উপ সম্পাদকীয় ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ড 

ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৮-২০১৯ ইং ০০:৩৬:৩৫ | সংবাদটি ১৯ বার পঠিত

১৫ আগস্ট বেদনাসিক্ত একটি দিন। ঐদিন জাতি অশ্রুসিক্ত নয়নে স্মরণ করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর স্বজনদের, যারা ঐ কালো রাতের শেষ প্রহরে শহীদ হয়েছিলেন। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস, আগস্ট মাস শোকের মাস। সেনাবাহিনীর কতিপয় ভ্রষ্ট সদস্যের হাতে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহধর্মিনী বেগম ফজিলাতুন্নেসাসহ পরিবারের মোট ২৮ জন নিহত হয়েছিলেন। মর্মান্তিক এই হত্যাকা- বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালিমা লেপন করে। জাতীয় শোক দিবস পালন এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে সেই কালিমা হয়তো দূর হবে না। হত্যাকারীদের বিচার হওয়ার পরও জাতি সেই বেদনা ভুলতে পারে না। শোক দিবস পালনের মাধ্যমে ঘৃণ্য এই হত্যাকা-ের নিন্দা জানানো তাই জাতির বিবেককে জাগ্রত রাখার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।
হত্যাকা- মাত্রই জঘন্যতম অপরাধ। মানুষ মরণশীল। কিন্তু সে মৃত্যু যদি হয় অস্বাভাবিক এবং তা যদি হয় মানুষেরই হাতে-তাহলে সেই মৃত্যুকে সহজে মেনে নেওয়া যায় না। বর্তমানে সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ সমগ্র বিশ্বে বহুল আলোচিত। জঙ্গি হত্যাকারীদের প্রতি সুস্থ বিবেকবান মানুষের ঘৃণা এখন প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে। এখনকার খুনীরা ছদ্মবেশী, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট এর খুনীরা ছিল সুশৃঙ্খল বাহিনীর বিভ্রান্ত কতিপয় অমানুষ। তারা বিবেকহীন হয়েই এমন অমানবিক হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবার এ দেশের সকল স্তরের মানুষেরই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ধন্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই জাতি অর্জন করে স্বাধীনতা। তাকে এমনভাবে হত্যা করা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। তাই খুনীরা নির্দ্বিধায় বলা যায় অসুস্থ, উন্মাদ অপ্রকৃতিস্থ। আজও সে জন্য তারা কোটি মানুষের ঘৃণার পাত্র।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন উদার মনের মানুষ। তৃণমূল স্তর থেকে উঠে আসা জাতীয় নেতা। বাঙালির প্রাণপ্রিয় জননেতা। জাতিকে পাকিস্তানী শাসন শোষণ থেকে মুক্ত করার লড়াইয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে বারবার। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। জনগণকে সজাগ সচেতন করে সুকৌশলে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। তার দেখানো পথ ও আহ্বানে জাতি ১৯৭১ সালে অর্জন করে স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। বিজয়ী বাঙালির এই নেতা ১৯৭২ সালে ছাড়া পেয়ে ১০ জানুয়ারি ফিরেন স্বদেশে। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে জাতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বরণ করে নেয়। তিনি সদ্য স্বাধীন দেশের পুনর্গঠনে সচেষ্ট হন। তার নেতৃত্বে দেশ উন্নতির সোপানে উঠবে, সফল হবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন। এই প্রত্যাশায় জাতি তাঁকে ঘিরে ঐক্যবদ্ধ হয়। চলে বিধ্বস্ত দেশ গঠনের কাজ। কেউ ভাবতেই পারেনি যে, এই মহান ব্যক্তির জন্য ১৯৭৫ এর মর্মান্তিক ১৫ আগস্ট অপেক্ষা করছে।
বঙ্গবন্ধু নিজের সরলতা ও আন্তরিকতায় ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। তাই ঐ রাতে খুনীরা গুলাগুলির মধ্যে তার বাসভবনে ঢোকার পর রাতের বসনেই তিনি বেরিয়ে আসেন। জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কী চাও! এর জবাবে আসে গুলি। ঘটনাস্থলেই তিনি শহীদ হন। ঘাতকরা ছিল সংগঠিত। পরিকল্পিতভাবেই তারা হত্যাকা- চালায়। বাসভবন ঘেরাও করে। ভোর রাতে কেউ কল্পনাও করেনি যে, এমন কা- ঘটতে পারে। ঐ রাতে বঙ্গবন্ধুর বাস ভবনে যারা ছিলেন তাদের সবাইকে ওরা হত্যা করে। অন্যত্রও হানা দিয়ে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন এমন কি অবুঝ শিশুদেরও হত্যা করে।
১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট ভোর রাতে যারা শহীদ হন তাদের জাতি প্রতি বছর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বেগম ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন মহীয়সী এক রমনী, স্নেহময়ী মা। তিনিও রক্ষা পাননি।
রক্ষা পায়নি শিশু রাসেল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র। এই তালিকায় আছেন বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ কামাল, দ্বিতীয় ছেলে শেখ জামাল, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসের, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল খুকু, শেখ জামালের স্ত্রী পারভীন জামাল, বঙ্গবন্ধুর বোনের স্বামী কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি ও তাঁর স্ত্রী বেগম আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমদ, আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের ছোট মেয়ে বেবি সেরনিয়াবাত, কনিষ্ঠ পুত্র চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত আব্দুল্লা বাবু, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতে অবস্থানকারী আব্দুল নঈম খান রিন্টু। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বাইরে থাকায় ভাগ্যক্রমে রক্ষা পান।
সে ছিল এক বিভীষিকাময় রাত, এখন তা দুঃসহ স্মৃতি। এই স্মৃতি জাতির বিবেককে আলোড়িত করে। ১৫ আগস্ট শোক দিবসে আমরা এই শহীদদের জানাই শ্রদ্ধা। তাদের পরকালীন শান্তি কামনা করি।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, সিলেটের ডাক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • শিক্ষার রাজ্যে এক বিস্ময়
  • ডেঙ্গু ও বানভাসি মানুষ
  • শিল্প-সাহিত্যে ১৫ আগস্ট
  • ইমাম-মুয়াজ্জিন সার্ভিস রোলস-এর প্রয়োজনীয়তা
  • বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা
  • শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবেশ
  • তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির
  • ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়
  • বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা
  • শিক্ষা ও নৈতিকতা
  • কুরবানির সূচনা
  • কুরবানি ও আমাদের করণীয়
  • উন্নয়নের মানবিকতা বনাম গতানুগতিকতা
  • Developed by: Sparkle IT