পাঁচ মিশালী

রেলওয়ের সেবার মান

রাজু আহমেদ প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৮-২০১৯ ইং ০০:৪৮:৪৮ | সংবাদটি ২৯ বার পঠিত

আমাদের বাংলাদেশে যোগাযোগের যে কয়েকটি যানবাহন রয়েছে সে গুলোর মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে আমরা এখনো রেল পথকে বেছে নেই। কিছুটা হলেও নিরাপদ ভ্রমণের জন্যে বাংলদেশ রেলওয়ে এখনো আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের যাতায়তের জন্যে পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। দুর্ঘটনা কিছুটা হলেও এড়িয়ে যাওয়ার জন্যে দেশবাসী রেলওয়েতে যাতায়াত করে থাকেন। কেননা দেশে যে হারে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে সড়ক পথে যাতায়াতকে না বলতে পারলে আমরা যেন প্রাণে বাঁচি। রাস্তায় চলাচলকারী বাস মিনিবাস, অটোরিক্সা আর রিক্সাই বলুন না কেন, এগুলোর চালকদের কাছে যেন আমরা জিম্মি হয়ে পড়েছি। অদক্ষ অনভিজ্ঞ প্রশিক্ষণ বিহীন চালকদের দৌরাত্ম চারদিকে। আর বিশেষ করে সাধারণ পরিবহণ সাইনবোর্ড লিখে যারা অসাধারণ ভাবে নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় সেই ট্রাক নামক যন্ত্র দানবের কথা তো আর কারোরই অজানা নয়। প্রায় প্রতিদিনই স্থানীয় আর জাতীয় সংবাদপত্র বলুন সবখানেই একটা দুটো করে সড়ক দুর্ঘটনার খবর চোখে পড়ে। যে সব দুর্ঘটনা আমাদের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে সারা জীবনের কান্না নিয়ে আসছে। কেউ হারাচ্ছেন আদরের সন্তান, কেউ স্বামী, কেউ স্ত্রী, কেউ পিতামাতা আর কেউ আত্মীয় পরিজন। আমাদের অদক্ষ আর আনাড়ি চালকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেভাবে গাড়ি চালান তাদের কাছে অন্যের জীবনের কোন মূল্যই যেন থাকেনা। সঙ্গত এসব কারণেই সামান্য হলেও নিরাপদ ভ্রমণের জন্যে রেলওয়ে সবার প্রিয় যানবাহন। কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য এই রেলওয়ের বর্তমান হ-য-ব-র-ল চিত্র দেখার যেন কেউ নেই। কতকিছু হলো আলাদা মন্ত্রণালয় হলো। ভাড়া বৃদ্ধি পেল কিন্ত সেবার মান বাড়লো কই।
গন মানুষের আস্থা আর বিশ^াসের যাবাহন হিসেবে এই সুবর্ণ সুযোগটি কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ে নিতে পারতো অনায়াসে। আসলে রেলওয়ে কি তাহলে সেই সুযোগটি নিতে আগ্রহী না। বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান যে অবস্থা তাতে মনে হয় তারা দায়সারা ভাবে দায়িত্ব পালন করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করার মনোবাসনা নিয়েই এগিয়ে চলেছেন সম্মুখ পানে। এক সময় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই রেলওয়ে ডিপার্টমেন্ট ছিল। তখন শোনা যেত বছরের পর বছর রেলওয়ে লোকসান গুণছে। অথচ ট্রেনে উঠলে পরে দেখা যায় দাড়িয়ে যাওয়ার মত জায়গাটুকু নেই। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে রেলওয়েকে লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং যাত্রীদের সেবার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে যোগাযোগ মন্ত্রনালয় থেকে পৃথক করা হল। আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করে দায়িত্ব দেয়া হলো দেশের স্বনামখ্যাত একজন ব্যক্তিত্বের উপর। আমরা দেশের মানুষও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম যে আমরা নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবো। কিন্তু অতিব দুঃখের বিষয় যে, সেই সময় রেলওয়ের ভাড়া দ্বিগুন হলো। কালো বিড়ালে আক্রান্ত হলো রেলওয়ে। আপাদমস্তক কপাল পুড়লো সেই আমাদের মতো যাত্রীদের। যেখানে সেবার মান বাড়ানোর কথা সেখানে এক হোচটে সেবার মান কমলো আরো কয়েক গুন। পুরো দেশে রেলওয়ের যাত্রী সেবায় একটা হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হলো। যাই হোক সরকার সেটা থেকে উত্তরণের চেষ্টা অব্যাহত রাখলেন। আবার নতুন অভিভাবক নিয়োগ দিলেন। আবার আমরা সাধারণ যাত্রীরা আশায় বুক বাধঁলাম। কিন্তু ফলাফল সেই শূন্যই। অতি সম্প্রতি আবার বাড়ানো হয়েছে রেলওয়ের ভাড়া। সেবার মান বাড়ছে নাকি দিন দিন আরো কমছে। সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে আমাদের অভিভাবকরা আমাদের উপর ভাড়া বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ঠিকই অব্যাহত রেখেছেন। আর দেশের নতজানু জনগোষ্টি নিরব নিস্তব্ধ হয়ে সেই বাড়তি ভাড়া পরিশোধ করে যাতায়ত অব্যাহত রেখেছি। মন্তাজ মিয়া সিলেটের বাসিন্দা হলেও গত তিন দশক ধরে বসবাস করেন রাজধানী ঢাকার ইস্কাটন গার্টেন এলাকায়। স্বজন সুহৃদ আর নাড়ির টানে তাকে সপ্তাহে পনের দিনে কিংবা মাসে সিলেট ঢাকা যাতায়াত করতে হয়। রেলওয়ে তাঁর পছন্দের যানবাহন। সিলেট ঢাকা রেলপথে উপবন, জয়ন্তিকা, পারাবত পাহাড়িকা আর কালনি এক্সপ্রেস নামে যে পাঁচটি ট্রেনে যাতায়াত শুরু করেছিলেন মাত্র ৮০ টাকা ভাড়ায়। কালের পরিক্রমায় সেই ভাড়া আজ গিয়ে পৌচেছে ৩২০ টাকায়( শোভন চেয়ার)। কিন্তু তাঁর কাংখিত সেবা বাড়েনি। বাড়তি ভাড়া দিয়ে যে সেবার আশা নিয়ে তিনি ট্রেনে উঠেন। সেই প্রত্যাশিত সেবা যেন তাঁর স্বপ্নই থেকে যায়। সম্প্রতি মন্তাজ মিয়ার পাশের সীটে বসে রাজধানী থেকে নিজের শহর সিলেটে আসলাম। দীর্ঘ আট ঘন্টারও বেশি সময় ধরে জার্নি করতে গিয়ে মন্তাজ মিয়া বাংলাদেশ রেলওয়ে নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিলেন। বর্ণনায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের দুর্দশা আর লুটপাটের চিত্র। সেবার মান আর ভাড়া বৃদ্ধি প্রবণতা নিয়ে নানা খুটিনাটি। যার সবই হতাশা আর দুর্দশার। অথচ তখনও রেলওয়ের সীট কানায় কানায় ভর্তি ছিল যাত্রীদের পদভারে। আবার আমাদের আশে পাশে স্টেন্ডবাই টিকেট নিয়ে অসংখ্য যাত্রী দাঁড়িয়েও ছিলেন গন্তব্যে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। অথচ এই রেলওয়ে নাকি লোকসান গুণে বছরের পর বছর। শুধুমাত্র দুর্নীতি অনিয়ম আর লুটপাটের কারনে বাংলাদেশ রেলওয়ের আজ এই পরিণতি। তাহলে এই পরিবহণে সেবার মান বাড়বে কি করে। এমন এক অদ্ভুত দেশের বাসিন্দা আমরা। আমাদের এসব দুর্দশা দেখার যেন কেউ নেই।
লেখক : সিলেট প্রতিনিধি বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT