পাঁচ মিশালী

আমাদের পুত্তি

সমিক সহিদ জাহান প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৮-২০১৯ ইং ০০:৪৮:০২ | সংবাদটি ৪৭ বার পঠিত


আমাদের পুত্তির বয়স ৬০ বা ততোর্দ্ধ হবে। হালকা পাতলা গড়ন। মুখে হালকা পাতলা দাড়ি। মুখটা ছিল কিছুটা লম্বা ও চাপা । যার যেটা প্রয়োজন তার চাহিদা পূরণ করতেন। তার কাজ ছিল আমাদের দেখভাল করা। তখন ১৯৫৯/৬০ সাল হবে। আমরা আজিমপুর কলোনির ১১/বি বাসায় (ফ্ল্যাট)-এ থাকি। আজিমপুর কলোনির সকল সরকারি কর্মচারীদের বাসস্থান। আমার বাবাও সরকারি চাকুরীজীবী। সে কারণে আমরাও আজিমপুর কলোনীতে থাকতাম । এই কলোনীতে দুটি অংশে বিভক্ত ছিল, পরাতন বিল্ডিং ৩৮ বা ৩৯ নম্বর প্রর্যন্ত এবং এর পরেরগুলো নতুন বিল্ডিং হিসেবে পরিচিত ছিল। তখন প্রতিটি বিল্ডিংই ৩য় তলা পর্যন্ত ছিল। পুরাতন প্রতিটি বিল্ডিংয়ে ১২ টি করে ফ্ল্যাট ছিল। প্রত্যেক ফ্ল্যাটেই ছোট ছেলে মেয়েদের অভাব ছিল না। সকাল হলেই বাবা কাপড়চোপড় পড়ে অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতেন। আর পুত্তি চা-পাউরুটি ইত্যাদি নাস্তা তৈরি করে দিতেন । আমাদেরও আগপিছ করে চা পাউরুটি দেয়া হত। বাবা ৮ টার ভিতর অফিসের উদ্দেশ্যে ঘর হতে বের হয়ে যেতেন। সকাল ৯টার দিকে আমাদের দুধ ভাত দেয়া হত। বাবা অফিসে চলে যাওয়ার পর আমরা পুরা মাত্রায় স্বাধীন হয়ে যেতাম। আমাদের দেখভাল করার দায়িত্বে থাকতেন পুত্তি। তিনি আমাদের শাসনও করতেন। আমরা আড়ালে তাঁকে বুড়া মিয়া ডাকতাম। আসলে পুত্তির কি নাম ছিল? তবে বাবা তাঁকে মখা বলে ডাকতেন । তাঁর অন্য কোন নাম ছিল কিনা তা জানা নেই। আমাদের নিকট আত্মীয় যারা বাসায় বেড়াতে আসতেন তারা বলতেন মখা বেটা। তিনি প্রতিদিন বাজারে যেতেন, বাসায় প্রতিদিনের বাজার করা হত শেখ সাহেবের বাজার থেকে। বাবা বাজারের জন্য এক টাকা আটআনা (১.৫০ টাকা ) অথবা দু’টাকা দিতেন। এই টাকাতেই মাছ সবজি ও প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর বাজার নিয়া আসা হত। পুত্তি ৮:৩০ অথবা ৯ টার মধ্যে ঘর হতে বের হতেন। তারপর তিনি আজিমপুর ছাপড়া মসজিদের পাশ দিয়ে,শাহ সাহেবের বাড়ির গেটের ধার (পাশ) দিয়ে লালবাগের রাস্তা হয়ে শেখ সাহেবের বাজারে যেতেন। তিনি বাজার ব্যাগ হাতে বাসায় ফিরতেন তখন ১০:৩০ বা ১১ টা বেজে যেত। গরমের দিনে তিনি ঘামে ভিজে যেতেন। গায়ের কাপড় খুলতেন, তারপর আস্তে আস্তে ছালা হতে মাছ তরকারি ইত্যাদি একটা একটা করে বের করতেন। তিনি সকল কিছুই রান্না করতেন এবং দুপুর ও রাতে আমাদের খাবার পরিবেশন করতেন। পুত্তির বাড়ি আমাদের গ্রামেই জানতাম। পুত্তির নিত্যদিনের কাজ ছিল বাজার করা, রান্না করা এবং সবাইকে খাওয়াদাওয়া করানো। তারপরও কোন আত্মীয় স্বজন আসলে তাদের চা নাস্তা পরিবেশন করা। তখনকার দিনে আজিমপুর কলোনিতে বেশিরভাগ পরিবার রান্নার কাজে জ্বালানী কাঠ ব্যবহার করতেন। দু’একটি পরিবার কয়লা বা ভুষির চুলা ব্যবহার করতেন। রান্নাবান্নার অবসরে পুত্তি আশপাশ ফ্ল্যাটের পরিবার বা লোকজনের খোঁজখবর রাখা,তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি তাঁর কাজের অংশ হয়ে গিয়েছিল। একদিন পুত্তি নবাবগঞ্জ বাজার থেকে আসেন। তখন প্রায় সকাল ১১ টা বাজে, কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই তিনি গোসল খানায় প্রবেশ করেন। সেখানে তাঁর একটু ঢেঁকুর ওঠে। তার সাথে কিছুটা রক্ত আসে। তিনি কিছু বুঝতে পেরেছিলেন কি না জানিনা? তিনি ওঠে গিয়ে বসেন। এরপর আবার ওঠে গিয়ে হড়-হড় করে রক্তবমি করেন। শরীরের সকল রক্ত যেন দলা দলা হয়ে বেরিয়ে আসছে। তাঁকে ধরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়া হয়। বাবা অফিসে ছিলেন, কোনভাবে তাঁকে খবর দেয়া হয় - পুত্তির শরীর খুবই খারাপ। দুপুরের দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হতে একটি এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে বাবা আসেন। তখনকার দিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অনেক বড় একটি এ্যাম্বুুলেন্স গাড়ি ছিল। গাঢ় কালচে সবুজ রং এবং গাড়ির দু’পাশে লাল রং দিয়ে ক্রস চিহ্ন করা ছিল। আগেও এই গাড়িটিকে অনেকবার দেখেছি। আজিমপুর কলোনির কেউ অসুস্থ হলে এই এ্যাম্বুলেন্স গাড়িটি এসে রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেত। গাড়িটি এসেছে পুত্তিকে নিয়ে যেতে। একটি স্ট্রেচার বের করা হল। দু’জন দু’ধারে ধরে পুত্তিকে স্ট্রেচারে তুললেন। এরপর দু’জন স্ট্রেচারের দু’মাথার হাতলে ধরে গাড়িতে ওঠান। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে আস্তে আস্তে বড় রাস্তায় ওঠে। এরপর আমাদের চোখের অন্তরালে চলে যায়। সন্ধ্যার দিকে বাবা বাসায় আসেন। চেহারা অত্যন্ত মলিন। বললেন মখাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছি। এমনিতে স›ধ্যার পরিবেশ একটু থমথমে ভাবের মধ্যে থাকে। তারপর পুত্তির হাসপাতালে ভর্তি এবং বাবার চেহারায় করুণ ছাপ। সব মিলিয়ে এক স্তব্ধতা ঘরের মধ্যে বিরাজ করছিল। ঘরের মধ্যে যে বিদ্যুৎ বাতিটি জ্বলছিল মনেহলো তারও আলো কমে এসেছে। পড়তে বসার জন্য আমাদেরও কেউ কোন তাগাদা দিলনা। পরের দিন বাবা অফিস হতে বাসায় ফিরেন,হাসপাতাল গিয়েছিলেন। ডাক্তাররা চিকিৎসা করছেন বললেন, ডাক্তার বলেছে ভিতরে কিছু একটা ফেটে গিয়েছে। যে কারণে প্রচুর রক্তক্ষরণ এবং রক্তবমি হয়েছে। পুত্তি বাঁচবে কি না বা ঘরে আবার ফিরে আসবে কি না কিছুই বুঝতে পারলাম না। আরও দু’একদিন এভাবে পার হল। পরে একদিন বাবা এসে বললেন মখা নেই। নেই মানে কি,অর্থাৎ পুত্তি আর বেঁচে নেই। তিনি আর কখনো বাসায় ফিরবেন না। বাসায় আরো দু’একজন আত্মীয় এসেছিলেন। বাবা তাদের সাথে আলাপ করলেন। পুত্তিকে হাসপাতাল হতে একটি ঘোড়া গাড়ি করে আজিমপুর গোরস্তানে নিয়ে যাবেন। আজিমপুর এক নম্বর বিল্ডিং এর সামনে দিয়ে যে রাস্তাটি সোজা পশ্চিম দিকে চলে গিয়েছে সে রাস্তায় গেলেই আজিমপুর গোরস্তান। ১১/বি বাসা হতে বের হয়ে সে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম আর দেখতে লাগলাম। অপেক্ষার পালা যেন শেষ হয় না। অনেক্ষণ পর দেখলাম একটি ঘোড়া গাড়ি গোরস্তানের দিকে যাচ্ছে। ঘোড়াগাড়ির ওপরে খাটিয়াতে একটি লাশ, ওপরে চাদর দেয়া। গাড়িটির ভেতরে বাবার মত একজন বসা সাথে আরো দু’একজন। দুটি ঘোড়া গাড়িটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়িটি আমার দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। বুঝতে পারলাম গাড়িটি পুত্তিকে নিয়ে আজিমপুর গোরস্তানের দিকে যাচ্ছে।
এক-দুই বছর পরপর বাবা আমাদের গ্রামের বাড়ি নিয়ে যেতেন। আমরা ট্রেনে করে বাড়ি যেতাম। তখন ট্রেন ঢাকার ফুলবাড়িয়া স্টেশন হতে ছাড়ত। আজিমপুর হতে কখনো আমরা রিকসা দিয়ে আবার কখনো ঘোড়া গাড়ি দিয়েও আসতাম। সিলেটের ট্রেন সুরমামেল রাত ৮টার সময় স্টেশন হতে ছাড়ত। পরদিন সকাল ৮টার দিকে সিলেট এসে পৌঁছাত। সে বছর (পুত্তি মরার বছর) গ্রামের বাড়ি ভাদেশ্বর গিয়েছি। মনের আনন্দে এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে দিন কাটাচ্ছি। একদিন কেউ একজনের সাথে আমরা ভাই বোন বড় চাচার বাড়ি সিংকাপন গেলাম। বড় চাচা চাচি বয়ষ্ক মানুষ। আমাদের খুব আদর ¯েœহ করতেন। বড় চাচার বাড়ির উত্তর ধারেই আমাদের পুত্তির বাড়ি। বড় চাচার বাড়ি হতে আমরা ভাইবোন সকল পুত্তির বাড়ি গেলাম। ছোট বাড়ি। ছোট উঠান। পরিষ্কার ঝাড় দেয়া। দু’চালা ছনের ঘর। ঘরের ভিতর হতে পুত্তির স্ত্রী বেরিয়ে আসেন, হাসিখুশি চেহারা। আমাদের বসার জন্য পাটি, আধি পেতে দেন। বসার জন্য অনুরোধ করছিলেন। কয়েকটি ছেলে মেয়ে এসে আমাদের ঘিরে ধরে। লক্ষ করলাম উঠানের মাঝখানে বাঁশঝাড় ও গাছপালার ফাঁক দিয়ে রৌদ্রের আলো ছড়িয়ে পড়ছে। একটু দুরে নাসির উদ্দিন হাইস্কুল। সেখান হতে ছাত্র-ছাত্রীদের আওয়াজ ভেসে আসছিল।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT