জানা ছিল যে অবশ্যই এই ক্রমবর্ধমান উষ্ণতাকে রোধ করতে হবে।
কার্বন-ডাই-অক্সাইডের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে বলা হয় গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণতা। পৃথিবীর অবিবেচক মানুষেরা কলকারখানা চালিয়ে, গাড়ি, জাহাজ, বিমান চালিয়ে প্রতিমূহুর্তে কার্বন-ডাই-অক্সাইড তৈরী করছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বা পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে কারণ মানুষ জ্বালানি পুড়িয়ে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং তোমাদের পৃথিবীতে কার্বন-ডাই-অক্সাইডে চার ভাগের এক ভাগই তৈরি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দুঃখ হয় তোমাদের পৃথিবীর জন্য কারন পৃথিবীর কিছু মানুষের বিলাসী জীবনযাপনের মূল্য দিতে হচ্ছে বেশিরভাগ দরিদ্র রাষ্ট্রসমূহকে। পাহাড়, জঙ্গল, গাছ গাছালী কেটে তোমরা পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলেছো। কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিয়ন্ত্রণে রাখার একটা খুব সহজ উপায় আছে, সেটা হচ্ছে গাছ। গাছ বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিয়ে সেটাকে ব্যাবহার করে বাতাসে অক্সিজেন ছেড়ে দেয়। যে গাছ কার্বন-ডাই-অক্সাইড খাবার হিসেবে গ্রহণ করে এবং খাবার হজম হওয়ার পর বিক্রিয়ার মাধ্যমে অক্সিজেন পৃথিবীর বায়ু মন্ডলে ছেড়ে দেয়। বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা এত কম ছিল যে মাত্র ০.০৩৮% সেটাকে ধর্তব্যের মধ্যে নেয়ার কথাই ছিল না। কিন্তু মানুষের জ্বালানী ব্যবহার করার কারণে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ প্রায় ১৪ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্যে যে যন্ত্রপাতি তৈরি করা হয় কিংবা এ্যারোসলে থাকে যে গ্যাস তার নাম ক্লোরোফ্লোরকার্বন সংক্ষেপে সি.এফ.সি.। সি.এফ.সি এই গ্যাসটি কত বিপদজনক তোমরা জানো। গ্যাসটি প্রথমে বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে তারপর উপরে উঠে বায়ুমন্ডলে প্রতিরক্ষার যে ওজোন আস্তরন রয়েছে সেটা কুড়ে কুড়ে খেতে শুরু করে। সেটা কিভাবে? প্রাণি জগৎ ও মানুষ বাতাসের যে অক্সিজেনের নিঃশ্বাস নেয় সেই অণুটি তৈরি হয়েছে অক্সিজেনের দুটি পরমাণু দিয়ে। আর ওজোন তৈরি হয়েছে অক্সিজেনের তিনটি পরমাণু দিয়ে। পৃথিবীর মূল ওজোন স্তর বায়ুমন্ডলে ১২ থেকে ৩০ মাইল উপর। ওজোনের খুব পাতলা আস্তরনটি সারা পৃথিবীকে ঢেকে রেখেছে। সূর্যের আলোতে যে ভয়ংকর আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি রয়েছে ওজোনের এই পাতলা আস্তরনটুকু সেটা শুষে নেয়। ওজোনের এই পাতলা আস্তরণটুকু না থাকলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে পৌঁছে পৃথিবীর সর্বনাশ করে ফেলতো।
কিন্তু সেই সর্বনাশটিই ঘটেছে সি. এফ. সি. দিয়ে, পৃথিবীর বায়ু মন্ডল দিয়ে ভেসে ভেসে সি.এফ.সি. যখন ওজোন আস্তরনে পৌঁছায় তখন একটা ভয়ংকর ব্যাপার ঘটে। আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি সি. এফ. সি. কে ভেঙ্গে তার ভেতর থেকে ক্লোরিন নামের একটা গ্যাসকে মুক্ত করে দেয়। এই ক্লোরিন গ্যাস ওজোন গ্যাসে থাকা অক্সিজেনের তিনটা পরমাণুর মধ্যে একটা পরমাণুর সাথে বিক্রিয়া করে অক্সিজেনের একটা অণুকে মুক্ত করে দেয় ফলে ওজোনের আস্তরন ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। যে ওজোন আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করত, তা না থাকার কারণে পৃথিবীতে সেই রশ্মি সরাসরি চলে এসে আঘাত করতে শুরু করেছে। এক শতাংশ ওজোন কমে গেলে পৃথিবীতে দুই শতাংশ বেশি আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি এসে পৌঁছায়। এর কারণে মানুষের ত্বকে ক্যান্সার হয় পাঁচ শতাংশ বেশি এবং মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড রোগ অনেক বেশি পরিমাণে বাড়ছে, গাছগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে সহজে বড় হতে চাইছে না। পৃথিবীতে এসেছে এক ভয়াবহ দুর্যোগ। ওজোনের আস্তরণটুকু ভয়াবহভাবে কমতে শুরু করেছে সেই ২০১৮ সালেই এন্টার্কটিকার উপর ওজোনের আস্তরনটি ফুটো হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমান হয়ে গিয়েছিল। এখন তো পৃথিবীর প্রাণিজগতের অস্তিত্ব নিয়েই টান পড়েছে।
আমরা গাছ এবং অক্সিজেনের কথা বলেছিলাম। অক্সিজেন মানুষকে যেমন বাঁচিয়ে রাখে তেমনি এর একটি অংশ ওজোন স্তর তৈরি করে অতিবেগুনি রশ্মি থেকে মানুষ ও প্রাণিজগতকে রক্ষা করে। অথচ অক্সিজেনের সিংহভাগ আসে গাছ থেকে। তোমরা মানুষরা গাছ কেটে উজাড় করেছো। প্রকৃতি কিন্তু পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার জন্য এরকম নানা ধরনের প্রক্রিয়া করে রেখেছে এবং লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সেটা এই পৃথিবীতে চলে আসছে। কিন্তু পৃথিবীর মানুষ যতœ করে গড়া এই সমতাকে নষ্ট করে ফেলেছে। সাধের পৃথিবীর তাহলে কী সময় ফুরিয়ে আসছে? পৃথিবী কি তাহলে মানব শূন্য হতে যাচ্ছে? পৃথিবীর বাইরে কোথাও মানুষের জায়গা হবে না, পৃথিবীর মানুষ কল্পনায়ও সেটা ভাবেনি। একটা আশা ছিল মহাবিশ্বের কোথাও হয়তো মানুষের বসবাসের উপযোগী একটা গ্রহ বা জায়গা পাওয়া যাবে তাতো হলোনা।
তাহলে মানুষের লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তিল তিল করে গড়া, এত সুন্দর এই পৃথিবীর পরিসমাপ্তি? এই বিশাল বিশাল অট্টালিকা, নদীপথ, সড়ক পথ, বিমান পথ গবেষণাগার! বিশাল বিশাল জাহাজ বিমান সব পড়ে রইবে আর নেই শুধু মানুষ। মানবশূন্য পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে ভাবতেই ভাবনার জগতটা একটা অসহনীয় যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকে। ভাবতে ভাবতে তন্ময় হয়ে চিন্তার এক সীমাহীন অতলে হারিয়ে যায় তাজিম। আহারে এত সুন্দর একটা পৃথিবী বিধাতা দিলেন আর আমরা শেষ করে দিলাম? অনেক ক্ষণ! অনেক ক্ষণ পর হঠাৎ মোবাইলের ম্যাসেজ রিংটোন বাজতেই সম্বিত ফিরে আসে। রাদিয়াতকে ডেল্টা নক্ষত্রে পাওয়া গেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে পৌঁছে যাবে। ক্ষণিক একটা আনন্দানুভূতি সবার মধ্যে খেলে যায়।
রাদিয়াত চলে এসেছে। সবাই প্রস্তুত হও পৃথিবীতে দ্রুত যেতে হবে। পৃথিবীতে গরমের সাথে যুদ্ধ করে মরতে নয় পৃথিবীকে রক্ষায় যুদ্ধ করে মরার শপথ নিয়ে পৃথিবীর দিকে তারা যাত্রা শুরু করে।
পৃথিবীর সকল দেশের নেতৃস্থানীয়দের ম্যাসেজ পাঠানো হয় যে জরুরী বৈঠক সবাই পৃথিবীর মহাশূন্য স্টেশনে চলে আসুন। সহায়ক গ্রন্থ: বিগ ব্যাং থেকে হোমো স্যাপিয়েনস-মুহম্মদ জাফর ইকবাল, একটুখানি বিজ্ঞান-মুহম্মদ জাফর ইকবাল

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT