উপ সম্পাদকীয়

শিক্ষা ও নৈতিকতা

প্রাণ কান্ত দাস প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৮-২০১৯ ইং ০০:৩২:০৩ | সংবাদটি ১১১ বার পঠিত

সাধারণত: মানুষ লেখাপড়া শিখে শিক্ষিত হতে পারেন। কিন্তু সবাই সৎ, চরিত্রবান ও নৈতিক গুণের অধিকারী হতে পারেন না। যতই দিন অতিবাহিত হচ্ছে আমাদের দেশে এই সমস্যা ততই প্রকট আকার ধারণ করছে। আমরা যদি সুদূর অতীতের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, তখন শিক্ষিত লোক মাত্রই সাধারণত সৎ, চরিত্রবান ও নৈতিক গুণের অধিকারী হিসেবে সমাজে সম্মানিত হবেন। আর উচ্চ শিক্ষিত হলে তো কোন কথাই নেই। সমাজের সকলেই শ্রদ্ধায় তার প্রতি মাথা নত করতেন। তখন সমাজে লেখাপড়ার প্রতি মানুষের মধ্যে তেমন আগ্রহ ছিল না। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শতভাগ লেখাপড়া হত। এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে প্রাইভেট পড়া, কোচিং সেন্টার ইত্যাদি ছিল না। পাঠ্য পুস্তকের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোও ছিল প্রধানত নৈতিক শিক্ষা ভিত্তিক। যেমন-আমরা নিজেরাই ছোটবেলায় কবিতা শিখেছি-‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, আমি যেন সারাদিন ভাল হয়ে চলি।’ আর আজ শিশুদের শেখানো হয়-আকডুম বাকডুম ঘোড়াডুম সাজে, ঢাকডোল ঝাজর বাজে, বাজতে বাজতে চলল ঘোড়া, কমলাফুলির টিয়েটা সূর্য্যি মামার বিয়েটা।’ সেই সময় শিক্ষকের শাসনও ছিল খুবই কঠোর। শিক্ষকের শাসনের ভয়ে প্রত্যেক ছাত্র ছাত্রীকে লেখাপড়া শিখে স্কুলে আসতে হত। লেখাপড়া না শিখে ক্লাসে গেলে শিক্ষকের রোষানলে পড়তে হত। অর্থাৎ বেত্রাঘাতই তখনই একমাত্র প্রাপ্য ছিল। এভাবে স্কুল জীবনেই ছাত্র-ছাত্রীর লেখাপড়ার ভিত্তি গড়ে উঠত। এর ফলে তারা স্বাভাবিকভাবেই নৈতিক ও মানবিক গুণের অধিকারী হতেন। সুতরাং ঐ সময় সমাজে ঘুষ, দুর্র্নীতি, খুন-খারাবী, ধর্ষণ ইত্যাদি ছিল বিরল ঘটনা। এর বিনিময়ে সমাজের মানুষ পরম সুখ শান্তি ও মনের আনন্দে বাস করতেন।
কালের বিবর্তনে শিক্ষা ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তনের ফলে আজ সমাজে মানুষের মনে সেই সুখ শান্তি আর আনন্দ নেই। যা আছে তা শুধু কৃত্রিম ও বাহ্যিক। বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা দেখে মনে হয়, এর প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে-শিক্ষার্থীদের যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। আমাদের বর্তমান সরকার শিক্ষাকে অধিক জনপ্রিয় ও গণমুখী করে গড়ে তোলার জন্য সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। এজন্য বিনামূল্যে বই বিতরণ ও উপবৃত্তি প্রথা ইত্যাদি চালু করে দেশের সকল স্তরে জনগণকে শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ঘোষণায় দেশের সকল রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেছেন এবং অন্য আর এক ঘোষণায় দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি কলেজ ও একটি হাইস্কুল জাতীয়করণ করে দেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত স্থান অধিকার করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সীমাহীন আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে আজ দেশের প্রতিবন্ধিরাও লেখাপড়ায় অধিক মনোযোগী হয়েছে। গত ২১/০৭/১৯ তারিখের দৈনিক সমকাল থেকে জানা যায়, এবারের এইচ.এস.সি পরীক্ষায় জয়পুর হাটের জন্মথেকে দু’হাত হারানো বিউটি ‘এ’ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। এছাড়া পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার জন্মান্ধ হারুন পাবনার শহীদ এম মনসুর কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে জন্মান্ধ শাকিল। এছাড়া আরো ৪ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী যথাক্রমে হিমেল কান্তি দে জিপিএ-৪.৮, মোঃ সুব্রত আলম জিপিএ-৩.৮৩, ফারজানা আক্তার জিপিএ-৩.৭৫, আরফাতুল ইসলাম জিপিএ-৩.৬৭, তানভীর চৌধুরী জিপিএ-৩.৩৩ এবং ইয়াসমিন আক্তার জিপিএ ২.৫৮ পেয়ে এবারের এইচ.এস.সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
এতদসত্ত্বেও শিক্ষার যে কাক্সিক্ষত ফল অর্জিত হচ্ছে না এতে কারো দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই। এর প্রমাণ স্বরূপ সাবেক শিক্ষামন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে একদিন সিলেটে আমান উল্লাহ কনভেনশন সেন্টারে এক সেমিনারে বলেছিলেন, ‘আমি কঠোর পরিশ্রম করে দেশে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করলাম কিন্তু মানুষকে আশানুরূপ নৈতিক গুণে গুণান্বিত করতে পারলাম না। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আমি মনে করি সমস্যাটি শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত। সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি একটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পদ্ধতি এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমান শিক্ষার পরিবেশে এই পদ্ধতি কাগজে-কলমে চালু হলেও বাস্তবে দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুরোমাত্রায় চালু করা সম্ভব হয় নাই। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যপুস্তক রীতিমত না পড়েই পরীক্ষার খাতায় প্রায় মনগড়া সৃজনশীল উত্তর লিখে যাচ্ছে আর পরীক্ষায় পাশ করছে।
সাম্প্রতিককালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র উপস্থিতি খুবই হতাশাব্যঞ্জক। ভর্তির সময় তারা এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয় এবং পরীক্ষার সময় পরীক্ষা দেয়। তাদের মধ্যে যাদের যেদিন ইচ্ছা হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাশ করতে আসে। এসব প্রতিষ্ঠানে ছাত্র উপস্থিতির কোন বাধ্যবাধকতা নেই। নেই লেখাপড়া শেখারও কোন ধরাবাধা নিয়ম তাই বছরের শুরুতেই তারা প্রাইভেট পড়া ও কোচিং সেন্টারে দৌঁড়ঝাড় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু এসব পড়াতো পরীক্ষা পাশের পড়া। কীভাবে লেখাপড়া করলে তারা পরীক্ষায় পাশ করবে তারা শুধু তা-ই শেখে। এর ফলে পাঠ্যবইয়ের পড়া প্রধানত বইয়ের থেকে যায় এবং এগুলো আর তাদের শেখার সুযোগ নেই। এতে নেই কোন শাস্তির বিধান। কিছুদিন পূর্বে সরকার নিজেই তো আইন করে দিয়েছেন যে, লেখাপড়া না শেখলেও ছাত্রদের শাস্তি দেওয়া যাবে না। এই অবস্থায় তাদেরকে বুঝানো ছাড়া শিক্ষকদের আর কোন ক্ষমতা নেই। এটা ছাত্ররা জানার পর স্বাভাবিকভাবেই লেখাপড়ার প্রতি অমনোযোগী হচ্ছে। এর ফলে লেখাপড়ার পরিবেশ দিন দিন ভেস্তে চলে যাচ্ছে।
সরকারের আরেকটি অধ্যাদেশ এখানে উল্লেখ করা বিশেষ প্রয়োজন। সেটা হলো ¯œাতক শ্রেণীতে ইনকোর্স পরীক্ষায় ২০ নম্বর বরাদ্দ। এই ২০-এর মধ্যে ১৫ নম্বর টিউটরিয়াল এবং ৫ নম্বর ছাত্রদের ক্লাশে উপস্থিতির জন্য। এই আইনটি করা হয়েছে মূলত: ছাত্ররা যাতে শিক্ষকের নিকট দায়বদ্ধ থাকে এজন্য। এদিক থেকে এটা ভাল কিন্তু এটা তো নীতির কথা। বাস্তব চিত্র ভিন্ন। একদিকে এই আইনটি দ্বারা ছাত্রকে শিক্ষকের নিকট দায়বদ্ধ করা হলো এবং অন্যদিকে ছাত্রকে কোন শাস্তি দেয়া যাবে না-এই আইন দ্বারা ছাত্রকে অনেকটা উচ্ছৃল করতে সুযোগ দেয়া হল। এই অবস্থায় দুর্বল শিক্ষকের পক্ষে সবল ছাত্রদের জন্য ইনকোর্স পরীক্ষায় বরাদ্দ ২০ নম্বরের মধ্যে কত নম্বর তারা পেতে পারে-তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এছাড়া অবশিষ্ট ৮০ নম্বরের জন্য সময় ৩ ঘন্টা ৩০ মিনিট। এই ৮০ নম্বরের আবার ১০ নম্বর বরাদ্দ আছে ১০টি প্রশ্নের জন্য যা একজন ছাত্র অতি সহজেই অন্যের সাহায্য নিয়ে অহংবিৎ করতে পারে। সুতরাং ডিগ্রি পাস পরীক্ষায় কোন ছাত্র পাঠ্যবই রীতিমত পাঠ না করেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে। কাজেই ডিগ্রি পাস পরীক্ষায় পর্যন্ত শিক্ষার্থী রীতিমত পাঠ্যবই অধ্যয়ন না করা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গড়হাজির থাকার ফলে তাদের সততার নৈতিকতা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান একেবারে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণী পর্যন্ত কোথাও নৈতিকতা সম্পর্কিত নীতিবিদ্যা বিষয়টি সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় শিক্ষার্থীরা সরাসরি নৈতিকতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভে বঞ্চিত হচ্ছে।
সুতরাং সমাজ থেকে ঘুষ, দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি যাবতীয় অপরাধ সমূলে উচ্ছেদ করতে হলে শুধু অপরাধের জন্য শাস্তি বিধানই যথেষ্ট নয়। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার উপর সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অতীতের মত পাঠ্য পুস্তকের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো প্রধানত নৈতিকতা সম্পর্কিত হতে হবে। দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রীতিমত ক্লাশ অনুষ্ঠান ও ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। ছাত্রদের শাস্তিমূলক আইনটি অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করে শিক্ষক নিরাপত্তা আইন প্রবর্তন করতে হবে। সিলেবাসে নীতিবিদ্যা আবশ্যিক বিষয়ক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে সকল শিক্ষার্থীকে সরাসরি নৈতিকতা সম্পর্কে পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। আর তা হলেই ত্রিশ লক্ষ শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সোনার বাংলা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
লেখক : শিক্ষক, তাজপুর কলেজ।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বায়ু দূষণ
  • বিজয়ের মাসে প্রত্যাশা
  • বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ও দারিদ্র্য বিমোচন
  • ছায়াসঙ্গিনী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক প্রবাহিত নদী
  • বলিভিয়া : ইভো মোরালেসের উত্থান-পতন
  • সিলেট অঞ্চলের পর্যটন ভাবনা
  • মিড-ডে মিল
  • যৌতুক প্রথা নিপাত যাক
  • সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে
  • মানবাধিকার দিবস ও বাস্তবতা
  • বুয়েটের শিক্ষা
  • পাল্টে গেল শ্রীলঙ্কার ভোটের হিসাব
  • গড়ে তুলতে হবে মানবিক সমাজ
  • পাখি নিধন, অমানবিকতার উদাহরণ
  • দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান সফল হোক
  • সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক আইন-২০১৮
  • বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গ
  • বাঙালির ধৈর্য্য
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • Developed by: Sparkle IT