ধর্ম ও জীবন

বাইতুল্লাহর সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর বন্ধন

এইচএম মুুহিব্বুল্লাহ প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৮-২০১৯ ইং ০১:০৯:২১ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

ইসলামের পাঁচটি আরকান বা স্তম্ভের পঞ্চমটিই হলো হজ। হজ শব্দের অর্থ ইচ্ছা করা, সংকল্প করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় রাসুল (সা.) এর দেখানো পথ অনুযায়ী নির্ধারিত মাসের নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট স্থানে কাবাঘর প্রদক্ষিণ, আরাফার ময়দানে অবস্থান, সাফা-মারওয়া সায়িকরণ (গমনাগমন) প্রভৃতি কার্যাবলি পালনের নামই হজ। আর এ হজের সব বিধিবিধানও কাবা শরিফকে কেন্দ্র করেই দেওয়া হয়েছে। কাবা শরিফকে পবিত্র কোরআনে ‘আল বাইতুল হারাম’ এবং ‘আল বাইতুল আতিক’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
কাবাঘরকে সব মানবজাতির কল্যাণের প্রতীক হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এর স্থান আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত। খানায়ে কাবা সাধারণ মসজিদের মতো নিছক ইবাদাতের স্থান নয়। প্রথম দিন থেকেই এটি দ্বীন ইসলামের বিশ^ব্যাপী বিপ্লবের প্রচার কেন্দ্ররূপে নির্ধারিত হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, সেটিই হচ্ছে এ ঘর, যা বাক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্য হেদায়েত ও বরকতময়।’ (সূরা আলে ইমরান : ৯৬)। বায়হাকির বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, আদম (আ.) ও বিবি হাওয়ার পৃথিবীতে আগমনের পর আল্লাহ জিবরিল (আ.) এর মাধ্যমে তাদের কাবাগৃহ নির্মাণের আদেশ করেন। এ গৃহ নির্মিত হয়ে গেলে তাদেরকে তাওয়াফ করার আদেশ দেওয়া হয় এবং বলা হয়, ‘আপনি সর্বপ্রথম মানব এবং এ গৃহ সর্বপ্রথম গৃহ যা মানবম-লীর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে।’ (ইবনে কাছির)। বলা হয়, আদম (আ.) এবং বিবি হাওয়া পৃথিবীতে এসে হেজাজের আরাফাত নামক স্থানে মিলিত হন। এ কারণে হেজাজের এ স্থানটিকে আরাফাত (জানাশোনা) নামকরণ করা হয়েছে।
পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর কাবাগৃহ নির্মাণ করেন পৃথিবীর প্রথম মানব ও নবী আদম (আ.)। তারপরে নুহ (আ.) এর প্লাবন পর্যন্ত এ ঘর অক্ষত থাকে। পরে ইবরাহিম (আ.) প্রাচীর ভিত্তির ওপর এ গৃহ নির্মাণ করেন। এরপর কালের আবর্তনে জুরহাম গোত্র, আমালেকা সম্প্রদায় এবং কোরাইশরা এ গৃহ পুনর্র্নিমাণের দায়িত্ব পালন করে। সর্বশেষ এ নির্মাণে আমাদের প্রিয়নবী (সা.) নিজে শরিক হয়ে তাঁর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে হাজরে আসওয়াদ প্রতিস্থাপন করেন।
ইবরাহিম (আ.) এর পূর্ববর্তী সময়ে হজ বর্তমান সময়ের মতো ফরজ ছিল না। এটি অন্যতম ইবাদাত হিসেবে পরিণত হয় মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.) এর কাবা নির্মাণের পরবর্তী সময় থেকে। আরবি তথা হিজরি সনের ১২তম মাসের নাম জিলহজ। এ মাসেই মহান আল্লাহ ইবরাহিম (আ.) কে হজ ফরজ হওয়ার বিষয়ে ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘এবং মানুষের মধ্যে হজের জন্য ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসবে।’ (সূরা হজ : ২৭)।
ইবনে আবি হাতেম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, যখন এ ঘোষণা প্রদানের নির্দেশ করা হয়, ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে আরজ করলেন, এটি তো জনমানবহীন প্রান্তর, এখানে ঘোষণা শোনার মতো কেউ নেই। জনবসতি এলাকায় আমার এ আওয়াজ কীভাবে পৌঁছবে? আল্লাহ প্রত্যুত্তরে বললেন, তোমার কাজ শুধু ঘোষণা করা। আর তোমার আওয়াজকে সারা জাহানে পৌঁছানোর দায়িত্ব আমার। এরপর ইবরাহিম (আ.) মাকামে ইবরাহিমে দাঁড়িয়ে অথবা কোনো বর্ণনায় আছে যে, তিনি কুবায়স পাহাড়ে আরোহণ করে আল্লাহর এ নির্দেশ পালন করেন। আল্লাহ নবীর এ আওয়াজকে শুধু পৃথিবী নয় বরং আলামে আরওয়াহ তথা রুহের জগতেও পৌঁছে দেন। ফলে কেয়ামত পর্যন্ত আগত প্রত্যেক রুহের কাছেই এ ইবরাহিমি ঘোষণা অতি পরিচিত হয়ে রইল। সুতরাং যার ভাগ্যে আল্লাহ এ পবিত্র ইবাদাত লিখে রেখেছিলেন তারা প্রত্যেকেই এ ঘোষণা শোনামাত্র ‘লাব্বাইক আল্লহুম্মা লাব্বাইক’ বলে অঙ্গীকার করেছে। এর ফলেই আল্লাহর এ জমিনের প্রতিটি প্রান্ত থেকে কোনো অনুরোধ, নিবেদন, প্রচারপত্র ও বিজ্ঞাপন ছাড়াই প্রতি বছর অগণিত মুসলিম তাদের কৃত অঙ্গীকারকে পূরণ করার জন্য লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত করে কাবা প্রান্তর।
আল্লাহ নিজে তাঁর ঘরের মেহমানদের সব শত্রুর পরাশক্তি থেকে মুক্ত করে অবারিত রহমতের চাদরে আগলে রাখেন। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তারা কি দেখে না যে, আমি একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল করেছি? অথচ এর চতুষ্পাশের্^ যারা আছে তাদের ওপর আক্রমণ করা হয়।’ (সূরা আনকাবুত : ৬৭)। এ শহরে যে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। আমরা বাদশাহ আবরাহার ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে কাবা ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে অবগত আছি। আল্লাহ ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি প্রেরণ করে তাদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে তাদেরকে ভক্ষিত তৃণসদৃশ করে দেন।
এ পবিত্র ভূমিতে ইবরাহিম (আ.) এর অজস্র স্মৃতি রয়েছে। জীবনের অন্তিম মুহূর্তে তার কোলজুড়ে আসে এক পুত্র সন্তান, যার নাম ইসমাইল। আল্লাহর নির্দেশে আদরের এ সন্তান ও বিবিকে বাইতুল্লাহর কাছে রেখে অন্যত্র রওয়ানা হলেন। শত-সহস্র আদরের ঝংকার হৃদয়মাঝে কড়া নাড়লেও আল্লাহর নির্দেশের ঊর্ধ্বে ছিল না মোটেই। তবে যাওয়ার সময় তিনি আল্লাহর কাছে সঁপে দিয়ে গেলেন এমন দোয়া করে যা আল্লাহর খুবই পছন্দ হয়েছে বলে পবিত্র কোরআনে উদ্ধৃত করেছেন। ‘হে পালনকর্তা! নিশ্চয়ই আমি আমার পরিবারকে আপনার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় রেখে যাচ্ছি, যাতে তারা নামাজ কায়েম করে। অতঃপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদের ফলাদি দ্বারা রুজি দান করুন, আশা করা যায় তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।’ (সূরা ইবরাহিম : ৩৭)।
আল্লাহ দোয়া কবুল তো করলেনই সেই সঙ্গে আমাদের জন্যও বেশ কিছু নিদর্শন দিলেন। বিবি হাজেরা ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত শিশু সন্তান ইসমাইলের পিপাসা নিবারণের জন্য পানির খোঁজে ‘সাফা এবং মারওয়া’ পাহাড়ের মাঝে ছোটাছুটি করে যে কষ্ট করেছেন এবং তার প্রতি যে মমতা দেখিয়েছেন সেটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিল। সূরা বাকারায় আল্লাহ নিজে তার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। ‘নিশ্চয়ই সাফা এবং মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনাবলির মধ্যে অন্যতম।’ (সূরা বাকারা : ১৫৮)।
এ নিদর্শন আজও স্বগর্বে মহিয়ান। যারা হজব্রত পালন করেন তারা এ নিদর্শনের সাক্ষী হয়ে সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সায়ি (দৌড়াদৌড়ি) করেন। বিবি হাজেরার হতাশার সময় ইসমাইল (আ.) এর পায়ের আঘাতকে কেন্দ্র করে আল্লাহ আমাদের দান করেন এক মহা নিদর্শন ‘জমজম’ যা অদ্যাবধি বহমান। প্রতি বছর হজব্রত পালনকারীদের অল্লাহ এ জমজমের পানি দ্বারা আপ্যায়ন করেন, যা অত্যন্ত বরকতপূর্ণ। যে কূপ ও পানির রহস্য আজও অজানা। আল্লাহর আরেক অপরূপ নিদর্শনের নাম ‘মাকামে ইবরাহিম’ তথা ইবরাহিম (আ.) এর দাঁড়ানোর স্থান। এটি একটি পাথর, যা কাবা শরিফের পাশে চারদিকে লোহার বেষ্টনীর ভেতর একটি ক্রিস্টালের বাক্সে বিদ্যমান। এটিই পৃথিবীর প্রযুক্তির সহায়তা ব্যতীত স্বয়ংক্রিয় লিফট। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এ পাথরটির সাহায্যে ইবরাহিম (আ.) ও পুত্র ইসমাইল (আ.) পবিত্র কাবাঘর পুনর্র্নিমাণ করেন। হাজিরা একে সামনে রেখে ২ রাকাত নামাজ আদায় করে থাকেন।
আল্লাহর আরেকটি মহান নিদর্শন সেখানে রয়েছে, সেটি ‘হাজরে আসওয়াদ’। এটি কাবা শরিফের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে মাতাফ (তাওয়াফ করার স্থান) থেকে দেড় মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এটি জান্নাতি পাথর। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহিম বেহেশতের দুটি ইয়াকুত পাথর।’ (তিরমিজি)।
আবহমানকাল থেকেই এ পবিত্র ভূমির প্রতি মুসলিম-অমুসলিম সবার সম্মান ছিল চোখে পড়ার মতো। আল্লাহ মুসলিমদের জন্য পবিত্র হজ পালনের প্রতিদানও ঘোষণা করেছেন অগণিত। আল্লাহ আরাফাতের দিন হাজীদের দোয়া কবুল করেন। হাদিসে এসেছে, আরাফার দিনের মতো শয়তান এত বেশি লজ্জিত ও অপদস্থ আর কোনোদিন হয় না, কেননা এ দিন আল্লাহ তায়ালা স্বীয় বান্দার প্রতি অগণিত রহমত বর্ষণ করেন ও অসংখ্য গোনাহ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তায়ালা কাবার প্রান্তরে মুসলিমদের এত বেশি ক্ষমা করেন এবং এত নিয়ামতের চাদরে আবৃত করে রাখেন, যার মোহে, আকর্ষণে গোটা বিশে^র নানা প্রান্ত থেকে অগণিত মুসলিম কাবা শরিফে এসে লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT