উপ সম্পাদকীয়

বিশ্বাসের উপলব্ধি

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৮-২০১৯ ইং ০১:২৪:২২ | সংবাদটি ৯৪ বার পঠিত

ঈদ-উল-আযহা-কুরবানির ঈদ, পরম আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের উদ্দেশ্যে পশু উৎসর্গের উৎসব। ইসলামের প্রধান উৎসবের দু’টো উৎসবের একটা এ ঈদ। একে বড় ঈদও বলা হয়ে থাকে।
কুরবানি বা পশু উৎসর্গ মানুষের প্রাচীনতম ধর্মীয় আচার সমূহের একটি। সমাজতাত্ত্বিক মতে মানুষ কৃষি সমাজে উত্তরণের পর ধীরে ধীরে এ ধারণা গড়ে উঠে যে, পশু উৎসর্গ করলে ফসল বাড়ে। এ ধারণার বশবর্তী হয়ে পশুর রক্ত মাঠে ছিটিয়ে দেওয়ার প্রথাও প্রবর্তন হয়। শুধু পশু উৎসর্গ নয়, নরবলির মত জঘন্য কুসংস্কারও এ ধারণার সঙ্গে নানাভাবে জড়িত। সাধারণত কুমারী মেয়েদেরকেই বলি দেওয়া হত। আজও ভারতবর্ষের কোনো কোনো জায়গায় নরবলি দিয়ে সেই বলিকৃত মানুষের রক্ত মহাসমারোহে মাঠের উপর ছড়িয়ে দেওয়ার খবরও আমরা পাই মাঝে মাঝে।
হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর কুরবানি নরবলি প্রথার বদলে শুধু পশু কুরবানি করেননি, বরং কুরবানির সম্পূর্ণ তাৎপর্য বদলে দিয়েছেন। এ কুরবানি ফসল বৃদ্ধির উদ্দেশ্য নয়, রিপু বলির প্রতীক, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে।
যা হোক, পবিত্র ক্বোরআনে আমরা কুরবানির প্রথম উল্লেখ পাই আদিপিতা আদমের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কাহিনীতে। একই পিতার সন্তান-সন্ততিই তখন পৃথিবীর একমাত্র মানবগোষ্ঠী। হাবিল ও কাবিলের মধ্যে তাই তাদের একজন সুন্দরী বোনকে বিয়ে করা নিয়ে রেষারেষি গড়ে উঠে। অবশেষে স্থির হয়, দুজনেই কুরবানি করবেন। যার কুরবানি কবুল হবে, তিনিই মেয়েটিকে বিয়ে করবেন। তখনকার প্রথা অনুযায়ী আল্লাহর উদ্দেশ্যে শস্য মাঠের মধ্যে রেখে দিলেন দুই ভাই। হাবিলের শস্য স্বর্গীয় আগুনে পুড়ে গেল, মানে তাঁর কুরবানি কবুল হল। পরবর্তী ঘটনার বর্ণনার অবকাশ এখানে নেই। এখানেও কোনো কোনো পন্ডিত উৎসর্গের সম্পর্ক কৃষি সমাজের সঙ্গে বলে দেখাতে চেয়েছেন। হাবিল কাবিল যে কৃষি সমাজের লোক ছিলেন, তা তো শস্য উৎসর্গ করা থেকেই বোঝা যাচ্ছে। ক্বোরআন হাদিসের সাক্ষ্যও এ মতের অনুকূলে।
উৎপত্তি যে ভাবেই হোক, প্রাণী উৎসর্গ প্রাচীনতম ধর্মীয় প্রথা সমূহেরই একটি। ঈদ-উল-আযহাও অনুরূপ একটি উৎসের উৎসব। তবে এ উৎসবের প্রবর্তনের পিছনে জড়িত রয়েছে একটা অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সুবিদিত ঘটনাটি আবার একবার বর্ণনা করা যাক সংক্ষেপে।
ব্যবিলনের ঊর প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন ইব্রাহিম (আঃ) প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে। ইনি যুগপৎভাবে ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মের আদিগুরু। ইব্রাহিম (আঃ) পিতা আজর ছিলেন মূর্তি নির্মাতা, মূর্তি ব্যবসায়ী। ব্যবিলনের অধিবাসীরা ছিল মূর্তি পূজক। শুধু তাই নয় তারা প্রকৃতি পূজোও করত। পয়গম্বর ইব্রাহিম (আঃ) তাদেরকে যুক্তি দিয়ে পরাস্ত করলেও তারা বল প্রয়োগে তাঁকে নিরস্ত করবার চেষ্ঠায় লেগে যায়। এ সময় পারিবারিক অশান্তিও দেখা দেয়। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহর মদদ কামনা করলে আল্লাহ তাকে আদেশ দেন পরম প্রিয়তমা পতœী হযরত হাজেরাকে নিয়ে মক্কার মরু অঞ্চলে চলে যেতে। মক্কায় তখন জনমানব ছিল না। ছিল না কোনো শস্য বা জীবনধারণের উপযোগী সামগ্রী। এ দানাপানিহীন মরু বিয়াবানে প্রিয়তমা পতœী ও সদ্যজাত শিশুপুত্র ইসমাইলকে রেখে আল্লাহর আদেশে ইব্রাহিম (আঃ) আবার ফিরে গেলেন স্বদেশে। আবার যখন তিনি ফিরে এলেন মক্কায়, তখন ইসমাইল হেসে খেলে বেড়ানোর বালক। দানাপানিহীন বিয়াবানে আল্লাহর কৃপায় অলৌকিকভাবে পতœী ও পুত্রকে বেঁচে থাকতে দেখে ইব্রাহিমের আনন্দ আর ধরে না। কিন্তু এরই মধ্যে হয়ে গেল বিনা মেঘে বজ্রপাত। স্বপ্নে দেখলেন ইব্রাহিমকে আল্লাহ আদেশে করছেন, আমার উদ্দেশ্যে কুরবানি কর তোমার পুত্রকে। সন্তুষ্টচিত্তেই তিনি শিরধার্য করলেন আল্লাহর আদেশ। যেমন পতি তেমনি পতœী। তিনিও মুখ কালো করলেন না।
বলাবাহুল্য যে, হাজেরার কুরবানি ও নিখিল নারীজাতির আদর্শ হয়ে থাকার মত। পুরুষের পাশে এ রকম নারীই সম্ভব করে তুলতে পারে কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তরণ। ইব্রাহিম ডাকলেন ইসমাইলকে। মতামত চাইলেন তাঁর। যেমন ত্যাগী পিতা তেমনি সুযোগ্য পুত্র। উত্তর দিলেন, ‘আব্বা আমার, আপনি যে রকম আদিষ্ট হয়েছেন, সে রকমই করুন।ইনশাল্লাহ আমাকে আপনি পাবেন ধৈর্যশীলদের একজন।’ ইব্রাহিম (আঃ) এটাই প্রত্যাশা করছিলেন। পুত্রকে নিয়ে গেলেন মিনা ময়দানে। শোয়ালেন মাটিতে। পাছে পিতৃ স্নেহ উথলে উঠে, সেই ভয়ে তিনি কাপড় বেধে নিলেন চোখের উপর। আল্লাহ আসলে চেয়েছিলেন, ইব্রাহিমের খোদাপ্রেম ও তাঁর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয়তম বস্তু কুরবানি করার মানসিকতা পরীক্ষা করতে। ইব্রাহিম এ পরীক্ষায় সফল হলেন। জিব্রাইলের মাধ্যমে ইসমাইলের স্থলে রাখা হল একটা দুম্বা। ইব্রাহিম তাকেই জবেহ করলেন। প্রবর্তন হল কুরবানি উৎসবের।
জিলহজ মাসের ১০ তারিখে হজ যাত্রীরা এখনো কুরবানি করেন উট, দুম্বা অথবা ছাগল। ঐতিহাসিক সেই মিনা ময়দানে। হযরত মোহাম্মদ (দঃ) যখন মক্কা ছেড়ে মদিনায় যান, তখন মুসলমানরা একটা নতুন সমাজের মধ্যে হয় সুসংবদ্ধ, তখনই প্রয়োজন দেখা দেয় উৎসবের। আর তখন মোহাম্মদ (দঃ) প্রবর্তন করেন দু’টো উৎসব। তারই একটি আরবদের আদিপিতা ইসমাইলের স্মৃতিতে ঈদ-উল-আযহা।
ঈদ এমনিতেই মিলনের উৎসব, পবিত্রতার উৎসব, ত্যাগ ও মহত্ত্বের উৎসব। ঈদ-উল-আযহার তাৎপর্য হযরত ইব্রাহিম ও ইসমাইলের ত্যাগের স্পর্শে বেড়ে যায় আরো বহু গুণ। কোনো পন্ডিত ইচ্ছা করলেই একে ফার্টিলিটি কাল্ট-এর সঙ্গে মেলাতে পারেন। তবে হযরত ইব্রাহিমের জীবন ও আদর্শ এ ঘটনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে যে মহত্ব দান করেছে একে, তা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না।
ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ ছিলেন আল্লাহর বন্ধু। পবিত্র ক্বোরআনে রয়েছে ‘স্মরণ কর, যখনই ইব্রাহিমকে তাহার প্রভু যাচাই করলেন বিশেষ কয়েকটি ব্যাপারে এবং সে সবকটিতে উত্তীর্ণ হল তখন তিনি বললেন, আমি তোমাকে সকল মানুষের নেতা করতে চাই।’ বাকারা ১২নং আয়াত। এ পরীক্ষাগুলোর একটি ছিল সম্রাট নমরুদ ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের দ্বারা আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া।
হযরত ইব্রাহিম এতে উত্তীর্ণ হলেন। আগুনের উপরে বসে হাসলেন পুস্পের হাসি। তারপর এল স্বদেশ ত্যাগ করে মক্কায় গমন ও সেই দানাপানিহীন মরুবিয়াবানে পতœী ও শিশু শিশুপুত্রকে বিসর্জনের আদেশ। তাও তিনি পালন করলেন। সর্বশেষে এল চরম পরীক্ষা পুত্রের কুরবানি। হাসিমুখে তাও সম্পন্ন করলেন। এমন যে অনুগত বান্দা, এমন যে প্রিয়তম মানুষ, তাকে যে দুনিয়ার শ্রেষ্ট মর্যাদা দেওয়া হবে সে তো বলাই বাহুল্য। তবে ইব্রাহিম এই যে তিন ধর্মের নেতৃত্বে সমাসীন হওয়া, তার মূলে সবচেয়ে বড় জিনিস ছিল তাঁর ত্যাগ, তাঁর কুরবানি।
ত্যাগ ছাড়া মহৎ হওয়া যায় না, ত্যাগ ছাড়া আসে না সফলতা, ইব্রাহিম (আঃ) এ কথার প্রকৃষ্ট নিদর্শন। আর হচ্ছে ধৈর্য ও সংযম। কী অপরিসীম ধৈর্য থাকলে মানুষ আগুনে ঝাঁপ দিতে পারে, পুত্রকে কুরবানি করতে উদ্যত হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
ইব্রাহিম (আঃ) এ ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। ইব্রাহিমই আমাদেরকে শিখিয়েছেন যে পাপ থেকে পুণ্যের দিকে, অসত্য থেকে সত্যের দিকে যাত্রার নামই প্রকৃত দেশত্যাগ। প্রকৃত হিজরত। অবশ্যই তিনি আক্ষরিক অর্থে ও দেশত্যাগ করেছিলেন সত্যের খাতিরে আর এরই সূত্র ধরে প্রতিষ্ঠিত হল পবিত্র কাবা, প্রবর্তিত হল মুসলমানদের বিশ্ব সম্মেলন, সাম্য ও মৈত্রীর পরাকাষ্ঠা হজ্ব। তার সঙ্গে যুক্ত হল কুরবানি। প্রবর্তিত হল ঈদ-উল-আযহা উৎসব। শিক্ষা পেলাম আমরা নিশ্চয়ই পশুর রক্ত বা মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে আমাদের নিয়ত, সংকল্প। কুরবানির মাধ্যমে আমরা আমাদের রিপু দমন ও ত্যাগবরণের সংকল্পই ঘোষণা করি। হযরত ইব্রাহিমের মত এ কাজ করতে না পারলে ঈদ-উল-আযহা পালনই মাটি।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • প্রয়োজন সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন
  • চোরাকারবার বন্ধে চাই কৌশল
  • জাফলং ভ্যালি বোর্ডিং স্কুল
  • একটি বর্ণনাতীত ভাষ্য
  • Developed by: Sparkle IT