উপ সম্পাদকীয়

উন্নয়নের মানবিকতা বনাম গতানুগতিকতা

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৮-২০১৯ ইং ০১:২৬:০২ | সংবাদটি ১৯৫ বার পঠিত

উন্নয়ন বলতে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষেরা অর্থনৈতিক উন্নয়নকেই বুঝে থাকেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এতোই দৃশ্যমান যে উন্নয়নের অন্যান্য মৌলিক অনুসঙ্গ গুলো এর নীচে চাপা পড়ে থাকে। সরকারও তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিমিত্তে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে রেসের ঘোড়ার মতো শেষ রেখায় পৌঁছাতে মরিয়া হয়ে উঠে। বাংলাদেশের মতো দেশে, প্রথাগত ভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিভিন্নভাবে প্রচার করে জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়। প্রচারের প্রভাবে বেশির ভাগ মানুষ তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নকেই সার্বিক উন্নয়ন বলে ভাবতে থাকেন।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে কোন দেশের জাতীয় উন্নয়নের একটি প্রধান মাপকাঠি। মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য সূচক। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের নির্ধারিত মানদন্ড অনুযায়ী এক্ষেত্রে একটি দেশের মাথাপিছু আয়। নির্ধারণ করা আছে কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এর থেকে অনেক বেশি। মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ এখন ১৬১০ মার্কিন ডলারেরও উপরে। এছাড়াও জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক এসব সূচকের নির্ধারিত মান বাংলাদেশ ২০১৮ ইংরেজির প্রথমার্ধেই অর্জন করে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে।
নোবেলবিজয়ী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিকে সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ হিসাবে গণ্য করতে সম্মত নন। মানবিক গুণাবলির উন্নয়নের মাধ্যমে জনসংখ্যাকে মানব সম্পদে রুপান্তরিত করে সামাজিক উনয়নের ভিত তৈরী করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। অমর্ত্য সেন তাই জাতিসংঘভুক্ত দেশসমূহের শিক্ষা এবং মানব সম্পদ উন্নয়ন সম্পর্কে ধারণা তৈরির জন্য, মানব উন্নয়ন সূচক প্রবর্তন করেন। উন্নয়ন বিষয়টি সাধারণ গাণিতিক সংখ্যা বা ছকে প্রদর্শনের বিষয় নয়, বরং মানুষের ক্ষমতায়ন, সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে মানবিক ও উদারনৈতিক সমাজ গঠনই উন্নয়নের প্রধান লক্ষ্য, তা’ তিনি তাঁর তত্ত্ব ও এর অনুশীলনের মাধ্যমে প্রমাণ করে দেন। বিজ্ঞান ও দর্শনের সমন্বয়ের মাধ্যমে তিনি নুতন উদারনৈতিক ও মানবিক অর্থনীতির ধারণার সূচনা করেন। দুর্ভিক্ষ, মানব উন্নয়ন তত্ত্ব, জনকল্যাণ অর্থনীতি ও গণদারিদ্র্যের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে উদারনৈতিক রাজনীতিতে তিনি যে অবদান রাখেন, তা শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় নির্ভর উন্নয়নের গতানুগতিক ধারণাকেই ভেঙ্গে দেয়নি, সকল দেশের প্রেক্ষিত বিবেচনায় গ্রহণযোগ্যতা পেতেও সমর্থ হয়।
অমর্ত্য সেনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের তত্ত্ব বিশ্লেষণ আমার এ লেখার মূল উদ্দেশ্য নয়। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, পরস্পর পরস্পরের কতোটুকু পরিপূরক এবং সার্বিক উন্নয়নে ক্ষেত্রে এসব অনুসঙ্গ যে অবিচ্ছেদ্য, এ বিষয়টি তুলে ধরাই আমার লেখাটির ক্ষুদ্র প্রয়াস। সূচকের খাঁচায় বন্দী করা উন্নয়ন নামক পাখির সৌন্দর্য দেখে আমরা যেরকম অভিভুত হই, ঠিক সেরকম দৃশ্যমান উন্নয়নের রূপ দেখে আমরা যেন সে গুলোকেই উন্নয়নের রোল মডেল ভেবে না বসি।
