বিশেষ সংখ্যা

খুঁজে ফিরি সেই লেইছ ফিতা

মাজেদা বেগম মাজু প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৮-২০১৯ ইং ০১:২৪:৫৩ | সংবাদটি ১৫৮ বার পঠিত

‘লে-ই-ছ ফি-তা’ বলে হাঁক দেয়া ফেরিওয়ালাদের সংখ্যা দিনে দিনে হ্রাস পেলেও পূর্বে শহর ও শহরতলির আশপাশ এলাকায় এই লেইছ ফিতাওলাদের যে এক বিরাট ভূমিকা ছিল সেটা অনস্বীকার্য। লেইছ ফিতা বলতে অক্ষির সম্মুখে ভেসে ওঠে হাতে আকর্ষণীয় কাঁচের ফ্রেমে বাঁধানো বাক্সের ভিতরে মনোহারী জিনিস ও পেছনে বড় বোঝাসহ ফেরিওয়ালাদেন চেহারা। শহরের অলিগলিতে এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ঘুরে বেড়ানো ও রকমারি জিনিস বিক্রি করাই ছিল তাদের পেশা। যে কোন উৎসব পার্বণকে সামনে রেখে অন্যান্য ফেরিওয়ালাদের মত এই লেইছ ফিতা ওয়ালাদের ব্যবসাও জমজমাট হয়ে ওঠত। লেইছ ফিতা নিয়ে রয়েছে এদেশে ‘নগরবাউল’ এর বিখ্যাত ব্যান্ড সংগতি শিল্পী জেমসের কণ্ঠে জনপ্রিয় গান ‘লেইছ ফিতা লেইছ’। আজ থেকে দুই তিন দশক পূর্বেও মেয়েদের এত অবাধ স্বাধীনতা ছিল না বিধায় অধিকাংশ মহিলারা এই লেইছ ফিতাওয়ালাদের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিলেন। ঘরে বসে স্বল্প খরচে এই লেইছ ফিতাওয়ালাদের কাছ থেকে বিনাদ্বিধায় স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করতে অনেক সুবিধা পাওয়া যেত।
ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। সেটা চিরদিনের, চিরশ্বাশত। কিন্তু ছোটবেলা, কিশোরবেলার ঈদগুলোতে যে আনন্দ, যে সুখ খুঁজে পাওয়া যেত এখনকার ঈদগুলোতে সেই সুখ সেই আনন্দ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সেই চাঁদ দেখা নিয়ে হৈ হুল্লোড়, খুনসুটি, চাঁনরাতের আনন্দ, ঈদে প্রাপ্ত জামাকাপড় লুকিয়ে রাখা, মোরগডাকা ভোরে টিউবওয়েল চেপে ঝপাৎ ঝপাৎ শব্দে গোসল করার প্রতিযোগিতা, সারাদিন পাড়াময় ঘুরে বেড়ানো, রাতে একটি মাত্র টিভি চ্যানেল বিটিভিতে সাদাকালো ছায়াছবি ও আনন্দমেলার আনন্দ উপভোগ করার মজাই ছিল আলাদা। সেই ঈদগুলোর মত নির্মল ও অকৃত্রিম আনন্দের আজ বড়ই অভাব। চলার পথে জীবনের বাঁকে বাঁকে কতজনের সাথে দেখা হয়, কথা হয়। পরিচিত হতে হয় কত মানুষের সাথে। এর মধ্যে কতজনের ছবি ক্ষণে ক্ষণে স্মৃতির দর্পণে ভেসে ওঠে আসে বারবার কতজন হয়তো হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্তরালে। তেমনিভাবে মনের মুকুরে চিরঞ্জীব হয়ে থাকা দুই লেইছ ফিতাওয়ালা হলেন কন্টাই ভাই ও শিল্পীর বাপ। ঈদের সময় যাদের উপস্থিতি ছাড়া ঈদের আনন্দ পরিপূর্ণ হয়ে উঠত না।
এই দুই লেইছ ফিতাওয়ালা ছিলেন সচরাচর দেখা ফেরিওয়ালাদের চেয়ে একটু ভিন্ন প্রকৃতির। ব্যতিক্রমধর্মী এই দুই ফেরিওয়ালার সাথে জড়িয়ে আছে অধিকাংশ মহিলাদের স্মৃতি। তাদের সাথে স্মৃতি বিজড়িত দিনগুলি আমার মত আর অন্য কাউকে আন্দোলিত করে কি-না জানিনা, তবে ঈদ এলে ঈদের কেনাকাটার প্রাক্কালে শত ব্যবস্থার মাঝেও তাদের মুখচ্ছবি আমার মানসপটে কেন জানি ভেসে ওঠে বারবার।
আমার জানামতে তারা ছিলেন দুই ভাই। কন্টাই ভাই ও শিল্পীর বাপ নামেই দুজনে পরিচিত ছিলেন সবার কাছে। সেই ছোটবেলা থেকেই তাদের সাথে পরিচয়। তারপর শৈশব, কৈশোর গড়িয়ে আরও কতদিন কত বছর পার হয়ে গেছে তাদেরকে দেখে ও তাদের সাথে তামাশা করে করে। কিন্তু হঠাৎ করে বেশ কয়েকবছর ধরে তাদের দুজনকে আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। কন্টাই ভাই অনেক আগে থেকেই লোকসম্মুখে অনুপস্থিত। যখন জিনিস ফেরি করে বেড়াতেন সেই সময়ই কন্টাই ভাই বয়সের ভারে ন্যুব্জ্য ছিলেন। সেই তুলনায় শারীরিকভাবে সুস্থ সবল শিল্পীর বাপ বছরের পর বছর জিনিস ফেরি করে বেড়ালেও ধীরে ধীরে বার্ধক্যে উপনীত হয়ে তিনিও হঠাৎ করে চলে যান লোক চক্ষুর অন্তরালে। তাদের চলন, বলন সবকিছুই ছিল অন্য লেইছ ফিতাওয়ালাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সহজসরল অবিভ্যক্তি অথচ বিনোদনের খোরাক ছিল দুজনার কাছে। ঈদ আনন্দের বাড়তি সংযোজন ছিলেন এই দুই ভাই। তাইতো এখন নয়ন সম্মুখে না থেকেও দুজনে ঠাই করে নিয়েছেন সবার স্মৃতির পাতায়।
কন্টাই ভাই ছিলেন বড় আর শিল্পীর বাপ ছোট। তবে দুজনে কখনও একসাথে চলাফেরা করতেন না। আলাদা আলাদাভাবে একেকজন একেক জায়গায় বোঝা নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। শহরের প্রায় সবার সাথেই পরিচয় ছিল দুজনের। তাদের চলাফেরায় মিল অমিল দুটোই ছিল। দু’জনার কেউই কখনও চীৎকার করে ‘লেইছ ফিতা’ বলে কাউকে আকর্ষণ করতেন না যা সচরাচর অন্য ফেরিওয়ালাদের বেলায় ঘটে থাকে। নিরবে নিঃশব্দে কারো বাসার সামনে গিয়ে আস্তে করে বলতেন ‘কুনতা রাখিলাউকাতে’ অথবা ‘কুনতা রাখতায়নিগো’। এই ভিন্নদর্মী ডাক দেয়ার কারণে তাদেরকে আবার বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে মজার মজার নামে ডাকা হতো যেমন ‘আটাওরা মেলাওরা’, ‘কুনতাকুনতি’ কুনতা রাখিলাউকাতে ইত্যাদি।
কন্টাই ভাইয়ের স্বভাব ছিল বেধে রাখা বোঝা মাটিতে নামিয়ে রেখে সবকিছু খুলে চারিদিকে জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসা। জিনিস কারো পছন্দ হলে কিনবে না হলে নেই। তাতে কোন কষ্ট বা বিরক্তবোধ নেই। ক্রয় বিক্রয় শেষ হলে আবার সবকিছু ঠিকঠাকমত গুছিয়ে বোঝায় তোলে রাখা ছিল তার কাজ। এই যে জিনিস ছড়িয়ে রেখে সবাইকে আকর্ষণ করে আবার গুটিয়ে রাখা সেইজন্য সবাই তাকে বলত ‘আটাওরা মেলাওরার’ দোকান। প্রফুল্লচিত্তে কন্টাই ভাই নিজেই একথা সবাইকে প্রচার করে বেড়াতেন। তবে মজার ব্যাপার হলো তার কাছে রাখা একটা ব্যাগের ভিতর প্রায় শখানেক তা তারও বেশি মানুষের ঠিকানা পাওয়া যেত। এতে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট শহর ও আশপাশ এলাকার অনেক নামীদামী ব্যক্তিদের নাম ঠিকানা লিখা থাকত। যেখানে যেতেন সেখানের লোকজনের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠাতে সবাই তাকে তাদের বাসায় গিয়ে থাকার জন্য কেউ কাগজে বা কার্ডে নিজের নাম ঠিকানা লিখে দিয়ে আমন্ত্রণ জানাতেন। যার ফলে যে কোন সময় যেকোন জায়গায় কন্টাই ভাই তার পেশাগত কারণে নিজের পছন্দমত স্থানে অবস্থান করতে পারতেন। মানুষের অগাধ বিশ্বাস ও ভালবাসার কারণে তার থাকা খাওয়ার কখনও কোথাও কোন অসুবিধা হতো না।
তবে দুজনের মধ্যে সবচেয়ে মজার লোক ছিলেন শিল্পীর বাপ। কারো বাসার সামনে গিয়ে নাকিসুরে বলতেন, ‘কুনতা রাখিলাউকাতে’। অনেকে জিনিস কেনার পরিবর্তে আনন্দ উপভোগ করার জন্য তাকে ডেকে নিয়ে আসতেন। হাস্যরসের অনেক উপাদান ছিল তার কাছে। প্রথমত সবাই মজা করতেন বাচ্চাদের নাম নিয়ে। তাকে তার ছেলেমেয়ে কয়জন ও তাদের নাম কী জিজ্ঞেস করলে আঙুলে গুণে হিসেব করে করে বলতেন শিল্পী, আমেনা, মোমেনা, রুবিনা, সাবিনা, জরিনা ইত্যাদি আরও অনেক নাম। তারও স্বভাব ছিল বোঝার সব জিনিস বের করে মাটিতে সাজিয়ে রাখা। কন্টাই ভাইয়ের মত তিনি অবশ্য নিঃশব্দে জিনিস বের করে বসে থাকতেন না। সবাইকে আকর্ষণ করার জন্য একটি একটি করে সব জিনিস প্রদর্শন করতেন এবং নির্দ্বিধায় কোন জিনিস কোন কাজে লাগে বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিতেন। এগুলোর মধ্যে অত্যন্ত নি¤œমানের ¯েœা, পাউডার, বডিলোশন থেকে শুরু করে কাজল, লিপস্টিক, নেইলপালিশ, লোমনাশক লোশন, আলতা, চুড়ি, আয়না, চিরুনি, ব্রা বা ছ্টোগেঞ্জি (শিল্পীর বাপের ভাষায়) নেপথলিন, লেইছ, ফিতা, নায়ক নায়িকাদের রোমান্টিক ভিউকার্ড সহ ছিল আরও রকমারি জিনিসের সমাহার। কোন জিনিস কিভাবে ব্যবহার করতে হয় শিখিয়ে দিতেন শিল্পীর বাপ। ওড়না, ছোটগেঞ্জি কিভাবে গায়ে দিতে হয় সেটা নিজে পরিধান করে দেখিয়ে দিতেন। লিপস্টিক, নেইল পালিশ, চুড়ি, কাজল, সুরমা ইত্যাদি একে একে ব্যবহার করে বুঝিয়ে দিতেন। এসবের মধ্যে ভয়ংকর অথচ সুন্দর ছিল কাজলের ব্যবহার। অভিনব পন্থায় কাজলের ব্যবহার দেখার জন্য কেউ কেউ বলতেন, কাজল কেনা যাবে না কারণ আমরা চোখে সুন্দরভাবে কাজল পরতে পারি না। কাজল বিক্রি করার জন্য তখন শুরু হতো কাজল মাখার কসরৎ দেখানা। কনিষ্ঠ অঙ্গুলিতে সামান্য কাজল নিয়ে অপর হাতের আঙুলের সাহায্যে চোখের উপরিভাগ ফাঁক করে ধরতেন। তারপর কাজলসহ আঙুলের অগ্রভাগ চোখের ভেতর ঢুকিয়ে এ পাশ থেকে ওপাশ ঘুরিয়ে নিয়ে আসতেন। যা দর্শনে ভয়ে শরীর শির শির করে উঠত। কিন্তু এভাবে কাজল দেয়াতে তার কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতো বলে মনে হয়নি। তিনি এ কাজটা অত্যন্ত সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে সমাধান করতেন যার কারণে কোনদিন তার চোখ দিয়ে একফোটা জলও পড়তে দেখেনি কেউ। ভয়ংকর সুন্দর অথচ পৃথিবীর দুর্লভতম পদ্ধতিতে কাজল দেয়ার কৌশল তিনি শিখিয়ে দিতেন সবাইকে। এই কঠিন পদ্ধতিতে কোনদিন কারো দ্বারা কাজল মাখা আদৌ সম্ভব হয়েছিল কিনা আমার জানা নেই। তবে তার মন রক্ষার্থে অবশেষে অল্প দামের এক কৌটা কাজল রাখা হতো ঠিকই কিন্তু সেই কাজল কারো দ্বারা কোনদিন ব্যবহৃত হয়েছিল বলে আমার মনে হয়নি। আমার এক প্রবাসী আত্মীয়ের ভিডিও চিত্রে ধারণকৃত অনন্য রেকর্ড ছিল তার এই হৃদয়স্পর্শী কাজল মাখার দৃশ্য।
কেউ কোনকিছু কিনতে অপারগতা প্রকাশ করলে নাকিসুরে বিনীতভাবে বলতেন, ‘কুনতা না কিনলে অইতনায়। শিল্পীর মায় কইয়া দিছইন জিনিস বেচিয়া যাইবার সময় কদু ও মোরগ কিনিয়া লইয়া যাইবার লাগি। না নিলে গজ (ছোট লোহার শিক) লাল করি আমার গালও ছ্যাকা দিবা।’ বলে মাথা চুলকিয়ে মুচকি হাসি দিতেন। তার কথা বলার ধরণ ও ভঙ্গিমা দেখে সবাই হেসে লুটোপুটি খেত যা দেখে তিনি খুব আনন্দ পেতেন। জিনিসের দাম করার জন্যও তিনি অন্যরকম কৌশল অবলম্বন করতেন। নির্দিষ্ট জিনিসের যত দাম সেটা ডাক দিলে কিছুটা কমানো যাবে। অর্থাৎ তিনি যদি জিনিস বিক্রি না করে চলে যেতে উদ্যত হন তবে পিছন থেকে ডাক দিয়ে নিয়ে এলে জিনিসের মূল্য কিছুটা কমানো যাবে তার মানে ডাক দিলে কম। এরকম মজার মজার কান্ড ও কথা শুনার জন্য ঈদ এলে আমার মত সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন শিল্পীর বাপ ও কন্টাই ভাইয়ের জন্য। অনেকে জিনিস ক্রয় না করে এমনিতে তাদেরকে অনেক টাকা পয়সা দিতে চাইলে কখনো তারা সেটা গ্রহণ করতেন না। তাই অনেক সময় তাদের জিনিসের বিনিময়ে তাদেরকে বাড়তি টাকা পয়সা দান করতে হতো।
জীবনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত আনুষাঙ্গিক বিষয়াদির প্রিয় অপ্রিয় কত জিনিস কখন যে জীবন থেকে হারিয়ে গেছে একটুও টের পাইনি। চলতে চলতে আরও হয়তো কতকিছু হারিয়ে যাবে। জীবনে ঈদ আসে, ঈদ যায়। আবারও আসবে আবারও যাবে। কিন্তু আজ বর্তমান শতাব্দিতে দাঁড়িয়ে এই ভেজালের ভিড়ে খুঁজে পাইনা ফেলে আসা শৈশব কৈশোরের সেই নির্মল ঈদ আনন্দ। খুঁজে পাইনা সেই লেইছ ফিতা, সেই কন্টাই ভাই সেই শিল্পীর বাপকে। সেই সময় কখনো মনে হয়নি কন্টাই ভাই, শিল্পীর বাপ তাদের লেইছ ফিতা নিয়ে স্মৃতির ক্যানভাসে এমনভাবে মূর্তমান হয়ে এতখানি জায়গা দখল করে থাকবেন। কন্টাই ভাই, শিল্পীর বাপ তোমরা কে কোথায় আছ আমি জানিনা। তবে আমি ফরমালিন, কার্বাইড, ইথোফেন মুক্ত সেই মধুময় ঈদ আনন্দের দিনগুলির সাথে তোমাদেরকে তোমাদের অকৃত্রিম সরলতাকে, তোমাদের সেই নেপথলিনের গন্ধমাখা লেইছ ফিতাকে আজ ভেজালের এই যুগে এসে সত্যি সত্যি বড্ড মিস করছি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT