উপ সম্পাদকীয়

তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৮-২০১৯ ইং ০০:৪৬:২৮ | সংবাদটি ১২২ বার পঠিত

বাংলাদেশের ভাটিঅঞ্চল ফরিদপুরের আরও ভাটি গোপালগঞ্জ এর টুঙ্গিপাড়া গ্রামের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে পথ-ঘাটশূন্য অঞ্চল ডিঙ্গিয়ে ঢাকা-কোলকাতা-লাহোর-করাচিতে বিভিন্ন ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সফলতা অর্জনের মাধ্যমে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কীভাবে আমাদের মুক্তির সংগ্রামের ডাক দিলেন? সকল ঝুঁকি উপেক্ষা করে এই মানুষটি কীভাবে একদিন ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি, প্রয়োজনে আরও দেবো। এ দেশের মানুষকে স্বাধীন করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ।’ (৭ মার্চের ভাষণ)।
মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি আতাউল গণি ওসমানিকে আমি খুব কাছ থেকে দেখলেও কথা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের দুজন সেক্টর কামান্ডারকে আমি কাছ থেকে দেখেছি, একজন হলেন মেজর জিয়াউর রহমান। তাঁকে দেখেছি তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে সিলেট সফরে আসলে হযরত শাহ জালাল (র.) এর মাজার জিয়ারতে এবং দরগাহ মসজিদের তৎকালীন ইমাম হাফেজ মাওলানা আকবর আলী (র.)-এর দফতরে। তাঁর সাথে হাত মিলানো ছাড়া তেমন কথা হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের কামান্ডার মেজর জলিলকে আমি খুব কাছে বসে অন্তরঙ্গ আলোচনায় দেখেছি। অনেক গল্প করেছি। দেখেছি আমি তাঁকে জাসদের নেতা থাকতে। দেখেছি জাসদ ছেড়ে হাফিজ্জী হুজুরের হাতে তাওবাহ করে খেলাফত সংগ্রাম পরিষদে আসার পরও। সর্বদাই তিনি একজন দেশপ্রেমিক বীর ছিলেন। মেজর জলিলের মাথার বাবরি চুল, সাথে লম্বা দাঁড়ি, সাদা পাঞ্জাবি আমার কাছে খুব ভালো লাগতো। আমার ভালোলাগা মানুষদের মধ্যে দেখা-নাদেখা অনেকই আছেন। তবে বঙ্গবন্ধুকে আমি সরাসরি দেখিনি। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট তিনি যখন সপরিবারে আততায়ীর হাতে শহিদ হন, তখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ। খুব স্মরণ নেই। এতটুকু স্মরণ আছে, আমরা তখন সিলেট থেকে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছি। সময় ছিলো বর্ষাকাল। নৌকায় আমাদের বাড়ি থেকে নানাবাড়ির ঘাটে যেতেই কেউ একজন বললো, শেখ মুজিবকে পরিবারে হত্যা করা হয়েছে। কিছু বুঝিনি। তবে আশির দশকের দিকে আমাকে নাড়া দেয় বঙ্গবন্ধুর ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ ভাষণটি। অতঃপর বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে শুরু করি।
বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি শুরু মিশনারি স্কুলে থাকতেই। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি স্কুলের ছাদ সংস্কারের দাবীতে একটি গ্রুপ নিয়ে ওদের সাথে দেখা করেছিলেন। এখান থেকেই নেতৃত্বের দিকে তাঁর পথচলা শুরু। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত মুসলমানদের দাবি আদায়ের আন্দোলনের অংশ হিসেবে ‘নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন’-এ যোগ দেন এবং এক বছরের জন্য নেতা নির্বাচিত হন। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে এসট্রান্স পাশ করে তিনি কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজে (যা বর্তমানে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ কলেজ) আইনে ভর্তি হলেন। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই কলেজ তখন বেশ নামকরা ছিলো। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি এই কলেজে বেঙ্গল মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠেন। এই বছর তিনি ‘বঙ্গীয় মুসলিম লীগ’-এর কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত ও পাকিস্তান পৃথক হওয়ার সময় যে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয় তাতে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে শেখ মুজিবুর রহমানও মুসলিম রক্ষা এবং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচীতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ভারত-পাকিস্তান পৃথক হয়ে যাওয়ার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ। এভাবেই তিনি আস্তে আস্তে রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয় হয়ে উঠেন। অতঃপর ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, আইয়ূব বিরোধী আন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা তাঁকে জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত মঞ্জিলে পৌঁছিয়ে দেয়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয় তাঁর নেতৃত্বে। স্বাধীন হওয়ার পর তিনি জাতিসংঘ ও জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনে বাংলাদেশের সদস্যপদ নিশ্চিত করেন, বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায় করেন, ইউরোপ-আমেরিকা ভ্রমণ করে তিনি বাংলাদেশের জন্য মানবীয় ও উন্নয়নকল্পের জন্য সহযোগিতা চান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি শাসকের দায়িত্ব হাতে নিলে কিছু চামচা কর্তৃক তাকে ঘিরে মুজিববাদ কিংবা বাকশালের জন্ম দিলে আস্তে আস্তে তাঁর জনপ্রিয়তা কিছুটা হ্রাস পেতে শুরু হয়। তাজ উদ্দিন কিংবা ড. কামাল হোসেনের চিন্তার সাথে বঙ্গবন্ধুর চিন্তার কিছুটা বেমিল ছিলো। বাঙালি জাতির আত্মার সাথে ছিলো বঙ্গবন্ধুর আত্মার সম্পর্ক, যা বাকি দুজনের ছিলো না। ভারতে বসে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে ড. কামাল হোসেন যে সংবিধান তৈরি করেন তা ছিলো এদেশের মাটি আর মানুষের সাথে সম্পর্কহীন। এই সংবিধানের সাথে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও যে একমত হতে পারেননি তা তাঁর নিজের পরবর্তী কর্মসূচীগুলো প্রমাণ করে। রুশ-ভারত কর্তৃক ছাপিয়ে দেওয়া ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা বঙ্গবন্ধু করেননি সত্য, তবে তিনি নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন এই ধর্মনিরপেক্ষতার। বঙ্গবন্ধু বলেন, এই ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, এই ধর্মনিরপেক্ষতা মানে সকলের ধর্মীয় অধিকার। ধর্মনিরপেক্ষতার অতীতের সকল সংজ্ঞাকে তিনি পাল্টিয়ে দিয়ে ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডের মাধ্যমে ইসলামি অনুশাসনের পথে অগ্রসর হলেন। তিনি ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে নিষিদ্ধ হওয়া ইসলামিক একাডেমি পুনরায় চালু করলেন। তিনি মদ তৈরি ও বিক্রয় এবং জুয়া খেলা নিষিদ্ধ করলেন। যা পরবর্তিতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আবার চালু করেছেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশ অর্গানাইজেশন অফ দি ইসলামিক কনফারেন্স ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্যপদ গ্রহণ করে। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি লাহোরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে (ওআইসিতে) যোগ দিতে পাকিস্তানে গিয়ে সেই দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করেন। জনগণের সামনে তিনি যে বক্তব্য রেখেছেন সেগুলোকে সমন্বয় করলে দেখা যাবে শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামের কথা এবং শ্লোগান দিয়েছেন বেশি। আর তিনি যে আদর্শের কথা বলেছেন তা ইসলামিকই। বাকশাল বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় ছিলো না। তা রুশ-ভারতের এজেন্ড ছিলো বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা হ্রাসের জন্য। বাকশাল গঠনের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে শুরু করে এবং এরই সূত্রধরে ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে শত্রুরা তাঁকে শহীদ করে দেয়।
বাকশাল কিংবা ৭২-এর সংবিধান দেখলে মনে হয় বঙ্গবন্ধু বাম ছিলেন, কিন্তু বাস্তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি একটি মুহূর্তও বিশ্বাসের দিকে বাম ছিলেন না। তিনি মূলত স্বাধীনতার পর আটকা পড়ে গিয়ে ছিলেন একটি বিশাল শক্তির খপ্পরে। সম্পূর্ণ বিষয়টা চলে গিয়েছিলো তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি তাঁর নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকতে চাইলেও পারেননি একদিকে তাঁর দলের ভেতরের শত্রু এবং রুশ লবি আর অন্যদিকে রুশ-ভারতের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের ফলে। এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। আমি এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি ‘দ্রাবিড় বাংলার রাজনীতি’ বইয়ে। বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে বামরা কোনোদিন স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারেনি। তারা একেক সময় একেক জনের লেজুড়বৃত্তির করে বক্তৃতা-বিবৃতিতে ব্যক্তিগত নেতা হয়েছেন। অবশ্য প্রচারে-সাহিত্যে তাদের অবস্থান খুব দৃঢ় ছিলো।
বাংলাদেশের বামপন্থীরা স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাম হিসেবে চিহ্নিত করতে চেষ্টা করে। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার এবং তার সহচর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের লোকেরা এ কাজটা খুব শক্তভাবেই করেছে। কারণ শেখ মুজিবুর রহমানকে ইসলামের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারলে সাধারণ মানুষ রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসে যাবে না। স্বাধীনতার পর সাধারণ মানুষ রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, জামায়াত, মুসলিম লীগ ইত্যাদিদেরকে ধিক্কার দিতে শুরু করলে আত্মরক্ষার্থে তারা শেখ মুজিবুর রহমানকে ইসলামের শত্রু হিসেবে প্রচার করতে লাগলো। বঙ্গবন্ধু কোনদিনই ইসলামের বিরুদ্ধে ছিলেন না। প্রকৃত অর্থে তিনি ধর্ম বিশ্বাসে ছিলেন এদেশের আরো দশজন সাধারণ মানুষের মতোই বাঙালি মুসলমান। ধর্ম বিশ্বাসে কিংবা নেতৃত্বে তিনি মূলত আমাদের সাধারণ মানুষেরই প্রতিনিধি ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে সবাই বিবেচনা করতে হবে দলীয় চিন্তার উর্ধ্বে উঠে। স্মরণ রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু কোন দলের নয়, বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির। এই বাংলাদেশ কিংবা বাঙালি জাতির ইতিহাস যতদিন থাকবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নাম ততদিন বেঁচে থাকবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বায়ু দূষণ
  • বিজয়ের মাসে প্রত্যাশা
  • বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ও দারিদ্র্য বিমোচন
  • ছায়াসঙ্গিনী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক প্রবাহিত নদী
  • বলিভিয়া : ইভো মোরালেসের উত্থান-পতন
  • সিলেট অঞ্চলের পর্যটন ভাবনা
  • মিড-ডে মিল
  • যৌতুক প্রথা নিপাত যাক
  • সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে
  • মানবাধিকার দিবস ও বাস্তবতা
  • বুয়েটের শিক্ষা
  • পাল্টে গেল শ্রীলঙ্কার ভোটের হিসাব
  • গড়ে তুলতে হবে মানবিক সমাজ
  • পাখি নিধন, অমানবিকতার উদাহরণ
  • দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান সফল হোক
  • সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক আইন-২০১৮
  • বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গ
  • বাঙালির ধৈর্য্য
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • Developed by: Sparkle IT