তত্ত্বীয় আলোচনা থেকে বিষয়টিকে মাটিতে নামিয়ে নিয়ে আসার জন্য, আমার মনে হয় কিছু বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টিকে খোলাসা করা যেতে পারে। সহজ ভাবে উপস্থাপনার জন্য একটি কল্পিত উদাহরণ দেই। ধরুন একটি দালান নির্মাণের জন্য আপনি, ইট, বালি, সুড়কি, রড ইত্যাদি সামগ্রি সংগ্রহ করে, নির্মাণ কাজ সূচনা করার চেষ্টা করলেন। বাজারে সিমেন্ট উধাও, কিন্তু আপনি দালান নির্মাণে বদ্ধ পরিকর। শুরুতেই নির্মাণ কাজে সংশ্লিষ্ট সকলেই সমস্বরে আপনাকে সিমেন্টের চাহিদার কথা মনে করিয়ে দেবে, এবং সিমেন্ট ছাড়া যে নির্মাণ কাজ অসম্ভব তা ও সুস্পষ্টভাবে আপনার সামনে ঘোষণা করবেন। সিমেন্ট তাহলে এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ সিমেন্ট হল বন্ডিং ম্যাটেরিয়েলস অর্থাৎ ইটের সাথে ইটের যুক্ত হওযার মহা গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে সিমেন্ট। এই যুক্ততা ছাড়া কোনভাবেই মজবুত, দীর্ঘস্থায়ী দালান নির্মাণ সম্ভব নয়। ম্যাটেরিয়েলস গুলো ক্রয় করে যোগানের যে সামর্থ্য বা ক্যাপাসিটি তাহলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন। আর পরস্পরের বন্ধন তৈরি করে সমাজ যখন মানুষে মানুষে সংহতি, সহমর্মিতা, উন্নত নৈতিকতা, উন্নত সংস্কৃতি তৈরি করতে সক্ষম হয়, তখনই মূলত সার্বিক উন্নয়নের সূচনা ঘটে, সিমেন্ট যেমন ইটের সাথে ইটের কঠিন বন্ধন তৈরি করে দালান কোঠাকে স্থায়ী ও বাস উপযোগী করে তুলে, স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক বন্ধনও ঠিক তেমনি উন্নত সমাজ গঠনে সহায়তা করে থাকে। এই যে পরস্পরের সাথে যুক্ত হওয়া এ কাজটিকে ত্বরান্বিত ও বেগবান করতে সহায়তা করে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উন্নয়ন। পরিশুদ্ধ রাজনীতি তিনটি অনুষঙ্গ অর্থাৎ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। সবকিছুর জন্যই গস্পরের সাথে পরস্পরের বন্ধন ও সমন্বয় খুবই প্রয়োজন।
আর একটা উদাহরণ দিয়ে সামাজিক প্রেক্ষাপটে উন্নয়নকে বুঝার চেষ্টা করি। ধরুন আপনার পাশের গ্রামে অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক মানুষেরা বসবাস করেন। সরকারি একটি প্রকল্প প্রত্যেকটি পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করলো। সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের সমন্বিত প্রয়াসে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিটি পরিবারে কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করা হল।
একটি পর্যায়ে গ্রামটির প্রতিটি পরিবার সরকারি ও অর্থনৈতিক মানদ-ে আর প্রান্তিক মানুষ হয়ে থাকলেন না। এরকমের অর্থনৈতিক ভাবে স্বচ্ছল একটি গ্রাম কে কি আমরা উন্নত গ্রাম বলে অভিহিত করতে পারি? আমার মনে হয় “উন্নয়ন অধ্যয়নের” শিক্ষার্থীরা কোন ভাবেই উল্লেখিত গ্রামটিকে উন্নত গ্রাম বলে বিবেচনা করবেন না। কেন করবেন না? তারা প্রশ্ন ছুড়ে দেবেন, গ্রামের প্রত্যেকটি মানুষের কি ন্যূনতম শিক্ষা অর্জন হয়েছে? স্বাস্থ্য সেবায় তাদের পরিপূর্ণ প্রবেশাধিকার, গ্রামের মানুষের ইচ্ছামতো রাজনৈতিক দলে অংশগ্রহণ ও নিজেদের অধিকার তুলে ধরার মত ক্ষমতা, নারীর দৃশ্যমান ক্ষমতায়ন এসব বিষয় গুলো