ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৮-২০১৯ ইং ০১:০৮:০৭ | সংবাদটি ৫৯ বার পঠিত

সূরা : বাক্বারাহ
[পূর্ব প্রকাশের পর]
আজকাল সমগ্র বিশ্বের মুসলমান নানাবিধ বিপদাপদ ও সঙ্কটে নিমজ্জিত। অনেক অর্বাচীনের ধারণা, এ অবস্থার জন্যে সম্ভবতঃ আমাদের ইসলামই দায়ী। কিন্তু উপরোক্ত বর্ণনায় প্রতীয়মান হয়েছে যে, ইসলাম নং বরং ইসলামকে পরিহার করাই এর জন্য দায়ী। আমরা ইসলামের শুধু নামটুকু রেখেছি; আমাদের মধ্যে ইসলামের বিশ্বাস, চরিত্র, আমল ইত্যাদি কিছুই নেই।
এখানে প্রশ্ন হয় যে, আমরা যাই আছি, ইসলামেরই নাম নেই এবং আল্লাহ তা’আলা ও রসুল (সা.) কেই স্মরণ করি। পক্ষান্তরে যেসব কাফেল খোলাখুলিভাবে আল্লাহ ও রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং ইসলামের নাম মুখে উচ্চারণ করাও পছন্দ করে না, তারাই আজ বিশ্বের বুকে সব দিক দিয়ে উন্নত, তারাই বিশাল রাষ্ট্রের অধিকারী এবং তারাই বিশ্বের শিল্প ও ব্যবসায়ের একচ্ছত্র অধিপতি। দুষ্কর্মের শাস্তি হিসেবেই যদি আজ আমরা সর্বত্র লাঞ্ছিত ও পদদলিত, তবে কাফের ও পাপাচারীদের সাজা আরও বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু সামান্য চিন্তা করলেই এ প্রশ্নেরও অবসান হয়ে যায়।
প্রথমতঃ এর কারণ এই যে, মিত্র ও শত্রুর সাথে একই রকম ব্যবহার করা হয় না। মিত্রের দোষ পদে পদে ধরা হয়। নিজ সন্তান ও শিষ্যকে সামান্য বিষয়ে শাস্তি দেয়া হয়। কিন্তু শত্রুর সাথে তেমনি ব্যবহার করা হয় না। তাকে অবকাশ দেয়া হয় এবং সময় আসলে হঠাৎ পাকড়াও করা হয়।
মুসলমান যতোক্ষণ ঈমান ও ইসলামের নাম উচ্চারণ করে, আল্লাহর মাহাত্ম্য ও ভালোবাসা দাবী করে, ততোক্ষণ সে বন্ধুরই তালিকাভুক্ত থাকে। ফলে তার মন্দ আমলের সাজা সাধারণতঃ দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হয়Ñ যাতে পরকালের বোঝা কিছুটা হলেও হালকা হয়ে যায়। কাফেরের অবস্থা এর বিপরীত। সে বিদ্রোহী ও শত্রুর আইনের অধীন। দুনিয়াতে হালকা শাস্তি দিয়ে তার শাস্তির মাত্রা হ্রাস করা হয় না। তাকে পুরোপুরি শাস্তির মধ্যেই নিক্ষেপ করা হবে। ‘দুনিয়া মুমিনের জন্যে বন্দীশালা, আর কাফেরদের জন্যে জান্নাত।’ Ñমহানবী (সা.) এর এ উক্তির তাৎপর্যও তাই।
মুসলমানদের অবনতি ও অস্থিরতা এবং কাফেরদের উন্নতি ও প্রশান্তির মূলে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই যে, প্রত্যেক কর্মের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এক কর্ম দ্বারা অন্য কর্মের বৈশিষ্ট্য অর্জিত হতে পারে না। উদাহরণতঃ ব্যবসায়ের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আর্থিক উন্নতি আর ওষুধপত্রের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শারীরিক সুস্থতা। এখন যদি কেউ দিবারাত্র ব্যবসায়ে মগ্ন থাকে, অসুস্থতা ও তার চিকিৎসার প্রতি মনোযোগ না দেয়, তবে শুধু ব্যবসায়ের কারণে সে রোগের কবল থেকে মুক্তি পেতে পারে না। এমনিভাবে কেউ ওষুধপত্র ব্যবহার করেই ব্যবসায়ের বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ, আর্থিক উন্নতি লাভ করতে পারে না। কাফেরদের পার্থিব উন্নতি এবং আর্থিক প্রাচুর্য তাদের কুফরের ফলশ্রুতিতে নয়, যেমন মুসলমানদের দারিদ্র্য ও অস্থিরতা ইসলামের ফলশ্রুতি নয়। বরং কাফেররা যখন পরকালের চিন্তা-ভাবনা পরিহার করে পরিপূর্ণভাবে জাগতিক অর্থ-সম্পদ ও আরাম-আয়েশের পেছনে আত্মনিয়োগ করেছেÑ ব্যবসা শিল্প, কৃষি ও রাজনীতির লাভজনক পন্থা অবলম্বন করছে এবং ক্ষতিকর পন্থা থেকে বিরত থাকছে, তখনই তারা জগতে উন্নতি লাভ করতে সক্ষম হচ্ছে। তারাও যদি আমাদের মতো ধর্মের নাম নিয়ে বসে থাকতো এবং জাগতিক উন্নতির লক্ষ্যে যথাবিহিত চেষ্টা-সাধনা না করতো, তবে তাদের কুফর তাদেরকে অর্থ-সম্পদ ও রাষ্ট্রের মালিক বানাতে পারতো না। এমতাবস্থায় আমরা কিভাবে আশা করতে পারি যে, আমাদের (তথাকথিত নামের) ইসলাম আমাদের সামনে সকল বিজয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে দেবে? ইসলাম ও ঈমান সঠিক মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তার আসল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পারলৌকিক মুক্তি ও জান্নাতের অফুরন্ত শান্তি। উপযুক্ত চেষ্টা-সাধনা না করা হলে ইসলাম ও ঈমানের ফলশ্রুতিতে জগতে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও আরাম-আয়েশের প্রাচুর্য লাভ করা অবশ্যম্ভাবী নয়।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT