বিশেষ সংখ্যা

কুরবানি ও কয়েকটি মাসআলা

আবদুল্লাহ আল মনসুর প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৮-২০১৯ ইং ০১:২৩:৫২ | সংবাদটি ৪৪১ বার পঠিত

কারো নামে কি কুরবানি দেয়া যায়?
সাধারণত বলা হয় ‘এবার আমি অমুকের নামে অথবা বাবার নামে কিংবা মায়ের নামে কুরবানি দিব।’ এমনটা বলা অনুচিত। কারণ কুরবানি একটি আর্থিক ইবাদাত। আর ইবাদাত হবে শুধু আল্লাহর নামে। কোনো মানুষের নামে নয়। বরং বলা যেতে পারে অমুকের পক্ষ থেকে আল্লাহর নামে কুরবানি। আর এটাই শুদ্ধ। যদিও কারো নামে কুরবানি দ্বারা তার পক্ষ থেকে আদায় করা হচ্ছে এমনটাই উদ্দেশ্য করা হয়। তদুপরি এরুপ না বলাই ভাল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তা ভক্ষণ করোনা, যেগুলো আল্লাহ ব্যতিত অন্যের নামে জবাই করা হয়’। (সূরা আনআম, ১২১)। তিনি আরো বলেন ‘হে নবী আপনি বলুন, নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ একমাত্র আল্লাহর জন্য’ (সূরা আনআম, ১৬২)।
প্রাণীর অবয়ব না কুরবানি দাতার নিয়ত?
প্রতিবছর ঈদুল আযহা আসলেই মুসলিম সমাজে পশু কেনার এক মহড়া পরিলক্ষিত হয়। কে কার চেয়ে বড় পশু কুরবানি দিতে পারে। কে কার চেয়ে দামী পশু কুরবানি দিতে পারে এধরণের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায় সর্বত্র। আসলে আল্লাহ তাআলার কাছে গ্রহণযোগ্যতা কুরবানির পশুর দেহাকৃতির উপর ভিত্তি করে নয়। বরং কুরবানি দাতার নিয়তের উপর। কেউ যদি একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করার জন্য ছোট থেকে ছোট কোনো জন্তুও কুরবানি করে, তাহলে সেটা সহজেই পৌছে যায় রাব্বুল আলামীনের কাছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর কাছে কুরবানির রক্ত মাংস কিছুই পৌছেনা। বরং পৌছে তোমাদের তাকওয়া’। এজন্য প্রতিযোগিতা হওয়া চাই তাকওয়ার, লৌকিকতার নয়। (সূরা হাজ্জ, ৩৭)
প্রাণীর দাঁত না বয়স ধর্তব্য?
অনেকেই কুরবানির জন্তু কেনার সময় পশুর দাঁত কয়টি আছে যাচাই করেন। আসলে কুরবানির ক্ষেত্রে পশুর দাঁত নয়, বরং বয়স ধর্তব্য। গরু অথবা মহিষের জন্য কমপক্ষে দুই বছর হওয়া জরুরি। দুই বছর পূর্ণ না হলে তার দ্বারা কুরবানি জায়েজ নয়। ছাগলের জন্য কমপক্ষে একবছর হওয়া জরুরি। তবে ভেড়ার ক্ষেত্রে ছয় মাস পূর্ণ হলে তারদ্বারা কুরবানি জায়েজ। (সহীহ মুসলিম, ৫১৯৪)।
কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে মাংস দেয়া যায়?
অনেক সময় যারা কুরবানির পশু কে জবাই করে কিংবা কাটতে সহায়তা করে তাদেরকে পারিশ্রমিক হিসেবে কুরবানির পশুর মাংস দেয়া হয়। যা সম্পূর্ণ না জায়েজ। (ফাতাওয়া শামী ৯/৪৭৫) তাদেরকে পারিশ্রমিক দিতে হলে অন্য সম্পদ থেকে দিতে হবে। প্রয়োজনে তাদের সাথে পূর্বেই চুক্তি করে নিতে হবে। আর সাধারণ সাদাকাহের জন্য নির্ধারিত অংশ থেকে তাদেরকে দান করা জায়েজ রয়েছে। তবে কোনো ক্রমেই যেন তা পারিশ্রমিক হিসেবে গণ্য না হয়।
‘৭ ভাগে কুরবানি দেয়া যাবেনা’ কথাটি কি ঠিক?
কেউ কেউ মনে করে থাকেন ভাগে কুরবানি ঠিক নয়। তাদের এমন ধারণা সম্পূর্ণ হাদিস বিরোধী। কুরবানির জন্তু যদি গরু, মহিষ কিংবা উট হয় তাহলে তা সর্বোচ্চ ৭ জনের পক্ষ থেকে আদায় করা জায়েজ রয়েছে। এব্যাপারে সহীহ মুসলিমে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে, প্রখ্যাত সাহাবী হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে হজে ইহরাম বেধে বের হলে, তিনি আমাদেরকে নির্দেশ দেন, আমরা যেন উট ও গরুর বেলায় আমাদের মধ্য হতে প্রত্যেক সাতজন একটি প্রাণীতে শরীক হই’। তবে ভাগে কুরবানির ক্ষেত্রে সতর্কতার বিষয় হলো বন্টন যেন সুষ্ঠু ও ইনসাফপূর্ণ হয়।
কুরবানিদাতাদের নামের তালিকা কাগজে লিখে পাঠ করা কি জরুরি?
কুরবানির পশু জবাইর আগ মুহূর্তে কুরবানিদাতাদের নামের তালিকা কাগজে লিখে পাঠ করতে দেখা যায় অনেক এলাকায়। অনেকে এটাকে জরুরি মনে করে থাকেন। অথচ আদৌ এর কোনো ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহতে পাওয়া যায়না। টাকা যার কুরবানি তার। নিয়ত দেখেন একমাত্র রাব্বুল আলামিন। তিনি ভাল করেই জানেন কাদের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে এই কুরবানি। সুতরাং তালিকা করে পাঠ করার কোনো প্রয়োজন নেই।
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি না দিলে কি গুনাহগার হবে?
কুরবানি ওয়াজিব একটি বিধান। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আদায় না করলে অবশ্যই গুনাহগার হবে। অনেকের উপর কুরবানি ওয়াজিব অথচ আদৌ তিনি এ সম্পর্কে অবগত নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি না করে সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে’। (মুসনাদে আহমাদ, ৮২৮৩) ফিকহে হানাফির প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হোদায়ার ভাষ্য অনুযায়ী, কুরবানির দিনগুলোতে যার কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষ ব্যতিরেকে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা তার মূল্যের সমপরিমাণ সম্পদ থাকবে তার উপরই কুরবানি ওয়াজিব। যাকাতের মত পূর্ণ একবছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়।
ইমাম সাহেব দিয়ে জবাই করানো কি জরুরি?
অনেকে মনে করে থাকেন মসজিদের ইমাম সাহেব কিংবা মাদরাসার কোনো উসতাদ, ছাত্র এদের দিয়েই জবাই দেয়া জরুরি। আসলে ব্যাপারটি এমন নয়। নিজের কুরবানির পশু নিজেই জবাই দেয়া মুস্তাহাব। এক্ষেত্রে নিজে অক্ষম হলে অন্য কোনো মুসলিম দিয়ে জবাই করানো জায়েজ রয়েছে। তবে উলামায়ে কেরামের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা থেকে যদি কেউ এমনটি করে থাকেন তাহলে এতে দোষের কিছু নেই বরং এক্ষেত্রে আমরা অতিরিক্ত সওয়াবের আশা রাখি ইনশা আল্লাহ।
জবাই করার পূর্বে প্রচলিত লম্বা দুআ করা কি জরুরি?
অনেকে নিজের কুরবানি নিজে জবাই দেননা এই অজুহাতে যে, আমার দুআ মুখস্থ নেই। কুরবানির পশু জবাই করার পূর্বে যে দুআটি পড়া হয় তা পুরোটা এভাবে পাঠ করা জরুরি কিছু নয়। বরং জরুরি হলো ‘আল্লাহর নামে’ জবাই করা। ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলা। (সহীহ বুখারী, ৫২৩৮)। এটুকুই যথেষ্ট। আমরা পুরো দুয়া পাঠ করাকে উত্তম বলতে পারি। তা পাঠ না করলে কুরবানির কোনা ক্ষতি হবেনা ইনশা আল্লাহ।
জবাইর পর গলায় জোরে ছুরি ঢুকানো কি ঠিক?
জবাই করার পর অনেকে কুরবানির জন্তুর গলায় ছুরি দিয়ে জোরে আঘাত করেন। যা সম্পূর্ণ না জায়েজ ও গর্হিত একটি কাজ। যদি এই আঘাতে প্রাণী মারা যায়, তাহলে এই প্রাণী ভক্ষণ হালাল হবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তাছাড়া এটি সম্পূর্ণ অমানবিক একটি কাজ। কোনা প্রাণীকে অযথা কষ্ট দেয়াকে ইসলাম না জায়েজ বলেছে। এজন্য ধারালো ছুরি দিয়ে জবাই করার কথা বলা হয়েছে। যাতে প্রাণীর কষ্ট না হয়।
কুরবানির পশুর চামড়া কি নিজে ব্যবহার করা যাবে?
কুরবানির পশুর চামড়ার বিধান তার মাংসের মতই। নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করা, খাওয়া কিংবা পুরোটা কাউকে দিয়ে দেয়া জায়েজ। তবে বিক্রি করে ফেললে তার হকদার হয়ে যায় গরীব মিসকিন। তা অবশ্যই গরীব, অসহায় মানুষদের মাঝে বন্টন করে দিতে হবে। তবে বিক্রি করার চাইতে পুরোটা কোনো অসহায়কে অথবা কয়েকজনকে দিয়ে দেয়া উত্তম বলে মনে করি।

 

শেয়ার করুন
বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • সিলেট ও রবীন্দ্রনাথ
  • দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ
  • রবীন্দ্রনাথ ও মাছিমপুরের মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া
  • রবীন্দ্রনাথের হাতে ১২শ’ টাকার চেক দিয়েছিলেন এক সিলেটি
  • বাঙালির শোক ও বেদনার দিন
  • ইতিহাসের চোখে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড
  • দাবায়ে রাখতে পারবা না
  • কুরবানি : ইতিহাসের আলোকে
  • রক্তিম সূর্য
  • খুঁজে ফিরি সেই লেইছ ফিতা
  • কুরবানি ও কয়েকটি মাসআলা
  • সত্য ও ন্যায়ের পক্ষেই আমাদের দৃঢ় অবস্থান
  • আমার লেখকস্বত্তার অংশীদার
  • এই জনপদে ঐতিহ্যের ধারক সিলেটের ডাক
  • প্রিয় কাগজ, সাহসী কাগজ
  • পাঠকের প্রিয় সিলেটের ডাক
  • পাঠকনন্দিত সিলেটের ডাক
  • সিলেটের ডাকের তিন যুগ
  • সিলেটের ডাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে
  • সিলেটের ডাক : আলোর দিশারী
  • Developed by: Sparkle IT