অর্জন কিংবা প্রবেশাধিকার নিশ্চিত না হলে কোন বিবেচনাতেই গ্রামটি উন্নত গ্রাম হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেতে পারবে না। অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন অধ্যয়নের শিক্ষার্থী কেউই উন্নত গ্রাম হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করবেন না। উন্নত গ্রাম হিসাবে অভিহিত হতে হলে, শুধু উল্লেখিত বিষয় নয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক অনেক বিষয়ে পরিবর্তন বা রুপান্তর ঘটা অতি জরুরি। উন্নয়ন বিষয়টি অর্জন কোন ম্যাজিক নয়, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, গণতন্ত্রের সঠিক অনুশীলন, জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা, সর্বোপরি উন্নত নৈতিক গুণসম্পন্ন সাহসী রাজনৈতিক নেতৃত্ব এসব বিষয়ের উপস্থিতি ও সক্রিয়তা আবশ্যক।
উন্নয়নের সাথে সংস্কৃতির সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে একটু কথা বলা প্রয়োজন। সংস্কৃতি শুধুমাত্র সঙ্গীত শিল্পকলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের আচরণের সংস্কৃতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক সংস্কৃতি এক্ষেত্রে বিবেচ্য। একটি জাতির সংস্কৃতির মান বহুভাবে নির্ণীত হয়ে থাকে। জাতির আচরণে সহিষ্ণুতা, বিশেষ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জাতি কি গণতান্ত্রিক, নাকি চাপিয়ে দেয়ার উদাহরণ তৈরি করে, এ গুলো কিন্তু জাতিগত সংস্কৃতির মানদ- গঠনে ও জাতীয় উন্নয়নের ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশে জবাবদীহিতার সংস্কৃতি খুবই কার্যকর। আমাদের সার্বিক সংস্কৃতির মান যদি আমরা উন্নয়ন অর্জনের সমান্তরাল ভাবে গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন অর্জন শুধু দুরূহ’ই নয় অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সার্বিক উন্নয়নের ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে এরকম বিশ্লেষণ অনেক ক্ষেত্রে ধান ভানতে শিবের গীতের মতো মনে হয়। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়নের ধারণা তুলে ধরতে হলে, এরকম আপাত অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা খুবই জরুরি। কারণ জনগণের কাছে প্রকৃত উন্নয়ন ধারণা পরিষ্কার থাকা উচিত। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন তো জনগণের হাত ধরেই এগিয়ে চলে। তাই আমাদের ধারণাকে স্বচ্ছ রেখে, সকলের অংশ গ্রহণের মাধ্যমে, সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘ স্থায়ী উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, যে উন্নয়নের জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, অটুট বিশ্বাস, সুস্পষ্ট ধারণা এবং জনগণের পরস্পরের সাথে পরস্পরের যুক্ত হওয়ার স্বতঃস্ফূর্ত বাসনা অর্থাৎ সংহতিই পারে আমাদেরকে অভীষ্ট উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যেতে। শুধু মাত্র মাথা পিছু আয় ও প্রবৃদ্ধি অর্জন নির্ভর উন্নয়ন আমরা চাইনা, আমরা চাই সুপরিকল্পিত ও মানবিক অর্থনীতি বিকাশের মাধ্যমে সকল মানুষের স্বপ্ন পূরণে অঙ্গীকারাবদ্ধ এক মানবিক সমাজ গঠনের উন্নয়ন।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • প্রয়োজন সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন
  • চোরাকারবার বন্ধে চাই কৌশল
  • জাফলং ভ্যালি বোর্ডিং স্কুল
  • একটি বর্ণনাতীত ভাষ্য
  • Developed by: Sparkle IT