প্রথম পাতা

নির্মোহ-পরিচ্ছন্ন এক রাজনীতিকের বিদায়

সাঈদ নোমান প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৮-২০১৯ ইং ০৩:০১:৪৫ | সংবাদটি ৮৬ বার পঠিত

 রাজনীতির মাঠ ছেড়ে মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে দীর্ঘ লড়াই করে বিদায় নিলেন সিলেট আওয়ামী লীগের দু:সময়ের কান্ডারি আ ন ম শফিকুল হক। রেখে গেলেন নির্মোহ ও নিষ্কলুষ রাজনীতির অনুসরণীয় একটি অধ্যায়। সিলেটের রাজনীতির পরিচ্ছন্ন মুখ ছিলেন তিনি। ক্ষমতার পাদপ্রদীপে বছরের পর বছর ছিলেন। কিন্তু, নিজেকে সব দুর্নীতির উর্ধ্বে রেখে দেশ ও দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। যেভাবে অন্যের বাসায় ভাড়া থেকে সিলেট আওয়ামী লীগকে এক যুগের অধিক নেতৃত্ব দিয়েছেন, ঠিক এই ভাড়া বাসাতেই রোগ শোকে কাতর আ ন ম শফিক শেষ নি:শ^াস ত্যাগ করেছেন।
শিক্ষক ও সাংবাদিক থেকে দক্ষ রাজনীতিবিদ আ. ন. ম শফিক সিলেট আওয়ামী লীগের রাজনীতির এক বটবৃক্ষ ছিলেন। রাজনীতির জন্য জীবনের পুরোটাই বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি। স্বচ্ছ ব্যক্তি ইমেজ নিয়ে দিনরাত শ্রম দিয়ে সংগঠনকে শক্ত একটি অবস্থানে এনেছেন। তাঁর হাতে সৃষ্টি হয়েছে হাজারো নেতা-কর্মী। কিন্তু জীবনের শেষ বেলায় তিনি বড়ো অসহায়, নিঃস্ব ছিলেন। বাড়ি , গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স বিহীন আ ন ম শফিক মরণ ব্যাধি ক্যান্সারের সাথে দীর্ঘ লড়াই করে চলে গেছেন।
১৯৬৫ সালে এমসি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরই নাম লেখান ছাত্রলীগে। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জনমত সংগঠনে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে ৫ নম্বর সেক্টরে তখনকার জাতীয় পরিষদ সদস্য আব্দুল হকের সাথে কাজ করেছেন।
বিশ্বনাথ উপজেলার দশপাইকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মৌলভী তবারক আলীর ছেলে আ.ন.ম শফিকুল হক এক সময় পিতার পথ অনুসরণ করে লেগে যান শিক্ষকতা পেশায়। বিশ^নাথের মৌলভীরগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তার শিক্ষকতা শুরু। সে সময় মাস্টার সাব হিসেবে সব মহলে পরিচিতি পান তিনি। এককালে সাংবাদিকতাও করেছেন। ষাটের দশকে সাপ্তাহিক বাংলার বাণী পত্রিকায়, ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে সাপ্তাহিক খবর ও দৈনিক খবরে সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি।
এক সময় সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতা নূরুল ইসলাম খান, শাহ মোদাব্বির আলী সিলেট শহরে এসে স্থায়ী হতে ও রাজনীতি করার আহবান জানান আ.ন.ম শফিককে। এ সময় তিনি বিশ্বনাথের ৫ নম্বর দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনোনীত হন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পান দেওয়ান ফরিদ গাজী আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছিলেন ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল। ১৯৭২ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি হলে ফরিদ গাজী সভাপতি থাকেন আর শাহ মোদাব্বির আলী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এরপর সিলেট শহরে বসবাসের জন্য আসেন আ ন ম শফিক। এডভোকেট আব্দুর রহীম, ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চলসহ স্থানীয় নেতারা তাকে জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেন। এ সময় নতুন করে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন হলে সিলেট আওয়ামী লীগের কমিটিতে সদস্য হন তিনি।
এরই মাঝে ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। তখন সংগঠনের হাল ধরেন আ.ন.ম শফিক। সাবেক এমপি এডভোকেট আব্দুর রহিমকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও এডভোকেট সৈয়দ আবু নসরকে কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এ কমিটিতে নিজের শ্রমের জন্য স্থান পান আ.ন.ম শফিক। ১৯৭৭ সালে নতুন করে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন হলে সিলেট আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান এডভোকেট আব্দুর রহিম আর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান এডভোকেট আবু নসর।
১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পুরো সভাপতির দায়িত্বে আসেন এডভোকেট আব্দুর রহিম আর সাধারণ সম্পাদকের পুরো দায়িত্ব পান এডভোকেট আবু নসর। ১৯৮৬ সালের পরের সম্মেলনে সভাপতি অপরিবর্তিত থাকেন আর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আসেন আ.ন.ম শফিকুল হক। এরই মাঝে সভাপতি এডভোকেট আব্দুর রহিমের মৃত্যু হলে সিনিয়র সহসভাপতি এডভোকেট আবু নসর সভাপতির দায়িত্ব পান। ‘৯১ ও ’৯৭ সালের সম্মেলনেও শীর্ষ পদে পুরনোরাই বহাল থাকেন। ১৬ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলানোর পর ২০০২ সালের সম্মেলনে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পান আ.ন.ম শফিক। তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান ইফতেখার হোসেন শামীম। পরবর্তীতে আ ন ম শফিকুল হককে আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
রাজনীতি করতে গিয়ে অসংখ্যবার জেল-জুলুম ও হয়রানীর শিকার হয়েছেন আ.ন.ম শফিক। সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করেন। এ সময়ে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। পরে নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। ১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন করার কারণে দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন তিনি। এছাড়া খন্দকার মোশতাক, জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল এরশাদ এবং বেগম খালেদা জিয়ার শ্াসনামলে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং অনেক জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০০৬ সালে ১/১১ এর সময় কৌশলে সেনাসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ার পাশাপাশি আন্দোলন চালিয়ে গেছেন।
আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য ও সিলেটের প্রাচীনতম সাহিত প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সভাপতি আ.ন.ম. শফিকুল হক রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন, সংগঠনই ছিলো তার ধ্যান জ্ঞান। নিজের প্রতি ও স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল করেননি। কখন যে এত বড় রোগ শরীরে বাসা বেঁেধছে টেরই পাননি। ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক সময় সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ থেকে বাদ পড়ে যান। এর পর রোগ আরো বাড়তে থাকে। চিকিৎসায় ধরা পড়ে লিভার ক্যানসার। চিকিৎসকরা দ্রুত লিভার পাল্টাতে পরামর্শ দেন। এগিয়ে আসেন বিদেশে থাকা শুভাকাঙ্খিরা। তারা চিকিৎসার টাকার ব্যবস্থা করেন। তবে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে টাকা পেয়েছেন। ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের গুরগাঁওয়ে অবস্থিত ম্যাডান্টা মেডিসিটি হসপিটালে ২০১৫ সালের ৮ই মে লিভার প্রতিস্থাপন করা হয় তাঁর।
আ.ন.ম শফিকের গ্রামের বাড়ি সিলেটের বিশ^নাথ উপজেলায়। ২ ছেলে ও তিন মেয়ের সফল পিতা তিনি। ছেলে মেয়েরা পরিবার নিয়ে বিদেশে থাকেন। একই দলের মধ্যে গ্রুপিং বলতে কোনো কিছু আছে বলে মনে করতেন না বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। তিনি মনে করতেন, একই সংগঠনের কর্মীরা আপন ভাইয়ের মতো। রাজনীতি করলে ধনী হওয়া যায় না, তবে নেতা হওয়া যায় বলে আজীবন বিশ^াস ছিলো তাঁর।

শেয়ার করুন
প্রথম পাতা এর আরো সংবাদ
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি ছাড়া যে কোন পদে পরিবর্তন : কাদের
  • ডাক্তারদের ঘাড়ে কয়টা মাথা যে বলবেন খালেদা জিয়া খারাপ আছেন: ফখরুল
  • বন্ধু ভারত যেন আতঙ্ক জাগানো কিছু না করে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
  • বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন মোদি, প্রণব ও সোনিয়া
  • সড়কে নামার অপেক্ষায় ‘নগর এক্সপ্রেস’
  • ধর্মপাশায় ১৪৪ ধারা জারি
  • সকল ক্ষেত্রে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে
  • জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নয়া কমিটির প্রতি ইনাম চৌধুরীর অভিনন্দন
  • বালাগঞ্জ ওসমানীনগর মুক্ত দিবস আজ
  • বিজয়ের মাস
  • ছবি
  • লুৎফুর-নাসির জেলার এবং মাসুক-জাকির মহানগর আ.লীগের নেতৃত্বে
  • খালেদার জামিন শুনানি এজলাস কক্ষে নজিরবিহীন হট্টগোল
  • টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের কঠোর বার্তা
  • পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিনন্দন
  • ‘মুশতাককে গণপিটুনি দিয়ে মঞ্চ থেকে বের করে দেই’
  • সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চল মুক্ত দিবস আজ
  • প্রতিবন্ধীদের সম্পর্কে ‘নেতিবাচক মানসিকতা’ পরিহার করুন : প্রধানমন্ত্রী
  • বিজয়ের মাস
  • বিশ্ব ইজতেমার ১ম পর্ব শুরু ১০ জানুয়ারি
  • Developed by: Sparkle IT