বিশেষ সংখ্যা

রক্তিম সূর্য

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৮-২০১৯ ইং ০১:২৫:১৮ | সংবাদটি ১৫৮ বার পঠিত

ফেলে আসা অতীতের দিনগুলোকে আর স্মৃতির গহনে ধরে রাখতে চায় না পারুল। কিছু মুখচ্ছবি অন্তরের দর্পণ দিয়ে দেখতে চায় না সে। চেনা জানা কিছু পথ দিয়ে চলতে গিয়ে থমকে যায়। সেই কৃষ্ণছূড়া, সেই পলাশ, সেই বকুল।-মাধবীর হাতছানিতে যেতে পারে না-সাড়া দিতে পারেনা প্রভাত পাখীদের কলকাকলীর সুমধুর আহবানে। এখন তার সে গান গাইতে পারেনা গুন গুন করে। কে যেন টুটি চেপে ধরে। এই এক যুগ পরও সে ভুলতে পারছেনা কতকগুলো আওয়াজ, আকাশ ফাটানো করুণ আর্তনাদ! কিন্তু পারুল চায় এসব চিরতরে ভুলে যেতে, চায় স্মরণের ডায়রি থেকে এগুলো ছিঁড়ে ফেলে আগুনে জ্বালিয়ে ছারখার করে আকাশে উড়িয়ে দিতে। কিন্তু পারেনা; আগুন তখন আর দাউদাউ করে জ্বলেনা। জ্বলে হৃদয়তন্ত্রীর প্রতিটি পরতে পরতে। চির দিপ্যমান সেই দহন শেষ করে দিয়েছে পারুলের সাজানো বাগান; সেখানে ছিলো স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা হাজারো ফল ফুলের বৃক্ষরাজি, ছিলো আগত জীবনের সমুজ্জ্বল দিগন্ত। তবুও যেন শেষ হয়েও হচ্ছে না শেষ, রয়ে গেছে কিছু অবশিষ্ট; দহনও যা ছুঁতে পারেনি।
যাযাবর বীজনটার প্রতি বড্ড ঘৃণা ধরে গেছে পারুলের। হতাশার বালুচরেই তার বসবাস। অথচ আশা, স্বপ্ন সবই ছিলো একদিন। স্বপ্নের শুরুতেই আসে তান্ডব। আসে ধ্বংসাত্মক প্রলয়, তুফান। এই তুফানই আজ পারুলকে করেছে জীবন থেকে বিসর্জিত, নিঃস্ব, সংসার হারা। রাহুর বেগে সেদিন পারুলের সুখের সংসারে আঘাত হেনেছিলো সেই তুফান। পশ্চিমা হায়েনারা যখন এই মাটির বুকে দাপাদাপি করে ধ্বংসের খেলায় মেতেছে, তছনছ করে দিয়েছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মনোরম বাগানটি, তখন পুড়ে ছাঁই হয়েছে পারুলের রঙ্গিন স্বপ্নগুলোও।
সেই দিনগুলোকে ভুলতে পারেনি পারুল এখনও; ভুলে যাওয়ার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে তার। চোখের সামনে জ্বল জ্বল করছে সেদিনের সেই সূর্য ডুবে যাওয়ার মুহূর্তটি। রক্তিম ফুলের তোড়াগুলো আকাশে মেলে ধরে ঋতুরাজের আগমনের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলো কৃষ্ণচূড়ার গাছটি। পারুল দেখছিলো কৃষ্ণচূড়ার ফাঁক দিয়ে লাল আবির ছড়িয়ে সূর্যটা দিগন্তে তলিয়ে যাচ্ছিলো ধীরে ধীরে। তারই নীচ দিয়ে মাঠ থেকে গরুগুলো নিয়ে ঘরে ফিরছিলো শিমুল। পশ্চিমে তাকায় পারুল। না! আর সূর্যের শেষ বিন্দুও দেখা যাচ্ছে না। ..... হঠাৎ একটি বিকট শব্দ চমকে দেয় পারুলকে। হতভম্ব হয়ে পড়ে সে। আতংক এসে ভর করে তার ওপর। কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলোনা পারুল। তারপর আবার সেই শব্দ প্রচন্ড জোরে ...... তারপর আবার .... বারবার। উপর্যুপরি গুলির শব্দে পাথর হয়ে পড়ে পারুল। নিষ্প্রাণ-নির্জীব একটা জড় পদার্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। অসংখ্য বিষমাখা তীরের ফলা তাকে ঘিরে ধরে অক্টোপাসের মতো। কল্পনা থেকে হারিয়ে যায় সবকিছু পারুলের। এক মুহূর্তের জন্য সে চলে যায় অন্য জগতে ঝড়ে আক্রান্ত পাখীর মতো। নিজেকে হারিয়ে আবার খুঁজে ফিরে সে, বারবার। আবচা আঁধারে ডুকে যায় ছোট্ট গ্রামটি। তখনও কৃষ্ণছূড়ার চিরল সবুজ পাতা গুলোকে দেখা যায় তার স্বকীয়ত্ব বজায় রাখতে, আঁধার ভেদ করে রূপ ছড়াচ্ছিলো প্রতিবাদীর মতো। কানে এসে ধরা দেয় মুয়াজ্জিনের কণ্ঠের সুমধুর ধ্বনি। মুসল্লিরা চলে যায় কাফেলা সেজে মসজিদের দিকে। .... পারুলের উদ্বিগ্ন মনে ঝড় ওঠে-‘ওই পথ দিয়েইতো শিমুল আসছিলো গরুগুলো নিয়ে।’ পারুলের অনুসন্ধিৎসু চোখ দুটি নিক্ষিপ্ত আঁকাবাঁকা পথটির ওপর। ... কই, ওকে তো দেখা যাচ্ছে না। কোথায় শিমুল? ওই তো গরুগুলো উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। তারা কেবল অসহায়ের মতো ফেল ফেল করে চারদিকে তাকাচ্ছে। তারা একটু আশ্রয় চাইছে, ঠিকানা খুঁজছে। পারুল আরেকবার তার চোখ ঘুরিয়ে নিলো সামনে, পেছনে, ডানে, বামে; হয়তো দুষ্টুমি করে কোথাও ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে-এই ভেবে। কিন্তু না, পাওয়া যায় নি শিমুলকে। তখন আবার কানে আসলো বীভৎস শব্দগুলো। একটি আকাশ দানব ওড়ে গেলো মাথার ওপর দিয়ে। আর তখনই পূবাকাশে উঁকি দেয় পূর্ণিমার চাঁদটি। .... এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে ছোট্ট ঘরটিতে ফিরে আসে পারুল। তাদের সন্তান শেষ আশ্রয় সবুজকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নার সিন্ধুতে হারিয়ে যায় সে।
॥ দুই ॥
জীবনবাজি যুদ্ধে নামে গর্বিত বীর মায়ের সন্তানেরা। দেশমাতৃকার সম্মান বাঁচাতে লড়ে তারা কামান-মর্টারের বিরুদ্ধে। লড়ছে শিমুল। তার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তান সবুজ ও প্রিয় স্ত্রী পারুল তার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে-সকাল থেকে বিকেল আর বিকেল থেকে রাত। নির্ঘুম রাত কাটে পারুলের। রাতের নিকষ কালো অন্ধকার আঁকড়ে ধরে পারুলকে। চোখের জলে ভিজে আঁচল, ভিজে মাটি। দিনের আলো দূর করতে পারেনা তার চোখের অন্ধকার। দাওয়ায় বসে কেবলই সেই স্মৃতি তর্পন। সেই কৃষ্ণচূড়া তাকে আর কাছে টানে না, আকৃষ্ট করে না। শিমুল ঘর ছেড়েছিলো যে সূর্যাস্তে, সেই সূর্যের উদয় দেখেনি সুদীর্ঘ ন’মাসেও। তবে তার বিশ্বাসের ভিত নড়েনি একদন্ড। সে জানে সূর্য আবারও উঠবে পূবের আকাশে।
আশায় বুক বাধে পারুল। নিঃস্ব কপর্দকহীনও বেঁচে থাকে আশা নিয়ে, স্বপ্ন নিয়ে। অকূল সাগরে হাবুডুবু খেয়ে যেমন কেউ কোন খড়কুটোকেও বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে বেছে নেয়, পারুলও তেমনি বেঁচে থাকে শিমুলের স্মৃতি বুকে আঁকড়ে ধরে। তার ধ্যান-জ্ঞান কেবলই শিমুলকে ঘিরে, তাদের সন্তানকে ঘিরে। তার বেঁচে থাকার অবলম্বন সন্তান আর স্বামীর স্মৃতিগুলো বুকে ধরে মুক্ত স্বাধীন দেশে বিজয় পতাকা হাতে শিমুলের বাড়ি ফেরার দৃশ্যটি দেখার স্বপ্ন। তার প্রতি মুহূর্তে চোখে ভাসে-সারাদিন তাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর ক্লান্ত অবসাদ দেহে ঘরে ফিরলে আঁচল দিয়ে গায়ের ঘাম মুছে দেয়ার দৃশ্যটি। যখন সে ভুলে যেতো সব দুঃখ-কষ্ট-যাতনা। সে যেন দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছে-ওই তো শিমুল আসছে; কাঁধে একটি গামছা। সবুজ একটি লুঙ্গি পরা, মাথায় উসখো খুসকো চুল! সুদর্শন যুবক। চৈত্রের প্রখর রোদ্রে আক্রান্ত হাস্যোজ্জল মুখে মলিনতার ছাপ। তবুও পারুলের চোখে চোখ পড়তেই এক চিলতে মুচকি হাসি পারুলকে মুগ্ধ করে দেয়!
‘বাবা কোথায়? বাবা ফিরে আসছে না কেন? সবুজের এই প্রশ্নের জবাবে কী বলবে, তার কোন ভাষা খুঁজে পায়না পারুল। একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না পারুল তার ছেলেকে।’ কথা বলছেনা কেন মা, বলোনা আমার বাবা কবে আসবে? সেই যে চলে গিয়েছিলো বাবা একদিন সন্ধ্যায় আর এলোনা! আর কি আসবেনা বাবা? চুপ করে থেকোনা।’-সবুজের এই দৃঢ় দাবির মুখে পারুল আর নিশ্চুপ থাকতে পারে না। বলে-‘দেখো তোমার বাবা ঠিকই আসবে একদিন, এসে তোমাকে কত্তো আদর করবে।’ শত দুঃখেও মানুষ কখনও কখনও হাসে। কিন্তু এই হাসির নেপথ্যে যে কতো বেদনার কতো কান্নার ঝর্ণাধারা লুকিয়ে থাকে, তা কেবল সে-ই জানে। সবুজকে শান্তনার কথাগুলো বলে পারুল এমনি করেই সেইদিন হেসেছিলো। বলেছিলো-‘দেশ যেদিন স্বাধীন হবে, সেদিনই তোমার বাবা আসবে বীর সৈনিকের বেশে; দেখবে সে প্রাণ খুলে হাসবে। সবাই তাকে বরণ করবে ফুলের মালা দিয়ে। তুমি ভেবোনা সোনামণি। এবার ঘুমোও।’ সবুজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়েছিলো পারুল তাকে।
কিন্তু সে তো একদিনও গুমোতে পারেনি এই ন’মাসে। প্রতিটি রজনী কেটেছে তার আকাশের তারা গুণে আর ঝিঁঝিঁর ডাক শুনে শুনে। এই রাতটিও তেমনি কেটে গিয়েছিলো পারুলের। .... হঠাৎ সেই মুয়াজ্জিনের কণ্ঠের আওয়াজ। এই মধুর ধ্বনী শুনলেই তার চোখ দু’টি ঝলসে ওঠে, গা ছমকে ওঠে; মনে পড়ে যায় সেই ন’মাস আগের গোধূলি লগ্নের কথা আরও বেশি করে। সেই গোধূলিতে বাতাসে ভেসে আসছিলো আজানের সুর। তার সঙ্গে আরও শব্দ-বীভৎস আওয়াজও ঝালাপালা করেছিলো কান, ছাপিয়ে গিয়েছিলো মুয়াজ্জিনের কণ্ঠকেও। কিন্তু আজ ভোরের নির্মল বাতাসে বাধাবিঘœহীন সেই ধ্বনি। পারুলকে বিমোহিত করে আজানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া পাখীর কলকাকলী। সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে পূর্ব দিকে; সূর্যোদয়ের আশায়। ভাবে সে আজ বুঝি সূর্যটা দিগন্ত রাঙিয়ে তার মনের অন্ধকারও দূর করে দেবে। মন উচাটন পারুলের। এদিক ওদিক তাকায়। সূর্যটা উঁকি দিয়েছে পূবে। লাল সূর্য। রক্তিম আলো ছড়াচ্ছে। সে শুনতে পায় একটি আওয়াজ ভেসে আসছে দূর থেকে। কান পাতে। ধীরে ধীরে আওয়াজটি স্পষ্ট হতে থাকে। দেখে পূর্বদিক থেকে হাজারো মানুষের মিছিল আসছে তাদের বাড়ির দিকেই। সূর্য সংগ্রামীরা মিছিল করে এসে জড়ো হয় পারুলদের কৃষ্ণচূড়ার নীচে। শ্লোগান শুনে সে বুঝতে পারে দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমরা এখন মুক্ত। পারুল খুঁজতে থাকে শিমুলকে হাজার মানুষের ভীড়ে। কিন্তু পাচ্ছে না। বরং সে শুনতে পাচ্ছে গগণবিদারী শ্লোগান-জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু!! শহীদ স্মৃতি অমর হোক! শিমুল ভাইয়ের স্মৃতি অমর হোক!

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT